শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১০ বছরে ৪টি অনন্য অর্জন খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

একটি জাতির ইতিহাসে কিছু সময়কাল আসে যা কেবল উন্নয়নের জন্য নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের এই এক দশক তেমনই এক সোনালী অধ্যায়। এই ১০ বছরে বাংলাদেশ এমন ৪টি ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বকে যেমন শক্তিশালী করেছে, তেমনি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করে বিশ্বদরবারে এক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।

এই এক দশকের প্রথম ও প্রধান অর্জন হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন করে রায় কার্যকর করা। ১৯৭৫ সালের কলঙ্কিত অধ্যায়ের বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ দীর্ঘ ৩৪ বছরের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পায়। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু এবং শীর্ষ অপরাধীদের দণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের ঋণ শোধ করা হয়।

তৃতীয় অনন্য অর্জনটি হলো আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে মায়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে। চতুর্থত, দীর্ঘ ৬৮ বছরের মানবিক বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে ভারতের সাথে ঐতিহাসিক ছিটমহল বিনিময় চুক্তি (২০১৫) বাস্তবায়ন। এর মাধ্যমে কোনো প্রকার সংঘাত ছাড়াই ১৬২টি ছিটমহলের হাজার হাজার মানুষ ফিরে পেয়েছে তাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার।

বর্তমান নিবন্ধে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে অর্জিত এই ৪টি যুগান্তকারী সাফল্যের পটভূমি, আইনি লড়াই এবং চূড়ান্ত অর্জনের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে “১০ বছরে ৪টি অনন্য অর্জন” খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

 

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে "১০ বছরে ৪টি অনন্য অর্জন" খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

 

জাতির পিতার হত্যার বিচারের রায় কার্যকর

  • ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
  •  দায়মুক্তি আইন বা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়।
  •  বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার।
  •  ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মহিতুল। ইসলাম বাদী হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মামলা করেন।
  •  মোট চার ধাপে চলে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার কাজ।
  •  ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল বঙ্গবন্ধুর হত্যার মামলার রায়ে ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন।
  •  নিম্ন আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল শুনানিতে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ বিভক্ত রায় দেয়।
  •  বিচারপতি এম রুহুল আমিন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫ আসামির মধ্যে পাঁচ আসামিকে খালাস দিয়ে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। আর বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ আসামির সবার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
  • এরপর ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ তৃতীয়বারের মত রায় দিয়ে ১৫ জনের মধ্যে তিন জনকে খালাস দিয়ে ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
  • কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোট ক্ষমতায় এলে মুজিব হত্যার বিচার কাজ আবার আড়ালে চলে যায়।
  • ছয় বছর পর ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তত্ত্ববাবধায়ক সরকারের শাসনামলে তিন বিচারপতির বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত পাঁচ আসামির আপিল শুনানি গ্রহণ করতে শুরু করেন।
    ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারকার্যে গতি আনয়ন করে।
  • এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৯ সালে ১৯ নভেম্বর ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে চতুর্থবারের মত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ।
  • এই রায়ের মাধ্যমে ১৩ বছর ধরে চলা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আইনি ও বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়।
  • ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসির কার্যকর করা হয়।
  • তারা হ’ল: লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি) ও লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার) এখনও ৬জন বিদেশে পালিয়ে রয়েছে। পলাতকরা হ’ল: কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ, লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল এএম রাশেদ চৌধুরী, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, লে. কর্নেল এস এইচ নূর চৌধুরী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুল মাজেদ।
  • এক আসামী আজিজ পাশা জিম্বাবুয়েতে ২০০২ সালে মারা যায়।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার

  •  ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার বিষয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই গণদাবী অন্তর্ভুক্ত করে।
  • ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে বিজয় লাভ করার পর আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
    ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে এই বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাশ হয়।
  • সংসদে গ্রহীত প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকার বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস অ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুযায়ী অভিযুক্তদের তদন্ত এবং বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
  •  সরকারের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত ঘোষণাটি আসে ২০০৯ সালের ২৫ মার্চ।
  •  সরকার ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট সংশোধনের জন্য ২০০৯ সালের ২১ মে বিশেষজ্ঞদের মতামত চেয়ে ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টটি আইন কমিশনে পাঠায়।
  •  আইন কমিশন দেশের বিশেষজ্ঞ আইনজীবী, বিচারপতি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং কয়েকজন আইনজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে ১৯৭৩ সালে প্রণীত ট্রাইব্যুনালে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সংশোধন আনার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেয়।
  • আইন কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭৩ সালে প্রণীত আইনকে যুগোপযোগী করার জন্য ২০০৯ সালের ৯ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কিছু সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাশ করা হয়।
  •  স্বাধীনতা লাভের ৩৯ বছর পর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়।
  •  এরই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার এবং তাদের অপরাধের বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেয় ট্রাইব্যুনাল। • বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পুরাতন হাইকোর্ট ভবনকে আদালত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে "১০ বছরে ৪টি অনন্য অর্জন" খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

 

বিচারের রায়

  • ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম রায়টি দেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
  • রায়ে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রোকন আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ হয়। পলাতক থাকায় তার রায় এখনও কার্যকর করা যায়নি।
  • এ পর্যন্ত ৩০ মামলার রায় হয়েছে।
  • এর মধ্যে আপীল বিভাগে ৭টি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
  • এখনও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ১৯টির বেশি মামলা।
  • সাতটি রায়ের মধ্যে ৬টিতে ফাঁসির আদেশ হয় কার্যকর করেছে সরকার।
  • প্রথম ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয় ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার।
  •  দ্বিতীয় অপরাধী হিসেবে ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল রাত ১০টা ১ মিনিটে জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
  • জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে।
  • জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ২০১৬ সালের ১১ মে রাত ১২টা ১০ মিনিটে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
  • জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কাশিমপুর কারাগারে রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে ।
  • এছাড়া আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করছে জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।
  • ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর কারাগারে মারা গেছে ১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম ।
  • বিএনপির সাবেক নেতা আবদুল আলীম আজীবন কারাদণ্ড ভোগ করা অবস্থায় ২০১৪ সালের ৩০ আগস্ট মারা যায়।

মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সীমানার বিরোধ নিষ্পত্তি

  •  তিন দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিবেশী মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ চলছিল।
  • ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আনক্লস অনুসমর্থনের মধ্যে দিয়ে সমুদ্রে ন্যায্য অধিকারের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
  •  সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশন আনক্লজ অনুসমর্থনের পর ১০ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১১ সালের জুলাই মাসের মধ্যে মহীসোপানের দাবী জাতিসংঘের নিকট জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু ২০০৮ সাল পর্যন্ত সে কাজ সম্পন্ন হয়নি।
  •  ২০০৯ সালের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। আনক্লস মেনেই বাংলাদেশ জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত ইটলসে ১৪ ডিসেম্বর ২০০৯ সালে মামলাটি দাখিল করে বাংলাদেশ।
  •  বিরোধ নিষ্পত্তিতে ইটলসের বিচারিক এখতিয়ার মেনে নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বিশেষ মতৈক্য হয়। এটি পরে ইটলসের ১৬তম মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
  • ২০১০ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ নিজের পক্ষে সব দালিলিক প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করে। আর মিয়ানমার তাদের প্রমাণ জমা দেয় সে বছরের ১ ডিসেম্বর।
  • মিয়ানমারের দাবির বিপক্ষে বাংলাদেশ বক্তব্য উপস্থাপন করে ২০১১ সালের ১৫ মার্চ।
  • আর বাংলাদেশের যুক্তির বিপক্ষে মিয়ানমার তাদের বক্তব্য তুলে ধরে ২০১১ সালের ১ জুলাই।
  •  ২০১১ সালের ৮ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই দফায় মৌখিক শুনানিতে নিজেদের পক্ষে নারিগুলো তুলে ধরে।
  • সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রসীমার দাবি পেশ করে বাংলাদেশ।
  • অন্যদিকে মিয়ানমারের যুক্তি ছিল, সমুদ্র উপকূল থেকে সমদূরত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
  • এই রায়ের ফলে উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
  • মিয়ানমারের পর ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়। ২০১৪ সালের ৭ই জুলাই ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মামলার নিষ্পত্তি হয়।
  • সালিসি আদালতের রায়ে বঙ্গোপসাগরের বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশ পেয়েছে। বাকি ছয় হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার পেয়েছে ভারত।
  • খাই দুটি রায়ের ফলে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের বিষয়টি সুরাহা হওয়ায় এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত হয়।

 

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে "১০ বছরে ৪টি অনন্য অর্জন" খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

 

ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়

  • অখণ্ড ভারত বিভক্ত করে ভারত এবং পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ১৯৪৭ সালে রেডক্লিফের মানচিত্র বিভাজন থেকেই উদ্ভব হয় ছিটমহলের।
  • এক দেশের ভূখণ্ডে থেকে যায় অন্য দেশের অংশ। এতে এক অসহনীয় মানবিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। • ১৬২টি ছিটমহল ছিল দুই প্রতিবেশী দেশে। এর মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ছিল বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ছিল ভারতের অভ্যন্তরে।
  • ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ছিটমহলে বসবাসরত লোকসংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ছিটমহলের লোকসংখ্যা ছিল ১৪ হাজার।
  • ২৪ হাজার ২৬৮ একর ভূমি নিয়ে দুই দেশের ছিটমহল ছিল। তার মধ্যে ভারতের জমির পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ১৫৮ একর। বাংলাদেশের ছিটমহলের জমির পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ১১০ একর।
  •  ভারতীয় ছিটমহলগুলোর অধিকাংশই ছিল বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। এসবের মধ্যে লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি ও নীলফামারিতে ৪টি ভারতীয় ছিটমহল ছিল।
  •  অপরদিকে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের অবস্থান ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। এর মধ্যে ৪৭টি কুচবিহার ও ৪টি জলপাইগুড়ি জেলায় ছিল।
  •  ১৯৭৪ সালে ভূমি বিনিময় নিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যা ইতিহাসে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি নামে পরিচিত।
  • বাংলাদেশ চুক্তিটি অনুসমর্থন করলেও ভারত তখন তা করেনি।
  • ২০১১ সালে সীমান্ত চুক্তির সঙ্গে সই হয় প্রটোকল। অনিবার্য হয়ে পড়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রটোকলসহ সীমান্ত চুক্তি কার্যকর করতে ভারতের সংবিধান সংশোধন।
  • ২০১৫ সালের ৫ মে ভারতের রাজ্যসভায় সীমান্ত বিল অনুমোদন করা হয়। এর দু’দিন। পর ৭ মে ভারতের লোকসভায়ও বিলটি পাস হয়।
  • এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালে স্বাক্ষরিত এ বিষয়ক প্রটোকল বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়।
  • সীমান্ত বিল পাসের পর ২০১৫ সালের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফর করেন। সে সময় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে সীমান্ত বিলের চুক্তি বিনিময় হয়।
  • ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহল বিনিময় চুক্তি কার্যকর হয়।
  •  দীর্ঘদিনের বন্দিত্বের অবসান হয় ভারত ও বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহলের ৫৫ হাজার মানুষের।

 

পরিশেষে বলা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এই ১০ বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কলঙ্ক ও অমীমাংসিত সমস্যা থেকে মুক্তির এক মহাকাব্যিক সময়। জাতির পিতার হত্যার বিচার সম্পন্ন করা এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল আইনের শাসনই প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং বিশ্বদরবারে এক অকুতোভয় ও নীতিবান রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই বিচারিক বিজয় জাতিকে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস থেকে মুক্তি দিয়ে নতুন প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত করেছে।

একইসাথে, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির ওপর অধিকার এবং ৬৮ বছর ধরে মানবেতর জীবন যাপন করা ছিটমহলবাসীদের বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে একীভূত করা ছিল দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এক অসামান্য কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সাফল্য। এই ৪টি অনন্য অর্জন কেবল রাজনৈতিক বিজয় নয়; এগুলো বাংলাদেশের মানচিত্রকে করেছে নিষ্কণ্টক এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিয়েছে একটি গৌরবোজ্জ্বল ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার এই দূরদর্শী নেতৃত্বই প্রমাণ করে যে, সঠিক সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐক্য থাকলে যেকোনো অসম্ভাবকে বাস্তবে রূপান্তর করা সম্ভব।