আরবের বাইরে প্রথম মসজিদ , ভারতবর্ষ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সহনশীলতা । ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা এক বিস্ময়কর তথ্য পাই—মক্কা-মদিনা তথা আরবের বাইরে প্রথম মসজিদের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল এই দক্ষিণ এশিয়ায়, বর্তমান ভারতের মাটিতে। এটি কেবল ধর্মের প্রচার নয়, বরং প্রাচীন ভারতভূমির অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং ভিন্নমতের মানুষের প্রতি সহনশীলতার এক জীবন্ত সাক্ষ্য।

১. চেরামন জুম্মা মসজিদ (Cheraman Juma Masjid)

কেরালার কোডুঙ্গালুরে অবস্থিত এই মসজিদটি নির্মিত হয় ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে। এটিই ভারতবর্ষের এবং আরব উপদ্বীপের বাইরে নির্মিত ইতিহাসের প্রাচীনতম মসজিদ।

প্রতিষ্ঠাতা:

বলা হয়, সাহাবি মালিক দ্বীনদার (রা.) এবং তাঁর সাথীরা তৎকালীন স্থানীয় হিন্দু রাজা ‘চেরামন পেরুমল’-এর অনুমতি ও সহযোগিতায় এটি নির্মাণ করেন।

স্থাপত্যশৈলী:

এই মসজিদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নির্মাণশৈলী। এটি শুরুতে দেখতে আরবের মসজিদের মতো ছিল না, বরং স্থানীয় কেরালা বা ‘দ্রাবিড়ীয়’ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছিল। মসজিদের ভেতরে কাঠের কাজ এবং নকশা প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের শৈলীর সাথে মিল সম্পন্ন।

প্রাচীন প্রদীপ:

এই মসজিদে একটি প্রাচীন তেলের প্রদীপ (Lamp) রয়েছে যা প্রায় ১০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রজ্জ্বলিত রাখা হয়েছে। সকল ধর্মের মানুষ এই প্রদীপের জন্য তেল দান করে, যা ভারতের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক।

কিবলার দিক:

কথিত আছে, এই মসজিদটি নির্মাণের সময় এর কিবলা নির্ধারণে স্থানীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। এটি ভারতের প্রথম মসজিদ যা সরাসরি মক্কার কাবার দিকে মুখ করে নির্মিত।

রাজা চেরামন পেরুমল:

লোকগাঁথা অনুযায়ী, এই রাজা স্বপ্নে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হতে দেখেছিলেন এবং পরে আরব বণিকদের কাছে এর অলৌকিক ব্যাখ্যা শুনে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি মক্কায় গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

 

পালাইয়া জুম্মা পল্লী - কিলাকারাই পুরাতন জুম্মা মসজিদ
পালাইয়া জুম্মা পল্লী – কিলাকারাই পুরাতন জুম্মা মসজিদ

 

২. চেরামন জুম্মা মসজিদ (Cheraman Juma Masjid):

তামিলনাড়ুর কিলাকারাই নামক প্রাচীন বন্দরে এটি অবস্থিত। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, এটি ৬২৮ থেকে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়।

নির্মাণ ইতিহাস:

ইয়েমেনি বণিকরা যখন বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভারতে আসেন, তখন স্থানীয় চোল/পান্ড্য রাজাদের (হিন্দু) আনুকূল্যে এই ইবাদতখানাটি তৈরি করা হয়।

সমুদ্র তীরের দুর্গ:

এই মসজিদটি দেখতে অনেকটা দুর্গের মতো। এর দেওয়ালগুলো অত্যন্ত পুরু এবং এটি সমুদ্র উপকূলের পাথর ও চুনাপাথর দিয়ে তৈরি। একে ‘কিলাকারাই পুরাতন জুম্মা মসজিদ’ বলা হয়।

বাইজান্টাইন ও দ্রাবিড়ীয় প্রভাব:

এই মসজিদের কারুকাজে বাইজান্টাইন (প্রাচীন রোমান) এবং স্থানীয় দ্রাবিড়ীয় ঘরানার এক অপূর্ব মিশেল দেখা যায়। মসজিদের স্তম্ভগুলোতে খোদাই করা নকশাগুলো তৎকালীন শিল্পকলার এক অনন্য নিদর্শন।

বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু:

তৎকালীন সময়ে এই মসজিদটি কেবল ইবাদতখানা ছিল না, বরং এটি ছিল আরব ও দক্ষিণ ভারতের বণিকদের মিলনমেলা। এখানে বসেই লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যের বড় বড় চুক্তি সম্পন্ন হতো।

পুনর্নির্মাণ:

বর্তমানের কাঠামোটি মূলত ১১ শতকের দিকে সংস্কার করা হয়েছিল, তবে এর ভিত্তিটি ৬২৮-৬৩০ খ্রিস্টাব্দের আদি কাঠামোর ওপরই দণ্ডায়মান।

চেরামন জুম্মা মসজিদ - ২০১২ সাল
চেরামন জুম্মা মসজিদ – ২০১২ সাল

এই দুটি মসজিদ মক্কা-মদিনা তথা আরবের বাইরে প্রথম মসজিদ।

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই দুটি মসজিদই নির্মিত হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায়। যখন খোদ আরবের অনেক অঞ্চলে ইসলাম পূর্ণাঙ্গরূপে বিস্তৃত হয়নি, তখন ভারতের রাজারা মুসলিম বণিকদের মসজিদ তৈরির ভূমি দান করেছিলেন।

ভারতভূমি কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। শতাব্দী ধরে এটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিতাড়িত ও নির্যাতিত মানুষের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে কাজ করেছে:

ইহুদিদের আশ্রয়:

রোমান বা ইউরোপীয় দেশগুলোতে ইহুদিরা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হলেও, ভারতবর্ষে তারা দাঙ্গা বা ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়নি।

পার্সিদের আগমন:

ইরান থেকে বিতাড়িত পার্সিরা (পার্সি ধর্মাবলম্বী) তাদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে এই ভারতেই প্রথম আশ্রয় পায় এবং আজও তারা অত্যন্ত সম্মানের সাথে এখানে বসবাস করছে।

মুসলিম গোত্রগুলোর আশ্রয়:

ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন আরবে অন্তর্কোন্দল শুরু হয়, তখন তথাকথিত শক্তিশালী শাসকদের দ্বারা বিতাড়িত বা দুর্বল অনেক ধর্মীয় গোত্র এই ভারতভূমিতে এসে নিরাপত্তা খুঁজে পেয়েছিল।

প্রকৃতির ধর্ম ও সহনশীলতা

কেরালার চেরামন মসজিদে আজও যে সহস্র বছরের পুরোনো প্রদীপটি জ্বলছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—এদেশ কেবল ধর্মের সংঘাত দেখেনি, বরং প্রদীপে তেল ঢেলে একে অপরের ধর্মকে রক্ষা করার এক দীর্ঘ পরম্পরাও দেখেছে। চেরামন পেরুমল এবং কিলাকারাইয়ের এই মসজিদগুলো আজ কেবল মুসলিমদের সম্পদ নয়, বরং অখণ্ড ভারতবর্ষের উদারতার আন্তর্জাতিক সনদ।

ভারতবর্ষের এই দুটি প্রাচীন মসজিদ কেবল ইটের দালান নয়; এগুলো সাক্ষ্য দেয় যে এদেশের মাটির ধর্ম হলো সহনশীলতা। হিন্দু রাজারা মুসলিমদের মসজিদ বানাতে ভূমি দিয়েছেন, পার্সিদের মন্দির গড়তে বাধা দেননি—এই উদারতাই ভারতকে পৃথিবীর মানচিত্রে অনন্য করে তুলেছে।

আপনার ব্যক্তিগত দ্বীন বা ধর্ম যা-ই হোক না কেন, মাটির ও প্রকৃতির একটি ধর্ম আছে—তা হলো ‘সহাবস্থান’। প্রকৃতি সবাইকে গ্রহণ করে। ইতিহাসের পাতায় এরকম শত শত ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা নয় বরং একে অপরকে সম্মান জানানোই ধ্বংস থেকে বাঁচার একমাত্র পথ। প্রকৃতির এই সহনশীল ধর্মের বিরোধিতা করলে পতন অনিবার্য।

তথ্যসূত্রসমূহ (Sources):

  • Official Website of Cheraman Juma Masjid: এই মসজিদের দাপ্তরিক পোর্টালে এর ইতিহাস, রাজা চেরামন পেরুমল এবং মালিক দ্বীনদারের আগমনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
  • Archaeological Survey of India (ASI): ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ কর্তৃক কেরালা উপকূলের প্রাচীন স্থাপত্য নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টগুলোতে এই মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকৃত।
  • Kerala Tourism Department: কেরালার পর্যটন ও সংস্কৃতি বিষয়ক অফিসিয়াল আর্কাইভে এই মসজিদকে ভারতের প্রাচীনতম মসজিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
  • The Hindu (Archives): ভারতের প্রখ্যাত সংবাদপত্র ‘দ্য হিন্দু’-তে তামিলনাড়ুর কিলাকারাই বন্দরের ইতিহাস এবং এই প্রাচীন মসজিদের বাইজান্টাইন স্থাপত্যশৈলী নিয়ে বেশ কিছু গবেষণাধর্মী ফিচার প্রকাশিত হয়েছে।
  • Tamil Nadu Wakf Board Records: তামিলনাড়ু ওয়াকফ বোর্ডের দাপ্তরিক নথিতে এই মসজিদের প্রাচীনত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।
  • History of the Tamil Muslims (Book): জে. রাজা মোহাম্মদ রচিত এই গ্রন্থে দক্ষিণ ভারতের সাথে আরব বণিকদের প্রাচীন বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের দালিলিক প্রমাণ রয়েছে।
  • UNESCO – Silk Road Project: ইউনেস্কোর ‘সিল্ক রোড’ প্রকল্পে ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক রুটে অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদগুলোকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
  • History of Islam in South Asia (Academic Paper): বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঐতিহাসিকদের গবেষণাপত্রে মালিক দ্বীনদার (রা.)-এর নেতৃত্বে আরবের বাইরে প্রথম মিশন সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা রয়েছে।

 

আরও পড়ুন:

Leave a Comment