প্রভা আত্রেও চলে গেলেন | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

প্রভা আত্রেও চলে গেলেন।
ওনার মরু বিহাগ শুনতে শুনতে বৌকে বলতাম, যদি কোনদিন ওনাকে প্রেম নিবেদনের সুযোগ হয়, আর উনি যদি নিবেদনে সাড়া দিয়ে ফেলেন, তাহলে আমাকে কিন্তু আর পাওয়া যাবে না কিছুতেই !

শুধুমাত্র গান-বাজনাতেই না, একাডেমিক কাজেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনেক খেদমত করেছেন তিনি।

আত্মস্থ করা তো দূরে থাক, ইদানীং একটা শোক হজম করার সময় হয় না, অন্য আরেকটি খবর দরজায় এসে দাড়ায়। ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মনে শুনি। শুনে আচারিক অভিব্যক্তি বা খারাপ লাগার অভিনয়। তারপর আবার সেই একই ….। কাজের মাঝে কখনো চোখ ভিজে আসলেও গোপনে মুছতে হয়, পাছে লোকে পাগল না ভাবে।

এইসবের মধ্যেও মনে করি.. আজাদ রহমান চলে গেলেন, তার বাংলা খেয়ালের সব মিলিয়ে হয়তো ২০ ঘণ্টারও আর্কাইভ নই। ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর কাছ থেকে তার দুই ঘরানার গান-গল্প কতটুকু সংরক্ষণ হল? কবীর সুমনের ব্লটিং পেপারের কতটুকু বের করে রাখ গেল?

এই সকাল-বিকেল তারকার যুগে আর কাউকে দেখা যাবে না ওনাদের মতো। কেউ আর অমন বনস্পতির মতো দাঁড়াবেন না, ছায়াও দেবেন না।

আগামী প্রজন্মের জন্য যত্ন করে সংরক্ষণের শেষ সময়ও চলে যাচ্ছে। কিন্তু এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি, যখন সিস্টেমের লোকজন এসবের কোন গুরুত্ব দেবার বদলে, দুটো টাইলস বেশি লাগানো গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

 

প্রভা আত্রেও চলে গেলেন

 

১৯৩২ সালে পুনেতে এক মারাঠি পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কিন্তু অদ্ভুত এক গল্প নিয়ে সঙ্গীতে এসেছিলেন। তাঁর পরিবারে আগে থেকে গান-বাজনার কোনো চর্চাই ছিল না। শৈশবে ওনার মা একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করার জন্য ডাক্তারের পরামর্শে ঘরে একটা হারমোনিয়াম আনা হয়। মায়ের সেই গান শোনার মাধ্যমেই ছোট্ট প্রভার মনে সঙ্গীতের প্রতি প্রথম টান তৈরি হয়।

তিনি অ্যাকাডেমিকভাবেও ছিলেন প্রচণ্ড শিক্ষিত, যা সেই আমলের সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে সচরাচর দেখা যেত না। পুনের ফার্গুসন কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক (B.Sc.) করে পুনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওকালতি (LL.B.) পাস করেন। সঙ্গীতকে কেবল সাধনা নয়, গবেষণার চোখে দেখতেন বলেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ‘সরগম’-এর ব্যবহারের ওপর গবেষণা করে পিএইচডি করেছিলেন।

তিনি বিদায় নিলেন কিরানা ঘরানার অন্যতম সেরা প্রতিনিধি হিসেবে। কিংবদন্তি পণ্ডিত সুরেশবাবু মানে এবং বিদুষী হীরাবাঈ বাদেকরের কাছে সঙ্গীতের কঠিন দীক্ষা নিয়েছিলেন তিনি। সুরের শুদ্ধতা আর রাগের আবেগময় বিস্তারই ছিল তাঁর গানের মূল শক্তি। প্রভা আত্রের কণ্ঠে এই ঘরানার ঐতিহ্যবাহী রূপ যেমন ফুটত, তেমনি তিনি ঠুমরি, দাদরা আর ভজনের মতো ধারাতেও সমান পারদর্শী ছিলেন।

সঙ্গীতের জগতে তাঁর অবদান বিশাল। তিনি কেবল মঞ্চে গেয়েই থেমে ছিলেন না, আগামী প্রজন্মের জন্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গেছেন। মুম্বাইয়ের এসএনডিটি (SNDT) উইমেনস ইউনিভার্সিটির মিউজিক ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলেন। পুনেতে তরুণদের সঙ্গীত শেখানোর জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্বরময়ী গুরুকূল’। একজন দারুণ স্রষ্টা হিসেবে তিনি ‘অপূর্ব কল্যাণ’, ‘মধুকৌন্স’, ‘রানি টোডি’ -এর মতো বেশ কয়েকটি নতুন রাগ সৃষ্টি করেন। সঙ্গীত নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বইও লিখেছেন তিনি। ভারত সরকার ওনাকে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ এবং সর্বশেষ ২০২২ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে।

শান্তিতে থাকুন প্রভা আত্রে।

কিরানার সঙ্গীতের উপযুক্ত খাদেম হিসেবে আপনার নাম উজ্জ্বল থাকুক।