বাংলাদেশ যখন “ডিজিটাল বাংলাদেশ” গড়ার লক্ষ্যে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল ব্যাংকিং এবং তথ্যভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে। ২০১৪ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি—ডিজিটাল অবকাঠামো যেমন গড়ে উঠছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে এক নতুন ধরনের সম্পদ, যাকে আমরা “ডিজিটাল এসেট” বলতে পারি। কিন্তু এই সম্পদের সুরক্ষা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো কার্যকর কোনো বীমা কাঠামো গড়ে ওঠেনি—যা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে বীমা খাত মূলত প্রচলিত ধাঁচেই পরিচালিত হচ্ছে। জীবন বীমা, অগ্নি বীমা, মোটর বীমা—এসব ক্ষেত্রেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অথচ দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ডিজিটাল নির্ভর হয়ে উঠছে। ব্যাংকিং খাতে অনলাইন লেনদেন বাড়ছে, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে, সফটওয়্যার ও আইটি সেবা খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে। এই সব ক্ষেত্রেই তথ্য, ডেটা, সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এসব সম্পদের কোনো ক্ষতি হলে—যেমন হ্যাকিং, ডেটা চুরি বা প্রযুক্তিগত বিপর্যয়—তার জন্য কোনো বীমা সুরক্ষা এখনো বিদ্যমান নেই।
আইনগত দিক থেকেও বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন থাকলেও তা মূলত সাইবার অপরাধ দমনেই সীমাবদ্ধ। ডিজিটাল সম্পদের আর্থিক মূল্যায়ন, ক্ষতির হিসাব বা ক্ষতিপূরণ—এসব বিষয়ে কোনো সুসংগঠিত নীতিমালা এখনো প্রণীত হয়নি। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি বড় ধরনের ডেটা ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাহলে তার আর্থিক ক্ষতি বহনের দায় সম্পূর্ণভাবে সেই প্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তায়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা সামনে আসে—ডিজিটাল এসেটের বীমা নিশ্চিত করা না গেলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নিশ্চয়তা খোঁজেন। তারা জানতে চান, তাদের বিনিয়োগকৃত ডেটা, প্ল্যাটফর্ম বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার আর্থিক সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে। যদি কোনো দেশে এই ধরনের বীমা কাঠামো না থাকে, তাহলে সেই দেশ বিনিয়োগের জন্য তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। একইভাবে, দেশীয় উদ্যোক্তারাও বড় পরিসরে ডিজিটাল উদ্যোগ নিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন, কারণ সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজস্ব বহন করতে হয়।
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি শুধুমাত্র ডিজিটাল অবকাঠামো গড়েই থেমে থাকব, নাকি সেই অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবব? কারণ বাস্তবতা হলো, ডিজিটাল সম্পদ যত বাড়বে, ততই বাড়বে তার ঝুঁকি। আন্তর্জাতিকভাবে ইতোমধ্যে “সাইবার ইনস্যুরেন্স” বা ডিজিটাল ঝুঁকি বীমা চালু হয়েছে, যেখানে ডেটা লস, সিস্টেম ডাউনটাইম বা অনলাইন প্রতারণার মতো ঝুঁকির জন্য বীমা সুরক্ষা দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
এই মুহূর্তে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, “ডিজিটাল এসেট” কী—এটি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা জরুরি। ডেটা, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট—এসবকে অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে এগুলোর জন্য বীমা কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে না।
দ্বিতীয়ত, বীমা খাতে “সাইবার ঝুঁকি”কে একটি স্বতন্ত্র ঝুঁকি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ইনস্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (IDRA) এই বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারে এবং বীমা কোম্পানিগুলোকে নতুন ধরনের পলিসি প্রবর্তনে উৎসাহিত করতে পারে।
তৃতীয়ত, ব্যাংক, টেলিকম এবং আইটি খাতে ন্যূনতম সাইবার সুরক্ষা ও বীমা কাভারেজ নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ এই খাতগুলোতেই ডিজিটাল সম্পদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
চতুর্থত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডেটাকে মূল সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে না। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে কোনো নীতিমালাই কার্যকর হবে না।
২০১৪ সালের এই সময়টি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আমরা যদি এখনই ডিজিটাল এসেট সুরক্ষা এবং বীমা কাঠামোর দিকে নজর না দিই, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হতে পারে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন আমরা প্রযুক্তির পাশাপাশি তার নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বীমা সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেব।
