ধ্রুপদ । গীত ধারা । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ধ্রুপদ হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে প্রাচীন এবং শাস্ত্রনিষ্ঠ গায়নরীতি। এই ধারায় সুর, তাল ও রাগের বিশুদ্ধতা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়, এবং সেই কারণে এখানে নিয়ম-কানুনও তুলনামূলকভাবে কঠোর। ধ্রুপদে কোনো অতিরিক্ত অলংকার বা আবেগপ্রবণতার চেয়ে রাগের মৌলিক রূপকে পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠা করাই প্রধান লক্ষ্য। এর গায়কি সংযত, গম্ভীর এবং ধ্যানমগ্ন প্রকৃতির।

তালের সঙ্গত হিসেবে ব্যবহৃত হয় পাখোয়াজ, যা ধ্রুপদের অন্যতম পরিচায়ক। তবলার তুলনায় পাখোয়াজের ধ্বনি ভারী ও প্রশস্ত, যা ধ্রুপদের মেজাজের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই কারণেই ধ্রুপদকে অনেক সময় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত্তি বা “মূলধারা” হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

ধ্রুপদ । গীত ধারা । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

জেনে নেয়া যাক ধ্রুপ ও পরিবেশনের বিষয়ে প্রথমিক তথ্য:

 

আলাপ: রাগ উপস্থাপনার ভিত্তি

ধ্রুপদ পরিবেশনের সূচনা হয় আলাপ দিয়ে, এবং এই অংশটি ধ্রুপদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত অংশ। এখানে কোনো তাল ব্যবহার করা হয় না; সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে রাগের বিকাশ ঘটে। ‘আ, রে, নি, না, রি, ই, নোম, তোম’—এই ধ্বনিগুলোর মাধ্যমে আলাপ করা হয়, যা নোম-তোম আলাপ নামে পরিচিত।

আলাপ শুরু হয় অতি ধীর গতিতে—অতি-বিলম্বিত বা বিলম্বিত লয়ে। সাধারণত ষড়জ (সা) থেকে শুরু করা হলেও, কখনও রাগের বাদী স্বর থেকেও সূচনা হতে পারে। শিল্পী প্রথমে মন্দ্র সপ্তকে (নিচের স্বরপরিসর) রাগের গম্ভীরতা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ধীরে ধীরে মধ্য ও তারা সপ্তকে উঠে রাগের বিস্তার ঘটান এবং শেষে আবার মূল স্বরে ফিরে আসেন।

এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি স্বরকে আলাদা করে সময় দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। বাদী-সমবাদী স্বরগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাগের চলন, স্বর-সংযোগ এবং বৈশিষ্ট্য একে একে তুলে ধরা হয়। আলাপের মধ্য দিয়েই শ্রোতা রাগটির একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে শুরু করেন।

ধ্রুপদের আলাপ অংশটি অত্যন্ত জটিল ও কারিগরিভিত্তিক। এখানে শিল্পীর স্বরনিয়ন্ত্রণ, শ্বাসপ্রশ্বাসের দক্ষতা এবং রাগ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশেই শিল্পীর প্রকৃত পারদর্শিতা প্রকাশ পায়।

বাণী ও প্রবন্ধ: ধ্রুপদের কাঠামো

আলাপের বিস্তৃত ও তালহীন অংশ শেষ হওয়ার পর ধ্রুপদ পরিবেশনা প্রবেশ করে তার পরবর্তী ধাপে—বাণী বা গানের কথার অংশে, যেখানে প্রথমবারের মতো তালবাদ্য, বিশেষত পাখোয়াজ, যুক্ত হয়। এই অংশ থেকেই ধ্রুপদের প্রবন্ধধর্মী কাঠামো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধ্রুপদ মূলত একটি সুসংগঠিত গীতরূপ, যার ভেতরে সাহিত্য, সুর এবং তাল—এই তিনটির একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বয় থাকে। এখানে কেবল সুরের বিস্তার নয়, বরং বাণীর অর্থ ও ছন্দও সমান গুরুত্ব পায়।

ধ্রুপদের এই প্রবন্ধ সাধারণত চারটি প্রধান অংশ বা তুক নিয়ে গঠিত—স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী এবং আভোগ। এই চারটি অংশ মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ রচনার কাঠামো তৈরি করে। বাণীগুলো সাধারণত হিন্দি, ব্রজভাষা বা উর্দুতে রচিত হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে চার লাইনের একটি সাহিত্যিক রূপ অনুসরণ করে। তবে বাস্তব পরিবেশনায় সবসময় চারটি অংশই ব্যবহৃত হবে—এমন নয়; অনেক ধ্রুপদে কেবল স্থায়ী ও অন্তরা—এই দুই অংশ নিয়েই গানের উপস্থাপনা সম্পন্ন হয়, বিশেষত যখন পরিবেশনা সংক্ষিপ্ত বা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

পরিবেশনার ক্রমও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত প্রথমে স্থায়ী গাওয়া হয়, যা গানের ভিত্তি স্থাপন করে এবং রাগের মূল পরিসরকে সামনে আনে। এরপর অন্তরায় গিয়ে স্বরের বিস্তার কিছুটা উপরের দিকে প্রসারিত হয়, এবং পুনরায় স্থায়ীতে ফিরে এসে সেই ভিত্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। তারপর সঞ্চারী ও আভোগ অংশের মাধ্যমে রাগের আরও বিস্তৃত রূপ দেখানো হয়, এবং শেষে আবার স্থায়ীতে ফিরে এসে পুরো গঠনকে একটি পূর্ণতা দেওয়া হয়। এই বারবার স্থায়ীতে প্রত্যাবর্তন কেবল একটি কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি শ্রোতার মনে রাগের মূল স্বরপরিসরকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতেও সাহায্য করে।

এইভাবে ধ্রুপদের বাণী ও প্রবন্ধ অংশ একটি চক্রাকার বিন্যাসে এগোয়, যেখানে প্রতিটি অংশ রাগের ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরে, কিন্তু সবশেষে আবার মূল সুরের ভিত্তিতে ফিরে আসে। ফলে গানের কাঠামো যেমন সুসংহত থাকে, তেমনি রাগের উপস্থাপনাও হয় ধাপে ধাপে এবং পরিষ্কারভাবে।

তাল, লয় ও পাখোয়াজের ভূমিকা

ধ্রুপদে ব্যবহৃত তাল সাধারণত ৭, ১০ বা ১২ মাত্রার হয়। এর মধ্যে ১০ মাত্রার সাদরা এবং ১৪ মাত্রার ধামার বিশেষভাবে প্রচলিত। পাখোয়াজের গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ ধ্বনি এই তালের গাম্ভীর্য বজায় রাখে।

লয় বা গতি ধ্রুপদে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। শুরুতে ধীর লয়ে পরিবেশন হলেও, শিল্পী ধীরে ধীরে লয়ের গতি বাড়াতে পারেন। কখনও আড়াইগুণ বা তিনগুণ লয়ে পৌঁছে জটিল লয়কারীর কাজ দেখানো হয়। এই লয়বিন্যাস ধ্রুপদের গায়নশৈলীতে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক মাত্রা যোগ করে।

অলংকার ও স্বরপ্রয়োগ

ধ্রুপদে অলংকারের ব্যবহার অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং শাস্ত্রনির্ভর। এখানে ব্যবহৃত প্রধান অলংকারগুলোর মধ্যে রয়েছে—আশ, ন্যাস, মীড়, গমক, মূর্ছনা, স্পর্শন এবং কম্পন। বিশেষ করে গমক ধ্রুপদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যা স্বরের দৃঢ়তা ও শক্তিকে প্রকাশ করে।

ধ্রুপদের গায়কি সরলরেখায় এগোয় না; বরং স্বরের ওঠানামা, স্থিতি এবং গতির মাধ্যমে রাগের চরিত্র ফুটিয়ে তোলে। প্রতিটি স্বর স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা হয়, এবং অপ্রয়োজনীয় অলংকার পরিহার করা হয়।

ধ্রুপদ শোনা ও বোঝা

ধ্রুপদ নতুন শ্রোতার কাছে কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে, কারণ এতে তাৎক্ষণিক আকর্ষণের চেয়ে ধীরে ধীরে উপলব্ধির বিষয় বেশি। এখানে ধৈর্য নিয়ে শুনতে হয় এবং রাগের বিকাশ অনুসরণ করতে হয়। অনেকেই প্রথমে খেয়াল গায়কি দিয়ে শুরু করে পরে ধ্রুপদের দিকে অগ্রসর হন।

তবে একবার ধ্রুপদের প্রতি শ্রবণ-সংবেদন তৈরি হলে, এর গভীরতা এবং সূক্ষ্মতা আলাদা করে ধরা পড়ে। তখন আলাপের ধীর বিস্তার, পাখোয়াজের ছন্দ এবং স্বরের স্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

পরিবেশনার ভিন্নতা

উপরের যে ধারাবাহিকতায় ধ্রুপদ পরিবেশনের বর্ণনা দেওয়া হলো, তা একটি সাধারণ কাঠামো। বাস্তবে ঘরানা, শিল্পী, সময় ও পরিবেশ অনুযায়ী এই বিন্যাসে কিছু পরিবর্তন হতে পারে। কোনো শিল্পী আলাপের কোনো অংশকে ভিন্ন গতিতে পরিবেশন করতে পারেন বা প্রবন্ধের অংশগুলোর উপস্থাপনায় নিজস্বতা আনতে পারেন।

তবে এই মৌলিক কাঠামোটি জানা থাকলে ধ্রুপদ শোনা ও বোঝা সহজ হয়।

 

ধ্রুপদ বিষয়ে  একটি টিউটোরিয়াল:

 

ধ্রুপদ বিষয়ে আরও একটি টিউটোরিয়াল:

 

ধ্রপদের এক ধরনের ইতিহাস:

 

ধ্রুপদ হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত্তিমূল, যেখানে রাগের বিশুদ্ধতা, স্বরের স্থিতি এবং তালের শৃঙ্খলা সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। এটি এমন একটি গায়নশৈলী, যা দীর্ঘ অনুশীলন, নিয়ন্ত্রণ এবং মনোযোগ দাবি করে। ধ্রুপদের মাধ্যমে রাগসংগীতের মৌলিক রূপ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়।

 

আরও দেখুন: