শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ বিলাসখানি টোড়ী। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
রাগ বিলাসখানি টোড়ী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত মরমী, গম্ভীর এবং করুণ রসপ্রধান রাগ। এই রাগের উৎপত্তির সাথে জড়িয়ে আছে এক অতিমানবিক ও আবেগঘন ইতিহাস। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, মুঘল সম্রাট আকবরের সভার নবরত্ন ও সংগীত সম্রাট মিঞা তানসেনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বিলাস খাঁ এই রাগের সৃষ্টি করেন।
কথিত আছে, পিতার মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন বিলাস খাঁ যখন তানসেনের মরদেহের সামনে গান ধরলেন, তখন তাঁর শোকাতুর হৃদয়ের আর্তিতে এক নতুন সুরের সৃষ্টি হলো। সেই সুরের প্রভাবে তানসেনের প্রাণহীন হাত নড়ে উঠেছিল বলে লোককথা প্রচলিত আছে। পিতার প্রতি পুত্রের এই শোকাতুর অর্ঘ্যই ‘বিলাসখানি টোড়ী’ নামে অমর হয়ে আছে। যদিও এটি টোড়ী নামধারী, কিন্তু এর স্বরবিন্যাস অনেকটা ভৈরব ঠাটের কোমল স্বরগুলোর মতো। এটি মূলত ভোরের রাগ হলেও এর শান্ত ও গম্ভীর প্রকৃতি একে অন্য সব টোড়ী থেকে আলাদা করে।

রাগ বিলাসখানি টোড়ী
বিশেষত্ব: বিলাসখানি টোড়ী রাগের চলন অত্যন্ত বক্র এবং বিলম্বিত লয়ে এর রূপ সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে। এই রাগে কোমল ঋষভ এবং কোমল ধৈবত এর আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভৈরবী রাগের স্বর ব্যবহৃত হলেও এর গায়নশৈলী এবং মীড় একে টোড়ী অঙ্গের মর্যাদা দিয়েছে।
রাগের শাস্ত্র
- ঠা্ট: ভৈরব (অনেকে একে ভৈরবী ঠাটের রাগও বলেন, তবে স্বর প্রয়োগ বিচারে ভৈরব ঠাটই যুক্তিযুক্ত)।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ৫টি এবং অবরোহণে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা ঋা গা পা দ্া র্সা
- অবরোহ: র্সা না দ্া পা মা গা ঋা সা
- বাদী স্বর: কোমল ধৈবত
- সমবাদী স্বর: কোমল গান্ধার
- বর্জিত স্বর: আরোহণে মধ্যম ও নিষাদ বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ, গান্ধার, ধৈবত ও নিষাদ—এই চারটি স্বরই কোমল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মধ্যম ও পঞ্চম শুদ্ধ।
- সময়: প্রাতঃকাল (দিনের দ্বিতীয় প্রহর)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, আধ্যাত্মিক এবং করুণ রসাত্মক।
রিলেটেড বা সম্পর্কিত রাগসমূহ
- রাগ ভৈরবী: বিলাসখানি টোড়ীতে ভৈরবীর সবকটি স্বর ব্যবহৃত হয়, তবে টোড়ী অঙ্গের মীড় ও চলন একে আলাদা করে।
- রাগ মিঞা কি টোড়ী: নামের শেষে টোড়ী থাকলেও মিঞা কি টোড়ী থেকে এর স্বরবিন্যাস সম্পূর্ণ ভিন্ন।
- রাগ আশাবরী: আরোহণে কিছু সামঞ্জস্য থাকলেও গান্ধার ও ধৈবতের আন্দোলনে বিলাসখানি টোড়ী পৃথক হয়ে যায়।
- রাগ কোমল ঋষভ আসাবরী: চলনের দিক থেকে এই রাগের সাথে বিলাসখানি টোড়ীর অনেক সময় ভ্রম তৈরি হয়।
- রাগ ভূপাল টোড়ী: আরোহণে উভয় রাগই ঔড়ব হওয়ায় কিছুটা মিল লক্ষ্য করা যায়।
এই রাগের করুণ ও ভক্তিপূর্ণ সুর মানুষের মনকে জাগতিক ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে নিয়ে এক অপার্থিব প্রশান্তির স্তরে পৌঁছে দেয়। শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষার্থীরা তাঁদের কান তৈরির জন্য এবং মীড় ও আন্দোলনের সূক্ষ্ম কাজ শেখার জন্য এই রাগের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করেন। ওস্তাদ আমির খাঁ বা পণ্ডিত ভীমসেন জোশীর কণ্ঠে এই রাগের বিলম্বিত খেয়াল এক অভাবনীয় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
যদিও এই রাগ ভৈরবী ঠাটের কিন্তু রাগটি টোড়ি অঙ্গে গাওয়া হয়। এই জন্য এই রাগকে অনেকে টোড়ির ভিন্নতর প্রকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাধারণ গান বাজনায় রাগ বিলাসখানি টোড়ী:
সাধারণ গান বাজনায় রাগ বিলাসখানি টোড়ী-র ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত এবং দুঃসাহসিক। কারণ, এর অতি-গম্ভীর প্রকৃতি এবং ‘টোড়ী অঙ্গ’-এর বক্র চলন লঘু সংগীতের ছাঁচে ফেলা বেশ কঠিন। তবে সুরকারেরা যখন গভীর হাহাকার, আধ্যাত্মিক শূন্যতা বা তীব্র বিরহ বোঝাতে চেয়েছেন, তখন এই রাগের আশ্রয় নিয়েছেন।
নিচে সাধারণ গান ও চলচ্চিত্রে এই রাগের প্রয়োগের প্রামাণ্য উদাহরণ দেওয়া হলো:
১. বাংলা আধুনিক গান
- ঝরানো মরীচিকা পথে — শিল্পী: মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় : এটি বাংলা আধুনিক গানে বিলাসখানি টোড়ীর সবচেয়ে সার্থক ও বিশুদ্ধ প্রয়োগগুলোর একটি। মানবেন্দ্রের কণ্ঠে এই রাগের সেই বিশেষ ‘মীড়’ এবং কোমল স্বরগুলোর (ঋ, গা, দ্, না) করুণ আবেদন নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। গানের প্রিলিউড এবং অন্তরায় এই রাগের চলন অত্যন্ত স্পষ্ট।
২. হিন্দি চলচ্চিত্রের গান (বলিউড)
- তেরে বিন সূনে নয়ন হামারে — চলচ্চিত্র: মেরি সুরত তেরি আঁখে (১৯৬৩), শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর ও মহম্মদ রফি : এস. ডি. বর্মনের সুরে এই গানটি রাগ বিলাসখানি টোড়ী-র ওপর ভিত্তি করে তৈরি। গানটিতে বিরহের এক শান্ত অথচ গভীর রূপ চিত্রিত হয়েছে। যদিও এটি কিছুটা ‘মিশ্র’ বা লঘু ঢঙে গাওয়া, তবুও এর মূল কাঠামোটি বিলাসখানি টোড়ীর।
- ঝুঁটো কেয়া বোলে — চলচ্চিত্র: কাফির (১৯৯১), শিল্পী: ভূপিন্দর সিং : এই গজলধর্মী গানটিতে বিলাসখানি টোড়ীর গম্ভীর এবং দার্শনিক মেজাজটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
৩. নজরুলগীতি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় — শিল্পী: বিবিধ শিল্পী : নজরুল এই গানটিতে টোড়ী ও ভৈরবীর এক অনন্য মিশ্রণ ঘটিয়েছেন যা অনেক সময় বিলাসখানি টোড়ী-র আবহে শোনা যায়। নজরুলের রাগাশ্রয়ী গানগুলোতে টোড়ী অঙ্গের যে গভীরতা, তা এই রাগের বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে যায়।
সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:
বাঁশিতে রাগ বিলাসখানি টোড়ী:
বাঁশিতে রাগ বিলাসখানি টোড়ী বাজানো অত্যন্ত কঠিন এবং মুন্সিয়ানার কাজ। যেহেতু এটি একটি ‘আন্দোলিত’ এবং ‘মীড়’ প্রধান রাগ, তাই বাঁশিতে ছিদ্রের ওপর আঙুলের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ (Half-holing) এবং ফুঁয়ের দোলনের মাধ্যমে এই রাগের গভীরতা ফুটিয়ে তুলতে হয়।
নিচে বাঁশিতে এই রাগের প্রয়োগ ও শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলোর প্রামাণ্য তথ্য দেওয়া হলো:
১. পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া : বাঁশিতে বিলাসখানি টোড়ীর সবচেয়ে আধ্যাত্মিক ও মরমী রূপটি তাঁর বাজনায় পাওয়া যায়। হরিপ্রসাদজি এই রাগের ‘আলাপ’ অংশে মন্দ্র সপ্তকের যে গম্ভীর চলন দেখান, তা শ্রোতাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। বিশেষ করে কোমল গান্ধার ($গা$) এবং কোমল ঋষভ ($ঋ$)-এর ওপর তাঁর যে দীর্ঘ ও করুণ মীড়, তা বিলাসখানি টোড়ীর মূল আত্মা। তাঁর বাঁশিতে এই রাগের ‘টোড়ী অঙ্গ’ অত্যন্ত স্পষ্ট।
২. পণ্ডিত রঘুনাত শেঠ : তিনি বিলাসখানি টোড়ীর প্রামাণ্য এবং ব্যাকরণগত দিকটি বাঁশিতে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। রঘুনাত শেঠের গায়ন-অঙ্গ শৈলী এই রাগের বক্র চলনকে বাঁশিতে খুব নিপুণভাবে তুলে ধরত। তিনি রাগের আরোহণে $মা$ এবং $না$ বর্জিত রেখে ঔড়ব রূপটি (সা ঋ গা পা দ্ র্সা) অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বজায় রাখতেন।
সেতারে রাগ বিলাসখানি টোড়ী:
সেতারে রাগ বিলাসখানি টোড়ী বাজানো এক চরম ধৈর্যের পরীক্ষা। সেতারের তরফ ও বাজারি তারের অনুরণন এই রাগের গম্ভীর ও করুণ রসকে এক আধ্যাত্মিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। সেতারে এই রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর দীর্ঘ ‘মীড়’ এবং কোমল স্বরগুলোর ওপর সূক্ষ্ম ‘আন্দোলন’।
১. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মাইহার ঘরানা) সেতারে বিলাসখানি টোড়ীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ এবং গভীর রূপটি তাঁর বাজনায় পাওয়া যায়। নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সেতারে এই রাগের ‘আলাপ’ অংশে এক অদ্ভুত বিবাগী ভাব ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি কোমল ঋষভ (ঋ) এবং কোমল ধৈবত (দ্) স্বর দুটির ওপর সেতারের তার টেনে যে আন্দোলন করতেন, তা শোনার সময় মনে হয় যেন কেউ কাঁদছে। তাঁর ‘গায়ন-অঙ্গ’ বাজনায় বিলাসখানি টোড়ীর বক্র চলন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
২. ওস্তাদ বেলায়েত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা) : তাঁর সেতারে বিলাসখানি টোড়ীর কারুণ্য এবং গায়কির সূক্ষ্মতা অতুলনীয়। বেলায়েত খাঁ সাহেব সেতারকে কণ্ঠসংগীতের সমপর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিলাসখানি টোড়ীর কোমল গান্ধার (গা)-এর কাজগুলো তিনি এত কোমলভাবে দেখাতেন যে তা হৃদয়ে গিয়ে লাগে। তাঁর বাজানো এই রাগের দ্রুত গতির ‘তান’ এবং ‘ঝালা’ এই রাগের এক উজ্জ্বল দিক উন্মোচন করে।
