রাগ সিন্ধু ভৈরবী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অনন্য এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় রাগের নাম রাগ সিন্ধু ভৈরবী (Sindhu Bhairavi)। এটি মূলত একটি মিশ্র রাগ, যা শুদ্ধ ভৈরবী এবং সিন্ধু রাগের এক অপূর্ব সংমিশ্রণে তৈরি। শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরগুলোতে এটি সাধারণত অনুষ্ঠানের সমাপ্তিলগ্নে গাওয়া হয়। এর সুমধুর চলন এবং করুণ ও ভক্তি রসের গভীরতা শ্রোতাদের মনে এক চিরস্থায়ী আবেশ তৈরি করে।

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 রাগ সিন্ধু ভৈরবী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ সিন্ধু ভৈরবী

রাগ সিন্ধু ভৈরবীর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ সিন্ধু ভৈরবী মূলত আসাবরী ঠাটের (ভৈরবী ঠাট সংলগ্ন) অন্তর্গত একটি রাগ হিসেবে বিবেচিত হলেও এর গায়নশৈলী অত্যন্ত নমনীয়। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর ‘বারো স্বরের’ ব্যবহার। যদিও এর মূল কাঠামো ভৈরবী রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, কিন্তু সিন্ধু অঙ্গের সংমিশ্রণে এতে শুদ্ধ ঋষভ এবং শুদ্ধ ধৈবতের প্রয়োগ ঘটে, যা একে শুদ্ধ ভৈরবী থেকে আলাদা এক উজ্জ্বলতা দান করে।

ঐতিহাসিকভাবে, এই রাগটি সিন্ধু প্রদেশ (বর্তমান পাকিস্তান) এবং উত্তর ভারতের লোকসুর থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। এটি মূলত একটি ‘সর্বকালিক’ রাগ, তবে প্রাতঃকালে এর মাধুর্য সবথেকে বেশি ফুটে ওঠে। খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা এমনকি হালকা শাস্ত্রীয় সংগীতের (Semi-classical) জন্য এটি এক অপরিহার্য রাগ। এতে বিরহ, করুণা এবং আধ্যাত্মিক আর্তি—এই তিনটির এক অদ্ভুত সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: আসাবরী (অনেক মতে ভৈরবী ঠাট)।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা ঋা জ্ঞা মা পা দা ণি র্সা
  • (কখনো কখনো শুদ্ধ ঋষভ ও শুদ্ধ ধৈবতের স্পর্শ থাকে)

  • অবরোহ: র্সা ণি দা পা মা জ্ঞা ঋা সা
  • পকড় (মুখ্য চলন): জ্ঞা মা পা দা পা, মা জ্ঞা, ঋা সা, ন্ দা ন্ সা
  • বাদী স্বর: ধা (কোমল ধৈবত – দা)।
  • সমবাদী স্বর: রে (কোমল ঋষভ – ঋা)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (ঋা), গান্ধার (জ্ঞা), ধৈবত (দা) এবং নিষাদ (ণি) কোমল; মধ্যম শুদ্ধ (মা); তবে বিশেষত্ব হলো এতে প্রয়োজনভেদে বারোটি স্বরই কৌশলে ব্যবহার করা যায়।
  • সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত), তবে অনুষ্ঠান সমাপ্তির রাগ হিসেবে এটি যেকোনো সময় গাওয়া যায়।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত করুণ, ভক্তিপ্রধান এবং শান্ত।

রাগ সিন্ধু ভৈরবী হলো ভারতীয় সংগীতের সেই সার্বজনীন সুর যা জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সব মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এর বারোটি স্বরের পরিমিত ব্যবহার শিল্পীকে এক অসীম স্বাধীনতা প্রদান করে, যা খুব কম রাগের ক্ষেত্রে দেখা যায়। আসরের শেষে যখন শিল্পী সিন্ধু ভৈরবীর আলাপ শুরু করেন, তখন তা যেন এক আধ্যাত্মিক পূর্ণতার ইঙ্গিত দেয়। সরলতা এবং রসের গভীরতাই এই রাগকে যুগ যুগ ধরে সংগীত পিপাসুদের কাছে প্রিয় করে রেখেছে।

Raga Sindhi-Bhairavi Scale [ রাগ সিন্ধু-ভৈরবী ]
Raga Sindhi-Bhairavi Scale

দক্ষিণেও এই রাগটির নাম সিন্ধু ভৈরবী। গঠনও কাছাকাছি। শুধু গায়কীর কারণে শুনতে একটু আলাদা লাগতে পারে।

আরোহ-আবরোহ এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে শুনে নিতে পারেন ।

 

 

রাগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে খাজা খুরশিদ আনোয়ারের রাগমালার ট্র্যাকটি শুনতে পারেন:

 

ianring.com মিউজিক থিওরিতে তে সিন্ধু-ভৈরবী:

 

ওস্তাদ সালামত আলী খান মুলতানী কাফী গেয়েছেন সিন্ধু-ভৈরবী :

 

ওস্তাদ সালামত আলী খাঁ সাহেবের ছেলে শাফকাত সালামত আলী সিন্ধু-ভৈরবী দেখিয়েছেন :

 

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরবী: সিন্ধু ভৈরবীর মূল ভিত্তি; ভৈরবীতে শুদ্ধ স্বরের প্রয়োগ কম কিন্তু সিন্ধুতে বেশি।
  • রাগ সিন্ধু: এই রাগের চপলতা ও স্বরবিন্যাস সিন্ধু ভৈরবীর পূর্বাঙ্গ গঠনে সাহায্য করে।
  • রাগ মিশ্র ভৈরবী: সিন্ধু ভৈরবীর মতোই এতেও বারো স্বরের ব্যবহার থাকে, তবে বিন্যাস ভিন্ন।
  • রাগ কাফি: সিন্ধু ভৈরবীর অবরোহে অনেক সময় কাফি রাগের ছায়া পরিলক্ষিত হয়।
  • রাগ আসাভরী: ঠাটগত মিল থাকলেও আসাবরীতে গান্ধার ও নিষাদ বর্জিত হওয়ার প্রবণতা থাকে।

 

কাজী নজরুল ইসলামের সিন্ধু ভৈরবী:

নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।

১. পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কণ্ঠে- যাহা কিছু মম

২. পুরবী দত্তের কণ্ঠে- সই ভাল করে বিনোদবেণী

 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সিন্ধু ভৈরবী:

কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়।

১.

 

আধুনিক গানে সিন্ধু ভৈরবী:

১.

 

ভজনে সিন্ধু-ভৈরবী:

১.

 

অন্যান্য:

 

 

যন্দ্রে সিন্ধু-ভৈরবী:

সেতার:

১. ইমদাদখানী ঘরানার শহীদ পারভেজ খানের সেতারে – ।

 

সরদ:

১.মাইহার ঘরানার খলিফা ওস্তাদ আলী আকবর খানের সরদে রাগ সিন্ধু-ভৈরবী ।

২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সরদে ।

 

খেয়াল:

১. রামপুর সহসওয়ান ঘরানার ওস্তাদ রশিদ খানের –

২. আমীর খান সাহেব এর ।

৩. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্বের কেদার – ।

৪. জয়পুর ঘরানার শিল্পী কিশোরী আমনকারের গলায়

৫. পণ্ডিত মুকুল শিবপুত্রের ।

৬. বিদুষী শোভা মুডগালের ।

 

টিউটোরিয়াল:

যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। স্বর মল্লিকার পাশাপাশি দু একটি  লক্ষণ গীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। লক্ষণ গীত মূলত শেখানো হয় রাগের লক্ষণগুলো সহজে ধরতে। লক্ষণ গীত ছোট খেয়াল প্রায় একই কাজ করে। অনলাইনে অনেক গুলো আছে। একটু খোঁজাখুঁজি করলে পেয়ে যাবেন। স্যাম্পল হিসেবে নিচের দুটো লিংক দেয়া হল।

১. রাগ সিন্ধু-ভৈরবীর স্বরমল্লিকা।

২. এনিসিআরটির টিউটোরিয়াল।

 

তথ্যসূত্র:

১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ২ ও ৪): মিশ্র রাগ ও ভৈরবী অঙ্গের বিশ্লেষণের জন্য।

২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (সংগীত কার্যালয়, হাতরস): রাগের শাস্ত্রীয় নিয়ম ও বারো স্বরের ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য।

৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও সিন্ধু প্রদেশের সুরের প্রভাব সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।

৪. সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমী (SRA): রাগের সময়কাল এবং প্রামাণ্য গায়নশৈলী যাচাইয়ের জন্য।

৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’: রাগের রসতাত্ত্বিক ও গায়নশৈলী সংক্রান্ত বিশ্লেষণের জন্য।

 

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 রাগ সিন্ধু ভৈরবী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

আও দেখুন:

Leave a Comment