বাংলাদেশে জরুরী অবস্থার তারিখ সমূহ ও প্রেক্ষাপট

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান যখন লেখা হচ্ছিল, তখন আমাদের সংবিধান প্রণেতারা বুকে এক দারুণ, স্বাধীন আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুনেছিলেন। তাঁরা এমন একটা দেশের ছক কষেছিলেন, যেখানে কোনোদিনও এমন কোনো অন্ধকার পরিস্থিতি আসবে না—যার জন্য রাষ্ট্রকে সংবিধানের বাইরে গিয়ে ‘জরুরি অবস্থা’ বা ইমার্জেন্সি জারি করতে হয়। নিজেদের সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে তাঁরা কোনো ধরণের স্বৈরতান্ত্রিক বা দমনমূলক আইনের ছায়াও দেখতে চাননি। আর ঠিক এই জেদ থেকেই বাহাত্তরের মূল সংবিধানে জরুরি অবস্থা জারির কোনো রকম সুযোগ বা বিধানই রাখা হয়নি।

কিন্তু কাগজের কলমে স্বপ্ন দেখা যতটা সহজ, রক্ত-মাংসের বাস্তব দুনিয়াটা ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ও জটিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই শুরু হলো নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সেই চরম অর্থনৈতিক সংকট, নতুন গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরের নানা দুর্বলতা আর চারপাশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক ভয়াবহ অবনতি। চারদিকের এই অস্থিরতাই যেন চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল—শুধু বড় বড় গণতান্ত্রিক বুলি আউড়ে রাষ্ট্র চালানো যায় না; দেশ বাঁচাতে এবং একটা কার্যকর রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে কঠিন ও সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে দ্রুত কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার মতো একটা আইনি ফ্রেমওয়ার্ক বা জরুরি বিধানের আসলেই বড্ড প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশে জরুরী অবস্থার তারিখ সমূহ ও প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে জরুরী অবস্থা

 

সংবিধানে বদল: যেভাবে যুক্ত হলো ‘জরুরি অবস্থা’

বাহাত্তরের সংবিধানে যে স্বপ্নীল গণতন্ত্রের ছক আঁকা হয়েছিল, মাত্র এক বছরের মাথায় তা রুক্ষ বাস্তবের ধাক্কা খেল। চারপাশের চরম অস্থিরতা সামাল দিতে ১৯৭৩ সালেই সংবিধানের ‘দ্বিতীয় সংশোধনী’ পাস করা হয়। আর এই সংশোধনীর হাত ধরেই বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্ত হয় এক নতুন অধ্যায়—”নবম-ক” ভাগ।

এর অধীনে সংবিধানে ১৮১ (ক), ১৮১ (খ) এবং ১৮১ (গ)—এই তিনটি নতুন অনুচ্ছেদ বা ধারা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এই নতুন আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেওয়া হলো যে, দেশের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলে তিনি সংকটকালীন ব্যবস্থা হিসেবে দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ বা ইমার্জেন্সি জারি করতে পারবেন।

ইতিহাসের পাতা উল্টে: বাংলাদেশে ৫ বার জরুরি অবস্থা জারির গল্প

লাল-সবুজের এই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষ এখন পর্যন্ত মোট ৫ বার এই জরুরি অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। আর প্রতিবারই এই ঘোষণার পেছনে কাজ করেছে তীব্র রাজনৈতিক পারদ, রাজপথ কাঁপানো আন্দোলন, পর্দার আড়ালে সামরিক বাহিনীর চাল কিংবা এক একটা গভীর জাতীয় সংকট। চলুন দেখে নেওয়া যাক সেই কালো দিনগুলোর পেছনের আসল গল্প:

১. ১৯৭৪ সালের ২৮শে ডিসেম্বর (প্রথম ইমার্জেন্সি)

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের সময়টা বাংলাদেশের জন্য ছিল এক মহাসংকটের কাল। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশে তখন একদিকে খাদ্য সংকট ও তীব্র চড়া পণ্যের দাম, অন্যদিকে রাজনৈতিক হানাহানি আর প্রশাসনিক দুর্নীতি। জনজীবনে তখন চরম অনিশ্চয়তা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যখন দেখল পরিস্থিতি সাধারণ আইন দিয়ে আর ধরে রাখা যাচ্ছে না, তখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার শেষ চেষ্টা হিসেবে দেশে প্রথমবারের মতো জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।

২. ১৯৮১ সালের ৩০শে মে (জিয়া হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ধাক্কা)

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টায় নৃশংসভাবে খুন হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্রপ্রধানের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে গোটা দেশ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে এবং পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। এই চরম অস্থিতিশীল মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।

৩. ১৯৮৭ সালের ২৭শে নভেম্বর (এরশাদ বনাম বিরোধী জোট)

স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের তখত কাঁপিয়ে দিতে তখন রাজপথে বিরোধী দলগুলোর লাগাতার আন্দোলন, ঘেরাও আর হরতাল চলছে। একদিকে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা, অন্যদিকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া—এই দুই নেত্রীর যুগপৎ গণআন্দোলন তখন তুঙ্গে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন এরশাদ সরকারের হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জরুরি অবস্থা জারি করেন।

৪. ১৯৯০ সালের ২৭শে নভেম্বর (এরশাদ পতনের শেষ অংক)

এটি ছিল এরশাদ আমলের একদম শেষ কাউন্টডাউন। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলন আর বিরোধী জোটগুলোর এককাট্টা কর্মসূচিতে গোটা দেশ তখন অচল। রাজপথে সংঘাত আর রক্তপাত ঠেকাতে এরশাদ আবারও জরুরি অবস্থার তাস খেলেন। কিন্তু এবার আর শেষ রক্ষা হয়নি। এই ঘোষণার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।

৫. ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি (সেই বহুল আলোচিত ১/১১)

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, নাটকীয় আর আলোচিত জরুরি অবস্থা। তবে এই সংকটের বীজ কিন্তু বোনা হয়েছিল আরও কয়েক বছর আগে। ২০০১ সালে মেয়াদ শেষে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একদম শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেয়। কিন্তু এরপর বিএনপি জোট ক্ষমতায় এসে পরবর্তী নির্বাচনকে নিজেদের অনুকূলে রাখতে সেই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেই নানা কৌশলে প্রভাবিত করার চেষ্টা শুরু করে।

প্রথম চাল হিসেবে তারা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে দেয়, যাতে বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন। এই নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও রাজপথে আন্দোলন শুরু হয়। কে এম হাসানকে নিয়ে বিতর্কের জেরে তিনি শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু বিএনপি জোট দমে না গিয়ে এবার চালল আরও বড় চাল—সংবিধানের অন্য সব বিকল্প বাদ দিয়ে তৎকালীন দলীয় রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদকেই একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে দেওয়া হলো।

রাষ্ট্রপতির এই নজিরবিহীন দ্বৈত ভূমিকা আর একতরফা নির্বাচনের জেদের কারণে ২০০৬ সালের শেষদিকে এসে ক্ষমতাসীন বিএনপি জোট ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে দেশজুড়ে লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যায়। রাজপথে তখন ‘লগি-বৈঠা’র তাণ্ডব, ঘেরাও আর লাগাতার হরতাল-অবরোধের এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। দেশ যখন আক্ষরিক অর্থেই এক গৃহযুদ্ধের গৃহদাহে পুড়ছে, ঠিক তখনই এই ঘোলাটে পানিতে পর্দার আড়াল থেকে চাল চালল সেনাবাহিনী। জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশন থেকে বাদ পড়ার ভয় আর দেশের ভেতর একনায়কতন্ত্র ঠেকাতে মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনী দৃশ্যপটে হাজির হয়।

অবশেষে এলো সেই বহুল পরিচিত ১১ই জানুয়ারি বা ‘১/১১’। তীব্র চাপের মুখে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন এবং সেনাসমর্থিত ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে এক নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। সেই সাথে জারি করা হয় জরুরি অবস্থা, যা প্রায় দীর্ঘ দুই বছর স্থায়ী ছিল। এই সময়ে দেশের বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতা, শীর্ষ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হন, বাতাসে ওড়ে দুই নেত্রীকে মাইনাস করার ‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলার গুঞ্জন এবং দেশ দেখে এক ছদ্মবেশী সেনা-নিয়ন্ত্রিত ভিন্ন ঘরানার শাসনব্যবস্থা।

 

শেষ কথা

পেছনের পাতাগুলো ওল্টালে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার বোঝা যায়—বাংলাদেশে যখনই জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে, তা আসলে আমাদের চেনা রাজনীতির কোনো না কোনো বড় বিপর্যয় বা সংকটকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কখনো দেশের সার্বভৌমত্ব আর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাঁচানোর তাগিদে, কখনো রাজপথের রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক সহিংসতা থামাতে, আবার কখনো বা স্রেফ ক্ষমতার লোভ আর রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের ভারসাম্যহীনতার সুযোগ নিয়ে এই ইমার্জেন্সির তাস খেলা হয়েছে। সংবিধানে সংকট সামাল দেওয়ার জন্য এই ‘জরুরি অবস্থা’র আইনি ফ্রেমওয়ার্ক রাখা হলেও, এর প্রয়োগ এবং এর আড়ালে নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে দেশে-বিদেশে বিতর্কের কিন্তু শেষ নেই।

দিনশেষে একটা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জরুরি অবস্থার মতো পদক্ষেপ নেওয়াটা ভীষণ সংবেদনশীল এবং বিপজ্জনক একটা ব্যাপার। কারণ এই ইমার্জেন্সি জারির সাথে সাথেই সাধারণ মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো এক ঝটকায় বাক্সবন্দী হয়ে পড়ে। তাই ৫৪ বছরের এই চড়াই-উতরাই থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে আমাদের আর কোনোদিন এই কালো আইনের মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য প্রয়োজন কোনো মেকি বুলি নয়—বরং একটা সুস্থ-স্বাভাবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ভেতর থেকে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং দলমতনির্বিশেষে সবার জন্য আইনের সমান শাসন নিশ্চিত করা। তবেই হয়তো আমাদের সংবিধানের সেই বাহাত্তরের আদি স্বপ্নটা পুরোপুরি সার্থক হবে।