শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ চাঁদনী কেদার। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

রাগ চাঁদনী কেদার
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মেহফিলে রাত্রির প্রথমাংশে কেদার অঙ্গের গম্ভীর ও রাজকীয় পরিবেশন প্রথাগতভাবে অত্যন্ত প্রিয়। কেদার অঙ্গের সেই সুগম্ভীর অবয়বের সঙ্গে যখন চাঁদনীর স্নিগ্ধ শুভ্রতা ও কোমল স্বরের বিশেষ সুরসংগতি এসে মেশে, তখন সৃষ্টি হয় এক পরম মনোহর ও আভিজাত্যপূর্ণ অপ্রচলিত রাগ—‘রাগ চাঁদনী-কেদার’ (বা সংক্ষেপে ‘চাঁদনী-কেদার’)।
নাম থেকেই স্পষ্ট যে, এটি মূল রাগ কেদারেরই এক অনবদ্য ও মায়াবী শাখা-রূপ, যেখানে রূপক কাব্যের মতো সুরের গা থেকে যেন পূর্ণিমার চাঁদের আলো চুইয়ে পড়ে।
ঐতিহাসিক প্লট ও ‘A Night at the Taj’ (১৯৬৭)
রাগ চাঁদনী-কেদারের নাম উচ্চারণ করলেই জড়িয়ে থাকে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ইতিহাসের এক অমর সাঙ্গীতিক উপাখ্যান।
এক চিরন্তন কাল্পনিক রূপকথা: সম্রাট শাহজাহান ও তাঁর প্রিয়তমা মহীয়সী মমতাজ বেগম বিধাতার বিশেষ অনুমতিক্রমে কেবল একটিমাত্র পূর্ণিমা রাতে মর্ত্যে নেমে এসেছেন নিজেদের ভালোবাসার স্মারক ‘তাজমহল’ দেখতে। স্ফটিকস্বচ্ছ মার্বেলের গা বেয়ে নামছে জোৎস্নার মায়াবী ধারা। দূরে নদী পার হয়ে দৃষ্টি যত দূর যায়, সর্বত্র রূপালী আলোকের প্লাবন। সেই মোহিত ও পরম আবেশময় ক্ষণে তাঁরা এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে, ভোরের ঘণ্টা বেজে ওঠার শব্দেও তাঁদের খেয়াল ছিল না। স্বর্গের ফেরেশতারা তাগাদা দিচ্ছে দ্রুত ফিরে যাওয়ার; আর সেই বিদায়লগ্নে তাঁরা শেষবারের মতো ভালোবাসার তাজমহলটিকে দেখে নিচ্ছেন…
ঠিক এই আবেগঘন প্লটের ওপর নির্ভর করেই ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল বিশ্বসঙ্গীতের এক ঐতিহাসিক দ্যোতনা—‘A Night at the Taj’ অ্যালবাম। ইমদাদখানী-ইটাওয়া ঘরানার প্রবাদপ্রতীম দুই সুরসাধক ওস্তাদ বেলায়েত খাঁ (সেতার) এবং তাঁর অনুজ ওস্তাদ ইমরাত খাঁ (সুরবাহার)-এর অবিস্মরণীয় জুগলবন্দিতে প্রায় ৪০ মিনিট জুড়ে রেকর্ড করা হয়েছিল রাগ চাঁদনী-কেদার। সেখানে সুরবাহারের সুগম্ভীর ধ্বনিতে ফুটে উঠেছিল শাহজাহানের বিরহ আর সেতারের সুমিষ্ট টানে রূপ পেয়েছিল মমতাজের ব্যাকুলতা। তবলায় সংগত করেছিলেন পণ্ডিত নিজামুদ্দিন খাঁ।
ইতিহাস ও রাগের পরিচয়
চাঁদনী-কেদার কোনো নতুন বা গাণিতিক রাগ নয়; এটি মূলত কল্যাণ ঠাটের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা কেদার পরিবারের একটি অত্যন্ত মনোহর শাখা রাগ।
সাধারণ শ্রোতার কানে প্রথমবার শুনলে একে খাঁটি কেদার বলেই মনে হয়। তবে কেদারের চিরাচরিত গাম্ভীর্যের পাশাপাশি এতে কোমল নিখাদ (ণ) এবং কোথাও কোথাও স্পর্শমাত্র শুদ্ধ গান্ধারের প্রয়োগ রাগে এক পরম স্নিগ্ধ জোৎস্নাময় পরিবেশ তৈরি করে। এর মূল রস হলো শৃঙ্গার (মিলনের আনন্দ ও বিরহের করুণতা) এবং শান্ত রস।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: কল্যাণ ঠাট।
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ‘গ’ বা গান্ধার প্রায় বর্জিত বা বক্রভাবে ব্যবহৃত হয়; অবরোহে সাতটি স্বর)।
- বাদী স্বর: ম (শুদ্ধ মধ্যম)।
- সমবাদী স্বর: স (ষড়্জ)।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), শুদ্ধ গান্ধার (গ – বক্র ও স্পর্শ স্বর), শুদ্ধ মধ্যম (ম), তীব্র মধ্যম (হ্ম – কেদার অঙ্গের মূল স্পর্শ), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (দ), শুদ্ধ নিখাদ (ন – আরোহে) এবং কোমল নিখাদ (ণ – অবরোহণে চাঁদনী অঙ্গ ফুটিয়ে তুলতে)।
- সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত স্নিগ্ধ, মায়াবী, গম্ভীর অথচ আভিজাত্যপূর্ণ।
আরোহ, অবরোহ ও পকড় (স্বরসংগতি)
আরোহণ:
স ম, হ্ম ম প, ধ নি র্স
(S – m, M – M – P, D – N – S’)
অবরোহণ:
র্স ণ ধ প, ধ প হ্ম ম, ম র স
(S’ – n – D – P, D – P – M’, m – R – S)
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
ধ নি ধ প, ধ প হ্ম ম, m - র - স
(D – N – D – P, D – P – M’, m – R – S)
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
১. তীব্র ও শুদ্ধ মধ্যমের প্রয়োগ: খাঁটি কেদারের মতোই এতে শুদ্ধ মধ্যম থেকে তীব্র মধ্যমে গিয়ে পঞ্চমে রূপান্তর (ম হ্ম প) অত্যন্ত জোরদার ও স্পষ্ট। তবে চাঁদনী-কেদারে শুদ্ধ ও তীব্র মধ্যমের ওপর অতিরিক্ত আন্দোলন ও স্থায়িত্ব দেওয়া হয়।
২. চাঁদনী অঙ্গের ‘কোমল নিখাদ’: সাধারণ কেদারে কোমল নিখাদ ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু অবরোহণে র্স ণ ধ প বা ধ ণ ধ প মীড়ে কোমল নিখাদের সূক্ষ্ম প্রয়োগই একে ‘চাঁদনী’ বিশেষণে ভূষিত করে।
৩. গান্ধার ও নিখাদ নিয়ে বিতর্ক: বিভিন্ন ঘরানার প্রয়োগভেদে চাঁদনী-কেদারে কোমল নিখাদের মাত্রা এবং অবরোহে শুদ্ধ গান্ধার স্পর্শ করা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। ইমদাদখানী ঘরানায় শুদ্ধ নিখাদ ও অবরোহী কোমল নিখাদের সুষম ভারসাম্যকে প্রধান প্রাধান্য দেওয়া হয়।
একসময় শাস্ত্রীয় আসরে এই রাগের বেশ চল ছিল এবং এইচএমভি (HMV)-সহ নানা গ্রামোফোন লেবেলে এর বাণিজ্যিক রেকর্ডও পাওয়া যেত। তবে বিগত দু-তিন দশকে মূলধারার মেহফিলে বিরল ও জটিল স্বরপ্রক্ষেপণের কারণে রাগটি কিছুটা অপ্রচলিত হয়ে পড়েছে।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ কেদার: কেদার পরিবারের জনক রাগ; যাতে কোমল নিখাদের প্রয়োগ সম্পূর্ণ বর্জিত।
- রাগ জলধর কেদার: কেদার পরিবারের আরেকটি প্রখ্যাত ও প্রফুল্ল রূপ।
- রাগ কামোদ: কল্যাণ ঠাটের আরেকটি সুপ্রাচীন রাগ যার সাথে অবরোহী ‘গ ম র স’ চরণের মিল পাওয়া যায়।
- রাগ ছায়ানট: কেদার ও কল্যাণ অঙ্গের নিকটবর্তী রাতের আরেকটি জনপ্রিয় রাগ।

কাজী নজরুল ইসলামের গানে চাঁদনী-কেদার:
নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।
১. অধীর বাগচীর কণ্ঠে- তরুণ অশান্ত কে বিরহী (তাল : ত্রিতাল, কথা ও সুর : কাজী নজরুল ইসলাম)। একই গান আঙুরবালা দেবীর কণ্ঠে।
যন্ত্রে চাঁদনী-কেদার:
সেতার:
১. ইমদাদখানী-ইটাওয়াহ ঘরানার ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ ও তার ভাই ইমরাত খাঁ সাহেবের বিখ্যাত চাঁদনি কেদারের কম্পোজিশন – A Night At The Taj ।
২. মাইহার ঘরানার পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের – চাঁদনী-কেদার।
৩.
সারেঙ্গী:
১. নাতথু খানের সারেঙ্গীতে- চাঁদনী কেদার
২.
খেয়াল:
১. ওস্তাদ আমীর খানের – চাঁদনী কেদার লাইভ । এটি নাকি ওস্তাদ ইমরাত খাঁ সাহেবের কোলকাতার বাসায় রেকর্ড করা।
২. ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ সাহেবের চাঁদনী-কেদার।
৩. তান সম্রাট ওস্তাদ নাসির আহমদ খাঁ সাহেবের ছোট্ট একটি – চাঁদনি-কেদার।
৪. পাটিয়ালা ঘরানার ওস্তাদ আমানত আলী- ফাতেহ আলী খাঁর- চাঁদনী-কেদার।
টিউটোরিয়াল:
যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। স্বর মল্লিকার পাশাপাশি দু একটি লক্ষণ গীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। লক্ষণ গীত মূলত শেখানো হয় রাগের লক্ষণগুলো সহজে ধরতে। লক্ষণ গীত ছোট খেয়াল প্রায় একই কাজ করে। অনলাইনে অনেক গুলো আছে। একটু খোঁজাখুঁজি করলে পেয়ে যাবেন। স্যাম্পল হিসেবে নিচের দুটো লিংক দেয়া হল।
রিলেটেড রাগ:
কেদার, বসন্ত-কেদার, কেদার-মালহার
চাঁদনী-কেদার সম্পর্কে আরও জানার জন্য:
১. Parrikar আর্কাইভ এর লেখা
২.
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
আরও পড়ুন :
