রাষ্ট্র যখন নতুন খোদা ও দেশপ্রেমের অভিনয় । ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

আমরা কি কখনো ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছি – যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা বেঁচে আছি, যে দেশটা আমাদের পরিচয় দেয়, সেই দেশের প্রতি ভালোবাসা কি আসলেই আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী হতে পারে?

গত শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশ ও আরব বিশ্বে ইসলামের এমন এক ধরনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বেশ পরিচিতি পায়, যেখানে ‘দেশ’ বা ‘জাতিরাষ্ট্র’কে এক নতুন উপাস্য বা মূর্তির মতো করে দেখানো হয়েছে। আল্লামা ইকবালের সেই বিখ্যাত কবিতার লাইনেও ঠিক এই সুরটাই উঠে এসেছিল—যেখানে তিনি বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ হলো ধর্মের কাফন।

উর্দু (আল্লামা ইকবাল):

ইন তাজা খুদাও মে বড়া সব সে ওয়াতান হ্যায়

জো প্যায়রাহান ইস কা হ্যায়, ও মাজহাব কা কাফน হ্যায়

বাংলা অনুবাদ:

“এই নতুন খোদাদের মধ্যে ‘দেশ’ বা ‘রাষ্ট্রই’ সবচেয়ে বড়,

এই খোদার গায়ের পোশাক মানেই ধর্মের কাফন!”

কিন্তু এই চিন্তা যখন কোনো মানুষের মনের গভীরে বসে যায়, তখন তার নিজস্ব সত্তার ভেতরেই একটা বড় ধরনের আদর্শিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বিশেষ করে ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে মওদুদীর লেখালেখি থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ইসলামের এই ‘জাতীয়তাবাদ-বিরোধী’ বয়ানকে যেভাবে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করা হয়েছে, তা আজ ইতিহাসের এক জটিল বিচার্য বিষয়। যদি ‘দেশপ্রেম’ মানেই কোনো না কোনোভাবে ধর্মীয় বিচ্যুতি বা ‘শিরক’ হয়, তবে একজন সাধারণ মুসলিম কি কখনো নিজের দেশের প্রতি পুরোপুরি সৎ থাকতে পারেন? নাকি তাকে প্রতিনিয়ত মনের বিরুদ্ধে একটা সামাজিক অভিনয় করে যেতে হয়?

তাহলে মূল প্রশ্নটা এখানেই—এই ধরনের বিশ্বাস বুকে নিয়ে একজন মানুষের পক্ষে কি আসলেই প্রকৃত দেশপ্রেমিক হওয়া সম্ভব?

স্যার মুহাম্মদ ইকবাল [ Muhammad Iqbal ]

ইকবালের দর্শন ও তাত্ত্বিক অনুসন্ধান

এই চিন্তার আসল গোড়াটা কোথায়, তা বুঝতে হলে আমাদের আল্লামা ইকবালের কবিতা আর তাঁর দর্শনের পেছনের প্রেক্ষাপটটা জানতে হবে। এক শতাব্দী আগে, চোখের সামনে যখন অটোমান খিলাফত ভেঙে যাচ্ছিল আর কামাল আতাতুর্কের হাত ধরে আধুনিক তুরস্কের জন্ম হচ্ছিল, তখন পুরো মুসলিম দুনিয়ার চেনা পরিবেশটা ওলটপালট হয়ে যায়। সেই সময়ে খিলাফত হারানোর বড় ধাক্কায় তৎকালীন অনেক চিন্তাবিদ ও সাধারণ মানুষ ভীষণ বিчисли হয়ে পড়েছিলেন। এই বড় সংকটের দিনে দাঁড়িয়ে আল্লামা ইকবাল তাঁর কবিতায় বলতে শুরু করলেন যে, মানচিত্রের সীমানা দিয়ে ঘেরা এই দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদ আসলে মুসলিম উম্মাহর একতার সবচেয়ে বড় শত্রু।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জন্ম নেওয়া এই ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ (Political Islam) বা ‘ইসলামিজম’-এর মূল ভিত্তিটি আসলে দাঁড়িয়ে ছিল ধর্মকে মানুষের আত্মিক বা নৈতিক শোধনের জায়গা থেকে সরিয়ে, তাকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের একটা রাজনৈতিক মতাদর্শে রূপান্তর করার ওপর। একে ঠিকমতো বুঝতে হলে আমাদের দুটি তাত্ত্বিক দিক দেখতে হবে:

১. ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের প্রতি অনীহা

এই চিন্তাধারার মূল কথা ছিল—একজন মুসলিমের পরিচয় কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকতে পারে না। আজ আমরা মানচিত্রে যে বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের সীমানা দেখি, একে তারা মনে করতেন পশ্চিমা উপনিবেশবাদের তৈরি করা একটা কৃত্রিম দাগ। সৈয়দ আবুল আ’লা মওদুদী (জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা) তাঁর আলোচিত ‘ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ’ (Islam and Nationalism) গ্রন্থে খুব স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে, ইসলাম এবং জাতীয়তাবাদ দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর জিনিস। তিনি জাতীয়তাবাদকে একটি ‘জাহিলিয়াত’ (অন্ধকার যুগ) বা তাগুতি (আল্লাহ-বিরোধী) শক্তি হিসেবে আখ্যা দেন। তাঁর মতে, নিজের মাটিকে ভালোবাসা বা দেশের সীমানাকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া এক ধরনের ‘আধুনিক মূর্তিপূজা’ বা শিরক, কারণ চূড়ান্ত আনুগত্য কেবল আল্লাহরই প্রাপ্য, কোনো ভূখণ্ডের বা পতাকার নয়।

২. সহিংসতার তাত্ত্বিক ভিত্তি

তত্ত্বের দিক থেকে এটাই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক মোড়। মওদুদী তাঁর ‘ইসলামের রাজনৈতিক মতবাদ’ (Political Theory of Islam) এবং ‘কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা’ বইয়ে ‘হাকিমিয়্যাত’ (Sovereignty of God) তত্ত্বের অবতারণা করেন। তিনি বলেন, মানুষের তৈরি কোনো আইন বা ধর্মনিরপেক্ষ বিধান (যেমন গণতন্ত্র বা জাতীয়তাবাদ) মেনে নেওয়া মানে আল্লাহর আইনকে অস্বীকার করা। আর যারা আল্লাহর আইনকে বাদ দিয়ে নিজেদের মতো সমাজ তৈরি করে, তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটাই ঈমানের দাবি।

যখন এই তত্ত্ব দিয়ে প্রমাণ করে দেওয়া হলো যে—দেশকে ভালোবাসা বা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করা মানেই আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে যাওয়া বা ‘শিরক’ করা; তখন তার পরের ধাপটি খুব স্বাভাবিকভাবেই চরমপন্থার দিকে চলে গেল। যেহেতু ধর্মীয় দৃষ্টিতে শিরক সবচেয়ে বড় অপরাধ, তাই এই বুদ্ধিজীবীরা যুক্তি দিলেন যে, এই ‘শিরক’-এর ওপর ভিত্তি করে যে রাষ্ট্র বা আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা ধ্বংস করা এক ধরনের ধর্মীয় দায়িত্ব বা ‘জিহাদ’।

আবুল আলা মওদুদী

১৯৭১: ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস

এই চরমপন্থী ও বিকৃত ব্যাখ্যার সবচেয়ে বাস্তব ও নিষ্ঠুর উদাহরণ তৈরি হয়েছিল ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশের মানুষ যখন নিজেদের ভাষা, অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়ছিল, তখন এই বয়ানটাকেই সরাসরি মাঠে বাস্তবায়ন করা হয়।

জামায়াতে ইসলামী, তাদের অঙ্গসংগঠন (আল-বদর, আল-শামস) এবং তৎকালীন পাকিস্তানের উগ্রপন্থী ওলামারা বিভিন্ন ফতোয়া ও বক্তৃতায় প্রচার করেছিলেন যে, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করা একটি ‘ফরজ’ বা আবশ্যকীয় দ্বীনি কাজ।

যেহেতু বাঙালিরা ‘মুসলিম উম্মাহ’ (যার প্রতীকী রূপ ছিল পাকিস্তান) ভেঙে একটি ভাষাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) গড়তে চাচ্ছিল, তাই তাদের চোখে বাঙালিরা হয়ে গিয়েছিল ‘বিদ্রোহী’ বা ‘মুনাফিক’।

এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই, মাঠপর্যায়ে বাঙালিদের সম্পদ ও নারীদের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বৈধতা দিয়ে ‘শত্রুর মাল’ হিসেবে গণ্য করার মতো চরম অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। ফলে নির্বিচারে গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধকে তারা ‘ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে জায়েজ’ মনে করতে পেরেছিল।

একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আজ আমাদের ঠান্ডা মাথায় এটা বোঝা খুব জরুরি যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শাসকরা কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েনি। তারা সাধারণ সৈনিক এবং তাদের অনুসারীদের ব্রেনওয়াশ করার জন্য এই বুদ্ধিজীবীদের তৈরি করা একটা ‘তাত্ত্বিক আফিম’ খাইয়েছিল।

যে সৈনিক বা আল-বদর সদস্যটি সাধারণ মানুষকে লাইন ধরে গুলি করে মারছিল, সে কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে অন্ধ হয়ে বিশ্বাস করছিল যে সে কোনো অপরাধ করছে না; বরং সে ‘ইসলামের শত্রু’ বা ‘জাতীয়তাবাদী মুনাফিকদের’ বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ করছে।

তত্ত্বের এই ভয়ংকর বিকৃতিই একটা জলজ্যান্ত মানুষকে কতটা নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে—ইতিহাসে ১৯৭১ আমাদের জন্য তার সবচেয়ে বড় এবং বেদনাদায়ক প্রমাণ।

একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবে এই ঐতিহাসিক সত্যগুলো গভীরভাবে ভাবায়। মনে প্রশ্ন জাগে—কীভাবে শুধুমাত্র ভাষার পার্থক্যের কারণে কিংবা নিজের অধিকারের কথা বলায় একজন কালেমাধারী মুসলিম অন্য মুসলিমের চোখে ‘মুনাফিক’ বা শত্রু হয়ে যেতে পারে? কীভাবে এই ধরনের অমানবিক আচরণকে ধর্মের নামে হালাল করার চেষ্টা করা সম্ভব হলো?

১৯৩৫ সালে স্যার মুহাম্মদ ইকবাল, লেডি অটোলাইন মোরেলের তোলা ছবি

অভিনয়ের দেশপ্রেম

সেদিনের সেই পুরনো আলোচনাগুলো যদি আমরা আজকের বাস্তবতায় মেলাই, তবে একটা খুব কঠিন মনস্তাত্ত্বিক সত্য সামনে চলে আসে। যারা আজও সেই উগ্র বা সংকীর্ণ রাজনৈতিক চিন্তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন, তারা মন থেকে কখনো আমাদের মতো সাধারণ দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি হতে পারেন না। কারণ তাদের মনের গভীরে বাংলাদেশ বা এই আধুনিক শাসনব্যবস্থা একটা অনৈসলামিক দেশ ছাড়া আর কিছুই নয়। ঠিক একইভাবে, আমরা যারা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি আর এই প্রিয় বাংলাদেশকে মন থেকে ভালোবাসি—তারাও সেই সংকীর্ণ মনের মানুষদের চোখে কখনো ‘খাঁটি’ বা সত্যিকারের মুসলমান হয়ে উঠতে পারি না।

আজকে যখন জামায়াতে ইসলামী বা মুসলিম লীগের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করা মানুষদের মুখে বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা কিংবা স্বাধীনতার পক্ষে বড় বড় কথা শোনা যায়, তখন তাদের ভেতরের আসল রূপটা বোঝা খুব একটা কঠিন নয়। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, এটা আসলে কোনো মন থেকে আসা অনুভূতি নয়, बल्कि পুরোপুরি একটা রাজনৈতিক কৌশল। সবচেয়ে বড় সংকট হলো, তারা তাদের এই দ্বিমুখী আচরণ বা কপটতাকেও নিজস্ব ধর্মীয় বয়ান দিয়ে নিজেদের কাছে হালাল বা বৈধ করার চেষ্টা করে।

এই দলগুলোর মানুষেরা মনে করে যে, তাদের ভাষায় এই ‘অনৈসলামিক’ বা ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে কিংবা বড় কোনো political লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ‘আল-তাকিয়া’ বা ‘হিকমাহ’ (কৌশল) অবলম্বন করা পুরোপুরি জায়েজ। যেহেতু তারা মন থেকে বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ও চেতনাকে মেনে নিতে পারে না, তাই এখানে মানিয়ে চলার স্বার্থে তারা মুখে ‘দেশপ্রেমের’ অভিনয় করা বা ছদ্মবেশ ধারণ করাটাকেই এক ধরনের ধর্মীয় হিকমাহ বা কৌশলগত অবস্থান মনে করে।

এই দ্বন্দ্বটা কিন্তু কেবল রাজনীতির মাঠের একটা হিসাব-নিকাশ নয়, এটা মানুষের মনের ভেতরের এক গভীর সততার সংকট। ‘আল-তাকিয়া’ বা ছদ্মবেশের এই বিশ্বাসের চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে জামায়াত বা মুসলিম লীগের মতো পাকিস্তানি চিন্তাধারার অনুসারীদের পক্ষে একই সাথে বাংলাদেশের প্রতি খাঁটি ভালোবাসা আর বুকে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সততার সাথে ধারণ করা—আসলেই এক অসম্ভব সমীকরণ। তারা সবসময়ই নিজের অজান্তে এক ধরনের দ্বিমুখী বা কপট জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়।

আরও দেখুন: