কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার ওসমানপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত রমানাথপুর গ্রামে অবস্থিত রমানাথপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ আজ একটি গৌরবময় বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছে। গড়াই নদীর তীরবর্তী অবহেলিত ও বঞ্চিত জনপদের মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার লক্ষ্যেই ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং স্থানীয় মানুষের সামাজিক উন্নয়ন, সচেতনতা ও নিরক্ষরমুক্তি আন্দোলনের প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে।

আজ এটি রমানাথপুর, গণেশপুর, আজইল, কোমরভোগসহ আশপাশের গ্রামের হাজারো মানুষের গর্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। শিক্ষা-দীক্ষায় দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এটি জেলার অন্যতম।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
১৯৮৬ সালের ২৪ অক্টোবর, তৎকালীন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিছু তরুণ, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে এ প্রতিষ্ঠানের সূচনা হয়।
প্রতিষ্ঠার মূল প্রেরণাদাতা ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক আব্দুল মমিন বিশ্বাস।
প্রথমে প্রতিষ্ঠানটি “রমানাথপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়” নামে যাত্রা শুরু করে গণেশপুর মারোয়ারীদের পরিত্যক্ত একটি গোলাবাড়ীতে। পরবর্তীতে রমানাথপুর গ্রামে জিকে খাল সংলগ্ন নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হয়। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় মানুষের আস্থার জায়গায় পরিণত হয়।
স্বীকৃতি ও ধাপে ধাপে অগ্রযাত্রা
১৯৯১ সালে: নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
২০০২ সালে: পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে।
২০০৬ সালে: উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে উন্নীত হয় এবং যশোর শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে।
বর্তমানে এটি ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান করছে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ
শিক্ষার্থী সংখ্যা: প্রায় ৬০০ জন
প্রভাষক: ৯ জন
সহকারী শিক্ষক: ১৫ জন
কর্মচারী (৩য় ও ৪র্থ শ্রেণি): ১০ জন
মোট জনবল: ৩৪ জন
প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় চমৎকার ফলাফল অর্জন করে আসছে। শিক্ষার্থীরা শুধু স্থানীয় পর্যায়েই নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে।
অবদান ও গুরুত্ব
গড়াই নদী অধ্যুষিত এই অঞ্চলের মানুষ এক সময় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। রমানাথপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার ফলে আজ সেই জনগোষ্ঠী সাক্ষরতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি শুধু সাধারণ শিক্ষা নয়, বরং সাংস্কৃতিক চর্চা, ক্রীড়া ও সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে এটি খোকসা উপজেলার অন্যতম প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।
অবকাঠামো ও আধুনিক উদ্যোগ
২০১৬ সালে স্থানীয় সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুর রউফের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানে একটি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়, যা তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
কলেজ শাখার এমপিওভুক্তির পর প্রধান বিচারপতি মো: হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর সুপারিশে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যেই মাটি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং শিগগিরই নির্মাণ কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব
প্রতিষ্ঠানটিতে একটি পূর্ণাঙ্গ শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব রয়েছে। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে স্থাপিত এই ল্যাবে আধুনিক প্রযুক্তি সরঞ্জাম দিয়ে শিক্ষার্থীদের আইসিটি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
যোগাযোগ:
প্রধান শিক্ষক: গোলাম মোস্তফা কামাল
📞 ফোন: ০১৭১৬৬০৫২৪৪
✉️ ইমেইল: Ramanathpur.ac@gmail.com
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় অবদান
রমানাথপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ শুধু পড়াশোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায়ও এটি খোকসা উপজেলার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের একটি।
শিক্ষার্থীরা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বারবার কৃতিত্ব দেখিয়েছে।
সাংস্কৃতিক চর্চা এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় ও জাতীয় পরিমণ্ডলে সুনাম অর্জন করেছে।
পরিচালনা ও নেতৃত্ব
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান সভাপতি হলেন বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক, ড. আমানুর আমান, পরিচালক, জনসংযোগ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষক মোস্তফা কামাল শিক্ষাবার্তাকে জানিয়েছেন—
“বর্তমানে পড়াশোনার পরিবেশ ও শিক্ষার মান ভালোভাবেই চলছে। কেবল একটি বহুতল ভবনের অভাব রয়েছে। ভবনটি নির্মিত হলে প্রতিষ্ঠানটি সব দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।”
প্রতিষ্ঠার পর থেকে গড়াই নদীর অববাহিকায় শিক্ষা-সচেতনতার আলো ছড়িয়ে আসছে রমানাথপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রায় চার দশকের পথচলায় এটি আজ খোকসা উপজেলার অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্য এবং কুষ্টিয়া জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছে।





