পেট্রো ডলার কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠলো?

পেট্রো ডলার—শব্দটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর ও বহুমাত্রিক। মূলত এটি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সেই আয়কে বোঝায়, যা মার্কিন ডলারে অর্জিত হয়। ১৯৭০-এর দশকে উদ্ভূত এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান নেয়। পেট্রো ডলারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ডলারকে বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যার ফলে তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য আরও সুসংহত হয়।

তবে পেট্রো ডলার কেবল একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, যুদ্ধ-বিগ্রহ, নিষেধাজ্ঞা, গোপন অপারেশন এবং বিশ্ব রাজনীতির অন্ধকার অধ্যায়। এই লেখায় ঐতিহাসিক দলিল ও গবেষণার আলোকে আমরা পেট্রো ডলারের উত্থান, এর সঙ্গে যুক্ত যুদ্ধ ও অশান্তি, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কৌশল (বিশেষত সিআইএ-এর ভূমিকা) এবং বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশদ আলোচনা করব। এতে স্পষ্ট হবে কীভাবে একটি মুদ্রা ব্যবস্থা বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং কেন এটি আজও বিশ্ব শান্তির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

পেট্রো ডলারের উত্থান: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

পেট্রো ডলারের সূচনা ১৯৭০-এর দশকের বৈশ্বিক তেল সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস চুক্তি মার্কিন ডলারকে সোনার সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্ব অর্থনীতির মূল ভিত্তিতে পরিণত করে। তখন প্রতি আউন্স সোনার মূল্য নির্ধারিত ছিল ৩৫ ডলার এবং অন্যান্য দেশের মুদ্রা ডলারের সঙ্গে বাঁধা ছিল।

কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপুল ব্যয়, অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি এবং অতিরিক্ত ডলার ছাপানোর ফলে সোনার রিজার্ভ দ্রুত কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ‘নিক্সন শক’ ঘোষণা করে ডলারকে সোনার মান থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। এর মধ্য দিয়ে ফিয়াট কারেন্সি যুগের সূচনা হয় এবং ডলারের মূল্য হ্রাস পায়, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

এই সংকটের মধ্যেই ১৯৭৩ সালে ইয়োম কিপুর যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ওপেকভুক্ত আরব দেশগুলো তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ফলে তেলের দাম এক লাফে চারগুণ বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র তখন চরম চাপে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের নেতৃত্বে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি হয়। ১৯৭৪ সালে সৌদি রাজা ফয়সালের সঙ্গে এই চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব তেল বিক্রি করবে কেবল মার্কিন ডলারে এবং অর্জিত অতিরিক্ত আয় মার্কিন ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করবে।

এই চুক্তিই পেট্রো ডলারের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে অন্যান্য ওপেক দেশও এই ব্যবস্থায় যুক্ত হতে বাধ্য হয়। ফলে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য পুরোপুরি ডলারনির্ভর হয়ে ওঠে। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘পেট্রো ডলার রিসাইক্লিং’, যা ১৯৭৪ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে প্রথম বড় পরিসরে কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অনায়াসে ডলার ছাপিয়ে বাজেট ঘাটতি চালাতে পারে, কারণ বিশ্বজুড়ে তেল আমদানিকারক দেশগুলোকে ডলার জমা রাখতে হয়।

এই ব্যবস্থার ফলে তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর অতিরিক্ত আয় আবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই ফিরে আসে। এতে মার্কিন ব্যাংকগুলো লাভবান হয় এবং ডলারের মূল্য স্থিতিশীল থাকে। তবে একই সঙ্গে আরব বিশ্বে বিভাজন সৃষ্টি হয়, যা ‘আরব কোল্ড ওয়ার’-এর জন্ম দেয়। মূলত এই ব্যবস্থাই যুক্তরাষ্ট্রকে কার্যত ‘অসীম ঋণ’ ব্যবস্থার সুবিধা দেয়।

পেট্রো ডলারের উত্থান ও যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস

পেট্রো ডলার যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক আধিপত্য দিলেও এর মূল্য দিতে হয়েছে বিশ্বকে। এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো হুমকিকে দমন করেছে, যা প্রায়ই সামরিক হস্তক্ষেপে রূপ নিয়েছে।

ইরাক তার অন্যতম উদাহরণ। ২০০০ সালে সাদ্দাম হোসেন তেল বিক্রিতে ডলারের বদলে ইউরো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। এটি ডলারের আধিপত্যের জন্য সরাসরি হুমকি ছিল। এরই পরিণতিতে ২০০৩ সালে ‘ওয়েপনস অফ ম্যাস ডেসট্রাকশন’-এর অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করা হয়। যুদ্ধের পর ইরাক আবার ডলারে তেল বিক্রিতে ফিরে যায়। এই যুদ্ধে প্রায় ৪.৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, যার ফলশ্রুতিতে ISIS-এর মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের উত্থান ঘটে।

একইভাবে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ২০০৯ সালে আফ্রিকার জন্য সোনা-ভিত্তিক ‘আফ্রো’ মুদ্রা চালুর উদ্যোগ নেন। এটি পেট্রো ডলারের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ২০১১ সালে ন্যাটোর নেতৃত্বে লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ হয় এবং গাদ্দাফি নিহত হন। এর পর দেশটি দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতায় নিমজ্জিত হয়, যা আফ্রিকায় অভিবাসন সংকট ও সন্ত্রাসবাদ বাড়িয়ে তোলে।

ভেনিজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধেও একই ধাঁচের চাপ দেখা যায়। তিনি চীনা ইউয়ানে তেল বিক্রি শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সাল থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং ২০২৫ সালে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়। এর ফলে দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়।

ইরানের ক্ষেত্রেও একই কৌশল দেখা যায়। ইরান ডলার এড়িয়ে ইউয়ান বা ইউরোতে তেল বিক্রি করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করে। ১৯৮০–৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে সমর্থন দিয়ে ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করে। এই যুদ্ধে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিহত হয়।

একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সংঘটিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধের ২৫–৫০ শতাংশই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তেল-সংশ্লিষ্ট ছিল, যা পেট্রো ডলারের সঙ্গে জড়িত। এসব উদাহরণ স্পষ্ট করে যে পেট্রো ডলার রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও গোপন অপারেশনের পথ বেছে নিয়েছে।

পেট্রো ডলারের নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র ও সিআইএর ভূমিকা

পেট্রো ডলারের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। সৌদি চুক্তির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ওপেক দেশগুলোকে সামরিক সুরক্ষা ও অস্ত্র সহায়তা দিয়ে এসেছে। এই ব্যবস্থাই পেট্রো ডলার রিসাইক্লিংকে কার্যকর রাখে।

১৯৪৭ সালের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী, সিআইএর দায়িত্ব জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা, যার মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও অন্তর্ভুক্ত। পেট্রো ডলারকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই সিআইএ গোপন অপারেশন, গোয়েন্দা সংগ্রহ ও কৌশলগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে রক্ষা করে।

ভেনিজুয়েলা, ইরান-ইরাক যুদ্ধ কিংবা ১৯৭০-এর দশকে আরব দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন—সব ক্ষেত্রেই সিআইএর ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া যায়। গোপন রিপোর্টগুলোতে পেট্রো ডলারকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের ভবিষ্যৎ

বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে ডি-ডলারাইজেশনের দিকে এগোচ্ছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের অংশ ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে ২০১৬ সালে এটি ছিল ৬৫ শতাংশ। BRICS দেশগুলো ডলার এড়িয়ে ইউয়ান বা রুবলে বাণিজ্য করছে। চীন ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই এখন ইউয়ানে। সৌদি আরবও চীনের সঙ্গে ইউয়ানে তেল বিক্রির চুক্তি করেছে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) ডলারের আধিপত্যকে আরও চ্যালেঞ্জ করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ঋণ (৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ডলারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের মতে, ডলারের প্রভাব ধীরে ধীরে কমবে, যদিও এটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হবে না। ভবিষ্যতে একটি বহুমুদ্রা-ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করবে। ২০২৫ সালে ডলার ইনডেক্স ৯.৫ শতাংশ কমেছে, যেখানে সোনার দাম বেড়ে ৩৯০০ ডলার প্রতি আউন্স ছাড়িয়েছে।

পেট্রো ডলার যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকে পরিণত করেছে, তবে এর বিনিময়ে বিশ্বকে মূল্য দিতে হয়েছে যুদ্ধ, অস্থিরতা ও মানবিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে। সিআইএ-সহ যুক্তরাষ্ট্রের গোপন কৌশল এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখলেও, ডি-ডলারাইজেশনের যুগে এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বিশ্ব যদি বহুমুখী মুদ্রা ব্যবস্থার দিকে এগোয়, তবে তা হয়তো দীর্ঘমেয়াদে আরও ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।