শাহ বানো মামলা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

আজ আমরা এমন একটি মামলার গল্প বলব, যা দেখতে খুবই সাধারণ। মামলার ধারা, বিষয় বা আইনি গুরুত্ব বিচার করলে এটি ছিল সিআরপিসির ১২৫ ধারায় করা একটি সাধারণ খোরপোষ মামলা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মামলাটিই পরে ভারতের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার গতিপথ আমূল বদলে দেয়।

১৯৩২ সালে ইন্দোরের খ্যাতনামা আইনজীবী মোহাম্মদ আহমেদ খানের সঙ্গে শাহ বানুর বিয়ে হয়। তাদের সংসারে পাঁচজন সন্তানের জন্ম হয়। দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাদের দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্তু একসময় আহমেদ খান দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তৎকালীন মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী এর জন্য শাহ বানুর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।

দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনায় শাহ বানু মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সংসারে তার ও সন্তানদের মর্যাদা কমতে থাকে। অবহেলা, অসম্মান এবং মানসিক নির্যাতন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালে, প্রায় ৪৩ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টেনে আহমেদ খান শাহ বানুকে ঘর থেকে বের করে দেন।

তবে শাহ বানু তখনই আদালতের দ্বারস্থ হননি। প্রথমে তিনি আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় মুসলিম সমাজের প্রবীণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন। তারা আহমেদ খানকে অনুরোধ করেছিলেন—হয় শাহ বানুকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে, নয়তো অন্তত তাকে খোরপোষ দিতে। কিন্তু এসব অনুরোধের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। তাই আহমেদ খান তা মানতে রাজি হননি।

এইভাবে স্থানীয় সালিশ ও মধ্যস্থতা চলতে চলতে প্রায় তিন বছর কেটে যায়। এ সময় শাহ বানু ও তার সন্তানরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। জমানো টাকা ও গহনা একে একে শেষ হয়ে যায়। ছেলেরাও তখন আইন পেশায় নতুন—তাদের আয় ছিল নামমাত্র। অল্প হাতের কাজ আর আত্মীয়দের সামান্য সহায়তায় পাঁচ সন্তান নিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

এই অবস্থায় বাধ্য হয়েই শাহ বানু আইনের আশ্রয় নেন। ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে তিনি সিআরপিসির ১২৫ ধারায় খোরপোষের মামলা করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আইনটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

শাহ বানু আদালতে মাসিক ৫০০ টাকা খোরপোষ দাবি করেন। সে সময় আহমেদ খানের মাসিক আয় ছিল প্রায় ৫,০০০ টাকা। অর্থাৎ দাবিকৃত অর্থ ছিল তার আয়ের তুলনায় খুবই সামান্য। তবুও আহমেদ খান এই খোরপোষ দিতেও অস্বীকার করেন।

মনে রাখতে হবে, এই ঘটনাগুলো ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন পৃথিবীর প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান ইতোমধ্যে তিন তালাক বাতিল করেছে এবং দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতিকে বাধ্যতামূলক করেছে। একই সময় ভারতে হিন্দু নারীরা স্বামীর আয়, স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি এবং জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি খোরপোষ পাওয়ার আইনি অধিকার ভোগ করছিলেন।

কিন্তু ভারতের মুসলিম নারীদের বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। আলাদা “ধর্মীয় পারিবারিক আইন”-এর অজুহাতে তালাকের পর মুসলিম নারীদের জন্য কার্যকর আইনি সুরক্ষা প্রায় ছিল না বললেই চলে। এই মামলার মূল জটিলতা তৈরি হয়েছিল সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় আইনের ওপর সংবিধানিক সুরক্ষাকে ঘিরে। আর এই সাংবিধানিক ফাঁকটিই পুরোপুরি কাজে লাগান মোহাম্মদ আহমেদ খান।

তিনি নিজেই ছিলেন একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী। তার যুক্তি ছিল—ভারতের সংবিধান তাকে ধর্মীয় বিষয়ে বিশেষ সুরক্ষা দিয়েছে। যেহেতু বিয়ে একটি ধর্মীয় বিষয়, তাই ধর্মনিরপেক্ষ আইন বা হিন্দু আইন তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। তিনি কেবল ইসলামি শরিয়াহ আইন মানতে বাধ্য, অন্য কোনো আইন দিয়ে তাকে খোরপোষ দিতে বাধ্য করা যায় না—এটাই ছিল তার দাবি।

শরিয়াহ আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, বিয়ের সময় নির্ধারিত মোহরানা পরিশোধ করা হয়ে গেলে এবং ইদ্দতকাল শেষ হলে একজন মুসলিম স্বামীর আর প্রাক্তন স্ত্রীর ভরণপোষণের কোনো দায় থাকে না। অর্থাৎ আইন অনুযায়ী শাহ বানুকে তিনি কিছুই দিতে বাধ্য নন—এটাই ছিল তার মূল প্রতিরক্ষা।

মামলাটি দায়ের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় চলে আসে। খুব দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে, কারণ মুসলিম সমাজে তখন আদালতে গিয়ে এভাবে খোরপোষ দাবি করার ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন ছিল। অন্যদিকে, ধর্মীয় আইনের সাংবিধানিক সুরক্ষার কারণে আদালতের অবস্থানও সহজ ছিল না। তবে মামলার মানবিক দিকটি এতটাই শক্তিশালী ও হৃদয়স্পর্শী ছিল যে, তা উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

মামলা শুরুর পরই কয়েকজন বিশিষ্ট আইনজীবী স্বেচ্ছায় শাহ বানুর পাশে দাঁড়ান এবং তাকে আইনি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেন।

শুরুতে আদালত নিজেও মামলাটি গ্রহণ করার বিষয়ে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। অনেকেরই আশঙ্কা ছিল—আদালত হয়তো মামলাটি সরাসরি খারিজ করে দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মামলাটি রেকর্ড হয় এবং নিয়মিত শুনানি শুরু হয়।

মামলা শুরু হতেই মোহাম্মদ আহমেদ খান শাহ বানুকে চাপ দিতে থাকেন যেন তিনি মামলা তুলে নেন। শাহ বানু এতে রাজি না হওয়ায়, ১৯৭৮ সালের নভেম্বর মাসে—মামলা চলাকালীনই—তিনি শরিয়া আইনে ‘তিন তালাক’ দিয়ে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর করেন। এরপর আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি যুক্তি দেন—
“যেহেতু এখন শাহ বানু আমার স্ত্রী নন, তাই ইসলামের ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী তাকে ভরণপোষণ দেওয়ার আর কোনো প্রশ্নই আসে না।”

এখানেই মামলার আসল সংঘাতের জায়গাটি তৈরি হয়। প্রশ্ন দাঁড়ায়—এই মামলা শোনার মাধ্যমে কি ভারতীয় আদালত সংবিধানকেই চ্যালেঞ্জ করছে?

মুসলিম ওলেমাদের বড় একটি অংশ প্রকাশ্যে শাহ বানুর স্বামীর পক্ষে দাঁড়িয়ে যান। তাদের যুক্তি ছিল—এই মামলার মাধ্যমে রাষ্ট্র মুসলিমদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। ব্যক্তিগত আইন যেখানে স্পষ্ট, সেখানে রাষ্ট্রীয় আদালতের নাক গলানোর অধিকার নেই।

অন্যদিকে শাহ বানুর পক্ষের আইনজীবীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। তাদের মূল বক্তব্য ছিল—ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারা একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ আইন, যার উদ্দেশ্য সমাজ থেকে দারিদ্র্য ও ভবঘুরেপনা দূর করা। একজন নারী হিন্দু, মুসলিম বা খ্রিস্টান যাই হোন না কেন—যদি তিনি তালাকপ্রাপ্ত হন এবং নিজের ভরণপোষণে অক্ষম হন, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁকে ন্যূনতম সুরক্ষা দেওয়া। ব্যক্তিগত আইন কখনোই এই ধরনের জনকল্যাণমূলক আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।

এর পাশাপাশি তারা কয়েকটি নির্দিষ্ট যুক্তি তুলে ধরেন—

১. শাহ বানু স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়েননি। তার স্বামী জোর করে তাকে এবং তার সন্তানদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। আইন অনুযায়ী, যদি কোনো স্বামী বিনা কারণে স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেন, তাহলে ১২৫ ধারার অধীনে স্ত্রী প্রতিকার পাবেন।

২. একজন নারী যিনি ৪৩ বছর সংসার করেছেন এবং বর্তমানে বৃদ্ধ ও কর্মক্ষম নন, তাকে মাত্র ৯০ দিনের খরচ দিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া চরম অমানবিক। বিয়ের সম্পর্ক শেষ হলেও প্রাক্তন স্বামীর মানবিক ও সামাজিক দায় শেষ হয়ে যায় না।

৩. ১৯৩৭ সালের ‘শরিয়ত অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট’ মূলত দেওয়ানি বিষয়ের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু সিআরপিসির ১২৫ ধারা হলো একটি ফৌজদারি প্রতিরোধমূলক আইন (Preventive Law)। একটি দেওয়ানি প্রথা দিয়ে ফৌজদারি সুরক্ষা বাতিল করা যায় না।

৪. দেনমোহর হলো বিয়ের সময়কার একটি পাওনা বা আর্থিক অধিকার। এটি বিচ্ছেদের পর আজীবন ভরণপোষণের বিকল্প (Substitute) হতে পারে না।

৫. শাহ বানুর কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস নেই এবং এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁর পক্ষে কাজ করে জীবন চালানো বাস্তবসম্মত নয়। অন্যদিকে মোহাম্মদ আহমেদ খান ইন্দোরের একজন প্রতিষ্ঠিত ও ধনাঢ্য আইনজীবী, যার মাসিক আয় প্রায় ৫,০০০ রুপি—১৯৭৮ সালের হিসেবে যা অত্যন্ত বেশি। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দেওয়া ১২৫ ধারার সরাসরি লঙ্ঘন।

৬. মামলার সময় পর্যন্ত তালাক কার্যকর হয়নি, ফলে শাহ বানু আইনগতভাবে তখনও ‘স্ত্রী’ হিসেবেই মামলা করেছেন। উকিলদের বক্তব্য ছিল—১২৫ ধারা একটি সামাজিক কল্যাণমূলক আইন (Social Welfare Law), যা ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য। স্বামীর ব্যক্তিগত আইন যাই বলুক না কেন, সিভিল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এই ধারায় আদেশ দেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার রাখে।

সব শুনানি শেষে ১৯৭৯ সালের আগস্ট মাসে ইন্দোরের ম্যাজিস্ট্রেট আদালত শাহ বানুর পক্ষে রায় দেন। তবে আদালত মাসিক ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করেন মাত্র ২৫ রুপি

মোহাম্মদ আহমেদ খানের আয় ও সামাজিক অবস্থানের তুলনায় এই অঙ্ক ছিল হাস্যকরভাবে কম। শাহ বানুর আইনজীবীরা বলেন—একজন ধনী আইনজীবীর স্ত্রীর জন্য ২৫ রুপি ভরণপোষণ চরম অবমাননাকর। এই টাকায় শাহ বানুর পাঁচ সন্তানের সংসার চালানো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

ফলে শাহ বানু বাধ্য হন উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে। ১৯৭৯ সালেই তিনি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে একটি রিভিশন পিটিশন দায়ের করেন (Criminal Revision No. 320 of 1979)। সেখানে তার পক্ষে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব নেন বিশিষ্ট আইনজীবী দানিয়াল লতিফি

ইতিমধ্যে মামলাটি সারা দেশে তুমুল আলোচনার ঝড় তোলে। যেহেতু মুসলিম ওলেমাদের বড় একটি অংশ প্রকাশ্যে শাহ বানুর স্বামীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশে এই মামলার বিরুদ্ধে বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছিলেন, তাই বিষয়টিতে দ্রুতই একটি রাজনৈতিক মাত্রা যুক্ত হতে থাকে। এটি আর শুধু ব্যক্তিগত পারিবারিক মামলা ছিল না—এটি পরিণত হচ্ছিল রাষ্ট্র বনাম ধর্মীয় আইনের এক বড় সংঘাতে।

মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট শাহ বানুর আইনজীবীদের যুক্তিতে সম্মত হয়। ১ জুলাই ১৯৮০ তারিখে আদালত ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের ২৫ রুপির আদেশ বাতিল করে মাসিক ১৭৯.২০ রুপি ভরণপোষণ নির্ধারণ করে দেয়। যদিও এটি শাহ বানুর দাবিকৃত ৫০০ রুপির চেয়ে কম ছিল, তবুও এটি ছিল তার জন্য একটি বড় আইনি বিজয়।

এই রায়ের পর ক্ষুব্ধ হয়ে মোহাম্মদ আহমেদ খান ১৯৮১ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। এই আপিলই পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে ভারতের আইনি ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত রায়ে পরিণত হয়।

সুপ্রিম কোর্টে তার পক্ষে এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল বোর্ড-এর পক্ষ থেকে যেসব পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করা হয়, সেগুলো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত—

১. শরিয়তের সীমাবদ্ধতা:
তাদের প্রধান যুক্তি ছিল, ইসলামি আইন বা শরিয়ত অনুযায়ী একজন স্বামী তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে কেবল ‘ইদ্দতকাল’ (তিন মাস) পর্যন্ত ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। এর বাইরে এক পয়সা দেওয়াও শরিয়তবিরোধী।

২. মোহরানা ইদ্দত:
তারা বলেন, যেহেতু বিয়ের সময় নির্ধারিত মোহরানা পরিশোধ করা হয়েছে এবং ইদ্দতকালীন খোরপোষও দেওয়া হয়েছে, তাই CrPC ১২৫ ধারা এখানে প্রযোজ্য নয়। কারণ ১২৫(৩)(গ) উপধারায় বলা আছে—প্রথাগত আইন অনুযায়ী প্রাপ্য টাকা পরিশোধ করা হলে অতিরিক্ত ভরণপোষণের দাবি করা যায় না।

৩. ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ:
তারা ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে বলেন, মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন পালনের অধিকার আছে। সুপ্রিম কোর্ট যদি ১২৫ ধারা অনুযায়ী আজীবন ভরণপোষণের আদেশ দেয়, তাহলে তা হবে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ।

৪. বিচ্ছেদের পর সম্পর্ক:
তাদের একটি অত্যন্ত বিতর্কিত যুক্তি ছিল—তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায়। এরপরও স্বামীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া ইসলামি দৃষ্টিতে ‘হারাম’ বা অবৈধ।

এই যুক্তিগুলোর জবাবে শাহ বানুর আইনজীবী দানিয়াল লতিফি আদালতে এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক অবস্থান নেন। তিনি সরাসরি পবিত্র কুরআনের উদ্ধৃতি দেন। সুরা বাকারার ২৪১ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন—
ওয়া লিল মুতাল্লাকাতি মাতাউন বিল মারুফ”—অর্থাৎ, তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী উপযুক্ত সংস্থান বা ভরণপোষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, কুরআনে ব্যবহৃত মাতা’ (Mata) শব্দটির অর্থ কেবল তিন মাসের খরচ নয়, বরং একজন তালাকপ্রাপ্ত নারীর সম্মানজনকভাবে জীবনযাপনের জন্য যা প্রয়োজন, তাই-ই। এটি সাময়িক সাহায্য নয়, বরং একটি মানবিক ও সামাজিক দায়।

দানিয়াল লতিফির যুক্তি ছিল—সুপ্রিম কোর্ট যদি শাহ বানুকে ভরণপোষণ দেন, তবে তা ইসলামের বিরুদ্ধে যাবে না; বরং তা হবে কুরআনের প্রকৃত শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন।

সব যুক্তি ও পাল্টাযুক্তি শুনে ২৩ এপ্রিল ১৯৮৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। আদালত বলেন—CrPC ১২৫ ধারা একটি মানবিক আইন’, যার উদ্দেশ্য দুর্বল ও অসহায় নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া, এবং এটি সব ধর্মের মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

আদালত মোহাম্মদ আহমেদ খানের সব যুক্তি খণ্ডন করে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ১৭৯.২০ রুপির ভরণপোষণের আদেশ বহাল রাখেন।

কিন্তু এত লড়াইয়ের পর পাওয়া এই ঐতিহাসিক বিজয় শেষ পর্যন্ত শাহ বানুকে সেই টাকা গ্রহণ করার সুযোগই দেয়নি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ভারতের মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড এই রায়কে “ধর্মীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ” হিসেবে ঘোষণা করে। এর পরপরই দেশজুড়ে বিশাল বিক্ষোভ শুরু হয়।

শাহ বানু নিজ সমাজ এবং ধর্মীয় নেতাদের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েন। তাকে বোঝানো হতে থাকে যে, এই রায় মেনে নেওয়া মানে ইসলামবিরোধী অবস্থান নেওয়া। সামাজিকভাবে তাকে একপ্রকার একঘরে করে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়।

এই চাপের মুখে একপর্যায়ে শাহ বানু নিজেই সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি ঘোষণা দেন—যদি সুপ্রিম কোর্টের এই রায় তার ধর্মের (শরিয়ত) পরিপন্থী হয়, তবে তিনি সেই রায় প্রত্যাখ্যান করছেন। জনসমক্ষে দেওয়া তার বিবৃতিতে তিনি বলেন—

“যেহেতু আমার ধর্মীয় নেতারা বলছেন সুপ্রিম কোর্টের রায়টি কুরআন ও শরিয়তের বিরুদ্ধে, তাই আমি ওই টাকা (ভরণপোষণ) নিতে অস্বীকার করছি।”

তিনি আরও বলেন, পরকালে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে তিনি এই টাকা গ্রহণ করবেন না।

তবে এতে আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং মুসলিম ওলেমারা এই রায়কে “ধর্মে হস্তক্ষেপ”-এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে সারা দেশে তা বাতিলের আন্দোলন আরও জোরদার করেন।

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের (২৩ এপ্রিল ১৯৮৫) পর রাজীব গান্ধী সরকার শুরুতে একে একটি প্রগতিশীল ও মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানায়। মে–জুন ১৯৮৫ সালে তৎকালীন তরুণ মন্ত্রী আরিফ মোহাম্মদ খান লোকসভায় সরকারের পক্ষ থেকে এই রায়ের সমর্থনে দীর্ঘ ও সাহসী বক্তব্য দেন।

তিনি কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তি দেন—তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে ভরণপোষণ দেওয়া ইসলামের মৌলিক চেতনার বিরোধী নয়, বরং তা ইসলামের ন্যায়বিচার ও মানবিকতার মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার এই বক্তব্য তখন শিক্ষিত ও প্রগতিশীল মহলে ব্যাপক প্রশংসা পায়।

কিন্তু অন্যদিকে মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড ও রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতারা এই ইস্যুকে আরও বড় করে তুলতে থাকেন। তারা সারা দেশে প্রচার চালাতে থাকেন—সরকার ইসলামের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে, মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য ধ্বংস করতে চাইছে।

এইভাবে একটি ব্যক্তিগত খোরপোষের মামলা ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি বিশাল রাজনৈতিক সংকটে—যেখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ভোটের অঙ্ক।

শাহ বানু মামলার রায়ের পর ভারতের সংসদে যে অভূতপূর্ব আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মুসলিম লীগের সাংসদ জি. এম. বানাতওয়ালা এবং রাজীব গান্ধী সরকারের তৎকালীন তরুণ মন্ত্রী আরিফ মোহাম্মদ খান

১০ মে ১৯৮৫ তারিখে মুসলিম লীগের সাংসদ জি. এম. বানাতওয়ালা লোকসভায় একটি প্রাইভেট মেম্বার বিল’ (Code of Criminal Procedure Amendment Bill) পেশ করেন। বানাতওয়ালার প্রস্তাব ছিল—ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১২৫ এবং ১২৭ ধারা সংশোধন করতে হবে, যাতে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে যে এই ধারাগুলো মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, যদি তা তাদের ব্যক্তিগত আইনের (Personal Law) সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়।

বানাতওয়ালার যুক্তি ছিল—সুপ্রিম কোর্ট শাহ বানু মামলায় শরিয়তের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং এই রায় মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ। তিনি এমনকি প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করেও মুসলিম পার্সোনাল ল-কে সুরক্ষা দেওয়ার দাবি জানান।

এই বিলের বিরোধিতা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তাঁর সরকারের সবচেয়ে প্রগতিশীল মুখ আরিফ মোহাম্মদ খানকে সামনে আনেন। ২৩ আগস্ট ১৯৮৫ তারিখে লোকসভায় আরিফ মোহাম্মদ খান যে ভাষণ দেন, তা আজও ভারতীয় সংসদীয় ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিতর্ক হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরিফ মোহাম্মদ খান কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতার মতো কথা বলেননি; তিনি কথা বলেছেন একজন ইসলামি চিন্তাবিদের মতো। কুরআন ও হাদিস থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি যুক্তি দেখান—তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে ভরণপোষণ দেওয়া কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং তা কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ। তিনি বানাতওয়ালার বিলকে আখ্যা দেন ইসলামবিরোধী’ এবং নারীবিরোধী’

তার এই পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্যে রাজীব গান্ধী এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি পাশের একজনকে নাকি বলেছিলেন—
“আরিফ যদি এই বিলের সমর্থনে কথা বলত, তাহলে আমি ওকে সঙ্গে সঙ্গে বরখাস্ত করতাম।”

আরিফ মোহাম্মদ খানের ভাষণের পর মনে হচ্ছিল—সরকার দৃঢ়ভাবেই শাহ বানু রায়ের পক্ষেই থাকবে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাসে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে থাকে।

১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর আসতে আসতে রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে হয়ে ওঠে। মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড ও রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতারা রাজীব গান্ধীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। ১৯ ডিসেম্বর ১৯৮৫-তে কয়েকটি উপ-নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি হলে রাজীব গান্ধী ভয় পেয়ে যান। তিনি বুঝতে পারেন—মুসলিম ভোট ব্যাংক হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা বাস্তব।

এরপর আরিফ মোহাম্মদ খানকে কিছু না জানিয়েই সরকারের শীর্ষ মহল রক্ষণশীল আলেমদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু করে। রাজীব গান্ধী সিদ্ধান্তে পৌঁছান—মুসলিম ভোট ধরে রাখতে হলে ওলেমাদের সঙ্গে আপস করতেই হবে।

ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসা তরুণ প্রধানমন্ত্রীকে সবাই আধুনিক ও প্রগতিশীল নেতা হিসেবে দেখতেন। আশা করা হয়েছিল—তার হাত ধরে ভারতে বড় ধরনের সামাজিক সংস্কার আসবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার ওপর জল ঢেলে দিয়ে রাজীব গান্ধী শেষ পর্যন্ত ওলেমাদের পক্ষেই দাঁড়ালেন।

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—সুপ্রিম কোর্টের শাহ বানু রায়কে কার্যত অকার্যকর করে দিতে সংসদে নতুন আইন পাস করা হবে

সরকারের এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তনে আরিফ মোহাম্মদ খান নিজেকে গভীরভাবে প্রতারিত বোধ করেন। ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ সালে যখন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম মহিলা (বিবাহবিচ্ছেদে অধিকার সুরক্ষা) বিল’ আনার ঘোষণা দেয়, তখন ক্ষোভ ও হতাশায় তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এটি ছিল নীতিগত অবস্থানের এক বিরল উদাহরণ, যেখানে একজন ক্ষমতাসীন মন্ত্রী নিজের সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সরে যান।

এর পরপরই সরকার সংসদে নিজেদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে বিলটি পাস করে নেয়। ইতিহাসে এই ঘটনাই পরিচিত হয়ে যায় শাহ বানু রায়কে উল্টে দেওয়া” হিসেবে। কার্যত, সুপ্রিম কোর্টের মানবিক ও প্রগতিশীল রায় সংসদের এক ভোটে অকার্যকর হয়ে যায়।

শাহ বানু মামলার রায়ের পর রাজীব গান্ধী সরকার যে রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল, তা পরবর্তীতে ভারতের ইতিহাসে তুষ্টির রাজনীতি’ (Politics of Appeasement) নামে পরিচিত হয়। একদিকে মুসলিম রক্ষণশীল সমাজকে শান্ত করা, অন্যদিকে হিন্দু সমাজকে সামাল দেওয়া—এই দ্বিমুখী কৌশলই মূলত ভারতের রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার বীজ বপন করে।

১৯৮৬ সালে শাহ বানু রায় উল্টে দিতে আইন পাস হওয়ার পর মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড খুশি হলেও সাধারণ প্রগতিশীল নাগরিক, নারী অধিকারকর্মী এবং হিন্দু সমাজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। হিন্দু ধর্মীয় নেতা ও রাজনৈতিক দলগুলো—বিশেষ করে বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ—অভিযোগ করে যে রাজীব গান্ধী ভোটের লোভে ভারতের সংবিধান এবং সুপ্রিম কোর্টকে অবমাননা করেছেন।

সমালোচকরা বলতে থাকেন—এটি কেবল একটি আইনি সংশোধন নয়; এটি একজন বৃদ্ধ ও অসহায় নারীকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় প্রথাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার নামান্তর।

এই ক্ষোভ সামাল দিতে এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে রাজীব গান্ধী সরকার নেয় আরেকটি আরও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। সেটি ছিল অযোধ্যার বিতর্কিত বাবরি মসজিদ–রাম জন্মভূমি প্রাঙ্গণের তালা খুলে দেওয়া।

১৯৪৯ সাল থেকে বাবরি মসজিদের মূল ফটকে তালা লাগানো ছিল এবং সেখানে কেবল একজন পুরোহিতকে বছরে একবার পূজা করার অনুমতি দেওয়া হতো। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) ১৯৮৪ সাল থেকেই রাম মন্দির আন্দোলন ও রথযাত্রার মাধ্যমে এই তালা খোলার দাবি জানিয়ে আসছিল।

১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬—যখন শাহ বানু বিল নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক চলছে—ঠিক সেই সময় ফৈজাবাদ জেলা আদালতের বিচারক কে. এম. পাণ্ডে এক আদেশে বাবরি মসজিদের তালা খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে হিন্দুরা সেখানে অবাধে পূজা করতে পারে।

ধারণা করা হয়, রাজীব গান্ধী সরকারের পরোক্ষ সমর্থন ও নীরব সম্মতিতেই কোনো কার্যকর প্রতিবাদ ছাড়াই মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই আদেশ কার্যকর করে তালা খুলে দেওয়া হয়। এমনকি রাষ্ট্রীয় দূরদর্শন (Doordarshan)-এ ঘটনাটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল।

এই একটি সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে ভারতকে ঠেলে দেয় এমন এক রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতের পথে, যার পরিণতি ছিল বহু বছরব্যাপী উত্তেজনা, সহিংসতা এবং শেষ পর্যন্ত বাবরি মসজিদের ধ্বংস।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজীব গান্ধী ভেবেছিলেন—শাহ বানু আইন’ দিয়ে মুসলিমদের সন্তুষ্ট করবেন এবং বাবরি মসজিদের তালা’ খুলে দিয়ে হিন্দুদেরও খুশি রাখবেন। অর্থাৎ, দুই পক্ষকেই একসঙ্গে সামলে রাখা যাবে। কিন্তু বাস্তবে ফল হয় ঠিক উল্টো।

মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ মনে করেছিল—সরকার তাদের কাছ থেকে একটি অধিকার কেড়ে নিয়ে তার বিনিময়ে হিন্দুদের বিশাল ধর্মীয় সুবিধা দিয়ে দিয়েছে। এই ক্ষোভ থেকেই ১৯৮৬ সালেই গঠিত হয় বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি’

অন্যদিকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজেপি এই ঘটনাকে তাদের আন্দোলনের বড় সাফল্য হিসেবে দেখে। তারা এটিকে রাম মন্দির আন্দোলনের প্রথম বড় বিজয় হিসেবে প্রচার করে এবং পূর্ণাঙ্গ রাম মন্দির নির্মাণের দাবিতে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয়।

রাজীব গান্ধীর এই দ্বিধাবিভক্ত নীতি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকেই এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ফেলে দেয়। শাহ বানু মামলা এবং বাবরি মসজিদের তালা—এই দুটি ঘটনাই ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে চরম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদের ধ্বংস।

অন্যদিকে, এই ইতিহাস বদলে দেওয়া মামলার কেন্দ্রীয় চরিত্র শাহ বানু তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলো কাটিয়েছেন চরম অর্থকষ্ট আর নিভৃত সাধারণ জীবনে। ১৯৮৭ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

তিনি যে লড়াইটি শুরু করেছিলেন, তা ভারতের আইন ও রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল ঠিকই—কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সেই জয়ের কোনো সুফল তিনি ভোগ করতে পারেননি।
এক অর্থে, ইতিহাস তাঁকে স্মরণ রেখেছে; কিন্তু রাষ্ট্র তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি।

শাহ বানুর ইন্তেকালের পরেও দানিয়াল লতিফি তার যুদ্ধ থামাননি। বরং তিনি শাহ বানুর রেখে যাওয়া লড়াইটাকেই আইনি রূপ দিয়ে সামনে এগিয়ে নেন। ২০০১ সালে তিনি ‘দানিয়াল লতিফি বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (২০০১)’ নামে আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা দায়ের করেন। তাঁর মূল যুক্তি ছিল—১৯৮৬ সালের মুসলিম মহিলা আইন মুসলিম নারীদের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে সাম্যের অধিকার (Article 14) এবং বাঁচার অধিকার (Article 21) থেকে বঞ্চিত করছে।

সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এই মামলায় সরকারের আইনটি সরাসরি বাতিল না করেই এমন এক ব্যাখ্যা দেন, যার ফলে কার্যত শাহ বানুর দাবিকৃত অধিকারই নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আদালতের মূল পর্যবেক্ষণগুলো ছিল—

১. ইদ্দতকাল বনাম আজীবনের সুরক্ষা:
আদালত বলেন, ১৯৮৬ সালের আইনের ৩(১)(ক) ধারায় বলা হয়েছে—স্বামীকে ইদ্দতকালের মধ্যে স্ত্রীকে “যথাযথ ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা” (Fair and Reasonable Provision) এবং “ভরণপোষণ” (Maintenance) নিশ্চিত করতে হবে। আদালত ব্যাখ্যা করেন,
ভরণপোষণ কেবল ইদ্দতকাল (৩ মাস) পর্যন্ত সীমিত হতে পারে, কিন্তু ‘যথাযথ ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা’ মানে হলো ওই নারীর সারা জীবনের জন্য সংস্থান নিশ্চিত করা।

২. এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ:
আদালত নির্দেশ দেন—একজন মুসলিম স্বামীকে ইদ্দতকালের মধ্যেই এমন পরিমাণ অর্থ বা সম্পত্তি দিতে হবে, যাতে তালাকপ্রাপ্ত নারী বাকি জীবন সম্মানজনকভাবে কাটাতে পারেন। অর্থাৎ, ৯০ দিনের মধ্যে তাঁকে ভবিষ্যৎ জীবনের পূর্ণ আর্থিক নিরাপত্তা দিয়ে দিতে হবে।

৩. শাহ বানু রায়ের চেতনার পুনর্জন্ম:
সরকারের আইন বহাল রেখেও আদালত কার্যত শাহ বানু মামলার মূল দর্শনকেই পুনরুজ্জীবিত করেন। আদালত বলেন—মুসলিম ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী কোনো নারী নিঃস্ব হয়ে পড়লে রাষ্ট্র ও সমাজ নির্বিকার থাকতে পারে না। মানবিক দায় রাষ্ট্রের ওপর থেকেই যায়।

শাহ বানুর সময়ে CrPC ১২৫ ধারায় মাসিক ৫০০ রুপির একটি আইনি সীমা (Ceiling) ছিল। কিন্তু দানিয়াল লতিফি মামলার এই ব্যাখ্যার পর সেই সীমাবদ্ধতা কার্যত উঠে যায়। বর্তমানে এই রায়ের ফলে মুসলিম নারীরা তাদের স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী এককালীন বা কিস্তিতে অনেক বড় অঙ্কের টাকা আদায় করার আইনি শক্তি পেয়েছেন—যা শাহ বানুর ৫০০ রুপির তুলনায় বহুগুণ বেশি হতে পারে।
অর্থাৎ, ইতিহাসের বিচারে শাহ বানুর ত্যাগ শেষ পর্যন্ত বৃথা যায়নি।

শাহ বানু মামলা আজ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’ বা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই একটি মামলা এবং এর পর রাজীব গান্ধী সরকারের সিদ্ধান্তই ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির (Communal Polarization) ভিত্তি তৈরি করেছিল।

১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ২টি আসন—দলটি তখন রাজনৈতিকভাবে প্রায় অস্তিত্বহীন। কিন্তু ১৯৮৫–৮৬ সালের শাহ বানু বিতর্ক বিজেপিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ইস্যু এনে দেয়। বিজেপি রাজীব গান্ধী সরকারের নীতিকে ‘সংখ্যালঘু তোষণ’ (Minority Appeasement) হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে। তারা দাবি করে—কংগ্রেস সরকার ভোটব্যাংকের লোভে সুপ্রিম কোর্ট ও সংবিধানকে অবমাননা করছে।

রাজীব গান্ধী যখন শাহ বানু রায় বাতিল করতে আইন পাস করেন, তখন হিন্দু ধর্মীয় নেতা ও আরএসএস (RSS) প্রচার করতে থাকে—
“হিন্দুরা নিজের দেশেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে যাচ্ছে।”

এর ফলেই হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে ভয়াবহ গতিতে।
১৯৮৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা ২ থেকে বেড়ে হয় ৮৫।
১৯৯১ সালে তা হয় ১২০।
১৯৯৬ সালে বিজেপি ১৬১টি আসন পেয়ে প্রথমবারের মতো লোকসভায় বৃহত্তম দল হয়।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ২৮২ আসনের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসেন।
২০১৯ সালে বিজেপি ৩০৩ আসনের পূর্ণ বহুমত নিয়ে আবার ক্ষমতায় এসে তিন তালাক আইন পাস করে।

এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার সূচনা হয়েছিল মূলত একটি বৃদ্ধ নারীর খোরপোষের মামলাকে ঘিরে—
একটি সাধারণ মামলা, যা শেষ পর্যন্ত বদলে দিয়েছিল ভারতের আইন, রাজনীতি এবং সমাজের গতিপথ।

 

শাহ বানো মামলা, বাবরি মসজিদ এবং ভারতের রাজনৈতিক বিবর্তনের বিস্তৃত টাইমলাইন

সাল / তারিখমূল ঘটনারাজনৈতিক ও আইনি প্রভাব
১৯৩২শাহ বানো ও মোহাম্মদ আহমেদ খানের বিয়েপরবর্তী ৪৩ বছরের দাম্পত্যের ভিত্তি
১৯৭৫শাহ বানো ঘর থেকে বিতাড়িতমুসলিম পারিবারিক আইনের বাস্তব নিষ্ঠুরতা প্রকাশ
এপ্রিল ১৯৭৮শাহ বানো CrPC ১২৫ ধারায় মামলা করেনমুসলিম নারীর প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় আইনি লড়াই
নভেম্বর ১৯৭৮মামলা চলাকালে তিন তালাকস্বামী আইনি কৌশলে মামলাকে দুর্বল করতে চায়
২৪ আগস্ট ১৯৭৯ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ২৫ রুপি ভরণপোষণদরিদ্র নারীর জন্য হাস্যকর ন্যায়বিচার
১ জুলাই ১৯৮০MP হাইকোর্ট ১৭৯.২০ রুপি নির্ধারণপ্রথমবার রাষ্ট্রীয় আদালত শরিয়ার সীমা ভাঙে
১৯৮১সুপ্রিম কোর্টে আপিলবিষয়টি জাতীয় ইস্যুতে রূপ নেয়
২৩ এপ্রিল ১৯৮৫সুপ্রিম কোর্ট রায়ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহাসিক ঘোষণা
মে–জুন ১৯৮৫আরিফ মোহাম্মদ খানের ভাষণরাষ্ট্র বনাম ধর্মের স্পষ্ট সংঘর্ষ
আগস্ট ১৯৮৫বানাতওয়ালার বিলমুসলিম পার্সোনাল ল রক্ষার প্রথম সংসদীয় প্রচেষ্টা
ডিসেম্বর ১৯৮৫উপনির্বাচনে কংগ্রেসের হাররাজীব গান্ধীর ভয় ও নীতিগত পতন
১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬বাবরি মসজিদের তালা খোলাপ্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে রাম মন্দির আন্দোলনের স্বীকৃতি
ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬আরিফ মোহাম্মদ খানের পদত্যাগনৈতিক রাজনীতির শেষ বড় প্রতীক
মে ১৯৮৬মুসলিম মহিলা আইন পাসসুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যত বাতিল
১৯৮৬বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটিমুসলিম সমাজে প্রতিরোধের সূচনা
১৯৮৬–৮৮VHP রাম আন্দোলনধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তর
নভেম্বর ১৯৮৯শিলান্যাসরাষ্ট্রীয়ভাবে মন্দির দাবির স্বীকৃতি
সেপ্টেম্বর ১৯৯০আদভানির রথযাত্রাভারতজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা
১৯৯১লোকসভা নির্বাচনবিজেপি ১২০ আসনে পৌঁছায়
৬ ডিসেম্বর ১৯৯২বাবরি মসজিদ ধ্বংসভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ভাঙন
১৯৯৩মুম্বাই দাঙ্গা ও বিস্ফোরণধর্মীয় সহিংসতার সর্বোচ্চ পর্যায়
১৯৯৬বিজেপি বৃহত্তম দলহিন্দুত্ব মূলধারায় প্রবেশ
২০০১দানিয়াল লতিফি মামলাশাহ বানো রায়ের আত্মার পুনর্জন্ম
২০০২গুজরাট দাঙ্গাধর্মীয় রাজনীতির চূড়ান্ত রূপ
২০১৪মোদি ২৮২ আসনএকক হিন্দুত্ববাদী শাসন শুরু
২০১৯মোদি ৩০৩ আসনপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা
২০১৯তিন তালাক আইনশাহ বানো বিতর্কের ঐতিহাসিক প্রতিশোধ
২০২০অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ শুরুবাবরি ধ্বংসের চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিজয়