সৎ লোকের শাসনের জামায়াতে ইসলামীর দুর্নীতি

বাংলাদেশে ধর্মকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে ‘সৎ লোকের শাসন’ কায়েমের স্লোগান দেওয়া জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের দুর্নীতির খতিয়ান অত্যন্ত ভয়াবহ। ২০০৮ সালের ৩১শে জানুয়ারি ‘দৈনিক আমাদের সময়’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, বাংলাদেশে চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে দুর্নীতির হারে সবার শীর্ষে ছিল জামায়াতে ইসলামী। তথ্যমতে, দলটির তৎকালীন ১৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা হয়, যার হার ৫৮.৮২ শতাংশ। এই তুলনামূলক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিএনপির সংসদ সদস্যদের ২৯.৮২ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগের ১৪.২৯ শতাংশ দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ জামায়াতের অর্ধেকেরও বেশি সংসদ সদস্য প্রত্যক্ষভাবে দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন।

তৎকালীন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে যেতে হয়েছিল ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের, গাজী নজরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান ও শাহজাহান চৌধুরীর মতো নেতাদের। পলাতক ছিলেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, মাওলানা আব্দুস সুবহান ও মিয়া গোলাম পরওয়ার। নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ডা. তাহেরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে টিআর-এর পৌনে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎসহ অবৈধভাবে ২৫ বিঘা সম্পত্তি অর্জনের মামলা ছিল। এমনকি জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণের টিন উদ্ধার করা হয়েছিল মিজানুর রহমান চৌধুরী ও মাওলানা আব্দুস সুবহানের ব্যক্তিগত ক্লিনিক ‘আল-আমানা’ থেকে। অন্যদিকে, খুলনা ও কানাইঘাটে মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং মাওলানা ফরিদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে যথাক্রমে আড়াই কোটি ও পঁচিশ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও চাঁদাবাজির মামলা নথিভুক্ত হয়। মাওলানা আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধেও ত্রাণের টিন আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত।

দলের শীর্ষ দুই কান্ডারী ও সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মুহম্মাদ মুজাহিদের কর্মকাণ্ড ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। নিজামী যখন কৃষিমন্ত্রী ছিলেন, তখন ২০০৩ সালে ৪ হাজার ব্লক সুপারভাইজার নিয়োগে ভয়াবহ অনিয়মের আশ্রয় নেন। ভাইভা পরীক্ষার আগেই দলীয় তালিকা অনুযায়ী অফিস দখলের ঘটনা ঘটলে তাকে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার। শুধু তাই নয়, নিজামীর নেতৃত্বাধীন শিল্প মন্ত্রণালয়ের আমদানি করা রক সালফেটসহ অন্যান্য উপকরণ নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি-র (JMB) হাতে পৌঁছে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও ইতিহাসের অংশ।

একই সময়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী থাকাকালীন আলী আহসান মুহম্মাদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ২০০৩ সালে ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য দেওয়া ৫৫৭ কোটি টাকার সাহায্যের অর্ধেকই মুজাহিদ সারাদেশে ৩ হাজার জামাত অফিস নির্মাণের জন্য বরাদ্দ করে দেন। এই জালিয়াতি ধরা পড়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রোষানল থেকে বাঁচতে জামাত নেতৃবৃন্দ রাতের অন্ধকারে নতি স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছিলেন। ধর্মের কথা বলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা এই দলটি যখনই সুযোগ পেয়েছে, তখনই রাষ্ট্রের সম্পদ লুটপাট এবং দলীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থেকেছে। নারীর নেতৃত্বে হারাম ফতোয়া দিয়েও ক্ষমতার লোভে সেই নেতৃত্বের অধীনে পাঁচ বছর মন্ত্রীত্ব করার পাশাপাশি ত্রাণের টিন ও জনস্বাস্থ্যের টাকা চুরি করা তাদের প্রকৃত শাসনের রূপই উন্মোচন করে।

জামায়াতে ইসলামী যখনই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে, তখনই তারা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে চরম দুর্নীতি ও অনিয়মে লিপ্ত হয়েছে। তবে সততার বিজ্ঞাপন দেয়াতে তারা এক নম্বর। তারা সবসময় নিজেরা সৎ, নিজেরা মজলুম, নিজেরা ধার্মিক – এইসব বিজ্ঞাপন এত বেশি-বেশি করে, এতটা নির্লজ্জতার সাথে করে, তাদের সাথে এই প্রচারে পেরে ওঠা সাধারণ রাজনৈতিক দলের পক্ষে আসলেই মুশকিল।