১/
রসুলুল্লাহ (সা) এর জীবদ্দশায় আরবের বাইরে প্রথম দুটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে ভারতে। মুসলিম আরব বনিকদের প্রার্থনা করার জায়গার আবেদনে সাড়া দিয়ে, মসজিদ দুটির জন্য জায়গা বরাদ্দ দিয়েছিলেন হিন্দু রাজারা। এমনকি চেরামন মসজিদের আশেপাশে যেন হিন্দুরা না আসে, এরকম আবদারও মেনে নিয়ে, হিন্দু প্রজাদের প্রতি আদেশ দিয়েছিলেন রাজা।
সেটা তলোয়ারের জোরে হয়নি। হিন্দু রাজা স্বেচ্ছায় দিয়েছিলেন। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার সংস্কৃতি থেকে দিয়েছিলেন।
আমরা আজ সেই আশ্রয়-প্রশ্রয়ের প্রতিদান দিচ্ছি তাদের দেব দেবীর মূর্তি ভেঙ্গে !
২/
আরবে নিপীড়ন সইতে না পেরে সিন্ধুতে হিজরত করে এসেছিলেন রসুলের কিছু বংশধর এবং কিছু নির্ধন-নির্বল আশেকে রসুলুল্লাহ (সা:)।
তাদের আশ্রয় এবং নিরাপত্তা দিতে গিয়ে, তথাকথিত মুসলিম সুলতানের বাহিনীর হাতে প্রাণ দেন হিন্দু রাজা দাহীর। রাজার মেয়ে সেই যুদ্ধে বাবার সাথে অস্ত্র ধারণ করেছিল। দাহীরকে হত্যা করে, তার পরিবারের মেয়েদের গনিমতের মাল হিসেবে ধর্ষণ করেন সুলতানের বাহিনী, রাজকন্যা প্রতিশোধ নিয়ে পরে আত্মহত্যা করেন।
আমাদের আশ্রয়দাতা দাহীর আজ আমাদের কেউ না। বরং তার খুনির নামে পাকিস্তান যুদ্ধ জাহাজ বানায়, মিসাইল বানায়!
[ হাজ্জাজের উপহার লুন্ঠনের কাহিনীটা দিয়ে জাস্টিফাই করার আগে ভাববেন মুহাম্মদ বিন কাসিম ১৭ বার আক্রমণ করেছে। আর শুধুমাত্র ভারত নয়, বহু জায়গায় রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর পরিবারবর্গ কে হত্যা করতে সেনা অভিযান হয়েছে।]
তখনকার মোরাটিলিটি বা তাদের আমি কিছু বলবো না। সেটা তাদের দায়। কিন্তু আমরা আজ একুশ শতকের মোরালিটি নিয়ে তাদের আমরা হিরো বানাবো কেন?
৩/
হিন্দুদের কথা বাদ দিলাম।
আমরা যখন মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র গুলোতে দল-উপদলে ভাগ হয়ে আদর্শ বা ক্ষমতার লড়াইয়ে একজন আরেকজনকে হত্যায় লিপ্ত হয়েছিলাম, তখন ভারতবর্ষ একমাত্র জায়গা- যেখানে আমাদের প্রতিটি উপদল (শিয়া, সুন্নি ইত্যাদি) নির্ভয়ে নিজের পরিচয় দিতে পেরেছে, নিজেদের মসজিদ নির্মাণ করতে পেরেছে, নিজের আচার পালন করতে পেরেছে। অন্তত একদল মুসলিম অন্যদল মুসলিমের ভয়ে পালিয়ে বেড়ায়নি বা যুদ্ধ ঘোষণা করেনি।
আল্লাহর নামে তৈরি রাষ্ট্র পাকিস্তান ছাড়া ভারত-বাংলাদেশ এখনও সব-উপদল নিরাপদে থাকতে পারছে।
কিন্তু আমাদের জেহাদি জাজওয়া যেই গতিতে আগাচ্ছে- অদূর ভবিষ্যতে ওহাবিরা ছাড়া বাংলাদেশে আর কোন ধর্মের উপদল থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।
৪/
আমাদের অনেক মুসলিম আশ্রয় নিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে। সেসব দেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, নাগরিকত্ব দিয়েছে, তাদের মেয়েদের বিবাহ করার অধিকার দিয়েছে, এমনকি রাজনীতি করার অধিকারও দিয়েছে। আমাদের মসজিদ তৈরির সুযোগ দিয়েছে। কিছু জায়গায় বিনা মূল্যে মসজিদের জন্য জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। যার একটিও আমাদের মুসলিম উম্মাহর ঠিকাদার রাষ্ট্র সৌদির কাছে পাওয়া যায় না (বরং এগুলো চাওয়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ)।
আমরা সেই উদারতার প্রতিদান হিসেবে- সেই মসজিদে বসে প্রতি সপ্তাহে তাদেরকে “কওমেল কফেরিন” বলে গালি দেই, তাদের পতনের প্রার্থনা করি, তাদের পরাজিত করার ঘোষণা দেই!
সেই কাফেরদের ট্যাক্সের টাকায় আমরা সোশাল খাই। আর সেই টাকাকে হালাল করার জন্য বলি- একদিন সারা পৃথিবী তো আমাদের পায়ের তলায় আসবে। তাই কাফেররা তাদের ভবিষ্যতের জন্য জিজিয়া দিচ্ছে!
৫/
রসুলুল্লাহ (সা:) কে মদিনাতে আশ্রয় দিয়েছিলেন বিধর্মীরা। তারা সবাই ইসলামই গ্রহণ করেনি, আর নিজেদের সংস্কৃতি ছাড়ার তো প্রশ্নই আসে না। বিধর্মীরা তাদের বাদ্য যন্ত্র বাজিয়ে নিয়মিত তাদের ধর্মাচার করে গেছে (এমনকি মক্কা বিজয়ের পরেও)।
বিধর্মী তো বিধর্মী, আমাদের সামনে উনি আনসারীদের প্রতি তার আচরণের উদাহরণই রেখে গেছেন। আনসারীরা গান বাজনার প্রতি ভীষণ অনুরক্ত ছিল। রসুল(সা:) তাদেরকে শুধু সহ্যই করেন নি, নিজের (পালিত) মেয়েকে আনসারীদের বউ করে পাঠানোর সময়, গানের দল সাথে দিয়ে দিয়েছেন।
বিরোধীদের বাদ্য যন্ত্র আমাদের মহানবীকে সহ্য করতে পেরেছেন, তার ইবাদতে অসুবিধা হয়নি। আজ আমরা হলাম বড় বাপের পোলা, রসুলুল্লাহ (সা) এরচেয়ে বেশি পিওরিস্ট মুসলিম। আজ আমাদের ইবাদতে অসুবিধা হয় তাই এসব বন্ধ করে দিতে চাই।
৬/
সারা পৃথিবী জুড়ে মুসলিম ক্রমশ ভয়ের নামে পরিণত হচ্ছে। কেন?
আমরা দু পাঁচজন নব মুসলিম এর কথা খুব গৌরব ভরে প্রকাশ করি। কিন্তু মুসলমানের ঘর থেকে ধর্মকে ক্রমশ ডিজওন করছে যে লক্ষ-কোটি মানুষ, সেটা জেনেও স্বীকার করি না।
আমরা দোষ দেই ইহুদি-নাসারা ষড়যন্ত্রকে। কিন্তু এর জন্য যে দায়ী আমাদের সীমাহীন মুনাফেকি, নাফরমানি, ইতরামি আর ভণ্ডামি। সেটা স্বীকার করি না। যেটা স্বীকার করে, নিজেদের দোষ মেনে, নিজেদের সংশোধন করলে হয়ত আমরা বাঁচতে পারতাম।
আল্লাহর কসম- আমার ইমান বলে- আমাদের বর্তমানে যে ইমান-আমল, তাতে আমরা এর চেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকার উপযুক্ত। আমরা যদি আজও সংশোধিত না হই, আমাদের জন্য বড্ড খারাপ দিন আসছে। সেই দিনে আমি মোডারেট মুসলিম বলে মাফ পাবো না। বাড়িতে আগুন লাগলে আমার একার বিছানা বাঁচবে না।