তারানা । গীত ধারা । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে এমন এক মুহূর্ত আসে, যখন শব্দ তার অর্থ হারায়, কিন্তু সুর ও ছন্দ নতুন অর্থ তৈরি করে। সেই মুহূর্তেই জন্ম নেয় তারানা—এক অনন্য গীতধারা, যেখানে অর্থহীন শব্দবন্ধ, দ্রুত লয় এবং নিখুঁত ছন্দবিন্যাস মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক মোহনীয় সুরজগৎ। তারানা আসলে গতির উৎসব, লয়ের খেলাঘর, এবং স্বরের বিমূর্ত নৃত্য

তারানার উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

তারানার উদ্ভাবনের কৃতিত্ব সাধারণত ত্রয়োদশ শতকের কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ আমীর খসরু-এর নামে সমর্পিত। ভারতীয় ও পারস্য সংগীতের মিলনযুগে তিনি এমন এক গীতরীতি সৃষ্টি করেন, যেখানে আরবি-ফার্সি ধ্বনি, তবলার বোল, এবং ভারতীয় রাগসঙ্গীতের কাঠামো একত্রিত হয়।

প্রচলিত মতে, সুফি দর্শনের অন্তর্গত আধ্যাত্মিক অন্বেষণ এবং ধ্যানমগ্ন সংগীতচর্চার মধ্য থেকেই তারানার জন্ম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধীরে ধীরে খেয়াল গায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে ওঠে এবং আজ হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

তারানার শব্দবিন্যাস: অর্থহীন না অর্থাতীত?

তারানায় ব্যবহৃত শব্দগুলো—যেমন “তানা”, “দেরে না”, “তনোম”, “ইয়ালালি”, “ওদানি”—প্রথম শ্রবণে অর্থহীন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অনেক সংগীতবিশারদ মনে করেন, এই শব্দগুলোর উৎস সুফি ভাবধারায় নিহিত, যেখানে শব্দের সরল অর্থের চেয়ে ধ্বনি ও কম্পনের আধ্যাত্মিক প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

উদাহরণস্বরূপ, কেউ কেউ বলেন “তানা” শব্দটি ফার্সি “তান” (অহং বা ‘আমি’)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে সংগীতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এই শব্দগুলো মূলত স্বর ও তালের ছন্দময় বিন্যাসকে সহজ ও প্রবাহমান করার মাধ্যম

অতএব, তারানার ভাষা কোনো অর্থবোধক ভাষা নয়—এটি এক ধরনের ধ্বনিময় ভাষা, যা সরাসরি শ্রোতার অনুভূতিতে আঘাত করে।

প্রধান বৈশিষ্ট্য ও গায়নশৈলী

তারানা গায়কি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের জন্য অন্যান্য গীতধারা থেকে স্পষ্টভাবে পৃথক—

১. দ্রুত লয়ের প্রাধান্য:
তারানা সাধারণত মধ্য থেকে দ্রুত লয়ে পরিবেশিত হয়। এতে শিল্পীর কণ্ঠের ক্ষিপ্রতা, স্বরনিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চারণের স্বচ্ছতা বিশেষভাবে পরীক্ষিত হয়।

২. ছন্দ ও লয়কারীর উৎকর্ষ:
যেহেতু এখানে অর্থবোধক বাণীর ভার নেই, তাই শিল্পী সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন লয়কারী, ছন্দের জটিল বিন্যাস এবং স্বরের কারুকার্যে। ফলে তারানা হয়ে ওঠে এক নিখুঁত ছন্দনির্ভর শিল্পরূপ।

৩. তবলার সঙ্গে সংলাপ:
তারানার চলন তবলার বোলের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে অনেক সময় গায়ক ও তবলাবাদকদের মধ্যে এক ধরনের সংলাপ বা জুগলবন্দি তৈরি হয়। এই পারস্পরিক আদান-প্রদান তারানার পরিবেশনাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

৪. উপস্থাপনার অবস্থান:
খেয়াল পরিবেশনের শেষপর্বে, যখন রাগের বিস্তার সম্পন্ন হয়, তখন শিল্পী সাধারণত দ্রুত লয়ে একটি তারানা পরিবেশন করেন। এটি আসরের আবহকে চূড়ান্ত উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

পারস্য ও ভারতীয় সংগীতের সেতুবন্ধন

তারানা এক অর্থে ভারতীয় ও পারস্য সংগীতধারার মিলনস্থল। এতে কখনো কখনো ফার্সি শব্দবন্ধ, আবার কখনো তবলার পরন বা পাড়ন যুক্ত করা হয়। যখন এই বোলগুলো তারানার ধ্বনির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়, তখন তাকে ‘বোল-তারানা’ বলা হয়।

এই সংমিশ্রণ তারানাকে শুধু একটি গীতধারা নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সংলাপ-এর রূপ দেয়—যেখানে বিভিন্ন ঐতিহ্য এসে একসূত্রে গাঁথা হয়।

নান্দনিক তাৎপর্য

তারানা এমন এক সংগীতধারা, যেখানে অর্থের সীমাবদ্ধতা ভেঙে ধ্বনি নিজেই অর্থ হয়ে ওঠে। এটি প্রমাণ করে যে সংগীতের আসল শক্তি তার ভাষায় নয়, বরং তার স্বর, লয় এবং কম্পনের মধ্যে নিহিত।

তারানার মধ্যে রয়েছে এক ধরনের বিমূর্ত সৌন্দর্য—যেখানে শ্রোতা শব্দের অর্থ খোঁজেন না, বরং সুরের প্রবাহে নিজেকে ভাসিয়ে দেন।

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 তারানা । গীত ধারা । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

‘অসুরের সুরলোকযাত্রা’র এই পর্বে এসে তারানা যেন এক ঝোড়ো বসন্ত-হাওয়া—যা শব্দের সীমা অতিক্রম করে সুরকে ছন্দের ডানায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। উস্তাদ আমীর খাঁ, উস্তাদ নিসার হুসেন খাঁ প্রমুখ কিংবদন্তি শিল্পীদের কণ্ঠে তারানা আজও এক পরম বিস্ময় হয়ে বেঁচে আছে—যেখানে প্রতিটি স্বর যেন সময়কে অতিক্রম করে সরাসরি হৃদয়ে পৌঁছে যায়।