চৈতি । গীত ধারা । হিন্দুস্থানি উপ-শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের আকাশ শুধু গুরুগম্ভীর রাগের আলাপ আর জটিল তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে আছে মাটির গন্ধমাখা, মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে উঠে আসা এক অনন্য সুরধারা—উপ-শাস্ত্রীয় সংগীত। এই ধারার মধ্যেই বিশেষ স্থান দখল করে আছে চৈতি—একটি ঋতুভিত্তিক গীতধারা, যা চৈত্র মাসের রুক্ষ অথচ আবেগময় সময়কে সুরে রূপ দেয়। বসন্তের শেষ প্রান্তে, যখন প্রকৃতি ধীরে ধীরে শুষ্কতার দিকে এগোয়, তখন মানুষের অন্তরের কোমলতম অনুভূতিগুলো যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আর সেই অনুভূতিরই সুরেলা প্রকাশ চৈতি।

চৈতির উৎস খুঁজে পাওয়া যায় উত্তরপ্রদেশের বারাণসী ও তার আশপাশের গ্রামীণ অঞ্চলে। এটি মূলত লোকসংগীতের ভেতর জন্ম নেওয়া একটি ধারা, যা পরে ধীরে ধীরে শাস্ত্রীয় সংগীতের ছোঁয়ায় পরিশীলিত হয়েছে। চৈত্র মাসের দুপুর—এক বিশেষ সময়—যেখানে রোদে মাটি ফেটে যাচ্ছে, অথচ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে আম্রমঞ্জরীর গন্ধ, দূরে কোথাও কোকিল ডাকছে, আর সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে মানুষের মনে জমে থাকা আবেগগুলো যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এই আবহেই জন্ম নেয় চৈতির সুর। কিংবদন্তি শিল্পী গিরিজা দেবীর কণ্ঠে চৈতি শুধু লোকগান হয়ে থাকেনি; তা উচ্চাঙ্গ সংগীতের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে।

চৈতির কাব্য ও ভাবধারা গভীরভাবে আবেগনির্ভর, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে প্রেম—বিশেষ করে বিরহের অনুভূতি। এখানে প্রিয়তমের অনুপস্থিতি, অপেক্ষা, আকুলতা—সবকিছুই এক মৃদু অথচ গভীর সুরে প্রকাশ পায়। চৈতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রায় প্রতিটি পদের শেষে ‘হো রামা’ শব্দবন্ধের ব্যবহার, যা একদিকে এই ধারার স্বাক্ষর, অন্যদিকে আবেগের এক ধরনের নিঃশ্বাসের মতো। যদিও ‘রাম’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়, এটি সরাসরি ধর্মীয় নয়; বরং প্রিয়তম বা পরম সত্তার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতির বর্ণনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ—আমগাছের মুকুল, বসন্তের শেষ হাওয়া, দুপুরের নিস্তব্ধতা—সব মিলিয়ে চৈতি হয়ে ওঠে এক দৃশ্যমান সংগীত।

সুরের দিক থেকে চৈতি কোনো নির্দিষ্ট রাগের মধ্যে আবদ্ধ নয়, তবে এর পরিবেশনায় কিছু বিশেষ রাগের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। মিশ্র খামাজ, পিলু, কাফি বা দেশ—এই ধরনের রাগের ওপর ভিত্তি করে চৈতি গাওয়া হয়। বিশেষ করে খামাজ রাগের কোমল ও শুদ্ধ নিষাদের ব্যবহার চৈতির করুণতা ও মাধুর্যকে গভীরভাবে প্রকাশ করে। চৈতির গায়কিতে ‘বোল-বনাও’-এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে—অর্থাৎ শব্দের অর্থ ও আবেগকে ফুটিয়ে তুলতে সুরের সূক্ষ্ম কাজ। তবে ঠুমরির তুলনায় চৈতির ভঙ্গি কিছুটা সরল এবং লোকজ, যা তাকে আরও হৃদয়গ্রাহী করে তোলে।

তালের দিক থেকেও চৈতি বৈচিত্র্যময়। এটি কখনো চৌতাল বা দীপচন্দীর মতো অপেক্ষাকৃত গম্ভীর তালে গাওয়া হয়, আবার অনেক সময় কাহারবা বা দাদরার মতো সহজ ও প্রবাহমান তালে পরিবেশিত হয়। এই ছন্দের দোল চৈতির ভেতরে এক ধরনের প্রাণোচ্ছলতা এনে দেয়, যা লোকজ সংগীতের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবলার মৃদু অথচ ছন্দময় থাপ্পড় এবং সুরের দোলায় চৈতি যেন এক চলমান দৃশ্য হয়ে ওঠে।

চৈতিকে শাস্ত্রীয় রূপদানের ক্ষেত্রে বেনারস ঘরানার অবদান অনস্বীকার্য। এই ঘরানার গায়কিতে যে মাধুর্য, শব্দের উচ্চারণে যে কোমলতা এবং তানের যে দানাদার কাজ—তা চৈতিকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ যখন তাঁর সানাইতে চৈতির সুর তুলতেন, তখন সেই সুর যেন গঙ্গার ঘাটে চৈত্রের হাওয়ার মতো ভেসে বেড়াত—মৃদু, গভীর এবং স্মৃতিময়।

চৈতি একা নয়; এটি একটি বৃহত্তর ঋতুচক্রের অংশ। কাজরী যেমন বর্ষার গান, হোরি যেমন ফাল্গুনের উৎসবমুখর সুর, তেমনি চৈতি হলো বসন্তের অন্তিম আর গ্রীষ্মের সূচনার মাঝখানে দাঁড়ানো এক আবেগময় সংগীত। এটি আনন্দ আর বিষাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ—যেখানে প্রকৃতির পরিবর্তন মানুষের অন্তরের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে।

চৈতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতম শিকড় আসলে এই মাটির মানুষের সরল সুরেই নিহিত। এক নির্জন চৈত্র দুপুরে যদি আপনি মন খুলে এই সুর শুনতে পারেন, তবে বুঝতে পারবেন—চৈতি আসলে গান নয়, এটি এক নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস, যা সুর হয়ে ভেসে আসে।