হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বীতাত বাদ্য ঘরানা (Bowed Instrument Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের বিস্তৃত পরিসরে বীতাত বাদ্য (Bowed Instruments) একটি বিশেষ ও সূক্ষ্ম অধ্যায়। ‘বীতাত’ বলতে মূলত সেই সব তন্ত্রী যন্ত্রকে বোঝায়, যেগুলো আঙুল বা মিজরাব দিয়ে টোকা দিয়ে নয়, বরং ‘গজ’ বা ধনুকের সাহায্যে তারে ঘর্ষণ সৃষ্টি করে বাজানো হয়। এই ঘর্ষণজনিত ধ্বনি উৎপাদনের ফলে যে স্বরধারা সৃষ্টি হয়, তা অত্যন্ত মসৃণ, দীর্ঘস্থায়ী এবং মানব কণ্ঠের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই কারণেই বীতাত বাদ্যকে অনেক সময় “closest to vocal music” বলা হয়।

এই শ্রেণির প্রধান যন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সারেঙ্গী, বেহালা (Violin), এস্রাজ, দিলরুবা, এবং কিছু ক্ষেত্রে সন্তুর (যদিও এটি প্রযুক্তিগতভাবে আঘাতজাত তন্ত্রী যন্ত্র, তবুও প্রসঙ্গক্রমে আলোচনায় আসে)। এর মধ্যে সারেঙ্গী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এটি দীর্ঘদিন ধরে ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুমরির মতো কণ্ঠসংগীতের প্রধান সহযোগী যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বলা হয়, সারেঙ্গীতে মানুষের কণ্ঠের প্রায় সব সূক্ষ্ম ভঙ্গি—মীড়, গমক, আন্দোলন—নির্ভুলভাবে প্রকাশ করা সম্ভব।

বীতাত বাদ্য ঘরানার ধারণা ততটা স্পষ্টভাবে “ঘরানা” হিসেবে বিভক্ত নয়, যেমনটি আমরা সেতার বা সরোদের ক্ষেত্রে দেখি। তবুও ইতিহাস ও পরম্পরার ভিত্তিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বা ঐতিহ্য চিহ্নিত করা যায়, যেগুলো নির্দিষ্ট শিল্পী বা পরিবারের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে।

সারেঙ্গী ধারায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম উস্তাদ বান্দে আলি খাঁ-এর প্রভাবিত পরম্পরা, যদিও তিনি মূলত বীণাবাদক ছিলেন, তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে বীতাত যন্ত্রেও ধ্রুপদীয় গাম্ভীর্য ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে সারেঙ্গীকে একক যন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন পণ্ডিত রাম নারায়ণ, যিনি এই যন্ত্রকে সঙ্গত থেকে তুলে এনে কনসার্ট মঞ্চে প্রধান বাদ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শৈলীকে অনেকেই আধুনিক সারেঙ্গী ঘরানার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম উস্তাদ সুলতান খাঁ, যিনি সারেঙ্গীর আবেগময় ও কণ্ঠসদৃশ ধ্বনিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনপ্রিয় করে তোলেন। তাঁর বাজনায় গায়কী আঙ্গের সূক্ষ্মতা এবং আবেগের গভীরতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

বেহালার ক্ষেত্রে, যদিও এটি পাশ্চাত্য যন্ত্র, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে এটি একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছে। পণ্ডিত ভি.জি. জোগ এবং ডি.কে. দত্ত প্রমুখ শিল্পীরা বেহালাকে হিন্দুস্থানি সংগীতে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁরা কণ্ঠসংগীতের অলংকার ও রাগবিস্তারকে বেহালার মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রীয় যন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এস্রাজ ও দিলরুবা মূলত উত্তর ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় ও পাঞ্জাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর প্রভাবে এই যন্ত্রগুলোর ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এগুলো সেতার ও সারেঙ্গীর একটি সংমিশ্রণধর্মী রূপ, যেখানে ফ্রেট (frets) থাকলেও বাউয়ের মাধ্যমে বাজানো হয়—ফলে গায়কী আঙ্গ ও তন্ত্রকারি আঙ্গের এক অনন্য মিশ্রণ তৈরি হয়।

বীতাত বাদ্যের মূল নান্দনিকতা নিহিত রয়েছে তার অবিচ্ছিন্ন স্বরপ্রবাহ এবং কণ্ঠসদৃশ অভিব্যক্তি-তে। এখানে স্বরের মধ্যে কোনো ভাঙন নেই; বরং এক স্বর থেকে অন্য স্বরে যাত্রা হয় ধীরে, মসৃণভাবে—যেন একটি অবিচ্ছিন্ন সুররেখা। এই কারণে বীতাত বাদ্য বিশেষভাবে উপযোগী রাগের আবেগ, করুণতা, বা গভীর মননশীলতা প্রকাশের জন্য।

সব মিলিয়ে, বীতাত বাদ্য ঘরানা কোনো একক কাঠামোয় আবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি প্রবাহমান ঐতিহ্য—যেখানে বিভিন্ন শিল্পী, অঞ্চল ও যন্ত্র মিলিত হয়ে একটি সমৃদ্ধ সংগীতভাষা তৈরি করেছে।