হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অবনদ্ধ বাদ্য ঘরানা (Percussion/Drum Gharanas) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের কাঠামোকে যদি তিনটি স্তম্ভে ভাগ করা হয়—সুর, শব্দ ও তাল—তাহলে অবনদ্ধ বাদ্য সেই তাল ও লয়ের প্রধান ধারক। “অবনদ্ধ” শব্দের অর্থ হলো এমন যন্ত্র, যার গায়ে চামড়া (সাধারণত পশুচর্ম) বাঁধা থাকে এবং আঘাতের মাধ্যমে ধ্বনি উৎপন্ন হয়। এই শ্রেণির যন্ত্রগুলোর মধ্যে প্রধান হলো তবলা, পাখোয়াজ এবং ঢোলক। এরা শুধু সঙ্গত দেয় না, বরং সংগীতের সময়চক্র, গতি এবং অভিব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

অবনদ্ধ বাদ্যের মধ্যে তবলা আজকের দিনে সবচেয়ে জনপ্রিয়। খেয়াল, ঠুমরি, টপ্পা, গজল—প্রায় সব ধরনের হিন্দুস্থানি সংগীতে তবলার ব্যবহার অপরিহার্য। তবলার উৎপত্তি নিয়ে নানা মত থাকলেও অনেকের মতে আমির খুসরো-এর নাম এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যদিও এটি ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত নয়। আধুনিক তবলা শিল্পের বিকাশ ঘটে বিভিন্ন ঘরানার মাধ্যমে, যেগুলো মূলত নির্দিষ্ট অঞ্চল ও গুরু-শিষ্য পরম্পরায় গড়ে উঠেছে।

তবলার ঘরানাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ হলো দিল্লি ঘরানা, যার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ধরা হয় সিদ্ধার খান ঢাড়ি-কে। এই ঘরানার বৈশিষ্ট্য হলো সরলতা, স্পষ্ট বোল এবং পরিমিত লয়কারি। এর পরবর্তী বিকাশ ঘটে আজরাড়া ঘরানায়, যার প্রতিষ্ঠাতা মীরু খানকাল্লু খান। এখানে দিল্লি ঘরানার ভিত্তির ওপর আরও জটিল লয়কারি ও বোলের বৈচিত্র্য যুক্ত হয়।

লখনৌ ঘরানা, যার সঙ্গে মোদু খানবখশু খান-এর নাম জড়িত, তবলার একটি নৃত্যধর্মী ও নান্দনিক ধারা। এতে নাচের (বিশেষত কথক) প্রভাব স্পষ্ট, এবং বোলের মধ্যে সৌন্দর্য ও অলংকারের ব্যবহার বেশি। এই ধারারই একটি শাখা হলো ফরুখাবাদ ঘরানা, যার প্রতিষ্ঠাতা হাজি ভিলায়েত আলি খান। এই ঘরানায় লয়ের সৌন্দর্য, বোলের পরিমিতি এবং সুষমতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

অন্যদিকে বনারস ঘরানা বা কাশী ঘরানা, যার প্রতিষ্ঠাতা পণ্ডিত রাম সহায়, তবলার এক শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত ধারা। এখানে পাখোয়াজের প্রভাব স্পষ্ট, এবং বোলগুলো বেশি জোরালো ও ছন্দময়। এই ঘরানার বাজনায় এক ধরনের উচ্ছ্বাস ও শক্তি লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া পাঞ্জাব ঘরানা, যার প্রতিষ্ঠাতা মিয়াঁ কাদির বখশ, তাতে পাখোয়াজ ও লোকসঙ্গীতের প্রভাব রয়েছে এবং বোলের গঠন অনেকটা ভিন্নধর্মী।

অবনদ্ধ বাদ্যের আরেকটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র হলো পাখোয়াজ। এটি মূলত ধ্রুপদ গায়কির প্রধান সঙ্গত যন্ত্র এবং এর ধ্বনি গভীর, গম্ভীর ও ধ্যানমুখী। পাখোয়াজের নিজস্ব কোনো “ঘরানা” ততটা সুসংহতভাবে বিভক্ত না হলেও বিভিন্ন বংশপরম্পরায় এর শিক্ষা প্রচলিত রয়েছে। পাখোয়াজে তাল পরিবেশনার ধরন অনেক বেশি বিস্তৃত ও প্রাচীন, যা ধ্রুপদের গাম্ভীর্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

ঢোলক তুলনামূলকভাবে লঘু সংগীত ও লোকসংগীতে ব্যবহৃত হলেও এর গুরুত্ব কম নয়। এটি কীর্তন, ভজন, লোকগান এবং আধা-শাস্ত্রীয় ধারায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ঢোলকের বাজনায় সহজতা ও ছন্দময়তা প্রধান, যা সংগীতকে সহজে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

অবনদ্ধ বাদ্যের মূল নান্দনিকতা নিহিত রয়েছে তাল ও লয়ের সূক্ষ্ম বিন্যাসে। এখানে প্রতিটি আঘাত একটি নির্দিষ্ট বোল তৈরি করে—যেমন “ধা”, “তিন”, “না”, “ক” ইত্যাদি—যা মিলিত হয়ে এক জটিল ছন্দবিন্যাস সৃষ্টি করে। এই বোলগুলো কেবল শব্দ নয়, বরং একটি ভাষা, যার মাধ্যমে তালবাদক তাঁর সৃজনশীলতা প্রকাশ করেন।

সব মিলিয়ে, অবনদ্ধ বাদ্য হিন্দুস্থানি সংগীতের সেই ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে সুরের স্থাপত্য গড়ে ওঠে। তবলার সূক্ষ্মতা, পাখোয়াজের গাম্ভীর্য এবং ঢোলকের সহজতা—এই সব মিলিয়ে তালবাদ্য ভারতীয় সংগীতকে দিয়েছে এক অনন্য ছন্দ, যা ছাড়া কোনো পরিবেশনা পূর্ণতা পায় না।