ধ্রুপদে দুমরাওন ঘরানা (Dumraon Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাচীনতম ধারা ধ্রুপদের ইতিহাসে বহু ঘরানা ও বাণীর উল্লেখ পাওয়া যায়—যেমন গওহার, খণ্ডার, নওহার ও ডাগরবাণী। এই মূল বাণীগুলোর পাশাপাশি সময়ের প্রবাহে কিছু আঞ্চলিক ও পারিবারিক ঘরানাও গড়ে ওঠে, যেগুলো ধ্রুপদের ঐতিহ্যকে নিজেদের মতো করে ধারণ ও পরিবেশন করেছে। সেইসব অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারার মধ্যে একটি হলো দুমরাওন ঘরানা (Dumraon Gharana)

এই ঘরানার বিকাশ ঘটে বর্তমান বিহারের বক্সার জেলার দুমরাওন অঞ্চলে, যা ঐতিহাসিকভাবে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। দুমরাওন রাজদরবার দীর্ঘদিন ধরে সংগীতচর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করত, এবং সেই পরিবেশেই ধ্রুপদ গায়কির একটি স্বতন্ত্র রূপ গড়ে ওঠে। যদিও এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য খুব কম পাওয়া যায়, তথাপি গবেষকদের মতে এটি ধ্রুপদের প্রাচীন বাণীগুলোর—বিশেষত খণ্ডার ও গওহার বাণীর—সমন্বয়ে বিকশিত একটি আঞ্চলিক ধারা।

দুমরাওন ঘরানার সংগীতচর্চায় ধ্রুপদের শাস্ত্রীয় কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকলেও এর উপস্থাপনায় একটি স্বতন্ত্র সরলতা ও প্রাঞ্জলতা লক্ষ্য করা যায়। এখানে আলাপের বিস্তার সাধারণত অতিরিক্ত দীর্ঘ বা জটিল নয়; বরং সংযত ও সুসংহতভাবে রাগের মূল রূপ তুলে ধরা হয়। স্বরের শুদ্ধতা এবং উচ্চারণের স্পষ্টতা এই ঘরানার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ধ্রুপদের আধ্যাত্মিকতা এখানে বজায় থাকলেও তা কখনো অতিরিক্ত গম্ভীর বা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে না—বরং একটি সহজবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য রূপে প্রকাশ পায়।

এই ঘরানায় পাখোয়াজের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং তাল-নির্ভর উপস্থাপনায় একটি দৃঢ়তা লক্ষ্য করা যায়। বোল-বন্ত, লয়কারি এবং ধামার পরিবেশনায় এই ধারার শিল্পীরা বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। ফলে এই ঘরানায় ধ্রুপদের কণ্ঠ ও তাল—উভয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক দেখা যায়।

দুমরাওন ঘরানার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হলো উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ-এর পারিবারিক পরিমণ্ডল। যদিও তিনি মূলত শেহনাই বাদক, তাঁর জন্মস্থান দুমরাওন এবং তাঁর পরিবারে ধ্রুপদ ও শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি শক্ত ভিত্তি ছিল। এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, দুমরাওনের সংগীত ঐতিহ্য শুধু ধ্রুপদেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা অন্যান্য ধারাকেও প্রভাবিত করেছে।

ধ্রুপদের অন্যান্য প্রধান ঘরানার সঙ্গে তুলনা করলে দুমরাওন ঘরানা একটি মধ্যপন্থী অবস্থান নেয়। ডাগর ঘরানার মতো অতিরিক্ত ধ্যানমুখী ও ধীর নয়, আবার দরভাঙ্গা ঘরানার মতো অতিরিক্ত লয়কেন্দ্রিকও নয়। বরং এটি একটি সুষম ও সংযত ধারা, যেখানে রাগ, স্বর এবং তাল—এই তিনটি উপাদানের মধ্যে একটি সুসমন্বয় দেখা যায়।

আজকের দিনে দুমরাওন ঘরানা ততটা প্রচলিত বা দৃশ্যমান না হলেও, এটি ধ্রুপদের ঐতিহাসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ধ্রুপদ কেবল কয়েকটি প্রধান ঘরানায় সীমাবদ্ধ নয়—বরং এটি একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক প্রবাহ, যার ভেতরে বহু আঞ্চলিক ধারা, পারিবারিক পরম্পরা এবং নান্দনিক বৈচিত্র্য লুকিয়ে আছে।

আরও দেখুন: