আগ্রা ঘরানার ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের কণ্ঠ ছিল অসম্ভব গমগমে, পুরুষালি এবং রাজকীয়। তাঁর গায়কির তেজ আর আভিজাত্য যেকোনো আসরকে মুহূর্তেই মোহাবিষ্ট করে রাখত। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে বরোদার মহারাজা সায়াজিরাও গায়কোয়াড়ের দরবারে খাঁ সাহেবের অবস্থান ছিল অনন্য। মহারাজা খাঁ সাহেবকে এতটাই ভালোবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন যে, নিজে উদ্যোগী হয়ে তাঁকে ‘আফতাব-এ-মৌসিকি’ (সঙ্গীতের সূর্য) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতে খাঁ সাহেবের প্রভাব বোঝাতে এই একটি উপাধিই যথেষ্ট ছিল।
একবার মহারাজার জন্মদিনের রাজকীয় জলসায় গান গাইছিলেন ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ। খাঁ সাহেবের দরাজ কণ্ঠের তান আর বিস্তারে দরবারের পরিবেশ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছাল যে, মহারাজা সায়াজিরাও আত্মহারা হয়ে পড়েন। তিনি রাজশিষ্টাচার এবং সমস্ত নিয়ম-কানুন ভুলে নিজের রাজকীয় সিংহাসন থেকে নেমে আসেন। সবার সামনে নিজের গলার বহুমূল্য হিরের হারটি খুলে ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর গলায় পরিয়ে দিয়ে মহারাজা আবেগঘন কণ্ঠে বললেন—
“আজ থেকে এই দরবারে আপনিই রাজা, আপনার সুরের সিংহাসন আমার এই কাঠের সিংহাসনের চেয়ে অনেক বড়!”
কিন্তু রাজকীয় এই সমর্পণের গল্প এখানেই শেষ নয়। দরবারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর রাতে যখন খাওয়ার সময় হলো, তখন এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখা গেল। রাজদরবারের প্রধান পোশাক খুলে স্বয়ং মহারাজা সায়াজিরাও সাধারণ এক ‘خانসামা’ (খানসামা) বা ভৃত্যের পোশাক পরে হাজির হলেন! সেই সাধারণ পোশাকেই তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিজে ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেবকে খাবার পরিবেশন করলেন। মহারাজা বোঝাতে চাইলেন, সুরের সম্রাটের সামনে তিনি কেবল একজন সামান্য সেবক মাত্র।
শুধু তাই নয়, জন্মদিনের দরবারে প্রজাদের পক্ষ থেকে পাওয়া সমস্ত বহুমূল্য উপহার এবং নজরানা মহারাজা পরম শ্রদ্ধায় খাঁ সাহেবের সম্মানে তাঁর সামনে পেশ করলেন। খাঁ সাহেবও রাজার এই রাজকীয় বিনয় আর ভালোবাসাকে দু’হাত ভরে গ্রহণ করলেন। তবে সুরের এই নির্লোভ সাধক উপহারগুলো নিজের বাড়িতে নিয়ে যাননি। তিনি তৎক্ষণাৎ মহারাজার দেওয়া সেই উপহার এবং ধন-রত্নগুলো দরবারের সাধারণ কর্মচারী ও গরিব মানুষদের ডেকে তাঁদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন!
মহারাজা সায়াজিরাওয়ের সাথে খাঁ সাহেবের আরেকটি দারুণ গল্প প্রচলিত আছে। খাঁ সাহেব ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন এবং স্বাধীনচেতা মানুষ। একবার বরোদা রাজদরবারের কোনো এক কঠোর নিয়মের কারণে খাঁ সাহেব সামান্য ক্ষুব্ধ হন এবং কাউকে কিছু না জানিয়েই বরোদা ছেড়ে চলে যান। মহারাজা যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনলেন খাঁ সাহেব চলে গেছেন, তিনি প্রমাদ গুনলেন। রাজকীয় অহংকার বিসর্জন দিয়ে মহারাজা তৎক্ষণাৎ লোক পাঠালেন খাঁ সাহেবকে ফিরিয়ে আনার জন্য। যখন লোক খাঁ সাহেবকে খুঁজে পেল, তখন খাঁ সাহেব বরোদা রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছেন। মহারাজার দূত গিয়ে করজোড়ে বললেন, “খাঁ সাহেব, মহারাজ আপনার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। আপনি না ফিরলে রাজপ্রাসাদে আজ চুলা জ্বলবে না!” এই ছিল একজন শিল্পীর প্রতি একজন শাসকের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ!