রাগ হংসধ্বনি (Hansadhwani) ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অপূর্ব মাধুর্য ও উজ্জ্বলতার প্রতীক। এটি মূলত উত্তর ভারতীয় রাগ ছিল না; এর জন্ম দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে। কর্ণাটকী সঙ্গীতে এই কালজয়ী রাগের স্রষ্টা হলেন মহান সুরকার রামস্বামী দীক্ষিতর (Ramaswami Dikshitar, ১৭৩৫–১৮১৭), যিনি বিখ্যাত সুরকার মুত্তুস্বামী দীক্ষিতরের পিতা।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আমীর খাঁ এবং উস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ সাহেবের মতো কিংবদন্তিদের হাত ধরে এই রাগটি উত্তর ভারতীয় বা হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতে প্রবেশ করে এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
‘হংসধ্বনি’ নামের অর্থ হলো ‘হাঁসের ডাক’ বা কণ্ঠস্বর। এই রাগের চলন অত্যন্ত সাবলীল, চপল এবং উজ্জ্বল। এর চলনে কোনো বক্রতা নেই, সোজা পথে আরোহ-অবরোহ সম্পন্ন হয়। এতে একটি স্বাভাবিক ভক্তি ও বীর রসের চমৎকার মেলবন্ধন ঘটে। হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের যেকোনো বড় আসর বা জলসার শুরুতে এই রাগটি পরিবেশন করার একটি সুন্দর রেওয়াজ রয়েছে।
রাগের শাস্ত্র (The Grammar of Raga Hansadhwani)
হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের ব্যাকরণ এবং ITCSRA-এর প্রামাণিক নিয়ম অনুযায়ী রাগ হংসধ্বনির ব্যাকরণ নিচে দেওয়া হলো:
- ঠাট: বিলাবল
- জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহণে ৫টি এবং অবরোহণে ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়)
- আরোহ: সা রে গা পা নী র্সা
- অবরোহ: র্সা নী পা গা রে সা
- বাদী স্বর: সা (ষড়জ) [কোনো কোনো ঘরানায় পা বা রে-কেও বাদী মানা হয়, তবে ষড়জ-এর স্থায়িত্বই সবচেয়ে প্রামাণ্য]
- সমবাদী স্বর: পা (পঞ্চম)
- বর্জিত স্বর: মা এবং দা (মধ্যম ও ধৈবত এই রাগে একেবারেই ব্যবহার করা হয় না)
- ব্যবহৃত স্বর: সা, শুদ্ধ রে, শুদ্ধ গা, পা, শুদ্ধ নী
- সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যার পর)। তবে এর উজ্জ্বল ও ভক্তিভাবের কারণে এটি যেকোনো শুভ সকালে পরিবেশনের জন্যও অত্যন্ত মানানসই।
- প্রকৃতি: উজ্জ্বল, শান্ত, চপল ও ভক্তি রসাত্মক।
রাগ হংসধ্বনি সম্পর্কিত অন্যান্য রাগ:
ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রামাণ্য গ্রন্থ অনুযায়ী হংসধ্বনি রাগের সাথে সুরের মিল বা সামান্য বৈপরীত্য থাকা রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
রাগ ভূপালী: হংসধ্বনির মতোই আরোহ-অবরোহে ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয় (ঔড়ব-ঔড়ব জাতি), তবে ভূপালীতে ‘নী’ বর্জিত থাকে এবং তার বদলে ‘দা’ ব্যবহৃত হয়। (সা রে গা পা দা র্সা)
রাগ শংকর: হংসধ্বনির স্বরকাঠামোর সাথে মিল আছে, তবে শংকর রাগে অতিরিক্ত হিসেবে শুদ্ধ ধৈবত (দা) এবং সামান্য মধ্যম (মা)-এর বক্র প্রয়োগ করা হয়।
রাগ বিলাবল: হংসধ্বনির উৎপত্তিস্থল বা মূল ঠাট; বিলাবল একটি সম্পূর্ণ রাগ (৭টি স্বরই লাগে), যেখান থেকে মধ্যম ও ধৈবত বর্জন করে হংসধ্বনি তৈরি হয়েছে।
রাগ জলধর কেদার: হংসধ্বনির স্বরবিন্যাসের সাথে সামান্য মধ্যমের (মা) ছোঁয়া দিয়ে জলধর কেদার তৈরি হয়, যা একে চপল রূপ দেয়।
রাগ নাগস্বরবলী: এটিও কর্ণাটকী সঙ্গীতের একটি ঔড়ব রাগ; হংসধ্বনির সাথে এর পার্থক্য হলো এতে ‘রে’ বর্জিত থাকে এবং তার জায়গায় ‘দা’ যুক্ত হয়। (সা গা মা পা দা র্সা)
রাগ হংসধ্বনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মেলবন্ধনের এক অনন্য প্রতীক। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকী ধারা থেকে এসে এটি যেভাবে উত্তর ভারতের হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতে নিজের স্থায়ী আসন করে নিয়েছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। মধ্যম (মা) এবং ধৈবত (দা) বর্জিত এই রাগের সরল স্বরবিন্যাস মানুষের মনকে মুহূর্তের মধ্যে শান্ত ও ভক্তিভাবে আপ্লুত করে তোলে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কোনো জলসার শুরুতে বা ভোরের বন্দনায় হংসধ্বনির চেয়ে মধুর ও সাবলীল রাগ খুব কমই আছে।
সূত্র:
১. ITC Sangeet Research Academy (ITCSRA) – Raga Guide & Archive: হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় ব্যাকরণের প্রধান বিশ্বস্ত ডিজিটাল উৎস।
২. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডের ‘ক্রমিক পুস্তক মালিকা’ (অংশ ২ ও ৩): হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের মূল ব্যাকরণ গ্রন্থ।
৩. The Raga Guide (Joep Bor): আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভারতীয় শাস্ত্রীয় রাগের স্বরলিপি ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।