মধ্যবিত্য পরিবারগুলোতে একসময় ডাইনিং টেবিল ছিল একটা ‘ট্রেনিং গ্রাউন্ড’। কতবার ধমক খেয়েছি উল্টা পাল্পা করে। খাবার টেবিলে আপনার বসার ভঙ্গি আর ভাত মাখার ধরনই বলে দেবে আপনার আদবের দৌড় কতটুকু। চলুন দেখে নেয়া যাক:
১. খাবার টেবিলে বসা
খাবার টেবিলে বসা থেকেই আপনার আদবের পরীক্ষা শুরু হয়।
- আসন গ্রহণ: হুট করে গিয়ে চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়া অসভ্যতা। বড়রা বা অতিথিরা বসার পর বসবেন। চেয়ার টেনে বসার সময় যেন মেঝেতে বিকট শব্দ না হয়।
- বসার ভঙ্গি: সোজা হয়ে বসুন। টেবিলের ওপর কনুই রাখা বা থুতনিতে হাত দিয়ে ঝিমাবেন না। দুই পা টেবিলের নিচে সোজা রাখুন, পা নাচানো বা পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করা চরম পর্যায়ের বেয়াদবি।
২. পরিবেশন ও সাধারণ সতর্কতা
বাঙালি খাবারে হাত ব্যবহারের আধিক্য থাকায় এই অংশটি সবচেয়ে সংবেদনশীল।
- চামচ ও বাটি ধরা: আপনার ডান হাত দিয়ে ভাত মাখা শুরু করার পর সেই হাত দিয়ে ভুলেও তরকারির চামচ, লবণের দানি বা পানির জগ ধরবেন না। এটি অত্যন্ত নোংরা একটি অভ্যাস। নিজের পাতে তরকারি নিতে হলে বাম হাত ব্যবহার করুন অথবা অন্য কাউকে পরিবেশন করতে বলুন।
- এক চামচ অন্য খাবারে নয়: ডালের চামচ দিয়ে তরকারি তোলা বা মাছের ঝোলের চামচ দিয়ে মাংস তোলা স্রেফ রুচিহীনতা। প্রতিটি খাবারের নিজস্ব স্বাদ ও সুবাস থাকে; এক খাবারের চামচ অন্য খাবারে ডুবিয়ে সেই আভিজাত্য নষ্ট করবেন না।
- অন্যের জিনিস স্পর্শ: নিজের গ্লাস বা প্লেট ছাড়া অন্য কারো গ্লাস, চামচ বা ব্যক্তিগত কোনো কিছুতে এঁটো হাত লাগাবেন না। এমনকি নিজের বাম হাত যদি পরিষ্কার থাকে, তবুও অন্যের জিনিসের সীমানা মাড়ানো থেকে বিরত থাকাই হলো আভিজাত্য।
৩. খাবার নিয়ম ও ক্রম
বাঙালি খাবার খাওয়ার একটি নির্দিষ্ট ব্যাকরণ বা সিকোয়েন্স আছে। হুটহাট মাংসের বাটিতে হাত দেওয়া পরিশীলিত মানুষের কাজ নয়।
খাওয়ার ক্রম: সাধারণত তেতো (যেমন—শুক্তো বা নিম বেগুন) দিয়ে শুরু করে ক্রমানুসারে ডাল, শাক, তরকারি, মাছ এবং সবশেষে মাংস বা টক (চাটনি) খাওয়ার নিয়ম। আবশ্য আমাদের দেশে ডালটা পরে খাওয়া হয়। সেটুকু আপনি পরিবর্তন করতে পারেন।
ভাত মাখা: ভাত মাখতে হবে কেবল ডান হাতের আঙুলের অগ্রভাগ দিয়ে। হাতের তালু বা আঙুলের গিঁট পর্যন্ত নোংরা করা দেখতে অত্যন্ত কদর্য। আপনার হাতের তালু যেন পরিষ্কার থাকে, সেটাই হলো আসল ‘তালিম’।
ছোট লোকমা: বড় বড় লোকমায় গোগ্রাসে খাওয়া মানেই হলো আপনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন আপনি নিয়মিত এমন খাবার পান না। লোকমা হতে হবে ছোট।
খাবার চিবানো: মুখ বন্ধ করে আস্তে আস্তে চিবোতে হবে। খাওয়ার সময় ‘চপ-চপ’ শব্দ করা চরম অসভ্যতা। খুব সচেতন ভাবে কিছুদিন চেষ্টা করুন, ঠিক হয়ে যাবে।
৪. সৌজন্য ও কৃতজ্ঞতা: রাঁধুনির প্রশংসা ও অপচয় রোধ
খাবার শেষে আপনার আচরণই বলে দেবে আপনার কৃতজ্ঞতাবোধ কতটুকু।
রান্নার প্রশংসা: যিনি রান্না করেছেন বা যিনি পরিবেশন করছেন, তার রান্নার প্রশংসা করা একটি বড় সৌজন্য। “রান্নাটা খুব চমৎকার হয়েছে”—এই একটি বাক্য আপনার মার্জিত ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়। খাবারে কোনো খুঁত থাকলেও তা সরাসরি কর্কশভাবে না বলে কৌশলে ইতিবাচকভাবে বলাটাই আভিজাত্য।
অপচয় না করা: থালায় খাবার নষ্ট করে ফেলে রাখা বাঙালি সংস্কৃতিতে অত্যন্ত অসম্মানজনক। নিজের প্রয়োজনমতো অল্প করে নিন, কিন্তু যতটুকু নেবেন তা পুরোটা শেষ করুন। থালায় উচ্ছিষ্টের পাহাড় জমানো ‘ছোটলোকি’র লক্ষণ।