বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভারতের দালাল থিওরির শুভঙ্করের ফাঁকি

বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি কমন এলিমেন্ট বা সাধারণ উপাদান হলো ‘ভারত’। এই দেশ দুটির রাজনৈতিক ময়দানে কোনো দল যদি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়, তবে সবচেয়ে সহজ এবং সস্তা অস্ত্রটি হলো তাকে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা। অদ্ভুত বিষয় হলো, এই তকমা দেওয়ার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না; কেবল জনগনের ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্টকে উস্কে দেওয়াই যথেষ্ট। কিন্তু এই ‘ঘৃণার রাজনীতি’র আড়ালে যে বিশাল অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত ক্ষতি হচ্ছে, তা সাধারণ জনগন খুব কমই উপলব্ধি করতে পারে। এটি মূলত শাসকগোষ্ঠীর এক সুনিপুণ ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’।

Table of Contents

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভারতের দালাল থিওরির শুভঙ্করের ফাঁকি

১. পাকিস্তান ও ‘এগজিসটেনশিয়াল থ্রেট’ বা অস্তিত্বের সংকট থিওরি

পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই দেশটির শাসকগোষ্ঠী (বিশেষ করে সামরিক জান্তা) সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে, ভারত যেকোনো সময় পাকিস্তানকে গিলে ফেলবে।

মিলিটারি বাজেট বনাম জনকল্যাণ:

পাকিস্তান তার জিডিপির একটি বিশাল অংশ (গড়ে ৩-৪% এবং ঐতিহাসিকভাবে আরও বেশি) ব্যয় করে সামরিক খাতে। এর বিপরীতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় থাকে ১-২% এর নিচে।

ভয়ের অর্থনীতি:

জেনারেলরা এবং রাজনীতিবিদরা জানেন, যদি ভারতের সাথে শত্রুতা শেষ হয়ে যায়, তবে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর বিশাল আধিপত্য এবং বাজেটের যৌক্তিকতা হারিয়ে যাবে। তাই নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তারা কাশ্মীর ইস্যু এবং ভারত-বিদ্বেষকে জিইয়ে রাখে।

ফলাফল:

আজ পাকিস্তান ঋণের জালে জর্জরিত, মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী। যদি গত ৭০ বছরে তারা ভারত-বিদ্বেষী প্রোপাগান্ডায় খরচ করা অর্থের অর্ধেকও মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় করত, তবে পাকিস্তানের অবস্থান আজ এশিয়ার শীর্ষ দেশগুলোর কাতারে থাকত।

 

২. বাংলাদেশে ‘ভারতের দালাল’ কার্ড: অযোগ্যতা ঢাকার ঢাল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে দেখা গেছে, যখনই কোনো সরকার বা বিরোধী দল জনগনের মৌলিক দাবি (ভোটের অধিকার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান) মেটাতে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা ‘ভারত কার্ড’ খেলে।

ধর্মীয় সুড়সুড়ি ও হিন্দু-বিদ্বেষ:

বাংলাদেশে ভারত-বিদ্বেষী রাজনীতিকে সফল করতে হিন্দু-বিদ্বেষকে একটি অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রচার করা হয় যে, অমুক দল ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ ভারতের অংশ হয়ে যাবে বা ইসলাম বিপন্ন হবে।

উন্নয়নের ব্যর্থতা ও লুটপাট:

যেসব রাজনীতিবিদদের দেশের টেকসই উন্নয়নের কোনো রূপরেখা নেই, তারা জনগনকে ‘দেশপ্রেম’ এবং ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষা’র ধুয়া তুলে সেন্টিমেন্টাল করে রাখে। মানুষ যখন দিল্লির আধিপত্য নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত থাকে, তখন পেছনের দরজা দিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত বা প্রাকৃতিক সম্পদ লুট হয়ে যায়। জনগনের নজর অন্যদিকে ঘোরানোর এটি একটি ক্ল্যাসিক ডাইভারশন ট্যাকটিক।

 

৩. ঐতিহাসিক সত্য বনাম রাজনৈতিক মিথ: ভারত কি সত্যিই দখল করতে চায়?

রাজনীতিবিদরা প্রচারণা চালান যে ভারত আমাদের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেবে। কিন্তু ইতিহাস এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে:

১৯৭১-এর সুযোগ: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতীয় বাহিনী এখানে অবস্থান করছিল। তারা চাইলে কয়েক বছর থাকতে পারত বা একটি পুতুল সরকার বসিয়ে রাখতে পারত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিরল যে একটি বিজয়ী বাহিনী এত দ্রুত বন্ধু রাষ্ট্র ত্যাগ করেছে।

সিকিম বনাম বাংলাদেশ/পাকিস্তান: সিকিমের অন্তর্ভুক্তিকে উদাহরণ হিসেবে টানা হলেও, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো বিশাল জনসংখ্যার এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ড শাসন করা ভারতের জন্য হবে এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক আত্মাহুতি। ভারত কখনোই এই দায়ভার নেবে না, কারণ এতে ভারতের নিজস্ব স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে।

ভারতের প্রকৃত চাহিদা: ভারত একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কাছে কেবল নিরাপত্তা (Security) চায়। তারা চায় তাদের সেভেন সিস্টার্স (উত্তর-পূর্ব ভারত) এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তারা চায় জঙ্গি অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে। তারা চায় প্রতিবেশীরা যেন তাদের দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় না দেয়।

 

৪. নদী, ট্রানজিট ও ভূখণ্ড: প্রয়োজনটা যুদ্ধের না নেগোসিয়েশনের?

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নদী (তিস্তা বা গঙ্গা), ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটি নিয়ে টানাপোড়েন আছে। কিন্তু এগুলো কোনোটিই অস্তিত্বের লড়াই বা যুদ্ধের বিষয় নয়।

ভৌগোলিক বাস্তবতা:

আমরা একই অববাহিকার নদী শেয়ার করি। পানির হিস্যা নিয়ে নেগোসিয়েশন হবে—এটি একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু একে ‘দেশ বিক্রি’ বা ‘সার্বভৌমত্ব হারানো’র সাথে গুলিয়ে ফেলা হয় কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে।

কানেক্টিভিটি:

ট্রানজিট দিলে ভারতের লাভ আছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশেরও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আছে। ইউরোপের দেশগুলো যদি নিজেদের সীমানা উন্মুক্ত করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় কেন তা হবে না? এখানে বাধাটি অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ‘ঘৃণা উৎপাদন’।

 

৫. ঘৃণার অর্থনীতি: সাধারণ মানুষের পকেট যেভাবে কাটা হয়

রাজনীতিবিদরা যখন ‘ভারত-বিদ্বেষ’ বা ‘ভারতের দালাল’ কার্ড খেলেন, তখন পর্দার আড়ালে এক বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়। এই ক্ষতির ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের কাঁধেই পড়ে।

বাজার ব্যবস্থার অস্থিরতা:

দক্ষিণ এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে সহজ ও সস্তা মাধ্যম হলো প্রতিবেশী দেশের সাথে সুসম্পর্ক। কিন্তু রাজনীতির কারণে যখন সীমান্ত বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়, তখন পণ্য আমদানিতে খরচ বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভারত থেকে পেঁয়াজ বা প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য আমদানিতে যখন ‘রাজনৈতিক টানাপোড়েন’ তৈরি হয়, তখন দেশের বাজারে হু হু করে দাম বাড়ে। দিনশেষে লাভ হয় একদল সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর, আর পকেট কাটে সাধারণ মানুষের।

অস্ত্র প্রতিযোগিতা বনাম দারিদ্র্য বিমোচন:

পাকিস্তানের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা ভারতের সাথে ছায়া যুদ্ধ (Proxy War) এবং সীমান্ত উত্তেজনা বজায় রাখতে গিয়ে নিজেদের দেউলিয়া করে ফেলেছে। পাকিস্তানের সামরিক বাজেটের মাত্র ১০ শতাংশ যদি তারা স্বাস্থ্য খাতে দিত, তবে দেশটির প্রতিটি নাগরিক বিনামূল্যে আধুনিক চিকিৎসা পেত। এই ‘কাল্পনিক শত্রু’র ভয় দেখিয়ে জনগণের টাকা দিয়ে কেনা হয় ট্যাঙ্ক আর মিসাইল, যা ক্ষুধার্ত পেটে অন্ন যোগাতে পারে না।

 

৬. প্রোপাগান্ডা ও ‘ডাইভারশন ট্যাকটিক’: জনগনের নজর ঘোরানোর কৌশল

দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে এটি একটি পরীক্ষিত ফর্মুলা। যখনই কোনো সরকার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি বা দুঃশাসনে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখনই তারা একটি ‘বাইরের শত্রু’ (External Enemy) তৈরি করে।

জাতীয়তাবাদের আফিম:

মানুষকে বলা হয়, “আমরা না খেয়ে থাকলেও সমস্যা নেই, কিন্তু সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে দেওয়া যাবে না।” এই আবেগ ব্যবহার করে জনগণের মৌলিক অধিকার—যেমন ভোট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা কেড়ে নেওয়া হয়। মানুষ যখন ভারতকে গালি দেওয়া বা হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করায় ব্যস্ত থাকে, তখন দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করে দেয়।

শিক্ষা ব্যবস্থার সাম্প্রদায়িকীকরণ:

ঘৃণা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শেখাতে হয় যে প্রতিবেশী দেশ আমাদের চিরশত্রু। পাঠ্যপুস্তকে ভুল ইতিহাস এবং সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ঢুকিয়ে দিয়ে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা হয়, যারা যুক্তির চেয়ে আবেগে বেশি চালিত। এতে দীর্ঘমেয়াদে দেশের মেধা ও মননশীলতা ধ্বংস হয়ে যায়।

 

৭. ভারত আসলে কী চায়? নিরাপত্তা বনাম আধিপত্য

রাজনীতিবিদরা প্রচারণা চালান যে ভারত আমাদের দখল করে নেবে। কিন্তু আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে ‘ভূমি দখল’ করার চেয়ে ‘অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপদ সীমান্ত:

ভারতের প্রধান চাহিদা হলো তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা। তারা চায় না বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ভারতের ভেতরে হামলা চালাক। এটি যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য একটি যৌক্তিক চাহিদা।

জঙ্গিবাদ দমন:

ভারত চায় তার প্রতিবেশী দেশগুলো যেন উগ্রবাদী ও জঙ্গিবাদী শক্তির চারণভূমি না হয়। কারণ প্রতিবেশী দেশের অস্থিরতা সরাসরি ভারতের ওপর প্রভাব ফেলে।

ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি:

ভারত চায় কম খরচে পণ্য পরিবহন। এটি একটি বাণিজ্যিক আদান-প্রদান হতে পারে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা একে ‘দেশ বিক্রি’র তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেন, যাতে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে না ওঠে। কারণ বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে তাদের ‘ঘৃণার দোকান’ বন্ধ হয়ে যাবে।

 

৮. ইতিহাস ও বাস্তবতা: দখলের সুযোগ ভারত নেয়নি

১৯৭১ সালের উদাহরণটি সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যুদ্ধের পর ভারতীয় বাহিনী চাইলে বছরের পর বছর বাংলাদেশে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়।

পাকিস্তানও বারবার দাবি করে ভারত তাদের ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু ১৯৭৪ সালের সিমলা চুক্তি বা পরবর্তীতে কারগিল যুদ্ধের সময়ও ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তান দখল করতে যায়নি। কারণ বিশাল জনসংখ্যার একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ শাসন করা ভারতের জন্য হবে এক আত্মঘাতী পরিকল্পনা। ভারত কেবল চায় তাদের সীমান্তে যেন অশান্তি না থাকে।

৯. লাভ কার? ক্ষতি কার?

লাভ:

লাভ হয় সেইসব রাজনীতিবিদদের, যাদের দেশ চালানোর ক্ষমতা বা মেধা নেই। লাভ হয় সেইসব ধর্মীয় নেতাদের, যারা ঘৃণা ছড়িয়ে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখেন। লাভ হয় সামরিক কর্মকর্তাদের, যারা বিশাল বাজেটের মালিক হন।

ক্ষতি:

ক্ষতি হয় সাধারণ জনগণের। তাদের শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্য নেই, সস্তায় খাবার নেই। তারা কেবল এক কাল্পনিক যুদ্ধের নেশায় মত্ত হয়ে নিজেদের জীবন ধ্বংস করছে।

 

১০. ছায়াযুদ্ধ ও উন্নয়নের বৈপরীত্য: কেন আমরা পিছিয়ে?

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর (বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) রাজনীতিতে ‘ভারত-ভীতি’ ছড়িয়ে যে বিশাল সামরিক ও গোয়েন্দা বাজেট বরাদ্দ করা হয়, তার তুলনা করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে।

বাজেটের অপচয়:

পাকিস্তান তার জিডিপির একটি বিশাল অংশ ভারতের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র ও বিশাল সেনাবাহিনী পালতে ব্যয় করে। অথচ দেশটির সাধারণ মানুষের নূন্যতম সুপেয় পানি বা বিদ্যুৎ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ভারতের সাথে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক থাকলে এই অর্থ দিয়ে পাকিস্তান আজ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ‘ইকোনমিক টাইগার’ হতে পারত।

বাংলাদেশেও একই ছায়া:

বাংলাদেশেও যখন ভারত-বিদ্বেষকে রাজনৈতিক এজেন্ডা করা হয়, তখন জনগনের মৌলিক অধিকারের চেয়ে ‘সীমান্ত রক্ষা’ বা ‘সার্বভৌমত্ব’ নিয়ে বেশি শোরগোল তোলা হয়। অথচ প্রকৃত সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয় শিক্ষিত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নাগরিকের মাধ্যমে, স্রেফ ভারত-বিরোধী শ্লোগান দিয়ে নয়।

 

১১/ দক্ষিণ এশিয়ার ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ স্বপ্ন বনাম বিভাজনের দেয়াল

ইউরোপের দেশগুলো (যেমন জার্মানি ও ফ্রান্স) শত বছর ধরে একে অপরের সাথে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু তারা একসময় বুঝতে পেরেছে যে যুদ্ধ করে কোনো জাতির পেট ভরে না। তারা তাদের সীমানা উন্মুক্ত করেছে, তৈরি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান যদি নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক দেয়াল তুলে না রাখত, তবে আমরা একে অপরের কাছ থেকে সস্তায় বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাদ্যপণ্য ও প্রযুক্তি নিতে পারতাম। কিন্তু রাজনীতিবিদরা জানেন, যদি এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে জনগনের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং তারা তখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলবে। তাই তারা চায় মানুষ যেন সব সময় ‘ভারত আমাদের গিলে ফেলবে’—এই আতঙ্কে থাকে।

১২/ ঘৃণা উৎপাদনের কারখানা: ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের অপব্যবহার

যেসব রাজনীতিবিদের দেশের জিডিপি বাড়ানোর বা সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা নেই, তারা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন।

ভারতের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দকে হিন্দু ধর্মের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। এতে দুই দেশের সংখ্যালঘু জনগন বড় ধরণের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। রাজনীতিবিদরা এই ঘৃণা উৎপাদন করেন যাতে সাধারণ মানুষ একে অপরের রক্ত পিপাসু হয়ে থাকে এবং শাসকগোষ্ঠী নির্বিঘ্নে দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে (কানাডা বা দুবাই) পাচার করতে পারে। দিন শেষে রাজনীতিবিদদের সন্তানরা ঠিকই বিদেশে সুখে থাকে, আর দাঙ্গায় বা অভাবের তাড়নায় মরে সাধারণ জনগন।

১৩/ চূড়ান্ত সত্য: ভারতের চাওয়া বনাম আমাদের লাভ

ইতিহাস এবং বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত কখনোই পাকিস্তান বা বাংলাদেশ দখল করতে চায় না। কারণ:

সাংস্কৃতিক ও জনসংখ্যাগত ঝুঁকি:

ভারত নিজের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য সামলাতেই হিমশিম খায়। তার ওপর বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো বিশাল জনসংখ্যার এবং ভিন্ন মতাদর্শের ভূখণ্ড দখল করা ভারতের জন্য হবে আত্মঘাতী।

নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা:

ভারত কেবল চায় তার চারপাশের দেশগুলো যেন স্থিতিশীল থাকে। প্রতিবেশী দেশে অরাজকতা মানেই ভারতের সীমানায় শরণার্থী ও উগ্রবাদের চাপ। তাই ভারতের স্বার্থেই তারা চায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান শক্তিশালী হোক, কিন্তু যেন ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়।

শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে মুক্তি

‘ভারতের দালাল’ বা ‘ভারত-বিদ্বেষী’ এই তকমাগুলো আসলে আমাদের আসল শত্রু নয়। আমাদের আসল শত্রু হলো দারিদ্র্য, অশিক্ষা, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতাহীন শাসনব্যবস্থা। রাজনীতিবিদরা যখন আমাদের শেখান যে ভারত আমাদের শত্রু, তখন তারা আসলে আমাদের বোঝাতে চান না যে—আমাদের প্রকৃত শত্রু আমাদের নিজেদের ঘরের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ শাসকগোষ্ঠী।

দক্ষিণ এশিয়ার জনগনের মুক্তি তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্টের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের অর্থনৈতিক ও মানবিক অধিকার নিয়ে কথা বলব। ভারত-বিদ্বেষ বা হিন্দু-বিদ্বেষ ছড়িয়ে যারা রাজনীতি করতে চায়, তারা আসলে দেশের বন্ধু নয়; তারা নিজেদের ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা নিশ্চিত করতে সাধারণ জনগনের ভবিষ্যৎকে জিম্মি করে রেখেছে। এই শুভঙ্করের ফাঁকি বোঝার সময় এখনই।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থ (Sources):

১/ The Battle for Pakistan: The Bitter Messenger and a Failed State – Shuja Nawaz: পাকিস্তানে সামরিক আধিপত্য ও ভারত-বিদ্বেষী রাজনীতির অর্থনৈতিক ক্ষতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

২/ The Idea of Pakistan – Stephen P. Cohen: পাকিস্তান কেন ভারতকে একটি ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে দেখে এবং এর ফলে দেশটি কীভাবে পিছিয়ে পড়েছে তার বর্ণনা।

৩/ Against the Stream: India’s Foreign Policy in the 1970s – J.N. Dixit: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারতের পিছু হটা এবং দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির নেপথ্য কাহিনী।

৪/ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায় – মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র: সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কীভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সম্প্রীতির ক্ষতি করে তার আলোচনা।

৫/ Foreign Policy of Bangladesh – Dr. Abdul Momén: বাংলাদেশের সাথে ভারতের নদীর পানি বণ্টন ও ট্রানজিট নিয়ে কূটনৈতিক দরকষাকষির নির্মোহ বিশ্লেষণ।

৬/ Why Nations Fail – Daron Acemoglu & James A. Robinson: কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাল্পনিক শত্রু তৈরি করে জনগনের সম্পদ লুট করে, তার বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উদাহরণ।

৭/ The Discovery of India – Jawaharlal Nehru: দক্ষিণ এশিয়ার অখণ্ড ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের ওপর আলোকপাত।

৮/ Human Development in South Asia (Reports by Mahbub ul Haq Center): সামরিক ব্যয় বনাম শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের তুলনামূলক পরিসংখ্যান।