হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের রাগের নোট

রাগ সোরথ । শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল ক্যানভাসে রাগ সোরথ হলো মাটির সুবাসধন্য এমন এক সুরমূর্তির নাম, যা ধ্রুপদী আসরের অভিজাত গাম্ভীর্য রক্ষা করেও শ্রোতার হৃদয়ে লোকজ চারণগীতির সরলতা ও ব্যাকুল আর্তি জাগিয়ে তোলে। ভারতীয় মার্গ সংগীতে এটি তার মাধুর্যময় স্বরপ্রযোগ, চপল-চঞ্চল প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা বিরহবেদনা এবং শৃঙ্গার রসের নিখুঁত রূপায়নের জন্য অত্যন্ত সমাদৃত। প্রাচীনকালে গুজরাট ও রাজস্থানের চারণ কবিদের লোকগীতি ও সৌরীয় গায়কি থেকে উদ্ভূত এই রাগটি পরবর্তীতে পণ্ডিতাগ্রগণ্য সংগীতজ্ঞদের হাতে পরিমার্জিত হয়ে শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম সুপরিচিত স্বকীয় রাগে রূপান্তরিত হয়।

রাগ সোরথ-এর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ঐতিহাসিক পটভূমি

রাগ সোরথ মূলত খামাজ ঠাট-এর অন্তর্ভুক্ত একটি সুপ্রাচীন রাগ। আপাতশ্রবণে এটিকে ‘রাগ দেশ’-এর সমগোত্রীয় বা অনুরূপ মনে হলেও, এর নিজস্ব চলন, স্বরপ্রযোগের নিয়ন্ত্রণ এবং জাতিগত বৈচিত্র্য একে সম্পূর্ণ আলাদা মর্যাদা দান করেছে।

সোরথ রাগের অন্যতম বড় বিশেষত্ব হলো এর আরোহ ও অবরোহের বৈষম্যভিত্তিক স্বরবিন্যাস। এর আরোহে গান্ধার (গা) এবং ধৈবত (ধা) স্বর দুটি সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে, অথচ অবরোহে ধৈবত এবং কোমল নিষাদের সুনিপুণ ব্যবহার ঘটে। দেশ রাগে যেখানে অবরোহে কোমল নিষাদের প্রয়োগ অত্যন্ত উন্মুক্ত ও স্পষ্ট, সোরথ রাগে সেই নিষাদের প্রয়োগ অনেক বেশি মার্জিত ও নিয়ন্ত্রিত।

ঐতিহাসিক বিচারে রাগ সোরথের আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে এর ‘রে’ (ঋষভ) এবং ‘পা’ (পঞ্চম) স্বরের বলিষ্ঠ সংগতির ওপর। ধ্রুপদী খেয়াল ও দ্রুত তানবিস্তারের পাশাপাশি ঠুমরি, দাদরা, সুফি কাওয়ালি এবং নিবেদিত ভজন পরিবেশনায় সোরথ রাগের প্রয়োগ এক অন্যরকম আবেগীয় আবহের সৃষ্টি করে।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো ও স্বরলিপি

শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রামাণ্য আকর গ্রন্থগুলোর আলো ক্যে রাগ সোরথের স্বরপরিচয় ও লক্ষণীয় নিয়মাবলী নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ঠাটে (Thaat): খামাজ।
  • জাতি (Jati): ঔড়ব-ষাড়ব (আরোহে ৫টি স্বর এবং অবরোহে ৬টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ (Aroh): সা রে মা পা নি সা (S R M P N S)।(আরোহে ‘গ’ এবং ‘ধ’ স্বর দুটি সম্পূর্ণ বর্জিত)।
  • অবরোহ (Avroh): সা নি(কোমল) ধা পা মা রে সা (S n D P M R S)।(অবরোহে কেবল ‘গ’ স্বরটি বর্জিত থাকে)।
  • বাদী স্বর (Vadi): শুদ্ধ ঋষভ (রে)।
  • সমবাদী স্বর (Samvadi): শুদ্ধ পঞ্চম (পা)।
  • বর্জিত স্বর (Varjit Swar): আরোহে গান্ধার (গা) ও ধৈবত (ধা); অবরোহে কেবল গান্ধার (গা)।
  • ব্যবহৃত স্বর: আরোহে শুদ্ধ স্বরসমূহ ব্যবহৃত হয় (শৈল্পিক টানে কদাচিৎ আরোহে শুদ্ধ নিষাদ স্পর্শ করা হয়); অবরোহে শুদ্ধ ধৈবতের সাথে কোমল নিষাদ (n) ব্যবহৃত হয়।
  • পরিবেশনের সময় (Time): রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
  • প্রকৃতি ও রস (Mood & Rasa): চঞ্চল, করুণ এবং শৃঙ্গার রসপ্রধান।
  • পকড় (Pakad/মূল সুরবাক্য): রে মা পা নি সা, সা নি(কোমল) ধা পা, মা রে, নি(কোমল) সা।

 

সংশ্লিষ্ট বা সদৃশ রাগের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

রাগ সোরথকে সংলগ্ন অন্যান্য রাগের সংমিশ্রণ থেকে আলাদাভাবে চেনার জন্য তুলনামূলক রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ দেশ (Desh): সোরথের সাথে দেশ রাগের নিকটতম সাদৃশ্য থাকলেও, দেশ রাগের জাতি ঔড়ব-সম্পূর্ণ (অবরোহে গান্ধার ব্যবহৃত হয়)। সোরথে অবরোহে গান্ধার পুরোপুরি বর্জিত থাকে।
  • রাগ তিলক কামোদ (Tilak Kamod): তিলক কামোদের স্বরপ্রযোগ ও বক্র চলনের সাথে মিল থাকলেও তিলক কামোদে রে-পা সংগতির ভঙ্গি এবং অবরোহের রূপ সোরথের চেয়ে ভিন্ন।
  • রাগ বৃন্দাবনী সারং (Brindabani Sarang): আরোহ-অবরোহের প্রাথমিক স্বরে গভীর মিল থাকলেও সোরথে অবরোহে ধৈবতের (ধা) স্পষ্ট উপস্থিতি একে সারং অঙ্গের রাগসমূহ থেকে আলাদা করে।
  • রাগ খামাজ (Khamaj): একই ঠাটের রাগ হলেও খামাজে গান্ধার ও কোমল নিষাদের আধিপত্য বেশি, যেখানে সোরথের আরোহে গা-ধা বর্জিত থাকায় তা স্বতন্ত্র চরিত্র পায়।
  • রাগ মাড়ু খামাজ (Maru Khamaj): এটি সোরথের সমগোত্রীয় ও নিকট রূপান্তর হলেও এতে অন্যান্য স্পর্শ স্বরের প্রাচুর্য থাকে।

রাগ সোরথ হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই বিশেষ সুরমূর্তি, যা কড়া ব্যাকরণের জটিলতায় বন্দি না থেকে সাধারণ সংগীতপ্রেমী এবং শাস্ত্রীয় পণ্ডিত—উভয় পক্ষকেই সমানভাবে আকর্ষিত করে। এর লোকজ ঢং ও ধ্রুপদী ছাঁচের মেলবন্ধন বিরহের রাতে কিংবা বর্ষার নিস্তব্ধতায় শ্রোতার মনে এক অনাবিল স্নিগ্ধতা ও আত্মিক প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়। সঠিক আলাপন ও ঋষভ-পঞ্চমের নিখুঁত ভারসাম্যের মাধ্যমে সোরথ রাগটি যখন পরিবেশিত হয়, তখন তা মাটির সুরকে স্বর্গীয় রূপ দিয়ে সুরলোকের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

প্রধান তথ্যসূত্র ও প্রামাণ্য গ্রন্থাবলী:

১. হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি (ক্রমিক পুস্তক মালিকা, ২য় ও ৩য় খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে

২. প্রণব ভারতী ও রাগ তত্ত্ব বি বোধ – পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর

৩. সংগীত বিশারদ – বসন্ত

৪. The Raga Guide: A Survey of 74 Hindustani Ragas – Joep Bor

৫. ভারতীয় সংগীতকোষ – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।