সোরথ রাগটি মূলত শৃঙ্গার রস এবং বিরহ বেদনার সংমিশ্রণে তৈরি। এটি শুনতে অনেকটা রাগ ‘দেশ’-এর মতো মনে হলেও এর চলন এবং স্বর প্রয়োগ একে সম্পূর্ণ আলাদা স্বকীয়তা দান করেছে। রাগ সোরথের একটি বড় বিশেষত্ব হলো এর অবরোহে কোমল নিষাদ n এবং শুদ্ধ নিষাদ N – উভয়েরই প্রয়োগ। তবে সোরথ রাগে নিষাদের ব্যবহার রাগ দেশের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত। এই রাগের প্রকৃতি চঞ্চল হলেও এর মধ্যে এক ধরনের গাম্ভীর্য ও আর্তি লুকিয়ে থাকে, যা শ্রোতার মনে গভীর দাগ কাটে। প্রাচীনকালে এটি লোকগীতি বা ‘চারণ’ গীতিতে প্রচুর ব্যবহৃত হতো, যা পরবর্তীতে শাস্ত্রীয় সংগীতের কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী রূপ পায়।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাটে: খামাজ।
- জাতি: ঔড়ব-ষাড়ব (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৬টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স র ম প ন স (সা রে মা পা নি সা)।
- অবরোহ: স ন ধ প ম র স (সা নি ধা পা মা রে সা)।
- বাদী স্বর: র (রে)।
- সমবাদী স্বর: প (পা)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে ‘গ’ (গা) এবং ‘ধ’ (ধা) বর্জিত; অবরোহে কেবল ‘গ’ (গা) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: আরোহে শুদ্ধ স্বর ব্যবহৃত হয়; অবরোহে শুদ্ধ ধৈবত এবং কোমল নিষাদ ব্যবহৃত হয়। কিছু বিশেষ প্রয়োগে আরোহে শুদ্ধ নিষাদ ব্যবহৃত হতে পারে।
- সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
- প্রকৃতি: চঞ্চল ও শৃঙ্গার রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ দেশ: সোরথের সাথে এর নিকটতম সাদৃশ্য রয়েছে, তবে দেশ রাগের জাতি সম্পূর্ণ আলাদা (ঔড়ব-সম্পূর্ণ)।
- রাগ তিলক কামোদ: সোরথের স্বর বিন্যাসের সাথে তিলক কামোদের কিছুটা মিল পাওয়া যায়, তবে চলন ভিন্ন।
- রাগ বৃন্দাবনী সারং: আরোহ-অবরোহের স্বর অনেকটা মিল থাকলেও সোরথে ধৈবতের ব্যবহার একে সারং থেকে পৃথক করে।
- রাগ খামাজ: ঠাট এক হওয়ায় স্বরের মিল আছে, কিন্তু সোরথের আরোহে
- গা-ধা বর্জিত থাকায় এটি স্বতন্ত্র।
- রাগ মাড়ু খামাজ: এটিও সোরথের সমগোত্রীয় রাগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাগ সোরথ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই সব রাগের মধ্যে একটি, যা সাধারণ মানুষ এবং শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ—উভয়ের কাছেই সমান জনপ্রিয়। এর সরলতা এবং লোকজ সুরের আবেদন একে অনন্য করে তুলেছে। বিশেষ করে বৃষ্টির রাতে বা বিরহের মুহূর্তে সোরথ রাগের বন্দিশ বা ঠুমরি শুনলে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করা যায়। সোরথ রাগের মাধুর্য টিকে আছে এর সঠিক ‘রে’ এবং ‘পা’ স্বরের সংগতির ওপর। এটি কেবল একটি রাগ নয়, এটি আমাদের মাটির সুর যা ধ্রুপদী ছাঁচে ঢালাই করা হয়েছে।
প্রধান তথ্যসূত্রসমূহ
পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (Kramik Pustak Malika, খণ্ড ২ ও ৩): এটি শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আকর গ্রন্থ। এখানে রাগ সোরথ-এর ঠাট (খামাজ), জাতি (ঔড়ব-ষাড়ব), এবং আরোহ-অবরোহের ব্যাকরণগত ভিত্তি বর্ণিত আছে। বিশেষ করে আরোহে ‘গ’ ও ‘ধ’ বর্জিত হওয়ার বিষয়টি এখান থেকেই নেওয়া।
পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’ ও ‘রাগ তত্ত্ব বিবোঁধ’: সোরথ রাগের চলন এবং এর সাথে রাগ ‘দেশ’-এর যে সূক্ষ্ম পার্থক্য, তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য এই গ্রন্থটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya, Hathras): পরীক্ষার্থী এবং সংগীত গবেষকদের জন্য এই বইটি একটি মানদণ্ড। এখানে সোরথ রাগের বাদী স্বর ‘রে’ এবং সমবাদী স্বর ‘পা’ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া রাগের সময় (রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর) এখান থেকে যাচাই করা।
Joep Bor — ‘The Raga Guide: A Survey of 74 Hindustani Ragas’: এটি একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্যকোষ। সোরথ রাগের আরোহ ও অবরোহে নিষাদের (শুদ্ধ ও কোমল) ব্যবহার এবং এর লোকজ (সৌরীয়) উৎপত্তির ইতিহাস এখান থেকে নেওয়া হয়েছে।
বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: বাংলা ভাষায় রাগ-রাগিনীর পরিচয় ও ইতিহাসের জন্য এটি একটি প্রামাণ্য দলিল। সোরথ রাগের প্রকৃতি ও এর প্রাচীন বিবর্তন সম্পর্কে তথ্য এখান থেকে সংগৃহীত।