রাগ গারা । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ গারা মূলত খামাজ ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। এই রাগের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর ‘আশ্রয়ী’ প্রকৃতি; অর্থাৎ এটি গাওয়ার সময় গায়ক অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে অন্যান্য রাগের (যেমন পিলু বা খামাজ) ছোঁয়া দিতে পারেন। তবে এর নিজস্ব একটি চলন রয়েছে যা একে স্বতন্ত্র করে তোলে। গারা রাগে শুদ্ধ এবং কোমল—উভয় প্রকার ‘গা’ (গান্ধার) এবং ‘নি’ (নিষাদ)-এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়, যা রাগটির মধ্যে এক ধরনের চঞ্চলতা ও বৈচিত্র্য তৈরি করে।

ঐতিহাসিকভাবে, গারা রাগের শিকড় লোকসংগীতের গভীরে প্রোথিত। এটি প্রাচীন কোনো রাগ নয়, বরং লোকজ সুরকে শাস্ত্রীয় ছাঁচে ফেলে পণ্ডিত ও ওস্তাদগণ একে বর্তমান রূপ দিয়েছেন। লোকজ সুরের আমেজ থাকায় সাধারণ শ্রোতাদের কাছে এই রাগটি খুব দ্রুত আবেদন তৈরি করতে পারে। এর চলন অনেকটা বক্র এবং এতে মীড় ও গিটকিরির কাজ অত্যন্ত শ্রুতিমধুর শোনায়। এটি মূলত বিরহ ও শৃঙ্গার রসের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।

রাগ গারা

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাটে: খামাজ।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়, তবে চলন বক্র)।
  • আরোহ: স গ ম প ধ ন স (সা গা মা পা ধা নি সা — এখানে গান্ধার ও নিষাদ শুদ্ধ)।
  • অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স (সা নি ধা পা মা গা রে সা — এখানে নিষাদ ও গান্ধার কোমল ব্যবহারের প্রবণতা বেশি)।
  • বাদী স্বর: গ (গান্ধার)।
  • সমবাদী স্বর: ন (নিষাদ)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ১২টি স্বরের মধ্যে শুদ্ধ স্বরের পাশাপাশি কোমল গান্ধার (জ্ঞা) ও কোমল নিষাদ (ণ) ব্যবহৃত হয়।
  • সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
  • প্রকৃতি: চঞ্চল, শৃঙ্গার ও করুণ রসপ্রধান।

 

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ খামাজ: গারার মূল ঠাট রাগ; খামাজের চলন গারার চেয়ে অনেক বেশি শাস্ত্রীয় ও গম্ভীর।
  • রাগ পিলু: গারা এবং পিলু উভয়ই মিশ্র রাগ এবং উভয় রাগে ১২টি স্বর ব্যবহারের সুযোগ থাকে, তবে পিলু অধিকতর করুণ।
  • রাগ ঝিনঝোটি: গারার অবরোহের সময় অনেক সময় ঝিনঝোটির আভাস পাওয়া যায়।
  • রাগ জয়জয়ন্তী: গারা রাগের স্বর বিন্যাসে জয়জয়ন্তীর সামান্য সাদৃশ্য পাওয়া যায়, যদিও জয়জয়ন্তীর কাঠামো অনেক জটিল।
  • রাগ ভৈরবীবাহার: মিশ্র প্রকৃতির গায়কিতে অনেক সময় গারার সাথে বাহার বা ভৈরবীর সংমিশ্রণ ঘটানো হয়।

রাগ গারা হলো শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই বিশেষ সুর যা কঠিন ব্যাকরণের শৃঙ্খল ভেঙে মানুষের আবেগকে প্রাধান্য দেয়। এর নমনীয়তা এবং বৈচিত্র্যময় স্বরপ্রয়োগ শিল্পীকে অবারিত সৃজনশীলতার সুযোগ দেয়। গারা রাগের সার্থকতা এর শুদ্ধ ও কোমল স্বরের সুনিপুণ লয়ে, যা শ্রোতার মনে এক স্নিগ্ধ প্রশান্তি ও মৃদু চঞ্চলতার দোলা দিয়ে যায়। লোকজ সুরের প্রাণশক্তি এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের আভিজাত্য—এই দুয়ের এক অনন্য মিলনস্থল হলো রাগ গারা।

তথ্যসূত্র:

১/ রাগ পরিচয় (১ম-৪র্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে: হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সর্বাধিক প্রামাণ্য আকর গ্রন্থ।

২/ সংগীত বিশারদ – বসন্ত: রাগের তাত্ত্বিক কাঠামো ও স্বরলিপি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য উৎস।

৩/ The Raga Guide: A Survey of 74 Hindustani Ragas – Joep Bor: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও তুলনামূলক আলোচনা।

৪/ নজরুল সংগীতের রাগ নির্দেশিকা: কাজী নজরুল ইসলামের গানে গারা রাগের সার্থক প্রয়োগ ও বিশ্লেষণ।

৫/ শাস্ত্রীয় সংগীতের তত্ত্ব ও ইতিহাস – এ কে এম মনসুর: দেশীয় সংগীতশাস্ত্রে রাগের বিবর্তন ও প্রয়োগ বিধি।