ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল আকাশে রাগ ‘বসন্ত মুখরি’ এক অনন্য, বৈভবশালী এবং অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। এই রাগটির জন্ম মূলত আমাদের দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীত পদ্ধতিতে, যেখান থেকে এটি পরবর্তীতে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে নিজের পাকা জায়গা করে নেয়। কর্ণাটকী সংগীতে এটিকে ‘বকুলভরণ’ (Vakulabharanam) নামক ১৪তম মেলাকর্তা রাগের সমগোত্রীয় মনে করা হয়। এর ভেতরের এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা এবং করুণ রসের সংমিশ্রণ শ্রোতার মনে এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি তৈরি করে।
রাগ বসন্ত মুখরি
রাগ বসন্ত মুখরির অন্দরমহল ও ইতিহাস
রাগ বসন্ত মুখরি মূলত ভৈরব ঠাটের একটি অতি সুমধুর রাগ। তবে এর চলনে ‘ভৈরব’ এবং ‘আশাবরী’—এই দুই বিখ্যাত ঠাটের এক অপূর্ব মেলবন্ধন বা কাটাকাটি লক্ষ্য করা যায়। এই রাগের সবচেয়ে বড় জাদুটাই লুকিয়ে আছে এর স্বর বিন্যাসের ভেতর; এটি শুনতে শুরুতে অনেকটা রাগ ভৈরবের মতো মনে হলেও এর অবরোহে যখন কোমল নিষাদ এবং কোমল ধৈবতের নিখুঁত প্রয়োগ করা হয়, তখন এটি চোখের সামনে একদম নতুন এক মায়াবী রূপ ধারণ করে।
ঐতিহাসিকভাবে, উত্তর ভারতীয় বা আমাদের চেনা হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতিতে এই রাগটি কিন্তু খুব বেশি প্রাচীন নয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং ওস্তাদ আমির খাঁ-র মতো কিংবদন্তি মহাপুরুষদের হাত ধরেই মূলত এই রাগটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই রাগের গায়নশৈলীতে এক ধরণের ‘আর্তি’, ব্যাকুলতা বা সম্পূর্ণ সমর্পণের ভাব থাকে—যা একে চমৎকার কোনো ভজন বা ধীর লয়ের খেয়াল গায়নের জন্য একদম পারফেক্ট করে তুলেছে। এটি মূলত করুণ এবং শান্ত রসপ্রধান রাগ। মাঝরাতে ঘুম ভাঙার পর কিংবা ভোরের আলো ফোটার আগে মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে এর বিস্তার শুনলে শরীর ও মন জুড়িয়ে যায়।
রাগের ব্যাকরণ ও শাস্ত্র
সহজ ভাষায় রাগটির ব্যাকরণগত কাঠামো নিচে দেওয়া হলো:
- ঠাট: ভৈরব।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (অর্থাৎ আরোহে এবং অবরোহে ৭টি করে স্বরই ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স র গ ম প ধ ন স।
- অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স।
- বাদী স্বর (রাগের রাজা): ম (মধ্যম)।
- সমবাদী স্বর (রাগের মন্ত্রী): স (ষড়জ)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়, সব স্বরই এতে উপস্থিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), ধৈবত (ধা) এবং নিষাদ (নি) — এই তিনটি স্বরই এখানে কোমল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর গান্ধার (গা), মধ্যম (মা) এবং পঞ্চম (পা) থাকে একদম শুদ্ধ।
- সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, করুণ ও শান্ত রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ভৈরব: বসন্ত মুখরির আরোহ আর ভৈরব দেখতে প্রায় এক, কিন্তু কোমল নিষাদের ছোঁয়া একে ভৈরব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়।
- রাগ নট ভৈরব: স্বর বিন্যাসে অনেক মিল থাকলেও নট ভৈরবে কোমল নিষাদের পরিবর্তে শুদ্ধ নিষাদ ব্যবহৃত হয়।
- রাগ আশাবরী: অবরোহের কিছু অংশে আশাবরীর ছায়া পাওয়া গেলেও গান্ধার ও ঋষভের কারণে এদের মেজাজ আলাদা।
- রাগ আহির ভৈরব: দুটি রাগই ভৈরব ঠাটের, কিন্তু আহির ভৈরবে ধৈবত শুদ্ধ আর আমাদের বসন্ত মুখরিতে ধৈবত কোমল।
- রাগ কলিঙ্গড়া: চলন ও স্বর বিন্যাসে কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও এদের ভেতরের মেজাজ ও বাদী-সমবাদী স্বর সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রাগ বসন্ত মুখরি হলো শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই বিশেষ সুরশালা—যা ভোরের স্নিগ্ধতায় মনের ভেতর এক আধ্যাত্মিক চেতনার জন্ম দেয়। এর ভেতরের লুকানো করুণ রস শ্রোতাকে বাইরের কোলাহল ভুলিয়ে নিজের আত্মার সাথে একাত্ম হতে সাহায্য করে। সীমিত কিছু স্বরের নিপুণ খেলা আর কোমল স্বরগুলোর সঠিক শ্রুতি প্রয়োগের মাধ্যমেই এই রাগের আসল রূপটি ফুটে ওঠে। যাঁরা আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতে নতুনত্বের সাথে নিখুঁত ঐতিহ্যের স্বাদ পেতে চান, তাঁদের কাছে বসন্ত মুখরি এক পরম পাওয়া। এটি কেবল কাগজের কলমে বেঁধে রাখা কোনো রাগ নয়; এটি আসলে ভোরের নিস্তব্ধতায় এক পশলা বৃষ্টির মতো শীতল, পবিত্র এবং স্নিগ্ধ।
তথ্যসূত্র:
১. সংগীত বিশারদ – বসন্ত (Sangeet Karyalaya): রাগের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং স্বর বিন্যাস যাচাইয়ের জন্য প্রামাণ্য গ্রন্থ।
২. The Raga Guide: A Survey of 74 Hindustani Ragas – Joep Bor: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ যেখানে বসন্ত মুখরি ও ভৈরবের পার্থক্য বর্ণিত।
৩. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’: রাগের চলন ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব আলোচনার অন্যতম প্রধান উৎস।
৪. কর্ণাটকী ও হিন্দুস্তানি সংগীতের তুলনামূলক আলোচনা – বিভিন্ন সংগীত জার্নাল: বকুলভরণ ও বসন্ত মুখরির ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিরূপণে।
৫. রাগ পরিচয় – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে: ভৈরব ঠাটের অন্তর্গত আধুনিক রাগসমূহের নিখুঁত শ্রেণীবিভাগ।
আরও দেখুন:
