ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল ভৈরব পরিবারে রাগ হুসাইনী ভৈরব (Hussaini Bhairav) একটি অত্যন্ত প্রাচীন, গম্ভীর এবং বিরল প্রকৃতির মিশ্র রাগ। নাম থেকেই স্পষ্ট যে এটি দুটি ভিন্ন ঐতিহ্যের সুর—’হুসাইনী’ এবং ‘ভৈরব’-এর এক অপূর্ব শৈল্পিক সংমিশ্রণ। শাস্ত্রীয় সংগীতে ভৈরবকে আদি ও পবিত্র রাগ হিসেবে গণ্য করা হয়, আর হুসাইনী অঙ্গটি মূলত মধ্যপ্রাচ্য বা সুফি ঐতিহ্যের প্রভাব বহন করে। এই দুইয়ের মিলনে হুসাইনী ভৈরব এক অনন্য আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য লাভ করেছে।
রাগ হুসাইনী ভৈরব
রাগ হুসাইনী ভৈরবের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
রাগ হুসাইনী ভৈরব মূলত ভৈরব ঠাটের একটি অতি উচ্চাঙ্গের মিশ্র রাগ। ঐতিহাসিকভাবে, এই রাগের উৎপত্তি মধ্যযুগীয় উত্তর ভারতীয় সংগীতের ধারায় পণ্ডিত ও ওস্তাদদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল। এটি মূলত ‘ভৈরব’ এবং ‘আসাভরী’ বা ‘হুসাইনী কানাডা’র কিছু বিশেষ চলনের সংমিশ্রণে তৈরি। অনেক সংগীতজ্ঞ মনে করেন, প্রাচীনকালে যখন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সাথে পারস্য ও আরবীয় সংগীতের মিলন ঘটছিল, তখন এই ধরণের রাগের উদ্ভব হয় যা সুফি সাধকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিল।
এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর চলনে কোমল ঋষভ (রে) এবং কোমল ধৈবত (দা)-এর আন্দোলন প্রধান থাকলেও, এতে কোমল নিষাদ (ণি)-এর বিশেষ প্রয়োগ থাকে যা একে শুদ্ধ ভৈরব থেকে পৃথক করে। এর চলন অত্যন্ত বক্র এবং ধীর গতির, যা ভোরের নিস্তব্ধতায় এক অপার্থিব বৈরাগ্য এবং সমর্পণের ভাব তৈরি করে। এটি মূলত ধ্রুপদ ও খেয়াল গায়কির জন্য আদর্শ, যেখানে মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকের কাজ বেশি থাকে।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: ভৈরব।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা রে জ্ঞা মা পা ধা ণি সা (দ্রষ্টব্য: কোনো কোনো ঘরানায় গান্ধার শুদ্ধ রাখা হয়, তবে হুসাইনী অঙ্গে কোমল গান্ধারের ব্যবহারই অধিক প্রচলিত)।
- অবরোহ: সা ণি ধা পা মা জ্ঞা রে সা।
- বাদী স্বর: ধা (কোমল ধৈবত)।
- সমবাদী স্বর: রে (কোমল ঋষভ)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ, গান্ধার, ধৈবত এবং নিষাদ — এই চারটি স্বরই কোমল ব্যবহৃত হয়। বাকি সব স্বর (সা, মা, পা) শুদ্ধ।
- সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বা দিনের প্রথম প্রহর)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, বৈরাগ্য ও ভক্তি রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ভৈরব: এই রাগের মূল আধার এবং প্রধান অঙ্গ রাগ।
- রাগ অহির্ ভৈরব: উভয় রাগে কোমল ঋষভ ও কোমল নিষাদ থাকলেও অহির্ ভৈরবে গান্ধার শুদ্ধ থাকে।
- রাগ আসাভরী: হুসাইনী ভৈরবের অবরোহের চলনে আসাভরীর কোমল স্বরবিন্যাসের ছায়া পাওয়া যায়।
- রাগ কৌশি ভৈরব: স্বর বিন্যাসের দিক থেকে মিল থাকলেও কৌশি ভৈরবে মালকোষের প্রভাব থাকে।
- রাগ শিবমত ভৈরব: উভয় রাগে ভৈরব অঙ্গ থাকলেও শিবমত ভৈরবে শিবরঞ্জনীর প্রভাব থাকে।
- রাগ হুসাইনী কানাডা: হুসাইনী অঙ্গে কোমল নিষাদ ও ধৈবতের যে বিশেষ লহর থাকে তা এখানে ব্যবহৃত হয়।
রাগ হুসাইনী ভৈরব হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই মায়াবী সুর যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে এক পবিত্র আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করে তোলে। ভৈরবের আভিজাত্য আর হুসাইনী অঙ্গের মরমী আকুলতা—এই দুয়ের সার্থক মিলনই হলো এই রাগ। যদিও বর্তমান সময়ের সাধারণ আসরগুলোতে এই রাগের প্রচলন কিছুটা সীমিত এবং এটি পরিবেশন করা অত্যন্ত কঠিন, তবুও এর তাত্ত্বিক ও শৈল্পিক গভীরতা সংগীতের গবেষক ও প্রকৃত সাধকদের কাছে অপরিসীম। শুদ্ধ চিত্তে এই রাগের আলাপ শুনলে তা শ্রোতা ও শিল্পী উভয়কেই এক অপার্থিব প্রশান্তির জগতের সন্ধান দেয়।
তথ্যসূত্র:
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (ক্রমিক পুস্তক মালিকা, খণ্ড ৪): বিরল এবং জটিল মিশ্র রাগসমূহের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের জন্য।
২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (সংগীত কার্যালয়): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য আকর।
৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও বিবর্তনের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।
৪. জোপ বোর — ‘দ্য রাগ গাইড’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও স্বর বিন্যাস যাচাইয়ের জন্য।
৫. অপ্রচলিত রাগ সংকলন (বিভিন্ন ঘরানা): হুসাইনী ভৈরব-এর মতো দুর্লভ রাগগুলোর প্রয়োগ পদ্ধতি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।
আরও দেখুন: