আধুনিক বাংলা গান | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

আধুনিক বাংলা গান কেবল সুর ও বাণীর সমষ্টি নয়, এটি বাঙালির এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পরিক্রমার ফসল। ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীত মানচিত্রে হিন্দি গজল, হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত বা দক্ষিণ ভারতের কর্নাটকী সংগীতের মতো শক্তিশালী ধারা থাকলেও ‘আধুনিক গান’ নামক যে স্বকীয় ঘরানাটি বাংলা ভাষায় তৈরি হয়েছে, তার সমান্তরাল কোনো ধারা অন্য কোনো ভাষায় সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এটি বাঙালির এমন এক আবিষ্কার যা ধ্রুপদী সংগীতের ব্যাকরণ এবং লোকসংগীতের মাটির ঘ্রাণকে একীভূত করে নাগরিক জীবনের আবেগ প্রকাশের বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকে আজ পর্যন্ত এই গানের ধারাটি যে পথ অতিক্রম করেছে, তা বাংলা ভাষার গর্বের ইতিহাস।

কাজী নজরুল ইসলাম

Table of Contents

আধুনিক বাংলা গানের সংজ্ঞা ও স্বাতন্ত্র্য

আধুনিক বাংলা গান কেবল একটি সংগীতের ধারা নয়, বরং এটি বাঙালির মননশীলতার এক বিমূর্ত প্রকাশ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন বাংলা সমাজব্যবস্থা ধর্মীয় আচারের গণ্ডি পেরিয়ে ইহজাগতিক ও নাগরিক জীবনের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল, তখনই ‘আধুনিক গান’ নামক এই অনন্য ধারার জন্ম হয়। এর মূল সংজ্ঞা নিহিত রয়েছে এর বিষয়বস্তুর আধুনিকতায়। প্রথাগতভাবে বাংলা গান ছিল হয় ঈশ্বরের আরাধনা (যেমন কীর্তন, শ্যামাসংগীত বা সুফি গান), না হয় মাটির টানে বাঁধা কোনো লোকজ আখ্যান (যেমন বাউল বা ভাটিয়ালি)। কিন্তু আধুনিক গান প্রথমবারের মতো মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিঃসঙ্গতা, হৃদয়ের গহীনের প্রেম, নাগরিক জীবনবোধ এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ককে সুরের ফ্রেমে বন্দি করে। এটি সমষ্টির কণ্ঠস্বর না হয়ে ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত ডায়েরির মতো কাজ করে।

এই ধারার অন্যতম প্রধান স্বাতন্ত্র্য হলো এর কাব্যনির্ভরতা। আধুনিক বাংলা গানকে প্রায়শই বলা হয় ‘কথা ও সুরের দাম্পত্য’। এখানে সংগীত কেবল সুরের কসরত নয়, বরং বাণী বা লিরিকই এর প্রধান চালিকাশক্তি। সুর এখানে বাণীর আজ্ঞাবহ হয়ে চলে, যাতে কবিতার গূঢ় অর্থটি শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছাতে পারে। এই কাব্যময়তার কারণেই বাংলা আধুনিক গান অন্য যেকোনো ভাষার গানের চেয়ে বেশি সাহিত্যমানসম্পন্ন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিক কালের গীতিকাররা প্রমাণ করেছেন যে, একটি চার মিনিটের গানেও উপন্যাসের গভীরতা বা কবিতার স্নিগ্ধতা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।

প্রাযুক্তিক ও ব্যাকরণগত দিক থেকে আধুনিক গানের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সৃজনশীল সংমিশ্রণ বা ফিউশন। এটি কোনো নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় রাগের শৃঙ্খলে বন্দি থাকে না। সুরকাররা অত্যন্ত নিপুণভাবে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন রাগের মিশ্রণ ঘটান এবং তার সাথে অবলীলায় যুক্ত করেন পাশ্চাত্য যন্ত্রানুষঙ্গ। পিয়ানো, ভায়োলিন বা গিটারের মতো বাদ্যযন্ত্রের সমান্তরাল ব্যবহার বাংলা গানের ভাবগাম্ভীর্যকে এক ধরনের বৈশ্বিক রূপ দান করে। ফলে আধুনিক গান তার আভিজাত্য বজায় রেখেও সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য ও শ্রবণযোগ্য হয়ে ওঠে। মূলত, শাস্ত্রীয় সংগীতের শৃঙ্খলা, লোকসংগীতের সহজাত আবেগ এবং পাশ্চাত্য সংগীতের আধুনিক অর্কেস্ট্রেশন—এই তিনের এক অপূর্ব জ্যামিতিক সমন্বয়ই হলো আধুনিক বাংলা গান, যা ভারতের অন্য কোনো আঞ্চলিক ভাষায় এমন সমৃদ্ধ রূপে আবিষ্কৃত হয়নি।

সলিল চৌধুরী | Salil Chowdhury
সলিল চৌধুরী | Salil Chowdhury

 

বাংলাদেশে আধুনিক বাংলা গানের ধারা: উন্মেষ ও বিকাশ

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব বাংলায় আধুনিক গানের যে অভিযাত্রা শুরু হয়, তার মূল সূতিকাগার ছিল ঢাকা বেতার। তৎকালীন নাজিমুদ্দিন রোডের একটি ছোট্ট ভবন থেকে সম্প্রচারিত এই বেতার কেন্দ্রটি কেবল তথ্য প্রচারের মাধ্যম ছিল না, বরং এটি ছিল বাঙালি সংস্কৃতির নবজাগরণের কেন্দ্র। দেশভাগের ফলে কলকাতা কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ও সুরকারদের অভাব যখন প্রকট হয়ে ওঠে, তখন ঢাকা বেতারকে কেন্দ্র করে একদল তরুণ ও প্রতিভাবান শিল্পী আধুনিক গানের কাঠামো নির্মাণে ব্রতী হন। আবদুল আহাদ, যিনি শান্তিনিকেতনে সরাসরি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, তিনি আধুনিক গানে এক ধরনের পরিশীলিত গায়কি ও সুরের আভিজাত্য নিয়ে আসেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে আধুনিক গান কেবল বিনোদনের মাধ্যম না হয়ে বরং নাগরিক মধ্যবিত্তের মননশীলতার পরিচায়ক হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, কাদেরী কিবরিয়া বা মাহমুদুন্নবীর মতো শিল্পীরা ঢাকা বেতারের স্টুডিওতে বসে যে গানগুলো রেকর্ড করেছিলেন, তা ছিল শব্দশৈলী ও বাণীর দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই সময়ে বেতারের মাধ্যমেই গানগুলো গ্রাম-গঞ্জ ও মফস্বলের মানুষের কানে পৌঁছে যায়, যা একটি শক্তিশালী শ্রোতামহল তৈরি করে। ঢাকা বেতারের সেই সীমিত প্রযুক্তির যুগেও শিল্পীদের একনিষ্ঠ সাধনা বাংলাদেশের আধুনিক গানকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করেছিল, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের সংগীতের মূলধারাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন সমর দাস
সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন সমর দাস

সূচনালগ্ন ও ঢাকা বেতারের ভূমিকা:

বাংলাদেশের আধুনিক গানের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর শিকড়সন্ধানী সুর, যা কলকাতার আধুনিক গান থেকে একে সম্পূর্ণ আলাদা একটি সত্তা দান করেছে। এই ধারার প্রধান কারিগর ছিলেন সমর দাস, আব্দুল লতিফ এবং আলতাফ মাহমুদের মতো কিংবদন্তিরা। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই অঞ্চলের মানুষের হৃদস্পন্দন লুকিয়ে আছে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া আর বাউল সুরের মূর্ত ব্যঞ্জনায়। তাই তারা আধুনিক গানে কেবল তবলার বোল বা হারমোনিয়ামের সুরেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং লোকজ সুরের সেই চিরায়ত ‘মেলোডি’র সাথে পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের ‘অর্কেস্ট্রেশন’ বা সমবেত সুরের এক অপূর্ব মিথস্ক্রিয়া ঘটান। সমর দাস আধুনিক গানে ভায়োলিন, পিয়ানো বা গিটারের মতো বাদ্যযন্ত্রের সাহসের সাথে প্রয়োগ করেন, যা গানকে এক ধরনের আন্তর্জাতিক মাত্রা দান করে। আবার আব্দুল লতিফের সুরারোপিত গানে মাটির সোঁদা গন্ধ এমনভাবে মিশে থাকত যে, নাগরিক কৃত্রিমতা তাকে স্পর্শ করতে পারত না। বিশেষ করে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে আধুনিক গান হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, যেখানে লোকজ সুরের করুণ রসকে ব্যবহার করে তৈরি হয় দেশাত্মবোধক আধুনিক গান। এই সময়কালেই আধুনিক গানের কাঠামোতে গজল ও উচ্চাঙ্গ সংগীতের মিশ্রণ ঘটিয়ে এক নতুন ঘরানা তৈরি করা হয়, যা বাংলা গানের আকাশকে বহুবর্ণিল ও সমৃদ্ধ করেছে।

গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী আব্দুল লতিফ
গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী আব্দুল লতিফ

ষাট ও সত্তরের দশক: আধুনিক গানের স্বর্ণালী বিপ্লব

বাংলাদেশে আধুনিক বাংলা গানের প্রকৃত বিপ্লব ও বিকাশ ঘটে ষাটের দশকে, যা সত্তরের দশকে এসে এক পূর্ণতা পায়। এই সময়কালটি ছিল সৃজনশীলতার এক অনন্য সন্ধিক্ষণ, যেখানে ঢাকা বেতারের গানের আভিজাত্য এবং চলচ্চিত্রের গানের (প্লেব্যাক) আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এই দুই দশকে আধুনিক গান কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার সাথেও যুক্ত হয়। এই রূপান্তরের প্রধান কাণ্ডারি ছিলেন একদল কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী। আবদুল জব্বার তাঁর ভরাট ও ওজস্বী কণ্ঠে আধুনিক গানে যেমন রোমান্টিকতা এনেছিলেন, তেমনি তাঁর গায়কিতে ছিল এক ধরনের পুরুষালি দৃঢ়তা, যা বিশেষ করে দেশাত্মবোধক আধুনিক গানে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। অন্যদিকে, মাহমুদুন্নবী ছিলেন আধুনিক গানের ‘দার্শনিক কণ্ঠ’। তাঁর গায়কিতে বিরহ ও বিষণ্ণতা এমন এক শৈল্পিক রূপে ফুটে উঠত, যা শ্রোতাকে নিভৃত চিন্তায় মগ্ন করত। ‘গানের খাতায় লিখে রেখেছি’ বা ‘তুমি যে আমার কবিতা’র মতো গানে তাঁর পরিমিতিবোধ ও সুরের সূক্ষ্ম কাজ আধুনিক গানকে এক অনন্য আভিজাত্য দান করেছে।

নারীকণ্ঠের আধুনিকতায় এই সময়টি ছিল অভাবনীয় সমৃদ্ধির। ফেরদৌসী রহমান তাঁর ধ্রুপদী সংগীতের ভিতকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক গানকে এক শাস্ত্রীয় উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য ভজন থেকে শুরু করে আধুনিক বা চপল সুরের গানেও সমানভাবে দ্যুতি ছড়িয়েছে। ঠিক তার পরপরই আধুনিক গানের দিগন্তে উদিত হন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। তাঁর কণ্ঠ ছিল যেন শরতের স্নিগ্ধতা—শান্ত, গভীর এবং অত্যন্ত মায়াবী। শাহনাজ রহমতউল্লাহর কণ্ঠে আধুনিক গান কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক থাকেনি; তাঁর গাওয়া দেশাত্মবোধক গানগুলো আধুনিক সংগীতেরই একটি সম্প্রসারিত এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দুই দশকের গায়কিই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আধুনিক গানের একটি স্থায়ী মানদণ্ড (Standard) তৈরি করে দেয়।

কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার
কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার

গানের নেপথ্য কারিগর: গীতিকার ও সুরকারদের মননশীলতা

বাংলাদেশের আধুনিক গানের অনন্যতা ও স্থায়িত্বের পেছনে মূল কারিগর ছিলেন এর মেধাবী গীতিকার ও সুরকাররা। আধুনিক গানকে কেবল সুরের খেলা থেকে বের করে একটি সাহিত্যিক রূপ দান করেছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল, গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের মতো শব্দশিল্পীরা। আবু হেনা মোস্তফা কামালের বাণীতে ছিল নাগরিক আভিজাত্য ও নিগূঢ় কাব্যময়তা, যা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের হৃদয়ে ঝড় তুলত। অন্যদিকে, গাজী মাজহারুল আনোয়ার আধুনিক গানকে গণমানুষের হৃদস্পন্দনের সাথে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর সহস্রাধিক গানে প্রেম, বিরহ এবং সমসাময়িক সমাজবাস্তবতা এমন সাবলীলভাবে উঠে এসেছে যে, তা বাঙালির জীবনের প্রাত্যহিক সংলাপে পরিণত হয়েছে। মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের গানে ছিল গভীর আবেগ ও দর্শনের সংমিশ্রণ, যা সুরকারদের জন্য নতুন নতুন সুরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ করে দিত।

সুরকারদের মধ্যে খান আতাউর রহমান ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তাঁর সুরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল লোকজ সুরের মাটির ঘ্রাণ এবং নাগরিক আধুনিকতার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য। তিনি জানতেন কীভাবে একটি ভাটিয়ালি সুরের রেশকে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সাজিয়ে শহুরে শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। সত্য সাহা ছিলেন মেলোডির জাদুকর। তাঁর সুরারোপিত গানে এক ধরনের সরলতা থাকলেও তার ভেতরে লুকিয়ে থাকত সুরের জটিল কারুকাজ, যা গানকে দীর্ঘস্থায়ী আবেদন দান করত। আবার সুবল দাসের সুরে ছিল এক ধরনের আধুনিক গতিশীলতা ও অর্কেস্ট্রেশনের চমৎকার ব্যবহার। এই কারিগরদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের আধুনিক গান একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছিল, যার ফলে আজও সেই সময়ের গানগুলো আমাদের সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে।

কণ্ঠশিল্পী পিলু মমতাজ
কণ্ঠশিল্পী পিলু মমতাজ

 

সত্তরের পরবর্তী উত্তাল সময় ও পপ সংগীতের প্রভাব

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক অভাবনীয় ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মনের অব্যক্ত কথা, ক্ষোভ এবং মুক্তির আনন্দ প্রকাশের জন্য চিরাচরিত ধীরলয়ের আধুনিক গান তখন যথেষ্ট ছিল না। এই শূন্যতা থেকেই জন্ম নেয় এক নতুন ধারা, যাকে আমরা ‘পপ’ বা ‘ব্যান্ড সংগীত’ হিসেবে চিনি। এই ধারার অগ্রপথিক ছিলেন আজম খান, ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর এবং পিলু মমতাজের মতো শিল্পীরা। আজম খান তাঁর উদাত্ত কণ্ঠ ও গিটারের ঝংকারে আধুনিক গানের ব্যাকরণে এক বিশাল ধাক্কা দেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পশ্চিমা ঘরানার পপ সংগীত তৎকালীন মূলধারার আধুনিক গানকে কোনোভাবেই বিলুপ্ত বা কোণঠাসা করেনি; বরং আধুনিক গানের অঙ্গনকে আরও বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ করেছে। আধুনিক গানের গঠনশৈলীতে কিছুটা দ্রুত লয় (Tempo) এবং ড্রামস, ইলেকট্রিক গিটার ও কঙ্গোর মতো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বাড়তে থাকে, যা গানকে আরও বেশি গতিশীল ও সমসাময়িক করে তোলে।

এই উত্তাল সময়ে আধুনিক গানের চিরায়ত মেলোডি বা সুমধুর ধারাটিকে যাঁরা অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন সাবিনা ইয়াসমিন এবং রুনা লায়লা। তাঁদের দীর্ঘ ও একচ্ছত্র আধিপত্য বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে এক স্বর্ণালি অধ্যায়। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠের নিখুঁত কাজ এবং ক্ল্যাসিক্যাল গানের ভিত আধুনিক গানকে এক অনন্য গাম্ভীর্য প্রদান করে। অন্যদিকে, রুনা লায়লার বহুমুখী গায়কি এবং আধুনিক গানে তাঁর ‘পারফর্মিং আর্ট’-এর ছোঁয়া ঢাকাই সংগীতকে বিদেশের মাটিতেও সমাদৃত করে। এই সময়েই সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতা’ কিংবা রুনা লায়লার কণ্ঠে বিভিন্ন আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানগুলো আধুনিক বাংলা গানের সীমানাকে বহুদূর বিস্তৃত করে দেয়। মূলত পপ সংগীতের উদ্দীপনা এবং এই দুই কিংবদন্তি নারী কণ্ঠের মেলোডির প্রভাবেই সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের আধুনিক গান এক পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী রূপ লাভ করে, যা আজও আমাদের গানের প্রধান চালিকাশক্তি।

কণ্ঠশিল্পী আজম খান
কণ্ঠশিল্পী আজম খান

আধুনিক বাংলা গানের নেপথ্য কারিগর: পঞ্চকবি

আধুনিক বাংলা গানের আজকের যে কাঠামো, তার আদি উৎস ও ব্যাকরণ রচিত হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুতে—পাঁচজন মহীরুহ সংগীতস্রষ্টার হাতে। যাঁদের আমরা সম্মিলিতভাবে ‘পঞ্চকবি’ হিসেবে অভিহিত করি। তাঁরা হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন এবং অতুলপ্রসাদ সেন। যদিও বর্তমান সময়ে তাঁদের সৃষ্টিকে স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ঘরানা যেমন ‘রবীন্দ্রসংগীত’ বা ‘নজরুলগীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে আধুনিক গানের বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পঞ্চকবির হাত ধরেই বাংলা গান প্রথম তার মধ্যযুগীয় বা ধর্মীয় খোলস ছেড়ে ‘আধুনিক’ ও ‘নাগরিক’ হয়ে উঠেছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন আধুনিক বাংলা গানের প্রধান স্থপতি। তিনি প্রথম দেখিয়েছেন যে, গান কেবল সুরের কসরত নয়, বরং এটি কথা ও সুরের এক অবিচ্ছেদ্য কাব্যিক সত্তা। তিনি ধ্রুপদী সংগীতের রাগকে গানের বাণীর প্রয়োজনে ভেঙেছেন এবং তাতে যুক্ত করেছেন বিলেতি সুর ও লোকজ অনুষঙ্গ। আধুনিক গানে ‘কথার ওজন’ এবং ‘সুরের ভাব’ কীভাবে সমান্তরালে চলে একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, তার শিক্ষা রবীন্দ্রনাথই দিয়ে গেছেন। আধুনিক গানের যে পরিমিতিবোধ ও গাম্ভীর্য, তার আদি পাঠ মূলত রবীন্দ্রসৃষ্টি থেকেই নেওয়া।

অন্যদিকে, কাজী নজরুল ইসলাম আধুনিক বাংলা গানে এক বৈপ্লবিক গতির সঞ্চার করেছিলেন। তিনি আধুনিক গানের সীমানাকে বহুদূর বিস্তৃত করেন গজল, ঠুমরি এবং বিচিত্র তালের ব্যবহারের মাধ্যমে। নজরুলের শ্রেষ্ঠ অবদান হলো আধুনিক বাংলা গানে ‘রোমান্টিকতা’ এবং ‘বিরহ’কে এক নতুন নাগরিক ব্যঞ্জনা দান করা। তাঁর ‘আধুনিক গান’ পর্যায়ের সৃষ্টিগুলোই পরবর্তী প্রজন্মের সুরকারদের শিখিয়েছে কীভাবে রাগের কঠোরতা বজায় রেখেও তাতে আধুনিকতার রঙ মেশানো যায়। নজরুলের গানের মাধ্যমেই বাংলা গানে প্রথম একটি শক্তিশালী অর্কেস্ট্রেশনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বাংলা গানে পাশ্চাত্য সংগীতের ‘কোরাস’ এবং ‘মার্চ মিউজিক’-এর স্বাদ নিয়ে আসেন, যা আধুনিক দেশাত্মবোধক গানের ভিত্তি তৈরি করে। অতুলপ্রসাদ সেন তাঁর গানে লখনউয়ের ঠুমরির মেজাজ এবং দেশি লোকজ সুরের (বাউল-কীর্তন) যে সুষমা ঘটিয়েছিলেন, তা আধুনিক গানের মেলোডিতে এক নতুন আভিজাত্য যোগ করে। আর রজনীকান্ত সেনের গানে ফুটে ওঠে ভক্তি ও আত্মসমর্পণের আধুনিক রূপ। এই পঞ্চকবির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলা গানের যে বৈচিত্র্যময় কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তাকেই ভিত্তি করে পরবর্তীতে ১৯৩০-এর দশকের গ্রামোফোন যুগের আধুনিক গানের স্বর্ণালী ইমারত নির্মিত হয়েছে। তাঁরা বাংলা সংগীতকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা দিয়েছেন, যা ভারতের অন্য কোনো আঞ্চলিক ভাষায় সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

কণ্ঠশিল্পী ফকির আলমগীর
কণ্ঠশিল্পী ফকির আলমগীর

 

ওপার বাংলার আধুনিক গান: স্বর্ণযুগ ও রূপান্তর

পশ্চিমবঙ্গে আধুনিক বাংলা গানের বিবর্তন মূলত একটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতায় গ্রামোফোন রেকর্ডের বাণিজ্যিক প্রসারের ফলে সংগীত কেবল উচ্চবিত্তের আসর বা জলসাঘর থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের অন্দরমহলে প্রবেশ করে। ১৯৩০ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত সময়কালকে আধুনিক বাংলা গানের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সময়ে বাংলা গান তার নিজস্ব নাগরিক ব্যাকরণ খুঁজে পায় এবং আকাশবাণী কলকাতার কল্যাণে তা প্রতিটি বাঙালির ড্রয়িংরুমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

লতা মঙ্গেশকর ও রুনা লায়লা
লতা মঙ্গেশকর ও রুনা লায়লা

গ্রামোফোন সংস্কৃতি ও গীতিকবি-সুরকারদের রসায়ন

কলকাতার এইচএমভি (HMV), মেগাফোন বা কলম্বিয়ার মতো রেকর্ড কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক সাফল্য বাংলা গানের কাঠামো বদলে দিয়েছিল। এই যুগে গানের মূল ভিত্তি ছিল শক্তিশালী গীতিকাব্য। শৈলেন রায় এবং প্রণব রায়ের মতো গীতিকাররা বাংলা আধুনিক গানে রোমান্টিকতা ও বিরহের এমন এক মার্জিত ভাষা নির্মাণ করেছিলেন, যা আগে দেখা যায়নি। তাদের কথায় যেমন ছিল কাব্যের গভীরতা, তেমনি ছিল সাধারণ মানুষের হৃদয়ের আকুতি।

এই বাণীতে সুরের জাদুকরী স্পর্শ দিয়েছিলেন কামাল দাশগুপ্ত এবং ‘সুরসাগর’ হিমাংশু দত্ত। হিমাংশু দত্ত ছিলেন একজন সত্যিকারের সংস্কারক। তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের অত্যন্ত জটিল রাগালাপ বা আলাপচারিতাকে আধুনিক গানের তিন-চার মিনিটের সীমিত পরিসরে যেভাবে বিন্যস্ত করেছিলেন, তা ছিল সমসাময়িক সংগীতে এক অভাবনীয় উদ্ভাবন। কামাল দাশগুপ্তের সুরে আবার ছিল আধুনিক গজল ও রোমান্টিকতার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ, যা ওপার বাংলার গানকে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক ভিত্তি দান করে।

সুরের তিন স্তম্ভ: হেমন্ত, মান্না ও শ্যামল মিত্র

ওপার বাংলার আধুনিক গানকে যারা আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও আভিজাত্য দিয়েছেন, তারা হলেন তিন কিংবদন্তি—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে এবং শ্যামল মিত্র। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ ছিল যেন আভিজাত্যের প্রতীক। রবীন্দ্রসংগীতের যে গাম্ভীর্য ও স্পষ্ট উচ্চারণবোধ তাঁর মধ্যে ছিল, তা তিনি আধুনিক গানে প্রয়োগ করে গানের মানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর দরাজ কণ্ঠের রোমান্টিক গানগুলো আজও বাঙালির চিরকালীন সম্পদ।

মান্না দে ছিলেন বাংলা সংগীতের সেই বিস্ময়কর প্রতিভা, যিনি প্রমাণ করেছিলেন যে বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের পাণ্ডিত্য এবং আধুনিক গানের লঘু মেজাজ একই সাথে বজায় রাখা সম্ভব। তাঁর গায়কিতে ছিল এক ধরনের কাঠামোগত ঋজুতা এবং গল্প বলার অদ্ভুত ক্ষমতা। ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’ বা ‘সে আমার ছোট বোন’-এর মতো গানগুলো আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে এক একটি মাইলফলক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, শ্যামল মিত্রের কণ্ঠ ছিল বিশুদ্ধ মেলোডি বা সুমধুরতার আধার। তাঁর গায়কিতে যে সহজলভ্য অথচ গভীর রোমান্টিক আবেদন ছিল, তা তৎকালীন তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিল।

লতা-আশা ও সলিল চৌধুরী: পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মেলবন্ধন

ভারতীয় সংগীতের দুই মহিরুহ—লতা মঙ্গেশকরআশা ভোঁসলে বাংলা গানকে যে সমৃদ্ধি দান করেছেন, তা অতুলনীয়। অবলীলায় ভাষাগত সীমানা পেরিয়ে তারা বাঙালির একান্ত আপন শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে বাংলা গান যেন এক দৈব স্নিগ্ধতা লাভ করেছিল। আর এই প্রতিভাদের কাজে লাগিয়ে আধুনিক বাংলা গানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন সুরকার সলিল চৌধুরী

সলিল চৌধুরীর অবদান ছিল যুগান্তকারী। তিনি বাংলা গানে প্রথম পাশ্চাত্য ‘সিম্ফনি’ এবং ‘কয়ার’ বা সমবেত সুরের সার্থক প্রয়োগ ঘটান। তাঁর গানের অর্কেস্ট্রেশনে যে কাউন্টার-পয়েন্ট এবং হারমোনির ব্যবহার দেখা যায়, তা ছিল তৎকালীন ভারতীয় সংগীতের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক। সলিল চৌধুরী কেবল প্রেম বা প্রকৃতি নিয়ে গান বাঁধেননি, তাঁর সুরের মধ্যে এক ধরনের বিদ্রোহ ও দ্রোহের সুরও ছিল। লতা মঙ্গেশকর, মান্না দে বা সবিতা চৌধুরীর কণ্ঠে তাঁর সুরারোপিত গানগুলো আধুনিক বাংলা গানকে একটি বৈশ্বিক চরিত্র দান করেছে। এই সময়েই ওপার বাংলার গান তার স্বর্ণশিখরে পৌঁছায়, যার রেশ আজও কাটেনি।

কণ্ঠশিল্পী ফিরোজ সাঁই
কণ্ঠশিল্পী ফিরোজ সাঁই

যন্ত্রানুষঙ্গ ও অর্কেস্ট্রেশনের বিবর্তন

আধুনিক বাংলা গান ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য আঞ্চলিক সংগীতের চেয়ে কেন স্বতন্ত্র এবং ঐতিহাসিকভাবে অগ্রগামী, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর নিরন্তর সঙ্গীতায়োজন বা অর্কেস্ট্রেশনের বিবর্তন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠোর অনুশাসন কিংবা লোকসংগীতের একতরা-তবলার সরলতা থেকে বেরিয়ে বাংলা গানই প্রথম আন্তর্জাতিক বাদ্যযন্ত্রের সাথে সফল মিতালি গড়ে তোলে। প্রারম্ভিক যুগে বাংলা আধুনিক গানে মূলত হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি এবং সেতারের মতো ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। কিন্তু ১৯৫০-এর দশক থেকে সুরকাররা বুঝতে পারেন, নাগরিক আবেগ ও আধুনিক জীবনের জটিলতা প্রকাশের জন্য বাদ্যযন্ত্রের বৈচিত্র্য প্রয়োজন। ফলে তারা সাহসের সাথে পাশ্চাত্য যন্ত্র যেমন ভায়োলিন (বেহালা), পিয়ানো, অ্যাকর্ডিয়ন, গিটার এবং চেলোর মতো যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করেন।

বাংলাদেশে সমর দাসের জাদুকরী অবদান

বাংলাদেশে আধুনিক গানের অর্কেস্ট্রেশনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমর দাস ছিলেন এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তি। তিনি কেবল একজন সুরকার ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন দূরদর্শী সংগীত পরিচালক। সমর দাস বাংলাদেশের গানের সুরের মধ্যে আধুনিকতার এক বিশেষ আভিজাত্য নিয়ে আসেন। তাঁর অর্কেস্ট্রেশনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল দেশি ও বিদেশি যন্ত্রের সুষম ও শৈল্পিক সমন্বয়। তিনি যেভাবে পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের ভরাট ধ্বনি বা ‘রিচ সাউন্ড’ তৈরি করতেন, তা তৎকালীন ঢাকা বেতারের গানগুলোকে এক ধরনের আন্তর্জাতিক মান দান করেছিল। বিশেষ করে তাঁর সুরারোপিত চলচ্চিত্রে ও রেডিওর আধুনিক গানে সেতারের সাথে ভায়োলিনের ‘সিন্ক্রোনাইজেশন’ বাংলা গানের গাম্ভীর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। সমর দাসের এই ধারাটিই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের আধুনিক গানের জন্য একটি আদর্শ মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।

সলিল চৌধুরীর বৈপ্লবিক পরিবর্তন: হারমোনি ও কাউন্টার পয়েন্ট

ওপার বাংলায় আধুনিক গানের যন্ত্রানুষঙ্গে সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি ঘটিয়েছিলেন সলিল চৌধুরী। তিনি পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতের ব্যাকরণকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বাংলা গানে আত্তীকরণ করেন। সলিল চৌধুরীই প্রথম বাংলা গানে ‘কাউন্টার পয়েন্ট’ এবং **’হারমোনি’**র সার্থক ও বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ ঘটান। সাধারণ গানে যেখানে একটি মাত্র মূল সুর (Melody) থাকে, সলিল চৌধুরীর গানে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রধান গায়কির সমান্তরালে বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে অন্য একটি স্বাধীন সুর বাজতে থাকে। এই কাউন্টার পয়েন্ট ব্যবহারের ফলে গানটি বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে এবং শ্রোতার কানে এক ধরনের ঐকতান তৈরি করে।

তিনি অর্কেস্ট্রার মাধ্যমে ‘কয়ার’ বা সমবেত কণ্ঠের এমন ব্যবহার করতেন যা গানের ভাবার্থকে আরও শক্তিশালী করত। গিটার ও অ্যাকর্ডিয়নের কাজকে তিনি যেভাবে পিয়ানোর সাথে মেলাতেন, তা ছিল সমসাময়িক ভারতীয় সংগীতের চেয়ে কয়েক দশক এগিয়ে। সলিল চৌধুরীর এই এক্সপেরিমেন্টাল অর্কেস্ট্রেশন কেবল বাংলা গান নয়, বরং পুরো ভারতীয় সিনেমার সংগীতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। তাঁর কারণেই আধুনিক বাংলা গান কেবল কান দিয়ে শোনার নয়, বরং প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের আলাদা আলাদা স্বর অনুভব করার এক শৈল্পিক মাধ্যমে পরিণত হয়।

কণ্ঠশিল্পী পিলু মমতাজ
কণ্ঠশিল্পী পিলু মমতাজ

বাংলাদেশে আধুনিক গানের বিশেষ শাখা

বাংলাদেশের আধুনিক গানের ইতিহাসে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সময়। এই দুই দশকে আধুনিক গানের চিরায়ত সংজ্ঞায় এক ধরনের বৈপ্লবিক রূপান্তর আসে। একদিকে যুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্মের চঞ্চলতা ও গতিশীলতা, অন্যদিকে নাগরিক জীবনের জটিলতা, নিঃসঙ্গতা ও ক্লান্তি—এই দুই বিপরীত মেরুর আবেগ গানে উঠে আসতে থাকে। এই সময়ে আধুনিক গান কেবল গ্রামোফোন বা রেডিওর গণ্ডি পেরিয়ে ক্যাসেট সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিটি তরুণের ব্যক্তিগত সঙ্গী হয়ে ওঠে। এই রূপান্তরের মূলে ছিল ব্যান্ডের উত্থান এবং পাশ্চাত্যের আধুনিক সুরের সাথে বাংলার লোকজ ও নাগরিক মেলোডির এক অনন্য রসায়ন।

সংগীতের নতুন ধারা: আখান্দ ভ্রাতৃদ্বয় ও ব্লুজ-জ্যাজের ছোঁয়া

আধুনিক বাংলা গানে পশ্চিমা সংগীতের ‘ব্লুজ’ (Blues) এবং ‘জ্যাজ’ (Jazz) ঘরানাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আত্তীকরণ করেছিলেন লাকী আখান্দ এবং হ্যাপী আখান্দ। তাঁরা বাংলা গানের দীর্ঘদিনের মন্থর লয়কে ভেঙে তাতে এক ধরনের আন্তর্জাতিক আবহ দান করেন। লাকী আখান্দের সুরারোপিত ‘আগে যদি জানতাম’ বা ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’র মতো গানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর সুরের বুনন অত্যন্ত আধুনিক হলেও এর বাণীর আবেগ ছিল খাঁটি বাঙালি। তাঁরা আধুনিক গানের মূল ব্যাকরণ ও মাধুর্য ঠিক রেখেই গিটারে এমন সব কর্ড ও রিদম ব্যবহার করেছিলেন, যা বাংলা সুরের জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। মূলত তাঁদের হাত ধরেই বাংলা আধুনিক গান পশ্চিমা যন্ত্রানুষঙ্গের সাথে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।

রক ও মেলোডির সমন্বয়: ব্যান্ড সংগীতের স্বর্ণযুগ

এই সময়েই বাংলাদেশে ফিডব্যাক, সোলস, রেনেসাঁ এবং মাইলসের মতো ব্যান্ডগুলো আধুনিক গানের এক উন্নত ও আধুনিক সংস্করণ নিয়ে হাজির হয়। এই ব্যান্ডগুলো আধুনিক গানকে কেবল ক্যাসেটের ফিতায় বন্দি রাখেনি, বরং মঞ্চে বা কনসার্টে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক উন্মাদনা হিসেবে পৌঁছে দিয়েছে। মাকসুদুল হকের গায়কিতে নাগরিক জীবনের হাহাকার যেমন ফুটে উঠত, তেমনি নকীব খানের সুরারোপিত গানে (যেমন: ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’) মেলোডির এক স্নিগ্ধ আভিজাত্য বজায় থাকত।

এই ব্যান্ডগুলো প্রমাণ করেছিল যে, ইলেকট্রিক গিটার বা ড্রামস বাজিয়েও অত্যন্ত সুমধুর আধুনিক গান তৈরি করা সম্ভব। আইয়ুব বাচ্চুর মতো গিটার জাদুকর এবং সুরকাররা আধুনিক গানে ‘মেলোডিক রক’-এর যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন, তা বাংলা গানের পরিসরকে আরও বিশাল করে তোলে। এটি কেবল পশ্চিমা অনুকরণ ছিল না; বরং এই ব্যান্ডগুলোর হাত ধরে বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র ‘আরবান মেলোডি’ বা নাগরিক সংগীত ধারা তৈরি হয়, যা আধুনিক বাংলা গানকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও জীবনমুখী করে তোলে। এই বিবর্তনটিই প্রমাণ করে যে, আধুনিক বাংলা গান সময়ের প্রয়োজনে নিজেকে বারবার পুনর্নির্মাণ করার ক্ষমতা রাখে।

বাংলাদেশি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা
বাংলাদেশি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা

 

গানের স্বর্ণযুগের অবসান ও পরিবর্তনের হাওয়া

বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে এসে আধুনিক বাংলা গানের প্রথাগত ক্ল্যাসিক ধারাটি এক গভীর সংকটের মুখে পড়ে। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশকের সেই স্বর্ণযুগ, যা মূলত হেমন্ত-মান্না-শ্যামল-লতা এবং সলিল চৌধুরীর সুরেলা মেলোডির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে ছিল, তার আবেদন নব্বইয়ের দশকের পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিছুটা মন্থর হয়ে আসে। স্বর্ণযুগের সেই শিল্পীদের প্রস্থান বা বার্ধক্য এবং গানের বাণীতে ক্লিশে হয়ে আসা প্রেম ও প্রকৃতির বর্ণনা তৎকালীন তরুণ প্রজন্মের কাছে অনেকটা একঘেয়ে হয়ে উঠছিল। ওপার বাংলায় এই যে বিশাল এক সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে এগিয়ে আসেন একদল নতুন চিন্তার সংগীতকার। ১৯৯২ সালে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের (বর্তমান কবির সুমন) ‘তোমাকে চাই’ অ্যালবামের মাধ্যমে বাংলা গানের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয়, যাকে সংগীত সমালোচকরা ‘জীবনমুখী গান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

নাগরিক বাস্তবতা ও জীবনমুখী গানের বিদ্রোহ

জীবনমুখী গান আসলে আধুনিক বাংলা গানেরই এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিদ্রোহী রূপান্তর। এই ধারার প্রধান কারিগর ছিলেন কবির সুমন, নচিকেতা চক্রবর্তী এবং অঞ্জন দত্ত। তাঁরা বাংলা গানের চিরচেনা ফুল-পাখি-চাঁদ আর আধ্যাত্মিকতার মেজাজকে ঝেঁটে ফেলে দিয়ে সেখানে স্থলাভিষিক্ত করলেন রূঢ় নাগরিক বাস্তবতাকে। প্রথমবারের মতো আধুনিক বাংলা গানে সরাসরি উঠে এল মধ্যবিত্তের বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৃদ্ধাশ্রমের হাহাকার, ফুটপাতের জীবন এবং শোষিত মানুষের লড়াই।

কবির সুমন:

তিনি বাংলা গানে পাশ্চাত্য লোকসংগীত (Folk) এবং প্রতিবাদের ভাষা (Protest song) নিয়ে আসেন। তাঁর গানে গিটারের একটি মাত্র কর্ডের সাথে নাগরিক ক্ষোভ আর অধিকারের কথা ধ্বনিত হতে থাকে।

নচিকেতা চক্রবর্তী:

তাঁর গানের বাণীতে ছিল সরাসরি তীক্ষ্ণ শ্লেষ এবং সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। ‘নীলাঞ্জনা’ বা ‘রাজশ্রী’র মতো রোমান্টিক গানের পাশাপাশি ‘বৃদ্ধাশ্রম’ বা ‘সরকারি কর্মচারী’র মতো গানগুলো আধুনিক গানের সংজ্ঞাই বদলে দেয়।

অঞ্জন দত্ত:

তিনি নাগরিক মধ্যবিত্তের নিঃসঙ্গতা ও যাপিত জীবনের ছোট ছোট গল্পগুলোকে ব্লুজ ঘরানায় উপস্থাপন করেন। তাঁর ‘বেলা বোস’ বা ‘মেরিলিন মনরো’ গানগুলো প্রমাণ করে যে, আধুনিক গান কেবল সুরের কসরত নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী গল্প বলার মাধ্যম।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জীবনমুখী গানের প্রভাব

জীবনমুখী গানের এই জোয়ার কেবল কলকাতার ভৌগোলিক সীমায় আটকে থাকেনি, বরং বাংলাদেশেও এর গভীর প্রভাব পড়েছিল। আশির দশকের শেষ দিকে এবং নব্বইয়ের শুরুতে বাংলাদেশে মাকসুদুল হক (ফিডব্যাক), আইয়ুব বাচ্চু (এলআরবি) এবং জেমস (নগর বাউল)-এর গানে এই নাগরিক যন্ত্রণার ছোঁয়া পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের অনেক গানেই বেকারত্ব, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক বৈষম্যের কথাগুলো অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে উঠে আসতে শুরু করে। অনেক একক শিল্পীও নিজেদের কথা ও সুরে নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ও সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরতে শুরু করেন। মূলত জীবনমুখী গান আধুনিক বাংলা গানকে ড্রয়িংরুমের আভিজাত্য থেকে বের করে রাজপথের মানুষের হৃদস্পন্দনের সাথে যুক্ত করেছিল, যা এই সংগীত ধারাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থবহ করে তোলে।

এন্ড্রু কিশোর
এন্ড্রু কিশোর

 

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আধুনিক গানের প্রভাব

বাংলাদেশের আধুনিক গানের বিবর্তনে চলচ্চিত্রের অবদান কেবল একটি মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হিসেবে স্বীকৃত। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে আধুনিক গানের যত কালজয়ী সৃষ্টি হয়েছে, তার একটি বিশাল অংশ এসেছে চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক থেকে। চলচ্চিত্রের গানগুলো মূলত পর্দার চরিত্র ও গল্পের প্রয়োজনাধীন হলেও, অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর কাব্যিক ও সুরের গুণমান এতই উচ্চমার্গের ছিল যে, সেগুলো মূল সিনেমাকে ছাপিয়ে স্বতন্ত্র ‘আধুনিক গান’ হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। রেডিওর পর চলচ্চিত্রই ছিল আধুনিক গানের সবচেয়ে বড় চারণভূমি, যেখানে গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীরা তাঁদের সৃজনশীলতার চূড়ান্ত পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতেন।

সাবিনা ইয়াসমিন ও রুনা লায়লার মহিমান্বিত অবদান

বাংলাদেশের আধুনিক গানের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি সাবিনা ইয়াসমিন এবং রুনা লায়লার অবদানের কথা বিস্তারিতভাবে না বলা হয়। এই দুই কিংবদন্তি শিল্পী আধুনিক গানকে যে রাজকীয় আভিজাত্য দান করেছেন, তা দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত ইতিহাসে বিরল।

সাবিনা ইয়াসমিন: তাঁর গায়কিতে এক ধরনের নিখুঁত কারিগরি দক্ষতা ও ধ্রুপদী সংগীতের প্রগাঢ় ভিত লক্ষ্য করা যায়। উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম থাকায় তিনি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন সুরের বিন্যাসকেও সাধারণ শ্রোতাদের কাছে অতি সহজে ও শ্রুতিমধুরভাবে পৌঁছে দিতে পারতেন। তাঁর কণ্ঠে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ কিংবা ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’-র মতো গানগুলো আধুনিক সংগীতের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় সম্পদ হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রের হাজার হাজার গানে তিনি যে পরিমিতিবোধ ও সুরের লালিত্য প্রদর্শন করেছেন, তা আধুনিক বাংলা গানের ধারাকে সমৃদ্ধতর করেছে।

রুনা লায়লা: রুনা লায়লার বহুমুখী প্রতিভা আধুনিক বাংলা গানকে একটি আন্তর্জাতিক ও গ্ল্যামারাস রূপ দান করেছে। গায়কির মধ্যে নাটকীয়তা, সুরের বৈচিত্র্য এবং কণ্ঠের অভাবনীয় খেল দেখানোর ক্ষমতা তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। রোমান্টিক মেলোডি থেকে শুরু করে চপল সুরের আধুনিক গান—সবখানেই তিনি সমান দক্ষ। চলচ্চিত্রের গানে রুনা লায়লার উপস্থিতি আধুনিক গানকে কেবল শ্রুতিমধুর করেনি, বরং তা বাঙালির নাগরিক সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে।

এন্ড্রু কিশোর: প্লেব্যাক সম্রাট ও অনুভূতির কারিগর

বাংলাদেশের আধুনিক গানে পুরুষ কণ্ঠের আধুনিকতা ও জনপ্রিয়তার সমার্থক নাম এন্ড্রু কিশোর। তাঁকে যথাযথভাবেই ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ উপাধি দেওয়া হয়েছে। এন্ড্রু কিশোরের গায়কির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ‘ভারসেটাইল’ বা বহুমুখী হওয়ার ক্ষমতা। তিনি যখন বিরহের গান গাইতেন, তখন তাঁর কণ্ঠে এক অদ্ভুত হাহাকার ঝরে পড়ত; আবার রোমান্টিক বা আনন্দঘন গানে তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠত অদম্য প্রাণশক্তি।

তাঁর গাওয়া ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’ কিংবা ‘পড়ে না চোখের পলক’-এর মতো গানগুলো আসলে এক একটি শক্তিশালী আধুনিক গান। এন্ড্রু কিশোর প্রমাণ করেছিলেন যে, চলচ্চিত্রের গান কেবল সিচুয়েশনাল (প্রেক্ষাপটনির্ভর) নয়, বরং তা জীবনের গভীর দর্শন ও সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক আবেগ প্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হতে পারে। তাঁর কণ্ঠ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিটি বাঁকে—সুখে-দুখে ও উৎসবে—এক অপরিহার্য সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এন্ড্রু কিশোরের আধুনিক গানের এই বিশাল উত্তরাধিকার আজও বাংলাদেশের সংগীত প্রেমীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

বাংলাদেশি কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন
বাংলাদেশি কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন

 

আধুনিক বাংলা গানের অনন্যতা বনাম ভারতীয় অন্যান্য ভাষা

ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীত মানচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ধ্রুপদী এবং লোকসংগীতের ধারা অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে ‘আধুনিক গান’ (Modern Song) নামক যে বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক ঘরানাটি বাংলায় গড়ে উঠেছে, তার সমান্তরাল কোনো ধারা অন্য কোনো ভারতীয় ভাষায় সেভাবে বিকশিত হয়নি। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, আধুনিক বাংলা গান কেন হিন্দি, তামিল বা মারাঠি গানের চেয়ে মৌলিকভাবে আলাদা? এই স্বাতন্ত্র্যের মূলে রয়েছে এর দর্শন, কাঠামো এবং বাণীর গভীরতা।

লিরিক বা বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব

আধুনিক বাংলা গানের প্রধানতম শক্তি হলো এর কাব্যনির্ভরতা। হিন্দি গানের বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য মূলত চলচ্চিত্রের ওপর নির্ভরশীল এবং সেখানে গানের মূল উদ্দেশ্য থাকে দৃশ্যকাব্যের পরিপূরক হওয়া কিংবা নাচ ও বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করা। বিপরীতে, বাংলা আধুনিক গান জন্মলগ্ন থেকেই ছিল ‘শ্রবণধর্মী’। এখানে সুরকার বা কণ্ঠশিল্পীর চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে গীতিকারের গুরুত্ব বেশি থাকে। এই গানে ব্যবহৃত উপমা, রূপক এবং জীবনদর্শন একে স্রেফ বিনোদনের মাধ্যম থেকে সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত করেছে। হিন্দি বা দক্ষিণ ভারতীয় গানে যখন শারীরিক আবেদন বা চপল ছন্দ প্রাধান্য পায়, বাংলা আধুনিক গান তখন ব্যক্তির নিভৃত বিষণ্ণতা, নাগরিক নিঃসঙ্গতা কিংবা প্রকৃতির সাথে মানুষের নিগূঢ় সম্পর্কের কথা বলে।

ঘরানা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

ভারতবর্ষের অন্য কোনো ভাষায় ‘আধুনিক গান’ হিসেবে আলাদা কোনো ঘরানা সেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ পায়নি যা কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ ভারতের তামিল, তেলুগু বা কন্নড় ভাষার সংগীত বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেখানে কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রভাব এতই প্রবল যে, আধুনিক বা লঘু সংগীতের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। সেখানে গানকে হয় শাস্ত্রীয় ব্যাকরণে আবদ্ধ থাকতে হয়, না হয় লোকজ সুরের অনুসারী হতে হয়।

অনুরূপভাবে, মারাঠি গানে ‘নাট্যসংগীত’ বা ভক্তিগীতি অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও স্বতন্ত্র ‘আধুনিক গান’ হিসেবে কোনো ধারা বাঙালির মতো করে সেখানে নাগরিক জীবনের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেনি। বাংলা গানই প্রথম শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠোর নিয়ম ভেঙে সেই সুরকে লঘু চালে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের যাপিত জীবনের সংলাপে পরিণত করেছে। আধুনিক বাংলা গান ঈশ্বর বা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের গান নয়, এটি একান্তই ‘মানুষের’ গান—যেখানে ব্যক্তি তাঁর নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পায়।

ব্যক্তিনিষ্ঠতা ও সার্বভৌম অস্তিত্ব

অন্যান্য ভাষার গান অনেক ক্ষেত্রে সমষ্টির উৎসব বা ধর্মীয় আচারের সাথে যুক্ত থাকলেও, আধুনিক বাংলা গান আগাগোড়া ব্যক্তিনিষ্ঠ। এটি একাকীত্বের সঙ্গী। এই গানগুলো কেবল সিনেমার কাহিনী এগিয়ে নেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি, বরং এক একটি গান নিজেই এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গল্প। এই সার্বভৌমত্বের কারণেই রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আজকের কবির সুমন বা অর্ণব পর্যন্ত—সবাই আধুনিক গানকে একটি স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছেন। এই যে ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশের স্বাধীনতা এবং কাব্যিক আভিজাত্য, এটাই আধুনিক বাংলা গানকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতে একটি অনন্য ও অপরাজেয় উচ্চতায় বসিয়েছে।

বাংলাদেশি সুরকার রবিন ঘোষ
বাংলাদেশি সুরকার রবিন ঘোষ

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ডিজিটাল যুগ

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক বাংলা গান এক বিশাল প্রযুক্তিগত ও চারিত্রিক পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়েছে। ক্যাসেট বা সিডি যুগের অবসানের পর গান এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ‘অ্যালগরিদম’-এর কবলে পড়েছে। এই ডিজিটাল বিপ্লব গানের প্রসারে যেমন গতি এনেছে, তেমনি এর গুণগত মান ও গাম্ভীর্য নিয়ে তৈরি করেছে নতুন বিতর্ক। বর্তমানে সংগীত কেবল শ্রবণের বিষয় না থেকে দৃশ্যকাব্য বা ‘মিউজিক ভিডিও’র ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বাণীর গভীরতা বা সুরের কারুকাজের চেয়ে ভিডিওর চটকদারি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে, যা আধুনিক বাংলা গানের মূল ভিত্তি ‘কাব্যনির্ভরতা’কে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

গাম্ভীর্য রক্ষার সংগ্রাম: অর্ণব, বাপ্পা ও অনুপম

এই অস্থির সময়ের মধ্যেও আধুনিক গানের সেই চিরচেনা আভিজাত্য ও পরিমিতিবোধ ধরে রাখার চেষ্টায় একদল শিল্পী নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে শায়ান চৌধুরী অর্ণব আধুনিক গানে এক ধরনের নতুন ‘সাউন্ড’ বা ধ্বনিমাধুর্য নিয়ে এসেছেন, যা একই সাথে আধুনিক এবং শেকড়সন্ধানী। তাঁর গানে এসরাজ বা বাঁশির মতো দেশি যন্ত্রের সাথে সিন্থেসাইজার বা ইলেকট্রিক গিটারের যে শৈল্পিক সংমিশ্রণ দেখা যায়, তা আধুনিক গানকে একবিংশ শতাব্দীর প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে। অন্যদিকে, বাপ্পা মজুমদার মেলোডি এবং আধুনিক পপ-রকের এক চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছেন, যা বাংলা গানের ক্ল্যাসিক আমেজকে ক্ষুণ্ণ করেনি। ওপার বাংলায় অনুপম রায় লিরিক-প্রধান গানের ধারাটিকে পুনরায় মূলধারায় ফিরিয়ে এনেছেন। তাঁর গানে নাগরিক জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত এবং সহজবোধ্য দর্শন আধুনিক বাংলা গানের সেই পুরনো আভিজাত্যকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে।

ফিউশন ও কোক স্টুডিও বাংলা: আধুনিকতার নতুন পথ

বর্তমান সময়ে আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম প্রধান প্রবণতা হলো ‘ফিউশন’ বা লোকজ সুরের সাথে আধুনিক যন্ত্রানুষঙ্গের সংমিশ্রণ। বাংলাদেশে ‘কোক স্টুডিও বাংলা’-র মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এই ধারাটি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এটি মূলত আধুনিক গানেরই একটি বিবর্তিত রূপ, যেখানে শেকড়ের বাউল, ভাটিয়ালি বা কবিগানকে আধুনিক অর্কেস্ট্রেশন, জ্যাজ বা রক এলিমেন্টের সাথে সাজানো হচ্ছে।

অনেকে একে মূল সুরের ‘বিচ্যুতি’ হিসেবে দেখলেও, বৃহত্তর অর্থে এটি আধুনিক গানের সীমানাকেই বিস্তৃত করছে। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে পুরনো সুরকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার ফলে তরুণ প্রজন্মের কাছে বাংলা গানের আবেদন নতুন করে তৈরি হচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জটি হলো, বাদ্যযন্ত্রের এই কোলাহলের মধ্যে যেন গানের ‘কথা’ হারিয়ে না যায়। কারণ, আধুনিক বাংলা গানের প্রাণভোমরা সবসময়ই ছিল এর বাণী। প্রযুক্তির ব্যবহারে গানটি যদি স্রেফ ‘শব্দ’ হয়ে দাঁড়ায় এবং তার ভেতরের ‘কবিতা’ হারিয়ে যায়, তবেই তা আধুনিক বাংলা গানের ধারা থেকে বিচ্যুতি হিসেবে গণ্য হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | Rabindranath Tagore

বাঙালির আত্মপরিচয় ও আধুনিক গানের ভবিষ্যৎ

আধুনিক বাংলা গান কোনো আকস্মিক আবিষ্কার নয়, বরং এটি বাঙালির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক শ্রেষ্ঠ ফসল। ১৯৩০-এর দশকের সেই হিমাংশু দত্ত বা কামাল দাশগুপ্তের সুর থেকে শুরু করে আজকের ফিউশন যুগ পর্যন্ত—এই গান বাঙালির আবেগ প্রকাশের একমাত্র নাগরিক ভাষা হিসেবে টিকে আছে। এটি ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক সংগীতের চেয়ে স্বতন্ত্র কারণ এটি কেবল বিনোদনের হাতিয়ার নয়, এটি বাঙালির এক একটি দীর্ঘশ্বাস, এক একটি যুদ্ধের স্মৃতি এবং প্রেম-অপ্রেমের দলিল।

বিশ্বায়ন ও ডিজিটাল যুগে বাংলা গানের রূপ বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আধুনিক বাংলা গানের যে মৌলিক স্বাতন্ত্র্য—অর্থাৎ কাব্যিক গভীরতা ও সুরের পরিমিতিবোধ—তা রক্ষা করা প্রতিটি শিল্পী ও শ্রোতার দায়িত্ব। যদি গানের সেই ‘বাণী’ বা ‘লিরিক’-এর মান ধরে রাখা যায়, তবে আধুনিক বাংলা গান আরও শত বছর ধরে বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। এটিই বাঙালির সেই নিজস্ব আবিষ্কার, যার সমান্তরাল কোনো ধারা বিশ্বের আর কোনো সংগীতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

আরও দেখুন: