ভারতীয় উপ-শাস্ত্রীয় বা ‘সেমি-ক্ল্যাসিক্যাল’ সংগীতের ভাণ্ডারে ‘হোরি’ এক অত্যন্ত উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত নাম। এটি মূলত বসন্তের উৎসব হোলি বা দোলকে কেন্দ্র করে রচিত এক বিশেষ গীতিশৈলী। উত্তর ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহার অঞ্চলে এর জন্ম ও বিকাশ ঘটলেও, এর সুরের মূর্ছনা আজ বিশ্বব্যাপী হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের শ্রোতাদের কাছে সমাদৃত। শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে গম্ভীর মেজাজের খেয়াল বা ধ্রুপদ পরিবেশনের পর যখন পরিবেশকে কিছুটা হালকা অথচ রসসিক্ত করার প্রয়োজন হয়, তখন অনেক শিল্পী ঠুমরীর পরিপূরক হিসেবে ‘হোরি’ পরিবেশন করেন।
হোরি গানের উৎস ও পটভূমি
হোরি গানের প্রধান উপজীব্য হলো শ্রীকৃষ্ণ ও রাধিকার বৃন্দাবনের হোলি খেলার লীলা। ব্রজধামের সেই চিরন্তন বসন্ত উৎসব, আবির খেলা, একে অপরের প্রতি কাদা বা রঙ ছোড়া এবং গোপিনীদের মান-অভিমান—সবকিছুই এই গানের বাণীতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। মূলত ব্রজবুলী বা হিন্দি ভাষার বিভিন্ন উপভাষায় এই গানগুলো রচিত হয়। উত্তর প্রদেশের মথুরা, বৃন্দাবন এবং বারসানার লোকসংস্কৃতি থেকেই এই গানের মূল কাঠামোটি উঠে এসেছে, যা পরবর্তীতে উচ্চাঙ্গ সংগীতের কাঠামোয় এসে ‘উপ-শাস্ত্রীয়’ রূপ লাভ করেছে।
শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য ও গায়কী
হোরি গান শুনতে অনেক সময় ঠুমরীর মতো মনে হতে পারে, কারণ দুটির মধ্যেই শৃঙ্গার রস (প্রেম ও বিলাস) এবং ভাবের প্রাধান্য বেশি থাকে। তবে ঠুমরীর তুলনায় হোরি গানের তাল ও চলন কিছুটা ভিন্ন।
তাল:
হোরি সাধারণত ‘দীপচন্দী’ বা ‘ধামার’ তালের ওপর ভিত্তি করে গাওয়া হয়। বিশেষ করে ধামার তালে গাওয়া হোরিকে অনেকে ‘হোরি-ধামার’ বলে থাকেন।
ভাব ও আবেগ:
এই গানে ভক্তির চেয়েও সখ্য ও বাৎসল্য রসের প্রকাশ বেশি দেখা যায়। রঙের উৎসবে একে অপরকে আক্রমণ করা বা হাসি-ঠাট্টার যে আমেজ, তা কণ্ঠের কারুকাজ বা ‘তানের’ মাধ্যমে শিল্পী ফুটিয়ে তোলেন।
রাগ:
হোরি প্রধানত কাফী, পিলু, খামাজ, ভৈরবী বা দেশ রাগের ওপর ভিত্তি করে গাওয়া হয়। তবে রাগের ব্যাকরণ মেনে চললেও শিল্পী এখানে ভাবের খাতিরে কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করেন।
ঠুমরীর সাথে তুলনা ও পরিবেশন রীতি
শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে হোরির স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খেয়াল গানের দীর্ঘ ও গম্ভীর বিস্তারের পর শ্রোতাদের মনকে চনমনে করতে ‘লাইট ক্লাসিক্যাল’ বা হালকা চালের কিছু পরিবেশন করার রেওয়াজ আছে। এই জায়গায় ঠুমরী যেমন জনপ্রিয়, তেমনি বসন্তের আমেজ থাকলে বা আসরের মেজাজ অনুযায়ী শিল্পীরা হোরি বেছে নেন। ঠুমরীর গায়কীতে যেমন বিরহের রেশ থাকে, হোরি সেখানে অনেক বেশি উৎসবমুখর এবং চঞ্চল। অনেক গুণী শিল্পী ঠুমরীর আংগিকে হোরি গেয়ে থাকেন, যাকে বলা হয় ‘ঠুমরী অঙ্গের হোরি’।

হোরি কেবল একটি গানের ধারা নয়, এটি বাঙালির বা ভারতের চিরায়ত উৎসবের একটি সাংগীতিক দলিল। বৃন্দাবনের সেই আধ্যাত্মিক প্রেমকে সাধারণ মানুষের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সাথে মিলিয়ে দেওয়ার কাজটি করে এই হোরি গান। বড় বড় ঘরানার শিল্পীরা যখন আসরের শেষে হোরির সুর তোলেন, তখন শ্রোতাদের মনে রঙের ঝিলিক আর বসন্তের বাতাস হিল্লোল দিয়ে যায়। এটি আমাদের শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই উদারতাকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ঈশ্বর ও মানুষ এক হয়ে উৎসবে মেতে ওঠে।
