চীনা সঙ্গীত বিশ্বের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে সমৃদ্ধ সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যের একটি। এর ইতিহাস প্রায় কয়েক হাজার বছরের পুরনো। চীনা দর্শনে সঙ্গীত কেবল বিনোদন নয়, বরং মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা এবং আধ্যাত্মিক ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।
“অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের এই পর্বে আমরা ড্রাগনের দেশের সঙ্গীত নিয়ে লিখবো।
চীনা সঙ্গীত: কনফুসীয় শৃঙ্খলা ও প্রকৃতির প্রতিধ্বনি
চীনা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রধান ভিত্তি হলো পঞ্চস্বর বা পেন্টাটোনিক স্কেল (পাঁচটি প্রধান স্বর: কুং, শাং, চিও, চি এবং ইউ)। চীনাদের কাছে প্রতিটি স্বর এক একটি প্রাকৃতিক উপাদান বা সামাজিক অবস্থানের প্রতীক।
১. চীনা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (Yayue)
চীনের রাজদরবারের ধ্রুপদী সঙ্গীতকে বলা হয় ‘ইয়াইউয়ে’ (Yayue)। এর অর্থ ‘মার্জিত সঙ্গীত’। এটি মূলত কনফুসীয় মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা রাজকীয় আচার, পূজা এবং উৎসবে ব্যবহৃত হতো। এর সুর অত্যন্ত ধীর, সুশৃঙ্খল এবং শান্ত প্রকৃতির।
২. প্রধান সঙ্গীত জনরাসমূহ (Major Genres)
চীনা সঙ্গীতে শাস্ত্রীয় ধারার পাশাপাশি আরও কিছু অত্যন্ত জনপ্রিয় জনরা রয়েছে:
- চীনা অপেরা (Xiqu): এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন মঞ্চকলা। এর মধ্যে পিকিং অপেরা (Peking Opera) সবচেয়ে বিখ্যাত। এতে গান, অভিনয়, তলোয়ার চালনা এবং বিশেষ মুখভঙ্গির মাধ্যমে ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক কাহিনী বর্ণনা করা হয়।
- কিউয়ি (Qu-yi): এটি মূলত কাহিনীভিত্তিক গানের ধারা। একজন বা দুজন শিল্পী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সুর করে গল্প বলেন।
- জিউয়ানকুই (Sizhu): একে বলা হয় ‘রেশম ও বাঁশের সঙ্গীত’ (Silk and Bamboo)। রেশমের তারের যন্ত্র (যেমন: পিপা, এরহু) এবং বাঁশের বাঁশি (যেমন: দিজি) দিয়ে তৈরি এই সঙ্গীত মূলত চা-ঘর বা সামাজিক আড্ডায় পরিবেশিত হয়।
- ধর্মীয় সঙ্গীত: বৌদ্ধ এবং তাওবাদী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি স্তোত্র গান, যা মন্দিরের শান্ত পরিবেশে গাওয়া হয়।
৩. প্রধান বাদ্যযন্ত্রসমূহ
চীনা যন্ত্রগুলোকে তাদের উপাদানের ওপর ভিত্তি করে আটটি ভাগে (Bayin) ভাগ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
- গুচিন (Guqin): এটি সাত তারের একটি জিথার। একে ‘চীনা সঙ্গীতের জনক’ বলা হয়। প্রাচীন পণ্ডিত ও ঋষিরা ধ্যানের জন্য এটি বাজাতেন।
- পিপা (Pipa): এটি নাশপাতি আকৃতির চার তারের লু্যট। এটি অত্যন্ত দ্রুত এবং ছন্দময় সুর তৈরি করতে সক্ষম।
- এরহু (Erhu): দুই তারের একটি বিশেষ বেহালা। এর সুর মানুষের কান্নার মতো করুণ এবং দীর্ঘস্থায়ী আমেজ তৈরি করে।
- দিজি (Dizi): বাঁশের তৈরি আড়াআড়ি বাঁশি, যাতে একটি বিশেষ ঝিল্লি (Dimu) থাকে যা সুরকে অনন্য কম্পন দান করে।
৪. কারিগরি বৈশিষ্ট্য
চীনা সঙ্গীত মূলত মেলডি বা সুরপ্রধান, এখানে পশ্চিমা সঙ্গীতের মতো জটিল হারমনির ব্যবহার নেই। এর বদলে শিল্পী একটি সুরের মধ্যেই সূক্ষ্ম অলঙ্করণ এবং গিটকিরি দিয়ে বৈচিত্র্য আনেন। চীনা সঙ্গীতের আরেকটি বড় শক্তি হলো এর প্রতীকী প্রকাশ; একটি সুর শুনে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন তা বসন্তের বাতাস, নাকি প্রবাহিত ঝরনার কথা বলছে।

চীনা সঙ্গীত কেবল সুরের সমষ্টি নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। হাজার বছর ধরে এটি চীনের মানুষের আনন্দ, বেদনা এবং আধ্যাত্মিক চেতনার বাহক হিসেবে টিকে আছে।
আরও দেখুন: