মেলকার্তা পদ্ধতি বা মেল সিস্টেম | দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দুই প্রধান ধারা—কর্ণাটকহিন্দুস্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই রাগকে শ্রেণিবদ্ধ করার জন্য একটি “জনক-স্কেল” বা parent framework ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ ভারতীয় কর্ণাটক ধারায় এই পদ্ধতির নাম মেলকার্তা, আর উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানি ধারায় এর সমতুল্য ধারণা হলো ঠাট। দুই পদ্ধতির লক্ষ্য একই—অসংখ্য রাগকে একটি সুশৃঙ্খল তাত্ত্বিক ভিত্তিতে সাজানো—তবু তাদের গঠন, পরিসর, ব্যবহারিকতা এবং দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। হিন্দুস্তানি ঠাটকে সাধারণত কর্ণাটক মেলকার্তার একটি ব্যবহারিক, সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বলা হয়।

দক্ষিণ ভারতীয় ধারায়, অর্থাৎ কর্ণাটক সঙ্গীতে, মেলকার্তা পদ্ধতি (Melakarta System) রাগবিন্যাসের সবচেয়ে সুসংহত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত। এটি মূলত এমন এক রাগতাত্ত্বিক কাঠামো, যার মাধ্যমে কর্ণাটক সঙ্গীতের অসংখ্য রাগকে একটি নির্দিষ্ট নীতির অধীনে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। “মেল” অর্থ স্বরসমষ্টি বা স্কেল, আর “কার্তা” অর্থ স্রষ্টা বা নির্মাতা। এই অর্থে মেলকার্তা হলো এমন সব জনক রাগ বা parent scale, যেগুলোর উপর ভিত্তি করে অসংখ্য জন্য রাগ (derived ragas) সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান স্বীকৃত পদ্ধতিতে মোট ৭২টি মেলকার্তা রাগ রয়েছে, এবং এগুলো কর্ণাটক সঙ্গীতের রাগব্যবস্থার মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

মেলকার্তা পদ্ধতি বা মেল সিস্টেম

মেলকার্তা পদ্ধতির ইতিহাসে ১৭শ শতকের প্রখ্যাত সঙ্গীততাত্ত্বিক বেঙ্কটমাখি (Venkatamakhi)-র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ চতুর্দণ্ডী প্রকাশিকা (Chaturdandi Prakasika)-তে তিনি প্রথম সুসংগঠিতভাবে ৭২ মেলকার্তার ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও এর আগেও রাগ শ্রেণিবিভাগের নানা পদ্ধতি ছিল, কিন্তু সেগুলো ছিল আংশিক ও অনেক সময় অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বেঙ্কটমাখির পরিকল্পনা রাগকে একটি গাণিতিক ও নান্দনিক ভারসাম্যের মধ্যে নিয়ে আসে। পরবর্তীকালে গোবিন্দাচার্যের সংশোধিত সম্পূর্ণ-স্বরভিত্তিক পদ্ধতি আজকের প্রচলিত ৭২ মেলকার্তা স্কিমকে আরও পরিশীলিত করে।

মেলকার্তা রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—প্রতিটি রাগে সাতটি স্বর সম্পূর্ণভাবে (সম্পূর্ণ বা Sampurna) আরোহ ও অবরোহে উপস্থিত থাকবে। অর্থাৎ সা, রি, গা, মা, পা, ধা, নিঃ—এই সাতটি স্বর ক্রমানুসারে ব্যবহৃত হবে এবং কোনো স্বর বর্জিত হবে না। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো, এতে ষড়জ (সা) এবং পঞ্চম (পা) সর্বদা স্থির থাকে। পরিবর্তন ঘটে রিষভ, গান্ধার, মধ্যম, ধৈবত ও নিষাদের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে। মধ্যমের দুটি রূপ—শুদ্ধ মধ্যম (M1) ও প্রতি মধ্যম (M2)—মেলকার্তা বিভাজনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। প্রথম ৩৬টি মেলকার্তা শুদ্ধ মধ্যমভিত্তিক, এবং পরের ৩৬টি প্রতি মধ্যমভিত্তিক।

এই ৭২টি মেলকার্তাকে আরও সুশৃঙ্খলভাবে সাজানোর জন্য এগুলোকে ১২টি চক্রে (Chakra) ভাগ করা হয়েছে, এবং প্রতিটি চক্রে ৬টি করে রাগ থাকে। যেমন ইন্দু, নেত্র, অগ্নি, বেদ, বাণ, ঋতু, ঋষি, বাসু, ব্রহ্মা, দিশি, রুদ্র, আদিত্য—এই নামগুলো চক্রের পরিচায়ক। এই চক্রভিত্তিক বিন্যাস শিক্ষার্থীদের জন্য রাগগুলোর স্বর-সম্পর্ক বুঝতে সহজ করে এবং একই সঙ্গে রাগের পারস্পরিক গঠনগত সাদৃশ্য ধরতে সহায়তা করে। চক্রের মধ্যে রিষভ-গান্ধার এবং ধৈবত-নিষাদের বিন্যাস ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়, যা পুরো ব্যবস্থাটিকে এক অনন্য গাণিতিক সৌন্দর্য দেয়।

মেলকার্তা পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর গাণিতিক সম্ভাবনা। কর্ণাটক সঙ্গীতে স্বরস্থানগুলোর সম্ভাব্য permutation ও combination থেকে যতগুলো সাত-স্বরবিশিষ্ট parent scale যৌক্তিকভাবে তৈরি করা সম্ভব, তার পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা ৭২। তাই এই পদ্ধতিকে কেবল সঙ্গীততাত্ত্বিক নয়, বরং এক ধরনের সুনির্দিষ্ট স্বর-গণিতের মডেলও বলা যায়। এই বৈজ্ঞানিক কাঠামোর কারণেই কর্ণাটক সঙ্গীতে নতুন রাগের বিশ্লেষণ, শিক্ষাদান এবং গবেষণা অনেক বেশি সুসংহতভাবে করা সম্ভব হয়েছে।

জনপ্রিয় অনেক রাগই এই মেলকার্তা পদ্ধতির অন্তর্গত। যেমন মায়ামালবগৌলা, খরহরপ্রিয়া, শংকরাভরণম, কল্যাণী, তোড়ি, হরিকাম্ভোজি—এসব রাগ নিজ নিজ মেলকার্তার ভিত্তিতে অসংখ্য জন্য রাগের জন্ম দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শংকরাভরণম থেকে বিলাহরি, দেবগান্ধারী, হামসধ্বনি প্রভৃতি জন্য রাগের উৎপত্তি দেখা যায়। এই কারণে মেলকার্তা পদ্ধতিকে অনেক সময় রাগের বংশতালিকা বলেও অভিহিত করা হয়।

হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের ঠাট পদ্ধতি এবং কর্ণাটক সঙ্গীতের মেলকার্তা পদ্ধতির মধ্যে একটি গভীর তাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে। যদিও হিন্দুস্তানি ধারায় ভাতখণ্ডে ১০টি ঠাটকে ব্যবহারিক শ্রেণিবিন্যাসের জন্য গ্রহণ করেন, কর্ণাটক ধারায় মেলকার্তার ৭২ রাগ আরও বিস্তৃত সম্ভাবনা তুলে ধরে। অর্থাৎ, যেখানে ঠাট পদ্ধতি ব্যবহারিক সরলতার দিকে ঝোঁকে, সেখানে মেলকার্তা পদ্ধতি তাত্ত্বিক পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়। এই কারণেই কর্ণাটক সঙ্গীতের রাগবিন্যাস অনেক বেশি বিস্তারিত ও গণনামূলক।

 

৭২ মেলকার্তা রাগের চক্রভিত্তিক বিন্যাস ও হিন্দুস্তানি ঠাটের সঙ্গে তুলনা

মেলকার্তা পদ্ধতির সৌন্দর্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে এর চক্রভিত্তিক বিন্যাসে। আগের আলোচনায় আমরা দেখেছি, কর্ণাটক সঙ্গীতে মোট ৭২টি জনক রাগ আছে। এই ৭২টি রাগকে আরও সহজে বোঝার জন্য এগুলোকে ১২টি চক্রে ভাগ করা হয়েছে, এবং প্রতিটি চক্রে ৬টি করে রাগ স্থান পেয়েছে। এই বিন্যাস শুধু সংখ্যাগত সুবিধার জন্য নয়; বরং প্রতিটি চক্রে রিষভ-গান্ধার এবং ধৈবত-নিষাদের পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়মে ঘটে। ফলে একজন শিক্ষার্থী যদি চক্রের নীতি বুঝে ফেলতে পারেন, তাহলে পুরো ৭২ মেলকার্তার কাঠামোই অনেক সহজ হয়ে যায়।

প্রথম ছয়টি চক্রে ব্যবহৃত হয় শুদ্ধ মধ্যম (M1), আর পরের ছয়টি চক্রে প্রতি মধ্যম (M2)। এই দুই অর্ধের মধ্যে এক ধরনের প্রতিফলনগত সম্পর্ক আছে। অর্থাৎ প্রথম ৩৬টি রাগের যে স্বরবিন্যাস, একই বিন্যাসে শুধু মধ্যম বদলে গেলে পরের ৩৬টি রাগ পাওয়া যায়। এই কারণে মেলকার্তা পদ্ধতিকে অনেকেই একটি স্বর-চক্র বা scale matrix বলে থাকেন। এতে রাগের গঠন শুধু নান্দনিক নয়, বিশুদ্ধভাবে গণিতসম্মতও।

চক্রগুলোর নামও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইন্দু, নেত্র, অগ্নি, বেদ, বাণ, ঋতু, ঋষি, বসু, ব্রহ্মা, দিশি, রুদ্র, আদিত্য—এই নামগুলো প্রতিটি সংখ্যার প্রতীকী অর্থ বহন করে। যেমন ইন্দু মানে এক চাঁদ, তাই এটি প্রথম চক্র; নেত্র মানে দুই চোখ, তাই দ্বিতীয়; অগ্নি তিন প্রকার, তাই তৃতীয়—এভাবে প্রতিটি নাম তার ক্রমিক অবস্থানকে স্মরণে রাখতে সাহায্য করে। এটি ভারতীয় সঙ্গীততত্ত্বের এক অসাধারণ mnemonic tradition।

উদাহরণ হিসেবে প্রথম চারটি চক্রের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ইন্দু চক্রে কানকাঙ্গী, রত্নাঙ্গী, গণমূর্তি, বনস্পতি, মানবতী, তানরূপী—এই ছয়টি রাগ থাকে। নেত্র চক্রে সেনাবতী, হনুমতোড়ি, ধেনুকা, নাটকপ্রিয়া, কোকিলপ্রিয়া, রূপাবতী। অগ্নি চক্রে গায়কপ্রিয়া, বাকুলাভরণম, মায়ামালবগৌলা, চক্রবাকম, সূর্যকান্তম, হাটকম্ভরী। আর বেদ চক্রে ঝংকারধ্বনি, নাটভৈরবী, কীরবাণী, খরহরপ্রিয়া, গৌরীমনোহরী, বরুণপ্রিয়া। এইভাবে ১২টি চক্র মিলিয়ে পুরো ৭২টি মেলকার্তা রাগ সম্পূর্ণ হয়।

এই পদ্ধতির সঙ্গে হিন্দুস্তানি ঠাট পদ্ধতির তুলনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুস্তানি সঙ্গীতে পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডে ব্যবহারিক প্রয়োজনে ১০টি ঠাট নির্ধারণ করেন—যেমন বিলাবল, কল্যাণ, খামাজ, কাফি, ভৈরব, টোড়ি ইত্যাদি। প্রতিটি ঠাট সাত-স্বরভিত্তিক parent scale হলেও, এগুলো মেলকার্তার মতো সম্ভাব্য সব স্বরসমষ্টিকে অন্তর্ভুক্ত করে না। অর্থাৎ ঠাট পদ্ধতি মূলত ব্যবহারিক শ্রেণিবিন্যাস, আর মেলকার্তা পদ্ধতি তাত্ত্বিক পূর্ণতা

এখানে একটি গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্কও আছে। ভাতখণ্ডের ঠাট-ধারণা অনেকাংশে কর্ণাটক সঙ্গীতের মেলকার্তা ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত। তবে তিনি শিক্ষাদান ও ব্যবহারিক রাগচর্চাকে সহজ করার জন্য মাত্র ১০টি ঠাটে সীমাবদ্ধ রাখেন। অন্যদিকে কর্ণাটক সঙ্গীত সম্ভাব্য সব parent scale-কে গ্রহণ করে ৭২টি মেলকার্তা বজায় রেখেছে। তাই বলা যায়, ঠাট পদ্ধতি হলো মেলকার্তার সংক্ষিপ্ত ও ব্যবহারিক সংস্করণ, আর মেলকার্তা হলো তার পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক রূপ।

 

মেলকার্তা বনাম ঠাট পদ্ধতি: সাদৃশ্য, বৈসাদৃশ্য ও উদাহরণসহ তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দুই প্রধান ধারা—কর্ণাটকহিন্দুস্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই রাগকে শ্রেণিবদ্ধ করার জন্য একটি “জনক-স্কেল” বা parent framework ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ ভারতীয় কর্ণাটক ধারায় এই পদ্ধতির নাম মেলকার্তা, আর উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানি ধারায় এর সমতুল্য ধারণা হলো ঠাট। দুই পদ্ধতির লক্ষ্য একই—অসংখ্য রাগকে একটি সুশৃঙ্খল তাত্ত্বিক ভিত্তিতে সাজানো—তবু তাদের গঠন, পরিসর, ব্যবহারিকতা এবং দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। হিন্দুস্তানি ঠাটকে সাধারণত কর্ণাটক মেলকার্তার একটি ব্যবহারিক, সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বলা হয়।

প্রথমে সাদৃশ্যের দিকটি দেখলে বোঝা যায়, উভয় পদ্ধতিই মূলত parent scale classification system। অর্থাৎ একটি মূল স্বরবিন্যাস থেকে বহু রাগের জন্ম হয়। যেমন হিন্দুস্তানিতে কল্যাণ ঠাট থেকে ইয়মন, শুদ্ধ কল্যাণ, কামোদ ইত্যাদি রাগের উৎপত্তি ধরা হয়; তেমনি কর্ণাটকে কল্যাণী মেলকার্তা থেকে মোহনম, হামসধ্বনি, যমুনা কল্যাণী প্রভৃতি জন্য রাগের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা হয়। দুই ক্ষেত্রেই মূল উদ্দেশ্য রাগের “বংশতালিকা” বোঝানো। অর্থাৎ কোন রাগ কোন স্বরসমষ্টির উপর দাঁড়িয়ে আছে, তা দ্রুত চিহ্নিত করা।

তবে বৈসাদৃশ্যের জায়গা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো সংখ্যা ও তাত্ত্বিক পরিসরে। মেলকার্তা পদ্ধতিতে মোট ৭২টি সম্পূর্ণ (সাম্পূর্ণ) জনক রাগ রয়েছে, যেখানে প্রতিটি রাগে আরোহ-অবরোহে সাতটি স্বরই বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে ভাতখণ্ডের হিন্দুস্তানি পদ্ধতিতে মাত্র ১০টি ঠাট ব্যবহারিকভাবে গৃহীত। এই ১০টি ঠাট সব সম্ভাব্য সাত-স্বর parent scale-কে অন্তর্ভুক্ত করে না; বরং প্রচলিত রাগচর্চাকে সহজভাবে সাজানোর জন্য নির্বাচিত। ফলে মেলকার্তা যেখানে পূর্ণ গাণিতিক সম্ভাবনা, ঠাট সেখানে শিক্ষাবান্ধব বাস্তব প্রয়োগ

আরও একটি গভীর পার্থক্য হলো স্বর-নিয়মের কঠোরতা। মেলকার্তায় প্রতিটি রাগ অবশ্যই সম্পূর্ণ, ক্রমানুগ, এবং নির্দিষ্ট মধ্যমভিত্তিক (M1 বা M2) হতে হবে। ফলে এটি একটি নির্ভুল scale matrix তৈরি করে। কিন্তু ঠাট পদ্ধতিতে রাগের সঙ্গে ঠাটের সম্পর্ক অনেক সময় ঢিলেঢালা। কোনো রাগ তার parent ঠাটের সব স্বর ব্যবহার নাও করতে পারে, আবার চলনে এমন স্বরও ব্যবহার করতে পারে যা ঠাটে সরাসরি ধরা পড়ে না। উদাহরণ হিসেবে রাগ বেহাগ বা মিশ্র খাম্বাজ-এ ঠাটভিত্তিক ব্যতিক্রম দেখা যায়। তাই ঠাট মূলত classification tool, কিন্তু মেলকার্তা অনেক ক্ষেত্রেই performable janaka raga হিসেবেও কাজ করে।

ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, ঠাট পদ্ধতি মেলকার্তা ভাবনা থেকেই অনুপ্রাণিত। পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডে কর্ণাটক সঙ্গীতের মেলব্যবস্থার গঠন দেখে উত্তর ভারতীয় রাগচর্চার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত ও ব্যবহারিক কাঠামো নির্মাণ করেন। তবে তিনি ৭২-এর পূর্ণ গাণিতিক সম্ভাবনা না নিয়ে, তৎকালীন প্রচলিত রাগগুলোর ব্যবহারিক মিলের ভিত্তিতে ১০টি ঠাটকে প্রাধান্য দেন। এই কারণে বলা যায়—মেলকার্তা হলো তত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ মহাবিশ্ব, আর ঠাট হলো তার ব্যবহারিক মানচিত্র

উদাহরণ দিয়ে তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। কর্ণাটকে শংকরাভরণম একটি মেলকার্তা, যার স্বরবিন্যাস হিন্দুস্তানির বিলাবল ঠাট-এর সঙ্গে প্রায় সমতুল্য। একইভাবে কল্যাণী ↔ কল্যাণ ঠাট, খরহরপ্রিয়া ↔ কাফি ঠাট, হনুমতোড়ি ↔ টোড়ি ঠাট—এই মিলগুলো দুই ধারার অন্তর্নিহিত ঐক্যকে তুলে ধরে। তবে কর্ণাটক পদ্ধতিতে একই parent scale থেকে আরও অনেক বেশি জন্য রাগের শাখা-প্রশাখা গড়ে ওঠে, যা মেলকার্তার বিস্তৃত শক্তিকে দেখায়।

 

মেলকার্তা থেকে জন্য রাগ সৃষ্টি: কর্ণাটক রাগবংশের বিশদ বিশ্লেষণ

কর্ণাটক সঙ্গীতের রাগতত্ত্বে মেলকার্তাজন্য রাগ-এর সম্পর্ককে অনেক সময় “রাগবংশ” বলা হয়। কারণ, মেলকার্তা হলো জনক রাগ (parent scale) এবং জন্য রাগ হলো তার উৎপন্ন বা সন্তান রাগ। ৭২টি মেলকার্তা রাগের প্রত্যেকটি সাত-স্বরবিশিষ্ট সম্পূর্ণ স্কেল, যেখান থেকে স্বর বর্জন, বক্র গতি, বিশেষ গমক, অনুপ্রবেশী স্বর বা ভিন্ন আরোহ–অবরোহের মাধ্যমে অসংখ্য নতুন রাগ সৃষ্টি হয়। এই জন্যই কর্ণাটক সঙ্গীতের বিশাল রাগভাণ্ডারের মূলে রয়েছে মেলকার্তা পদ্ধতি।

জন্য রাগ সৃষ্টির সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি হলো স্বর বর্জন (Varja)। অর্থাৎ জনক মেলকার্তার সাতটি স্বরের মধ্যে কোনো একটি বা একাধিক স্বর আরোহে, অবরোহে, বা উভয় ক্ষেত্রেই বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে অডব (৫ স্বর), ষাডব (৬ স্বর), বা অডব-সম্পূর্ণ, ষাডব-সম্পূর্ণ ইত্যাদি গঠন তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে শংকরাভরণম মেলকার্তা থেকে হংসধ্বনি তৈরি হয়, যেখানে মা ও ধা বর্জিত হয়ে স্বরবিন্যাস দাঁড়ায়: সা রি গা পা নিঃ সা। একইভাবে মোহনম-ও একটি বিখ্যাত জন্য রাগ, যা একই জনক রাগের স্বরসম্ভার থেকে পাঁচ-স্বরীয় সৌন্দর্য নিয়ে গঠিত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো বক্র গতি (Vakra prayoga)। এখানে জন্য রাগ জনক রাগের সব বা বেশিরভাগ স্বর রাখলেও স্বরগুলো সরল ক্রমানুসারে না গিয়ে zig-zag বা বাঁকানো পথে চলে। এই বক্র চলনই রাগের স্বাতন্ত্র্য তৈরি করে। যেমন বেগড়া, শ্রীরাগম, দরবার—এসব জন্য রাগের সৌন্দর্য মূলত তাদের বক্র গমন ও বিশেষ phrases-এর উপর নির্ভরশীল। ফলে একই মেলকার্তা থেকে বহু জন্য রাগ জন্ম নিলেও তাদের রস ও চলন সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়।

জন্য রাগ সৃষ্টিতে শুধু স্বরসংখ্যা নয়, গমক ও প্রয়োগভিত্তিক স্বর-চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় একই স্বরবিন্যাসের দুটি রাগ ভিন্ন গমক ও বিশেষ prayoga-এর কারণে আলাদা পরিচয় পায়। উদাহরণ হিসেবে কল্যাণী মেলকার্তা থেকে উৎপন্ন যমুনা কল্যাণী এবং হামীর কল্যাণী-র কথা বলা যায়। উভয়ের parent scale এক হলেও নির্দিষ্ট অলঙ্কার, ন্যায়াস স্বর, এবং phrase-এর ব্যবহারে তাদের আবেগ ও পরিচয় ভিন্ন। এটাই কর্ণাটক সঙ্গীতের রাগবংশকে এত সমৃদ্ধ করেছে।

মেলকার্তা থেকে জন্য রাগের জন্মের আরেকটি সূক্ষ্ম দিক হলো উপাঙ্গ ও ভাষাঙ্গ বিভাজন। উপাঙ্গ জন্য রাগ সম্পূর্ণভাবে তার parent মেলকার্তার স্বরের মধ্যেই থাকে। কিন্তু ভাষাঙ্গ রাগে কখনও কখনও parent scale-এর বাইরের “অনুপ্রবেশী” স্বরও দেখা যায়। যেমন ভৈরবী বা কাম্ভোজি-তে এই ধরণের বহিরাগত স্বরপ্রয়োগ রাগের আবেগকে আরও গভীর করে। অর্থাৎ জন্য রাগ সবসময় কেবল গণিত নয়; তার রসসৃষ্টি অনেকাংশে ব্যবহারিক গায়কি ও prayoga-নির্ভর।

রাগবংশের এই ধারণা বোঝাতে সবচেয়ে জনপ্রিয় উদাহরণ হলো মায়ামালবগৌলা। এটি একটি বহুল ব্যবহৃত মেলকার্তা, বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষায়। এই parent scale থেকে মালাহারি, বৌলি, গৌলা ইত্যাদি বহু জন্য রাগের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রথমে মায়ামালবগৌলা শিখে যখন তার থেকে মালাহারির মতো pentatonic রাগে যান, তখন তারা parent–child relationship খুব সহজে উপলব্ধি করতে পারেন।

একইভাবে খরহরপ্রিয়া মেলকার্তা থেকে অভেরী, শ্রীরঞ্জনী, দরবার, মধ্যমাবতী প্রভৃতি জন্য রাগের বিশাল পরিবার গড়ে উঠেছে। এই জন্য রাগগুলোর মধ্যে কিছুতে পাঁচটি স্বর, কিছুতে ছয়টি, কিছুতে বক্র গতি, আবার কিছুতে বিশেষ গমকপ্রধান phrases ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তাদের মূল আবেগগত শিকড় খরহরপ্রিয়ার মধ্যেই নিহিত। তাই মেলকার্তা শুধু scale নয়, অনেক সময় একটি রাগ-পরিবারের aesthetic DNA হিসেবেও কাজ করে।

 

মেলকার্তার ৭২ রাগের মধ্যে সবচেয়ে ব্যবহৃত ১০টি জনক রাগ ও তাদের জন্য রাগ পরিবার

কর্ণাটক সঙ্গীতের ৭২ মেলকার্তার মধ্যে সব রাগ সমানভাবে ব্যবহারিক মঞ্চে সমাদৃত নয়। অনেক মেলকার্তা মূলত তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, কিছু জনক রাগ যুগে যুগে গায়কি, কৃতির ঐতিহ্য, জন্য রাগের সমৃদ্ধ পরিবার এবং রসসৃষ্টির বৈচিত্র্যের কারণে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই জনপ্রিয় জনক রাগগুলিই কর্ণাটক সঙ্গীতের বাস্তব চর্চায় সবচেয়ে বেশি শোনা যায় এবং অসংখ্য জন্য রাগের জন্ম দিয়েছে। নিচে এমন সবচেয়ে ব্যবহৃত ১০টি মেলকার্তা ও তাদের রাগ-পরিবারের বিস্তৃত আলোচনা দেওয়া হলো।

প্রথমেই আসে মায়ামালবগৌলা (১৫তম মেলকার্তা)। কর্ণাটক সঙ্গীত শিক্ষার একেবারে প্রাথমিক স্তরে সরলি, জন্টাই, আলঙ্কার প্রভৃতি শিক্ষাদান এই রাগে শুরু হয়। এর গাম্ভীর্য, স্বরসমতা এবং সহজ ধ্যানযোগ্য চলনের কারণে এটি শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ। এই জনক রাগ থেকে মালাহারি, বৌলি, গৌলা, নাদানামকৃয়া-র মতো জন্য রাগের সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলো প্রাথমিক কৃতি ও গীতমে বহুল ব্যবহৃত। মায়ামালবগৌলার পরিবারে ভক্তি, গাম্ভীর্য এবং প্রাতঃকালীন আধ্যাত্মিক আবহ বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ জনক রাগ হলো শংকরাভরণম (২৯তম), যা হিন্দুস্তানি বিলাবল ঠাটের সমতুল্য। এটি কর্ণাটক সঙ্গীতের সবচেয়ে উজ্জ্বল, পরিপূর্ণ এবং বহুমাত্রিক parent scale-গুলোর একটি। এর জন্য রাগ পরিবার অত্যন্ত বিশাল—হংসধ্বনি, মোহনম, বিলাহরি, দেবগান্ধারী, আরভি, কেদারগৌলা প্রভৃতি রাগ এরই সন্তান। এই পরিবারে আনন্দ, ভক্তি, বীরত্ব ও ললিত রসের অসাধারণ সমাহার দেখা যায়। শংকরাভরণমকে অনেকেই কর্ণাটক সঙ্গীতের “মেজর স্কেল মহাবিশ্ব” বলে থাকেন।

তৃতীয় স্থানে খরহরপ্রিয়া (২২তম)। এটি কর্ণাটক সঙ্গীতের আবেগময় ও গমকসমৃদ্ধ জনক রাগগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর সন্তান রাগের সংখ্যা বিপুল—অভেরী, শ্রীরঞ্জনী, মধ্যমাবতী, দরবার, কানাড়া, হুসেনী ইত্যাদি। খরহরপ্রিয়ার পরিবারে করুণ, মাধুর্য, ভক্তি ও রোমান্টিক আবহ সমানভাবে পাওয়া যায়। বিশেষ করে মঞ্চে আলাপনা ও নিরবলির জন্য এটি শিল্পীদের অত্যন্ত প্রিয়।

এরপর আসে কল্যাণী (৬৫তম), যা প্রতি-মধ্যমভিত্তিক সবচেয়ে সমৃদ্ধ মেলকার্তা। হিন্দুস্তানি ইয়মন বা কল্যাণ ঠাটের সঙ্গে এর গভীর মিল আছে। এর জন্য রাগ পরিবারে রয়েছে যমুনা কল্যাণী, হামীর কল্যাণী, মোহনকল্যাণী, সুনাদবিনোদিনী প্রভৃতি। কল্যাণীর বৈশিষ্ট্য হলো তার অপার বিস্তার, গাম্ভীর্য ও ঐশ্বর্যময় আবহ। এটি কনসার্টের প্রধান রাগ হিসেবে অসাধারণ মর্যাদা পায়।

পঞ্চম জনক রাগ হিসেবে উল্লেখযোগ্য হরিকাম্ভোজি (২৮তম)। এটি হিন্দুস্তানি খামাজের সমতুল্য এবং অসংখ্য ললিত ও মাধুর্যপূর্ণ জন্য রাগের উৎস। কাম্ভোজি, খামাস, সুরাটি, ইয়াদুকুল কাম্ভোজি, মোহনম-এর মতো বহুল জনপ্রিয় জন্য রাগ এর পরিবারভুক্ত। বিশেষত নৃত্যসঙ্গীত ও কৃতি পরিবেশনায় এই পরিবারের ব্যবহার অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

ষষ্ঠ স্থানে হনুমতোড়ি (৮তম)। এর গভীর গাম্ভীর্য, ভক্তিময়তা এবং করুণ রস একে কর্ণাটক সঙ্গীতের অন্যতম গুরুগম্ভীর জনক রাগে পরিণত করেছে। শুভপন্তুভারালি, ধেনুকা, এবং আরও কয়েকটি গাঢ় ভাবসম্পন্ন জন্য রাগ এর পরিবারে দেখা যায়। মন্দ গতির আলাপনা ও কৃতিতে এর আবেদন অপরিসীম।

সপ্তম গুরুত্বপূর্ণ জনক রাগ নাটভৈরবী (২০তম)। এটি হিন্দুস্তানি আসাবরী বা ন্যাচারাল মাইনর স্কেলের সঙ্গে তুলনীয়। এর পরিবারে ভৈরবী, আনন্দভৈরবী, রেভতী, হিন্দোলম-এর মতো আবেগপ্রবণ ও জনপ্রিয় রাগের উপস্থিতি এটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

অষ্টম স্থানে চক্রবাকম (১৬তম)। এর জন্য রাগ পরিবার তুলনামূলক ছোট হলেও আহিরী, জনরঞ্জনী, বেগড়া প্রভৃতি রাগে এর প্রভাব পাওয়া যায়। এর মাধুর্যপূর্ণ গতি এবং সহজ স্মরণযোগ্য স্বরচলন একে শিক্ষার্থীদের কাছেও আকর্ষণীয় করে তোলে।

নবম গুরুত্বপূর্ণ রাগ কীরবাণী (২১তম)। আধুনিক কনসার্ট, ভক্তিগীতি, এমনকি চলচ্চিত্র সঙ্গীতেও এর প্রভাব অত্যন্ত বেশি। এর জন্য রাগ পরিবারে সিমহেন্দ্রমধ্যমম, চন্দ্রজ্যোতি, কলাবতী ইত্যাদি রাগের উল্লেখ করা যায়। কীরবাণীর গাঢ় আবেগ, রহস্যময়তা এবং মাইনর-ধর্মী সৌন্দর্য একে আধুনিক শ্রোতার কাছেও প্রিয় করে তুলেছে।

দশম স্থানে চারুকেশী (২৬তম)। এটি কর্ণাটক ও আধুনিক ভারতীয় সঙ্গীত উভয় ক্ষেত্রেই অসামান্য জনপ্রিয়। এর সন্তান রাগগুলোর মধ্যে নাদনামকৃয়া, গৌরীমানোহরী-প্রভাবিত কিছু জন্য রাগ, এবং আধুনিক সুরসৃষ্টিতে বহু রূপ দেখা যায়। চারুকেশীর মাধুর্য, বেদনা ও রোমান্টিক আবেদন তাকে মঞ্চ এবং চলচ্চিত্র—দুই জগতেই সমান জনপ্রিয় করেছে।

 

আরও দেখুন: