কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ১১ নং চরসাদিপুর ইউনিয়নে অবস্থিত শ্রীকোল গ্রামটি পদ্মার পাড়ের একটি বর্ধিষ্ণু এবং শান্ত জনপদ। চরসাদিপুর ইউনিয়নের অন্যান্য গ্রামের মতো শ্রীকোল গ্রামটিও কুষ্টিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এবং প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়।
নিচে শ্রীকোল গ্রাম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো:
১. ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশ
শ্রীকোল গ্রামটি পদ্মা নদীর উত্তর পাড়ে অবস্থিত। প্রশাসনিকভাবে এটি কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও ভৌগোলিকভাবে এটি পাবনা জেলার সীমানা সংলগ্ন। চরাঞ্চল হওয়ার কারণে এই গ্রামের চারপাশ পলিমাটি সমৃদ্ধ এবং দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে ঘেরা। গ্রামের পরিবেশ অত্যন্ত স্নিগ্ধ ও নির্মল।
২. কৃষি ও অর্থনীতি
শ্রীকোল গ্রামের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হলো কৃষি। এখানকার উর্বর জমি ফসল উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত।
প্রধান ফসল: চীনাবাদাম, পেঁয়াজ, রসুন এবং ভুট্টা। এই অঞ্চলের উৎপাদিত বাদাম ও পেঁয়াজ স্থানীয় বাজারে বেশ জনপ্রিয়।
অন্যান্য চাষাবাদ: সরিষা, তিল এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল (মসুর, মাসকলাই) এখানে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়।
পশুপালন: চরাঞ্চলে ঘাসের প্রাচুর্য থাকায় এখানকার প্রায় প্রতিটি পরিবার গরু ও মহিষ পালন করে। গবাদি পশুর দুধ ও মাংস বিক্রির মাধ্যমে গ্রামবাসী আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতা লাভ করে।
৩. যোগাযোগ ব্যবস্থা
চরাঞ্চলীয় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা ব্যতিক্রমী:
উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ: কুমারখালী উপজেলা শহরে যাওয়ার জন্য নৌকা বা ইঞ্জিনচালিত ট্রলারই একমাত্র ভরসা। পদ্মা নদী পার হয়ে মূল ভূখণ্ডে যেতে হয়।
পাবনার সাথে যোগাযোগ: কুষ্টিয়া শহরের চেয়ে পাবনা শহরের সাথে শ্রীকোল গ্রামের দূরত্ব কম এবং যাতায়াত সহজ। তাই দৈনন্দিন কেনাকাটা ও উন্নত চিকিৎসার জন্য মানুষ পাবনা শহরের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
৪. শিক্ষা ও সংস্কৃতি
শ্রীকোল গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের নদী পার হয়ে কুমারখালী সদরে অথবা পার্শ্ববর্তী পাবনা জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে হয়। এখানকার মানুষ অত্যন্ত সহজ-সরল, অতিথিপরায়ণ এবং কঠোর পরিশ্রমী। গ্রামীণ নানা উৎসব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এখানকার সংস্কৃতির বিশেষ দিক।
৫. জীবনসংগ্রাম ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ
শ্রীকোল গ্রামের মানুষের জীবন যেমন শান্ত, তেমনই সংগ্রামের।
নদী ভাঙন: পদ্মা নদীর ভাঙন এই গ্রামের প্রধান স্থায়ী সমস্যা। প্রতি বছর বর্ষায় নদী তীরবর্তী জমি এবং বসতভিটা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বন্যা: বর্ষাকালে চরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় কৃষিকাজ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। তবে চরের মানুষ এই প্রতিকূলতাকে জয় করেই যুগ যুগ ধরে টিকে আছে।
৬. আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন
বর্তমানে শ্রীকোল গ্রামেও ডিজিটাল বাংলাদেশের ছোঁয়া লেগেছে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার অনেক বেড়েছে এবং অনেক বাড়িতে এখন গ্রিড বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে গ্রামের মানুষ এখন অনেক বেশি তথ্যপ্রযুক্তির সাথে যুক্ত।