মালিগ্রাম গ্রাম, ৫ নং শিমুলিয়া ইউনিয়ন, খোকসা, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার অন্তর্গত ৫ নং শিমুলিয়া ইউনিয়নের একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং কৃষি ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ গ্রাম হলো মালিগ্রাম। ইউনিয়নের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এই গ্রামটি তার বিশাল কৃষি মাঠ, শান্ত সামাজিক পরিবেশ এবং শিক্ষা সচেতনতার জন্য অত্র অঞ্চলে সুপরিচিত।

প্রশাসনিক পরিচয় ও অবস্থান

মালিগ্রাম গ্রামটি প্রশাসনিকভাবে ৫ নং শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে গ্রামটির উত্তর-পূর্ব দিকে পাথালদড় গ্রাম, দক্ষিণে রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলা, পূর্বে বিলজানি এবং পশ্চিমে শিমুলিয়া (সদর) গ্রামের সীমানা অবস্থিত। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ডাটাবেইস অনুযায়ী, মালিগ্রাম মৌজাটি মূলত সমতল পলিমাটি সমৃদ্ধ কৃষি ভূমি এবং নিচু জলাভূমির সমন্বয়ে গঠিত।

জনমিতি ও জনসংখ্যা বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, মালিগ্রাম গ্রামের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১,৭৫০ জন। লিঙ্গভিত্তিক অনুপাতে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৮৯০ জন এবং নারীর সংখ্যা ৮৬০ জন। পরিবার বা হাউসহোল্ডের সংখ্যা আনুমানিক ৩৮০টি। ভোটার তালিকায় এই গ্রামে প্রায় ১,১২০ জন ভোটার নিবন্ধিত রয়েছেন। আবাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গ্রামটিতে আধুনিকতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়; এখানে প্রায় ২০% বাড়ি পাকা ও আধা-পাকা এবং বাকি ৮০% বাড়ি উন্নত মানের মজবুত টিনশেড কাঠামোয় নির্মিত।

শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র

যশোর শিক্ষা বোর্ড এবং ব্যানবেইস (BANBEIS)-এর তথ্যমতে, মালিগ্রাম গ্রামের গড় শিক্ষার হার প্রায় ৫৬.৫%। প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে গ্রামে মালিগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (প্রতিষ্ঠা ১৯৭৩ খ্রি.) প্রধান ভূমিকা পালন করছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার জন্য এই গ্রামের শিক্ষার্থীরা প্রধানত ইউনিয়নের প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিমুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং খোকসা সরকারি কলেজের ওপর নির্ভরশীল। ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে গ্রামে ১টি মসজিদ ভিত্তিক মক্তব ও নূরানী শিক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।

কৃষি, ভূমি ব্যবহার ও অর্থনীতি

ভূমি মন্ত্রণালয়ের মৌজা ও প্লটভিত্তিক ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ডাটাবেইস অনুযায়ী, মালিগ্রামের জমি অত্যন্ত উর্বর এবং মূলত তিন-ফসলী। এখানকার প্রধান কৃষি পণ্য হলো ধান, পাট, গম ও পিঁয়াজ। এছাড়া রবি মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে রবি শস্য উৎপাদিত হয়। গ্রামে কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২৮০টি। পেশাভিত্তিক বিন্যাসে কৃষিজীবী ৬৬%, ব্যবসায়ী ৭%, এবং সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও প্রবাসী ২৭%। গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষিপণ্য ব্যবসার সাথে জড়িত।

অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা

LGED এবং উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের অবকাঠামো ডাটাবেইস অনুযায়ী, মালিগ্রাম গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটামুটি উন্নত। গ্রামটি শিমুলিয়া-পাংশা সংযোগ সড়কের সাথে পাকা ও আধাপাকা রাস্তার মাধ্যমে যুক্ত। গ্রামে পাকা (বিসি) ও এইচবিবি রাস্তার পরিমাণ প্রায় ২.৫ কিলোমিটার এবং অভ্যন্তরীণ কাঁচা রাস্তা রয়েছে আরও ৩ কিলোমিটার। যাতায়াত ও পানি নিষ্কাশনের জন্য গ্রামে ৩টি কালভার্ট রয়েছে। হাট-বাজারের জন্য গ্রামবাসী মূলত শিমুলিয়া বাজার ও পার্শ্ববর্তী পাংশার স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনা

মালিগ্রাম গ্রামটি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও অনুশাসনের জন্য পরিচিত। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, গ্রামে ৩টি জামে মসজিদ ও ১টি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান রয়েছে। এখানে মূলত মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের আধিক্য থাকলেও ইউনিয়নের ঐতিহ্যগত সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য বিদ্যমান। গ্রামের মানুষের শেষ বিদায়ের জন্য ১টি বড় সামাজিক কবরস্থান সংরক্ষিত রয়েছে। সামাজিক সংহতি রক্ষায় স্থানীয় প্রবীণ ও শিক্ষিত যুবকদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

স্থানীয় নেতৃত্ব ও জননিরাপত্তা

প্রশাসনিকভাবে ৯ নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউপি সদস্য (মেম্বার) গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজ তদারকি করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনের সাথে সমন্বয় সাধনে ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক নিয়োজিত গ্রাম পুলিশ সদস্যরা এখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন। গ্রামের অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো বিবাদ নিরসনে স্থানীয় মুরুব্বি ও সমাজসেবকদের সমন্বয়ে গঠিত গ্রাম্য সালিশি ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। বর্তমানে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের আওতায় গ্রামের অভ্যন্তরীণ রাস্তা সংস্কার ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক অবস্থা

মালিগ্রাম অনেক পরিশ্রমী ও সচেতন মানুষের জন্মস্থান। এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবীরা বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে এই গ্রামের প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা গ্রামের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন। প্রধান সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ষা মৌসুমে নিচু এলাকার রাস্তায় সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা নিরসনে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশের অংশ হিসেবে গ্রামের মানুষ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে দ্রুত ই-সেবা গ্রহণ করছেন।

প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা, কৃষি সমৃদ্ধি এবং শান্ত গ্রামীণ পরিবেশের সমন্বয়ে মালিগ্রাম গ্রামটি ৫ নং শিমুলিয়া ইউনিয়নের একটি আদর্শ ও সম্ভাবনাময় জনপদ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

আরও দেখুন: