কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার ৯ নং আমবাড়ীয়া ইউনিয়নের অন্যতম প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী এবং আয়তনে বিশাল একটি গ্রাম হলো বিহড়বাড়ীয়া। কৃষি ও শিক্ষার মেলবন্ধনে এই গ্রামটি অত্র উপজেলার একটি মডেল গ্রাম হিসেবে পরিচিত।
প্রশাসনিক পরিচয় ও অবস্থান
বিহড়বাড়ীয়া গ্রামটি প্রশাসনিকভাবে ৯ নং আমবাড়িয়া ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। এটি ইউনিয়নের একটি একক এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ ওয়ার্ড। ভৌগোলিকভাবে গ্রামটি আমবাড়িয়া ইউনিয়নের উত্তর-পশ্চিমাংশে এবং গড়াই নদীর অববাহিকা থেকে কিছুটা দূরে সমতল ভূমিতে অবস্থিত। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ডাটাবেইস অনুযায়ী, বিহড়বাড়ীয়া মৌজাটি অত্যন্ত উর্বর এবং এর ভূমি শ্রেণী মূলত ‘উঁচু ও মাঝারি উঁচু’, যা বন্যাভুক্ত নয় এবং বছরব্যাপী কৃষিকাজের জন্য আদর্শ।
জনমিতি ও জনসংখ্যা বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং ইউনিয়ন পরিষদের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিহড়বাড়ীয়া গ্রামের জনমিতি নিম্নরূপ:
মোট জনসংখ্যা: ২,৫১০ জন (প্রায়)।
নারী-পুরুষ বিভাজন: পুরুষ ১,২৮০ জন এবং মহিলা ১,২৩০ জন।
পরিবার সংখ্যা: প্রায় ৫২০টি।
শিক্ষার হার: প্রায় ৪৭.৫%।
ধর্মীয় গঠন: গ্রামটি মূলত মুসলিম অধ্যুষিত। ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক কার্যক্রমে এখানকার মানুষের মধ্যে প্রবল ঐক্য পরিলক্ষিত হয়।
পেশা ও জীবনযাত্রার মান
বিহড়বাড়ীয়া গ্রামের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। তবে গ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চাকুরী ও ব্যবসার সাথে জড়িত।
কৃষক পরিবার: প্রায় ৩১০টি পরিবার সরাসরি চাষাবাদের ওপর নির্ভরশীল।
পেশাভিত্তিক বিন্যাস: কৃষিজীবী ৬০%, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ১৫%, দিনমজুর ১৫%, এবং বাকি ১০% সরকারি-বেসরকারি চাকুরী ও প্রবাসে কর্মরত।
ঘরের ধরন: গ্রামের আধুনিকায়নের ফলে প্রায় ৩০% বাড়ি পাকা ও আধা-পাকা ভবন, বাকি ৭০% ঘর মজবুত টিনশেড কাঠামোয় নির্মিত।
শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, বিহড়বাড়ীয়া গ্রামের শিক্ষা কাঠামো নিম্নরূপ:
বিহড়বাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: এটি গ্রামের শিক্ষার প্রধান ভিত্তি। বিদ্যালয়টি অত্যন্ত পুরনো এবং স্থানীয় শিক্ষার প্রসারে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বিহড়বাড়ীয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা: গ্রামের শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানে এই প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মাধ্যমিক শিক্ষা: গ্রামের শিক্ষার্থীরা সাধারণত পার্শ্ববর্তী আমবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা জয়ন্তীহাজরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। উচ্চ শিক্ষার জন্য তারা খোকসা উপজেলা সদরের কলেজগুলোতে অধ্যয়ন করে।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো (LGED ডাটাবেইস)
LGED-র রোড ইনভেন্টরি ও ম্যাপ অনুযায়ী বিহড়বাড়ীয়া গ্রামের অবকাঠামো চিত্র:
রাস্তাঘাট: গ্রামটি খোকসা-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের সাথে সরাসরি পাকা সড়ক (BC) দ্বারা যুক্ত। গ্রামের অভ্যন্তরে প্রায় ৩ কিলোমিটার পাকা রাস্তা এবং ২ কিলোমিটারের বেশি ইটের সলিং ও উন্নত কাঁচা রাস্তা রয়েছে।
কালভার্ট ও ব্রিজ: কৃষি পণ্য পরিবহনের জন্য এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য গ্রামে ৫টি ছোট-বড় কালভার্ট রয়েছে।
হাট-বাজার: গ্রামের নিজস্ব ছোট বাজার বা দোকানপাট থাকলেও গ্রামবাসী বড় ধরনের কেনাকাটা ও ব্যবসার জন্য আমবাড়িয়া হাট বা খোকসা বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনা
ইউনিয়ন ও উপজেলা প্রশাসনের তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী বিহড়বাড়ীয়া গ্রামের ধর্মীয় ও সামাজিক বিন্যাস নিম্নরূপ:
মসজিদ ও ঈদগাহ: গ্রামে ৩টি জামে মসজিদ রয়েছে। গ্রামবাসী প্রধান ঈদ জামাতের জন্য স্থানীয় নিজস্ব ঈদগাহ ময়দানে সমবেত হন।
কবরস্থান: গ্রামের দক্ষিণ অংশে একটি সুসংগঠিত এবং প্রাচীরঘেরা সামাজিক কবরস্থান রয়েছে।
সামাজিক কেন্দ্র: গ্রামের যুবকদের খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য একটি খেলার মাঠ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন সময় ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয়।
কৃষি, ভূমি ব্যবহার ও ল্যান্ড জোনিং
ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ডাটাবেইস অনুযায়ী, বিহড়বাড়ীয়া মৌজার জমি মূলত ‘তিন-ফসলী’। এখানে প্রচুর পরিমাণে পাট, পেঁয়াজ, রসুন ও আমন ধানের ফলন হয়। রবি শস্যের মৌসুমে এই গ্রামের মাঠগুলো সরিষা ও মসুর ডালের ফুলে ভরে ওঠে। ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বসতভিটার পাশাপাশি প্রচুর আম, মেহগনি ও লিচু বাগান রয়েছে। সেচ কাজের জন্য এখানে গভীর নলকূপ ও বিএডিসি-র সেচ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
স্থানীয় নেতৃত্ব ও উন্নয়ন প্রকল্প
বর্তমানে ৪ নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউপি সদস্য এবং গ্রাম পুলিশ (মহল্লাদার) গ্রামের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক বিষয়াদি তদারকি করেন। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বর্তমানে ‘গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার’ (TR/KABITA) প্রকল্পের আওতায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সোলার স্ট্রিট লাইট স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। ভোটার সংখ্যা অনুযায়ী এখানে পুরুষের তুলনায় মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি সামাজিক সচেতনতার পরিচয় দেয়।
সামাজিক সমস্যা ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ
বিহড়বাড়ীয়া একটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ গ্রাম। তবে বর্ষাকালে কিছু অভ্যন্তরীণ রাস্তার ড্রেনেজ সমস্যা এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এখানকার প্রধান সামাজিক চাহিদা। এই গ্রামের অনেক কৃতি সন্তান বর্তমানে চিকিৎসা, প্রকৌশল, সেনাবাহিনী এবং শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত আছেন, যারা গ্রামের আর্ত-সামাজিক উন্নয়নে বিভিন্নভাবে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করেন।
সামগ্রিকভাবে, বিহড়বাড়ীয়া গ্রামটি ৯ নং আমবাড়িয়া ইউনিয়নের একটি সুসংগঠিত ও সমৃদ্ধ জনপদ, যা তার ঐতিহ্যকে লালন করে আধুনিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আরও দেখুন: