রাগ মালশ্রী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ মালশ্রী হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত অনন্য এবং বিমূর্ত প্রকৃতির রাগ। এটি এর অতি অল্প স্বর ব্যবহারের জন্য পরিচিত, যা শিল্পীর জন্য যেমন চ্যলেঞ্জিং, শ্রোতার জন্য তেমনই ধ্যানের মতো প্রশান্তিদায়ক।

রাগ মালশ্রী

রাগ মালশ্রী: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ মালশ্রী (Malashree) একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং শুদ্ধ প্রকৃতির রাগ। এই রাগের বিশেষত্ব হলো এর স্বর সংখ্যা। প্রচলিত অনেক রাগে যেখানে ৫, ৬ বা ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়, মালশ্রী রাগের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রূপ মাত্র ৩টি স্বর (সা, গ, প) নিয়ে গঠিত। তবে ভিন্ন ভিন্ন মতভেদে এতে ৫টি স্বরও ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত ‘কল্যাণ’ ঠাটের অন্তর্গত বলে আধুনিক সংগীতশাস্ত্রে স্বীকৃত।

ঐতিহাসিকভাবে, মালশ্রী রাগের উল্লেখ শার্ঙ্গদেব রচিত ‘সংগীত রত্নাকর’ গ্রন্থেও পাওয়া যায়। এই রাগটি গাওয়ার সময় শিল্পী স্বরের কারুকার্যের চেয়ে স্বরের স্থায়িত্ব এবং মীড়ের ওপর বেশি জোর দেন। এটি বীর এবং শান্ত রসের সংমিশ্রণে গঠিত। এর সুরের গম্ভীরতা এবং সরলতা মনকে জাগতিক কোলাহল থেকে মুক্ত করে এক স্থির আধ্যাত্মিকতায় নিয়ে যায়।

রাগের শাস্ত্র

রাগ মালশ্রী-এর শাস্ত্রীয় নিয়ম ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • অন্যান্য নাম: মালশ্রী, মালশ্রি।
  • ঠাট: কল্যাণ।
  • জাতি: ত্রি-স্বরী (৩টি স্বর ব্যবহৃত হলে) অথবা ঔড়ব-ঔড়ব (৫টি স্বর ব্যবহৃত হলে)। বর্তমানে ঔড়ব রূপটিই বেশি প্রচলিত।
  • আরোহ: সা গ প নি সঁ (শুদ্ধ স্বর)।
  • অবরোহ: সঁ নি প গ সা (শুদ্ধ স্বর)।
  • (দ্রষ্টব্য: প্রাচীন ও কঠোর মতে এর আরোহ-অবরোহ কেবল: সা গ প — প গ সা)
  • বাদী স্বর: পঞ্চম (প)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: ঋষভ (রে) এবং মধ্যম (ম) সম্পূর্ণ বর্জিত। ঔড়ব মতে ধৈবত (ধ)-ও বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: গান্ধার (গ), পঞ্চম (প) এবং নিষাদ (নি) — সবগুলি শুদ্ধ
  • সময়: সূর্যাস্তের সময় বা গোধূলি বেলা (দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, ধীর এবং আধ্যাত্মিক।

 

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

মালশ্রী রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ হংসধ্বনি: হংসধ্বনিতে ঋষভ (রে) ব্যবহৃত হয়, যা মালশ্রীতে বর্জিত।

  • রাগ শিবরঞ্জিনী: শিবরঞ্জিনীতে কোমল গান্ধার ব্যবহৃত হয়, কিন্তু মালশ্রীতে গান্ধার শুদ্ধ।

  • রাগ ভূপালী: ভূপালীতে মধ্যম ও নিষাদ বর্জিত থাকে, কিন্তু মালশ্রীতে নিষাদ ব্যবহৃত হয় এবং ঋষভ বর্জিত থাকে।

  • রাগ মালগুঞ্জ: এই রাগে মালশ্রী এবং গুঞ্জী রাগের মিশ্রণ থাকে, যা এর চলনকে জটিল করে তোলে।

 

রাগ মালশ্রী তার সীমিত স্বরকাঠামোর মাধ্যমেই অসীম মাধুর্য তৈরি করতে সক্ষম। মাত্র কয়েকটি স্বরের ওপর ভিত্তি করে একটি পূর্ণাঙ্গ রাগ পরিবেশন করা শিল্পীর গভীর সাধনার পরিচয় দেয়। এটি এমন একটি রাগ যা কোনো চটুল তান বা দ্রুত লয়ের অলংকারে বিশ্বাসী নয়, বরং প্রতিটি স্বরের শুদ্ধতা ও গাম্ভীর্যের মাধ্যমেই এর সার্থকতা খুঁজে পায়। আধ্যাত্মিক সংগীত বা ধ্যানের জন্য মালশ্রী রাগের সুর অতুলনীয়।

তথ্যসূত্র (Sources)

নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. সংগীত রত্নাকর — শার্ঙ্গদেব (প্রাচীন উৎস)।

২. ক্রামিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৪) — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।

৩. রাগ পরিচয় — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

৪. সংগীত বিশারদ — বসন্ত (লক্ষ্ণৌ সংস্করণ)।

আরও দেখুন: