রাগ মারওয়া । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ মারওয়া হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অতি উচ্চাঙ্গ, গম্ভীর এবং দার্শনিক ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ রাগ। এটি মারওয়া ঠাটের মূল বা ‘আশ্রয় রাগ’।

রাগ মারওয়া

রাগ মারওয়া: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ মারওয়া (Marwa) তার অদ্ভুত স্বরবিন্যাস এবং মেজাজের জন্য সংগীত জগতে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এটি মূলত সূর্যাস্তকালীন একটি রাগ। এই রাগের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর অস্থিরতা এবং ব্যাকুলতা। এতে ‘ষড়জ’ (সা) স্বরটি খুব কম ব্যবহার করা হয়; শিল্পী গান গাওয়ার সময় বারবার ‘সা’ স্বরটিকে এড়িয়ে চলেন, যা শ্রোতার মনে এক ধরণের অতৃপ্তি বা গভীর ব্যাকুলতা তৈরি করে। যখন দীর্ঘক্ষণ পর শিল্পী ‘সা’ স্বরে স্থির হন, তখন শ্রোতা এক পরম শান্তি অনুভব করেন।

ঐতিহাসিকভাবে এটি অত্যন্ত প্রাচীন রাগ। এর নামের সাথে রাজস্থানের ‘মারওয়ার’ অঞ্চলের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এই রাগে কোমল ঋষভ (রে) এবং কড়ি মধ্যম (ম)-এর প্রয়োগ এক ধরণের তপ্ত বা দহনময় অনুভূতির সৃষ্টি করে, যা দিনের আলো শেষ হয়ে আসার মুহূর্তটিকে সুরের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে।

রাগের শাস্ত্র

রাগ মারওয়ার শাস্ত্রীয় নিয়ম ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • অন্যান্য নাম: মারুয়া।
  • ঠাট: মারওয়া।
  • জাতি: ষাড়ব-ষাড়ব (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৬টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: নি দ রে গা ম ধ নি রেঁ সঁ (এখানে রে—কোমল, ম—কড়ি। আরোহে ‘প’ বর্জিত)।
  • অবরোহ: সঁ নি ধ ম গা রে সা (এখানে নি, ধ, গা—শুদ্ধ; ম—কড়ি এবং রে—কোমল। অবরোহেও ‘প’ বর্জিত)।
  • বাদী স্বর: কোমল ঋষভ (রে)।
  • সমবাদী স্বর: ধৈবত (ধ)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই পঞ্চম (প) স্বরটি সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) হলো কোমল; মধ্যম (ম) হলো কড়ি বা তীব্র; এবং গান্ধার (গ), ধৈবত (ধ) ও নিষাদ (নি) হলো শুদ্ধ
  • সময়: দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ বা সূর্যাস্তকাল (বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, ব্যাকুল, বৈরাগ্যপূর্ণ এবং তপ্ত।

 

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

মারওয়া রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ পুরিয়া: পুরিয়া ও মারওয়ার স্বর একই, তবে পুরিয়ার বাদী স্বর গান্ধার (গ) এবং এটি নিচু স্বরে (মন্দ্র সপ্তক) বেশি গাওয়া হয়।
  • রাগ সোহিনী: সোহিনীতেও মারওয়ার মতো স্বর ব্যবহৃত হয়, তবে এটি উচ্চ স্বরে (তার সপ্তক) গাওয়া হয় এবং এটি শেষ রাত্রির রাগ।
  • রাগ পূরবী: পূরবী রাগে পঞ্চম (প) ব্যবহৃত হয় এবং এতে কোমল ধৈবত লাগে, যা মারওয়া থেকে একে আলাদা করে।
  • রাগ জয়েত: মারওয়া ঠাটের রাগ হলেও এর চলন এবং স্বর প্রক্ষেপণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

রাগ মারওয়া তার স্বরবিন্যাসের জটিলতা এবং ‘সা’ স্বরকে বর্জন করার কৌশলের মাধ্যমে সংগীতের এক উচ্চতর দর্শনকে তুলে ধরে। এটি মূলত ত্যাগ এবং বৈরাগ্যের সুর। সূর্যাস্তের ম্লান আলোয় মারওয়ার আলাপ শ্রোতাকে জীবনের নশ্বরতা এবং আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এই রাগটি আয়ত্ত করা যেকোনো শিল্পীর জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা এবং এর সার্থক পরিবেশনা এক অপার্থিব প্রশান্তি বয়ে আনে।

তথ্যসূত্র (Sources)

নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. ক্রামিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৪) — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।

২. রাগ পরিচয় (খণ্ড ৩) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

৩. সংগীত বিশারদ — বসন্ত (লক্ষ্ণৌ সংস্করণ)।

৪. রাগ তত্ত্ব ও রূপায়ন — ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীত একাডেমি।

আরও দেখুন: