রাগ বিভৎস ভৈরব । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ বিভৎস ভৈরব হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের ভৈরব অঙ্গের একটি অত্যন্ত বিরল এবং অপ্রচলিত রাগ। এটি মূলত ভৈরব রাগের একটি বিশেষ রূপ, যা এর নামের মতোই এক ধরণের উগ্র, গম্ভীর এবং অত্যন্ত শক্তিশালী আধ্যাত্মিক ভাব বহন করে।

রাগ বিভৎস ভৈরব

রাগ বিভৎস ভৈরব: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ বিভৎস ভৈরব (Bibhatsa Bhairav) মূলত ভগবান শিবের সংহারকারী রূপ বা ‘বিভৎস’ রুদ্র রূপের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি ভৈরব ঠাটের অন্তর্গত এবং এটি মূলত ভৈরববিভাস (ভৈরব ঠাটের বিভাস) রাগের একটি জটিল মিশ্রণ। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, এতে রাগ বিভাস-এর স্বরকাঠামোর ওপর ভৈরব রাগের চলন আরোপ করা হয়।

এই রাগের বিশেষত্ব হলো এর আরোহ ও অবরোহের বক্রতা এবং নির্দিষ্ট কিছু স্বরের ওপর বিশেষ চাপ। এটি গাওয়ার সময় এক ধরণের ভয়ংকর গাম্ভীর্য বা বীর রসের উদ্রেক ঘটে, যা সাধারণ ভৈরব রাগের করুণ বা ভক্তি রসের চেয়ে আলাদা। এটি মূলত এক ধরণের তান্ত্রিক বা নাদ-যোগ সাধনার রাগ হিসেবে প্রাচীন কালে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এই রাগের প্রচলন অত্যন্ত সীমিত এবং কেবল নির্দিষ্ট ঘরানার পণ্ডিতদের কাছেই এর শুদ্ধ রূপ সংরক্ষিত আছে।

রাগের শাস্ত্র

রাগ বিভৎস ভৈরব-এর শাস্ত্রীয় নিয়ম ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • অন্যান্য নাম: বিভাস ভৈরব, রুদ্র-বিভাস।
  • ঠাট: ভৈরব।
  • জাতি: ঔড়ব-ষাড়ব (মতভেদে আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৬টি বা ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা র্রে গা পা ধা সঁ (এখানে রে এবং ধ কোমল; ম ও নি বর্জিত)।
  • অবরোহ: সঁ নি ধা পা মা গা র্রে সা (এখানে ধ এবং রে কোমল; অবরোহে ম ও নি-র প্রয়োগ অত্যন্ত সূক্ষ্ম)।
  • বাদী স্বর: ধৈবত (ধ)।
  • সমবাদী স্বর: ঋষভ (রে)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে মধ্যম (ম) এবং নিষাদ (নি) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধ) হলো কোমল; বাকি স্বরগুলো (সা, গা, পা, মা, নি) শুদ্ধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় (যদিও আরোহে নি বর্জিত)।
  • সময়: প্রাতঃকাল বা ভোরের রাগ (সূর্যোদয়ের সময়)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, ভয়ংকর (উগ্র) এবং আধ্যাত্মিক।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

বিভৎস ভৈরব রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ ভৈরব: এটি এই রাগের মূল ভিত্তি, তবে ভৈরব রাগে সাতটি স্বরই সরলভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ বিভাস (ভৈরব ঠাট): বিভাস রাগের আরোহ-অবরোহের সাথে এর মিল অনেক বেশি, কিন্তু বিভৎস ভৈরবে অবরোহে মধ্যম ও নিষাদের সামান্য ছোঁয়া থাকে।
  • রাগ রৌদ্র ভৈরব: রৌদ্র ভৈরব আরও বেশি তেজস্বী এবং এতে সাতটি স্বরই সম্পূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ গুণকেলী: আরোহ-অবরোহের মিল থাকলেও গুণকেলী অনেক বেশি শান্ত এবং ভক্তিপ্রধান।

রাগ বিভৎস ভৈরব তার নামের মতোই শ্রোতার মনে এক আদিম ও শক্তিশালী কম্পন তৈরি করে। শাস্ত্রীয় সংগীতের যে শাখাগুলো আধ্যাত্মিক সাধনা এবং নাদব্রহ্মের উগ্র রূপ নিয়ে কাজ করে, সেখানে এই রাগের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি সাধারণ রঞ্জক রাগের চেয়ে অনেক বেশি সাধনার রাগ। আধুনিক সংগীতের আসরে এর অভাব পরিলক্ষিত হলেও, শাস্ত্রীয় সংগীতের বৈচিত্র্য এবং ভৈরব অঙ্গের গূঢ় রহস্য বুঝতে বিভৎস ভৈরব এক অনন্য অধ্যায়।

তথ্যসূত্র (Sources)

নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. ক্রামিক পুস্তক মালিকা (অপ্রচলিত রাগ সংগ্রহ) — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।

২. রাগ পরিচয় (খণ্ড ৪) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

৩. সংগীত বিশারদ — বসন্ত (লক্ষ্ণৌ সংস্করণ)।

৪. রাগ তত্ত্ব ও ঘরানা পদ্ধতি — বিভিন্ন প্রাচীন শাস্ত্রীয় সংগীত পাণ্ডুলিপি ও রেকর্ডস।

আরও দেখুন: