ইতিহাসের বইগুলোতে আমরা পড়ে এসেছি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তাকে ‘বাবা-এ-কওম’ বা জাতির পিতা বলা হয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণা ও অবমুক্ত হওয়া গোপন নথিপত্র এক চাঞ্চল্যকর ও ভিন্ন সত্যের দিকে আঙুল তুলছে। বিশেষ করে ২০০৫ সালে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক নরেন্দ্র সিং সারিলার বই ‘The Shadow of the Great Game: The Untold Story of India’s Partition’ প্রকাশিত হওয়ার পর ইতিহাসবিদদের মহলে এক নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তান সৃষ্টি কেবল একটি ধর্মীয় বা রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল ছিল না। বরং এটি ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের এক সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল। চার্চিলের সেই দাবার ছকেই আজকের পাকিস্তানের জন্ম। আসুন দেখি চার্চিলকেই পাকিস্তানের ‘আসল প্রতিষ্ঠাতা’ বা ‘নেপথ্যের জাতির পিতা’ কেন বলছি।
উইনস্টন চার্চিল কেন পাকিস্তানের প্রকৃত স্থপতি ও জাতীর পিতা?

১. ‘গ্রেট গেম’ এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশল: একটি দুর্ভেদ্য পরিখা
উইনস্টন চার্চিলের কাছে ভারতের স্বাধীনতা ছিল একটি কৌশলগত বিপর্যয়। তিনি কোনোভাবেই চাননি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এই ‘মুকুট’ হাতছাড়া হোক। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতি যখন তাকে বুঝিয়ে দিল যে ভারতের স্বাধীনতা ঠেকানো সম্ভব নয়, তখন তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষার জন্য এক বিকল্প ও কুটিল পথে হাঁটলেন।
ক) কংগ্রেসের অনমনীয় জাতীয়তাবাদ ও চার্চিলের ভীতি
চার্চিলের এই বিকল্প পথের মূলে ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তৎকালীন নেতৃত্বের প্রতি তার গভীর অবিশ্বাস ও আতঙ্ক। কংগ্রেসের সেসময়ের মূল কাণ্ডারিরা—জওহরলাল নেহরু, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালি জাতীয়তাবাদী আদর্শে উজ্জীবিত।
আপসহীন নেতৃত্ব:
এই নেতারা বহু বছর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জেল-জুলুম খেটে জাতীয় স্তরে নিজেদের অবস্থানকে ইস্পাতকঠিন করে তুলেছিলেন। তারা তাদের রাজনীতির ভিশন ও ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট নিয়ে ছিলেন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী।
বাফার স্টেট হিসেবে অযোগ্যতা:
চার্চিল বুঝতে পেরেছিলেন, নেহরু বা প্যাটেলের মতো নেতাদের বাঁকানো বা কোনো শর্তে বাধ্য রাখা সম্ভব নয়। তারা কখনোই বাফার স্টেট হিসেবে ব্রিটিশ বা তাদের মিত্রদের নিঃশর্ত সামরিক সমর্থন দেবে না। বরং তারা ভারতের নিজস্ব স্বার্থকে সবার ওপরে রাখবে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নিরপেক্ষ অবস্থান (Non-Aligned) নেবে। চার্চিলের কাছে এমন একটি স্বাধীন ভারত ছিল চরম ঝুঁকির বিষয়।
খ) সোভিয়েত আতঙ্ক ও নেহরুর সমাজতান্ত্রিক ঝোঁক
চার্চিলের মাথায় সবসময় একটি ভয় কাজ করত—সোভিয়েত ইউনিয়ন। তিনি আতঙ্কিত ছিলেন যে, নেহরুর সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা ভারতকে রাশিয়ার বলয়ে নিয়ে যেতে পারে।
যদি ঐক্যবদ্ধ ভারত সোভিয়েতদের বন্ধু হয়ে যায়, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ প্রভাব চিরতরে মুছে যাবে। চার্চিল কল্পনা করেছিলেন, একটি ঐক্যবদ্ধ ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভারত মহাসাগরের উষ্ণ জলসীমায় প্রবেশের সুযোগ করে দিতে পারে, যা ব্রিটিশ নৌ-সাম্রাজ্যের জন্য হবে এক বিরাট হুমকি।
গ) বাফার স্টেট বা ‘পরিখা’ তৈরির পরিকল্পনা
ব্রিটিশ সামরিক প্রধানদের গোপন মেমো এবং গোয়েন্দা রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গ্লোবাল ইন্টারেস্ট রক্ষা করতে হলে ভারতকে খণ্ডিত করা ছাড়া উপায় নেই।
চার্চিল ও তার সামরিক উপদেষ্টারা দেখলেন, ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত (বর্তমান পাকিস্তান) যদি একটি পৃথক ও অনুগত রাষ্ট্র হয়, তবে তা হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে একটি ‘দুর্ভেদ্য পরিখা’ বা ‘Moat’।
এই নতুন রাষ্ট্রটি হবে এমন একটি পক্ষ, যারা টিকে থাকার প্রয়োজনে সবসময় ব্রিটিশ সামরিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। ফলে তারা কংগ্রেসের মতো অবাধ্য হবে না, বরং ব্রিটিশদের সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত সুবিধা দিতে বাধ্য থাকবে। চার্চিল এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতেই পাকিস্তান আন্দোলনকে পর্দার আড়াল থেকে সরাসরি ত্বরান্বিত করেন এবং জিন্নাহকে তার দাবার প্রধান ঘুঁটি হিসেবে প্রস্তুত করেন।
![Muhammad Ali Jinnah উইনস্টন চার্চিল কেন পাকিস্তানের প্রকৃত স্থপতি ও জাতির পিতা? । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ 3 মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ [ Muhammad Ali Jinnah ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2014/02/Muhammad-Ali-Jinnah.jpg)
২. জিন্নাহ ও চার্চিলের গোপন আঁতাত: ‘মিস এলিজাবেথ’ ও ছদ্মনাম
ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও বিতর্কিত প্রমাণ হলো উইনস্টন চার্চিল এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী গোপন যোগাযোগ। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সংলাপ ছিল না, বরং ছিল ব্রিটিশ ভাইসরয় বা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের নজর এড়াতে চার্চিল কর্তৃক উদ্ভাবিত এক বিচিত্র এবং গোয়েন্দাসুলভ ছক।
ক) গোপন যোগাযোগের নেপথ্য কারণ
১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চার্চিল যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের বড় লাট বা ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল এবং কংগ্রেসের নেতাদের নজরদারির মধ্যে সরাসরি জিন্নাহকে সমর্থন দেওয়া কূটনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তিনি এক অতি-গোপনীয় চ্যানেল তৈরি করেন। চার্চিল জিন্নাহকে স্পষ্টভাবে অনুরোধ করেছিলেন যেন তিনি সরাসরি ডাউনিং স্ট্রিটে চিঠি না পাঠিয়ে চার্চিলের ব্যক্তিগত সচিব ‘মিস এলিজাবেথ হ্যান্ডলি-সিমোর’-এর বাড়ির ঠিকানায় চিঠি পাঠান।
খ) ‘ব্যক্তিগত বন্ধু’ বনাম ‘কৌশলগত ঘুঁটি’
১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাসে লন্ডনে একটি গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর চার্চিল এবং জিন্নাহর মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই মূলত জিন্নাহর প্রতি চার্চিলের নিঃশর্ত সমর্থনের চূড়ান্ত নীল নকশা তৈরি হয়। চার্চিল জিন্নাহকে কথা দিয়েছিলেন যে, ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টি হাউস অফ কমন্স এবং হাউস অফ লর্ডসে পাকিস্তানের দাবিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।
চার্চিল জিন্নাহকে লেখা এক চিঠিতে পরামর্শ দিয়েছিলেন—“Don’t take a decision on the Cabinet Mission Plan until you hear from me.” এটি প্রমাণ করে যে, জিন্নাহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কদম ফেলার আগে লন্ডনের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় থাকতেন।
গ) লন্ডনের ব্লু-প্রিন্ট বনাম লাহোর প্রস্তাব
সাধারণভাবে মনে করা হয় পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে। কিন্তু গোপন নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানের চূড়ান্ত ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কাঠামো বা ব্লু-প্রিন্ট লাহোর বা করাচিতে নয়, বরং ডাউনিং স্ট্রিট এবং চার্চিলের ব্যক্তিগত ড্রয়িং রুমে চূড়ান্ত হয়েছিল।
মিস এলিজাবেথের ঠিকানায় পাঠানো জিন্নাহর সেই চিঠিগুলোতে তিনি বারবার চার্চিলকে ‘সাম্রাজ্যের রক্ষাকর্তা’ হিসেবে সম্বোধন করতেন এবং চার্চিল তাকে আলাদা রাষ্ট্রের দাবিতে অটল থাকতে মানসিক ও রাজনৈতিক ‘অক্সিজেন’ জোগাতেন।
ঘ) ব্রিটিশ গোয়েন্দা নজরদারির বাইপাস
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস বা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো যখন কংগ্রেস নেতাদের প্রতিটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল, তখন চার্চিল স্বয়ং সেই গোয়েন্দা জালকে বাইপাস করে জিন্নাহর সাথে যোগসাজশ রক্ষা করতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল একটাই—কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের সামনে জিন্নাহকে এমন এক অনমনীয় প্রাচীর হিসেবে দাঁড় করানো, যাকে টপকানো নেহরু বা প্যাটেলের পক্ষে সম্ভব না হয়। জিন্নাহকে দেওয়া চার্চিলের এই গোপন নিশ্চয়তাই পাকিস্তান সৃষ্টির পথকে প্রশস্ত করেছিল।

৩. রাজনৈতিক ‘ভেটো’ ও মুসলিম লীগের উত্থান
উইনস্টন চার্চিল কংগ্রেসের অনমনীয় জাতীয়তাবাদকে চূর্ণ করার জন্য মুসলিম লীগকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট; জিন্নাহকে যদি নেহরু ও গান্ধীর সমানুপাতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তবে কংগ্রেসের একচ্ছত্র নেতৃত্বকে রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। এই কৌশলের মাধ্যমেই তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের পালে চূড়ান্ত হাওয়া দেন এবং দেশভাগকে একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে রূপান্তর করেন।
জিন্নাহর হাতে ‘স্থায়ী ভেটো’র ক্ষমতা
চার্চিল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই ১৯৪০ সালের আগস্ট মাসে একটি বিশেষ ঘোষণা দেন, যা ইতিহাসে ‘আগস্ট অফার’ নামে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে এটি বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয়দের সমর্থন পাওয়ার একটি সাধারণ চেষ্টা মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর রাজনৈতিক ফাঁদ। এই ঘোষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, ভারতের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষ বা গোষ্ঠীর ওপর নতুন কোনো শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হবে না, যাদের কর্তৃত্ব ব্রিটিশ সরকার স্বীকার করে।
এই একটিমাত্র ঘোষণার মাধ্যমে চার্চিল জিন্নাহর হাতে এমন এক ‘স্থায়ী ভেটো’ তুলে দেন, যা ভারতীয় রাজনীতির সমীকরণ চিরতরে বদলে দেয়। এর ফলে কংগ্রেস ব্রিটিশদের সাথে দেশের স্বাধীনতার বিষয়ে কোনো ঐক্যের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইলেও জিন্নাহর একটিমাত্র ‘না’ শব্দই সেই প্রস্তাবকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। জিন্নাহ কার্যত ভারতের শাসনতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠেন এবং চার্চিল নিশ্চিত করেন যে জিন্নাহর সম্মতি ছাড়া কংগ্রেস যেন এক পা-ও এগোতে না পারে।
কংগ্রেসের কারাবাস ও রাজনৈতিক শূন্যতা
এরপর ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধী যখন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দেন, চার্চিল একে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে চরম রাজদ্রোহ হিসেবে গণ্য করেন এবং অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করেন। চার্চিলের সরাসরি নির্দেশে গান্ধী, নেহরু, প্যাটেলসহ কংগ্রেসের প্রায় দশ হাজার শীর্ষ নেতাকে কারাবন্দী করা হয়। এর ফলে প্রায় তিন বছর ভারতের মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে কংগ্রেসের কোনো কার্যকর অস্তিত্ব ছিল না।
এই দীর্ঘ সময় যখন কংগ্রেসের মূল নেতৃত্ব জেলে নিশ্চুপ হয়ে পড়েছিলেন, চার্চিল তখন সুকৌশলে জিন্নাহ ও মুসলিম লীগকে রাজনৈতিক মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর অবাধ ও অবারিত সুযোগ করে দেন। ব্রিটিশ সরকার জিন্নাহকে পূর্ণ রাজনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করে এবং তাকে কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে। এই সময়টিকে চার্চিল ব্যবহার করেছিলেন জিন্নাহর রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে।
মুসলিম লীগের নাটকীয় উত্থান ও ব্রিটিশ ‘অক্সিজেন’
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো মুসলিম লীগের এই নাটকীয় উত্থান। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনেও যে মুসলিম লীগ ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে শোচনীয়ভাবে হেরেছিল, চার্চিলের বিশেষ রাজনৈতিক কৃপায় সেই লীগ মাত্র চার বছরে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়। চার্চিলের প্রশাসন মুসলিম লীগকে ‘ভারতীয় মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দিয়েছিল।
যখন কংগ্রেস নেতারা জেলে ধুঁকছিলেন, তখন জিন্নাহ ব্রিটিশদের সরাসরি ছত্রছায়ায় মুসলিম লীগের সদস্য সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেন এবং পাকিস্তানের দাবিকে প্রান্তিক গ্রাম-গঞ্জেও পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। চার্চিলের তৈরি করে দেওয়া এই রাজনৈতিক ‘অক্সিজেন’ এবং একচেটিয়া সুযোগ ছাড়া মুসলিম লীগের পক্ষে এত দ্রুত একটি প্রান্তিক দল থেকে ব্রিটিশদের প্রধান অংশীদারে পরিণত হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। মূলত চার্চিলই জিন্নাহকে নেহরুর সমান রাজনৈতিক উচ্চতায় বসিয়েছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে ভারত ভাগ ছাড়া ব্রিটিশদের আর কোনো পথ খোলা না থাকে।

৪. ক্রিপস মিশন: দেশভাগের প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ
১৯৪২ সালের ক্রিপস মিশনকে সাধারণ ইতিহাসবিদরা অনেক সময় একটি ‘ব্যর্থ মিশন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। কারণ এটি কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ—কারো পূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু উইনস্টন চার্চিলের সুদূরপ্রসারী কৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই মিশনটি ছিল তার জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক বিজয়। চার্চিল জানতেন যুদ্ধের ডামাডোলে ভারতকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তিনি এমন একটি প্রস্তাব সামনে আনতে চেয়েছিলেন যা দেশভাগের পথকে আইনিভাবে বৈধতা দেবে।
‘অপশন টু আউট’ ক্লজ: দেশভাগের আইনি বীজ
ক্রিপস মিশনের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছিল এর ‘অপশন টু আউট’ (Opt-out) ক্লজ। এই শর্তে বলা হয়েছিল যে, ভারতের যেকোনো প্রদেশ বা দেশীয় রাজ্য যদি প্রস্তাবিত নতুন ভারতীয় ইউনিয়নের শাসনতন্ত্র পছন্দ না করে, তবে তারা সেই ইউনিয়নে যোগ না দিয়ে নিজেদের পৃথক রাখতে পারবে। তারা চাইলে ব্রিটিশদের সাথে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র বা স্বায়ত্তশাসন বেছে নিতে পারবে।
এটিই ছিল ব্রিটিশ সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক দলিলে পাকিস্তানের ধারণার প্রথম পরোক্ষ আইনি স্বীকৃতি। চার্চিল অত্যন্ত সচেতনভাবে এই শর্তটি যুক্ত করেছিলেন। তিনি জানতেন নেহরু বা প্যাটেলের মতো জাতীয়তাবাদী নেতারা ভারতের এই ‘বলকানাইজেশন’ বা খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার প্রস্তাব কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। আর কংগ্রেস যখন এটি প্রত্যাখ্যান করবে, তখন মুসলিম লীগের কাছে পাকিস্তান দাবির সপক্ষে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক যুক্তি তৈরি হবে।
কংগ্রেসের ফাঁদে পড়া ও চার্চিলের সাফল্য
মহাত্মা গান্ধী এই প্রস্তাবকে ‘একটি দেউলিয়া ব্যাংকের ওপর ভবিষ্যতের তারিখ দেওয়া চেক’ (A post-dated cheque on a crashing bank) বলে অভিহিত করেছিলেন। চার্চিল ঠিক এটিই চেয়েছিলেন। কংগ্রেস যখন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল, তখন চার্চিল বিশ্ববাসীর কাছে, বিশেষ করে আমেরিকার কাছে প্রমাণ করার সুযোগ পেলেন যে—ব্রিটিশরা ভারতকে ক্ষমতা দিতে চায়, কিন্তু ভারতীয় নেতারাই নিজেদের মধ্যে একমত হতে পারছে না।
এই মিশনের মাধ্যমে চার্চিল অত্যন্ত চতুরতার সাথে দেশভাগের বীজটি ভারতের শাসনতান্ত্রিক দলিলে স্থায়ীভাবে পুঁতে দিয়েছিলেন। ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হলেও এটি জিন্নাহর ‘পাকিস্তান’ দাবিকে একটি নিছক রাজনৈতিক স্লোগান থেকে আইনি সম্ভাব্যতায় উন্নীত করে। এর ফলে ভারত বিভক্তি কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় এবং চার্চিলের সেই ‘বাফার স্টেট’ তৈরির স্বপ্নটি বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে।

৫. কৌশলগত তুলনা: জিন্নাহ বনাম চার্চিলের ভূমিকা
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পাকিস্তান চিন্তা কোনো আদর্শিক বা সুসংগঠিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। তিনি একটি পৃথক রাষ্ট্রের ডাক দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখা বা শাসনতন্ত্র কেমন হবে, সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘ব্লু-প্রিন্ট’ তিনি দিতে পারেননি। পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল মূলত সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে, কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পরপরই জিন্নাহর বক্তব্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায়।
রূপরেখাহীন রাষ্ট্র:
জিন্নাহ পাকিস্তান সৃষ্টির আগে বা পরে কোনো সময়েই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো বা আদর্শিক দিশা দিতে পারেননি। যে সাম্প্রদায়িক আবেগকে পুঁজি করে দেশ ভাগ হলো, রাষ্ট্র গঠনের পর জিন্নাহ হঠাৎ ঘোষণা করে বসলেন যে পাকিস্তান হবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তার এই ঘোষণা পরবর্তীতে পাকিস্তানের শাসকমহল বা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা ডিরেকশন খুঁজে পায়নি।
প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সীমাবদ্ধতা:
জিন্নাহ দেশ ভেঙে পাকিস্তান সৃষ্টি করতে পারলেও একটি নতুন জাতি গঠনের কারিগর হতে পারেননি। তার জীবদ্দশায় তিনি শাসনতন্ত্রের কোনো ভিত্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হন। ফলে পাকিস্তান একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ার বদলে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চারণভূমিতে পরিণত হয়।
চার্চিলের কৌশলী জয়:
এই অরাজকতা ও দিশাহীনতা মূলত চার্চিলের উদ্দেশ্যকেই সফল করেছিল। চার্চিল কখনোই চাননি পাকিস্তান একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠুক; তার লক্ষ্য ছিল একটি অনুগত ‘বাফার স্টেট’। জিন্নাহর কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় সেই সুযোগটি নেয় পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল।
অপরিবর্তিত শোষণ ব্যবস্থা:
পাকিস্তানে ব্রিটিশ আমলের সেই সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো বা জমিদার প্রথা বিলুপ্ত হয়নি। সাধারণ মানুষের জন্য যে ‘ইসলামিক ইনসাফ’ বা সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা অলীক কল্পনাতেই থেকে যায়। বাস্তবে শুধু শোষকের চেহারা বদলেছে—হিন্দু জমিদারদের জায়গা দখল করেছে পাকিস্তানি মুসলিম জমিদার, বড় শিল্পপতি, প্রভাবশালী মোল্লা এবং সর্বুপরি সামরিক বাহিনী।
জিন্নাহর এই আদর্শিক অস্পষ্টতা পাকিস্তানকে একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত করে, যা চার্চিলের সেই পুরনো ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ এবং ‘কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ’ নীতিকেই দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেয়। জিন্নাহ যেখানে শুধুমাত্র একটি মানচিত্র তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন, চার্চিল সেখানে একশ বছরের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করে গিয়েছিলেন।

৬. মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও পাকিস্তানের ভৌগোলিক গুরুত্ব
উইনস্টন চার্চিলের যুদ্ধকালীন ক্যাবিনেট নোট এবং অবমুক্ত হওয়া গোপন নথিপত্রগুলো ঘাঁটলে একটি চমকপ্রদ অনেক সত্য বেরিয়ে আসে—পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে ধর্ম আসলে কোনো মুখ্য বিষয় ছিল না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীতিনির্ধারকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ‘তেল’ এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ যখন বদলে যাচ্ছিল, তখন ব্রিটিশ জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটির রিপোর্টে বারবার একটি বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল: মধ্যপ্রাচ্যের তেল খনিগুলো রক্ষা করতে হলে এই অঞ্চলে ব্রিটিশদের একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি প্রয়োজন।
নেহরুর নিরপেক্ষতা বনাম চার্চিলের প্রয়োজনীয়তা
ব্রিটিশদের এই কৌশলগত ভাবনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন জওহরলাল নেহরু। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছিলেন যে, স্বাধীন ভারত কোনোভাবেই কোনো বিদেশি সামরিক জোটে জড়াবে না কিংবা নিজের মাটিতে কাউকে সামরিক ঘাঁটি গড়তে দেবে না। নেহরুর এই অনমনীয় জাতীয়তাবাদী অবস্থান চার্চিল ও ব্রিটিশ ‘ডিপ স্টেট’-কে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। তারা বুঝতে পারে যে, ঐক্যবদ্ধ ভারত স্বাধীন হলে ব্রিটিশরা তাদের পুরনো সাম্রাজ্যিক আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে না।
করাচি ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত: একটি পরিকল্পিত ঘাঁটি
এমতাবস্থায় ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকরা অনুধাবন করেন যে, করাচি বন্দর এবং ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত নিয়ে একটি নতুন অনুগত দেশ গঠন করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। এই অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে পারস্য উপসাগর এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের একেবারে কাছে হওয়ায় সামরিক দিক থেকে এটি ছিল অমূল্য। চার্চিল চেয়েছিলেন এমন একটি রাষ্ট্র, যারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই সবসময় ব্রিটিশদের মুখাপেক্ষী থাকবে এবং বিনিময়ে ব্রিটিশদের সামরিক ও বিমান ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেবে।
একটি ‘স্থায়ী বিমানবাহী রণতরী’
ঐতিহাসিকদের মতে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ছিল মূলত ব্রিটিশদের জন্য ভারত মহাসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রবেশদ্বারে অবস্থানরত একটি ‘স্থায়ী বিমানবাহী রণতরী’। চার্চিলের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—যদি ভারত তাদের হাতছাড়া হয়েও যায়, তবু যেন করাচি এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানকে ব্যবহার করে ব্রিটিশরা একদিকে যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নকে নজরে রাখতে পারত, অন্যদিকে তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারত। ফলে পাকিস্তান সৃষ্টি ছিল চার্চিলের একটি নিখুঁত ‘এনার্জি সিকিউরিটি’ বা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মিশন।

৭. বিরোধী দলে থেকেও দাবার চাল (১৯৪৫-৪৭)
১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির পরাজয় এবং উইনস্টন চার্চিলের ক্ষমতাচ্যুতি অনেককে অবাক করেছিল। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পরেও পাকিস্তানের লক্ষ্যপূরণে চার্চিলের তৎপরতা বিন্দুমাত্র থামেনি। বরং বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আরও বেশি সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তিনি তৎকালীন লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলিকে অনবরত রাজনৈতিক চাপে রাখতে থাকেন যেন ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় মুসলমানদের কৌশলগত স্বার্থ তথা ব্রিটিশদের ভবিষ্যৎ সামরিক স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া না হয়।
পার্লামেন্টারি যুদ্ধ ও জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণা
চার্চিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিতর্কে অত্যন্ত সচেতনভাবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে একটি ‘হিন্দু ব্রাহ্মণদের আধিপত্যশীল দল’ হিসেবে চিত্রিত করতে শুরু করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মহলে এবং ব্রিটিশ জনমতে এটি প্রতিষ্ঠিত করা যে, ব্রিটিশরা চলে গেলে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানরা নির্যাতিত হবে। এই বর্ণনার মাধ্যমেই তিনি জিন্নাহর আলাদা দেশের দাবিকে একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। চার্চিলের এই রাজনৈতিক ‘ন্যারেটিভ’ জিন্নাহর অবস্থানকে বিশ্ব দরবারে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
কমনওয়েলথ এবং ব্রিটিশ ‘এয়ারফিল্ড’
চার্চিলের এই সমর্থনের পেছনে পাকিস্তানের প্রতি কোনো দয়া বা মায়া কাজ করেনি। এর মূলে ছিল নিখাদ সাম্রাজ্যবাদী হিসাব। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের পর পাকিস্তান যখন ব্রিটিশ কমনওয়েলথে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন চার্চিল ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত স্বস্তি ও খুশি প্রকাশ করেছিলেন। কারণ নেহরুর ভারত প্রথম থেকেই কমনওয়েলথে থাকা বা না থাকা নিয়ে সংশয়ে ছিল এবং তারা ব্রিটিশদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসছিল। চার্চিল চেয়েছিলেন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশদের অন্তত একটি বিশ্বস্ত সামরিক ঘাঁটি বা ‘এয়ারফিল্ড’ বজায় থাকুক, যা পাকিস্তান নিশ্চিত করেছিল।
কৌশলী আইনজীবী বনাম পূর্বনির্ধারিত রায়
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে দেখা যায়, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন একজন অসাধারণ ধুরন্ধর কৌশলবিদ এবং অত্যন্ত তুখোড় আইনজীবী। তিনি তার মামলার প্রতিটি যুক্তি সাজিয়েছিলেন সুনিপুণভাবে। কিন্তু সেই ‘গ্রেট গেম’-এর আদালতে চার্চিল ছিলেন এমন এক ক্ষমতাধর ‘জাজ’ বা বিচারক, যিনি মামলার শুনানি শেষ হওয়ার আগেই রায়টি জিন্নাহর পক্ষে লিখে রেখেছিলেন। জিন্নাহ পাকিস্তানের স্রষ্টা হিসেবে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই নামের পেছনের আসল কারিগর ছিলেন চার্চিল, যিনি তার বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে একটি স্থায়ী ‘বাফার স্টেট’ পাওয়ার জন্য জিন্নাহকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও আইনি ঢাল প্রদান করেছিলেন।

৮. জিন্নাহ কি একা সফল হতেন?
প্রশ্ন ওঠে, চার্চিলের এই রাজনৈতিক ও সামরিক অভিসন্ধি ছাড়া জিন্নাহ কি পাকিস্তান তৈরি করতে পারতেন? উত্তর হলো—না, পারতেন না। কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনই শূন্য থেকে আসে না। জিন্নাহর ব্যক্তিগত মেধা থাকলেও, ব্রিটিশ রাষ্ট্রযন্ত্রের পূর্ণ সমর্থন ছাড়া পাকিস্তান আন্দোলন মাঝপথেই থমকে যেত। কেন জিন্নাহ একা এটি করতে পারতেন না, তার পেছনে থাকা শক্তিশালী কারণ ও প্রমাণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
ক) শেরে বাংলা ও বাংলার নেতাদের ওপর গোয়েন্দা চাপ
তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে মুসলিম লীগের চেয়েও জনপ্রিয় ছিল শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের ‘কৃষক প্রজা পার্টি’। কিন্তু ব্রিটিশদের ‘গ্রেট গেম’ সফল করতে হলে পুরো ভারতের মুসলমানদের জিন্নাহর পতাকাতলে একতাবদ্ধ দেখানো জরুরি ছিল। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তখন সক্রিয়ভাবে ফজলুল হকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ইতিহাস বলে, ফজলুল হককে একপ্রকার বাধ্য করা হয়েছিল মুসলিম লীগের সাথে জোট বাঁধতে এবং লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করতে। ফজলুল হকের মতো জননেতাকে যদি ব্রিটিশরা গোয়েন্দা মারফত নিয়ন্ত্রণ না করত, তবে জিন্নাহর পক্ষে বাংলায় আধিপত্য বিস্তার করা ছিল প্রায় অসম্ভব।
খ) ঢাকার নবাব ও আভিজাত্য শ্রেণিকে আর্থিক প্রলোভন
পাকিস্তান আন্দোলনের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ছিল তৎকালীন অভিজাত মুসলিম জমিদার ও নবাবরা। ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্যমতে, ঢাকার নবাব এবং উত্তর ভারতের জমিদারদের পাকিস্তান সমর্থন করার বিনিময়ে বিশাল অংকের অর্থ ও সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ঢাকার নবাবদের পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে রাখার জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার সমমানের সুবিধা ও রাজনৈতিক অভয় প্রদান করা হয়। এই বিপুল পরিমাণ পুঁজির জোগান এবং আভিজাত্য শ্রেণির সমর্থন না থাকলে মুসলিম লীগ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারত না।
গ) সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্লু-প্রিন্ট
রাষ্ট্র গঠনের জন্য শুধু জনসমর্থন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির একটি বিশাল অংশ এবং দক্ষ আমলাতন্ত্রকে পাকিস্তানের অনুকূলে ভাগ করে দেওয়ার পেছনে চার্চিলপন্থী ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের বড় ভূমিকা ছিল। তারা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে পাঞ্জাব ও সিন্ধুর সামরিক কর্মকর্তাদের পাকিস্তানের স্বার্থে মানসিকভাবে তৈরি করেছিলেন। এটি ছিল চার্চিলের নির্দেশে ব্রিটিশ ‘ডিপ স্টেট’-এর একটি সুদূরপ্রসারী প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র।
ঘ) আন্তর্জাতিক বৈধতা (The US Factor)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার প্রভাব বাড়লে তারা প্রথমে ভারত ভাগ চায়নি। আমেরিকা চেয়েছিল একটি ঐক্যবদ্ধ ভারত, যা সোভিয়েতদের রুখে দেবে। কিন্তু চার্চিল রুজভেল্ট এবং পরবর্তীকালে ট্রুম্যানকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, জিন্নাহর মুসলিম লীগকে ছাড়া এই অঞ্চলে কোনো স্থিতিশীল সমাধান সম্ভব নয়। চার্চিলের এই নিরন্তর কূটনৈতিক তদবিরের ফলেই জিন্নাহর দাবির পেছনে আন্তর্জাতিক ‘সিলমোহর’ পড়ে।
ঙ) কংগ্রেসের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা ও ব্রিটিশ ‘ভেটো’
নেহরু ও প্যাটেলের নেতৃত্বে কংগ্রেস তখন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তারা চাইলেই মুসলিম লীগের দাবিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নস্যাৎ করতে পারত। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার শুরু থেকেই জিন্নাহর পেছনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তারা জিন্নাহকে প্রতিটি আলোচনায় একটি স্থায়ী ‘ভেটো পাওয়ার’ দিয়েছিল। ব্রিটিশদের এই প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় না থাকলে কংগ্রেসের শক্তিশালী নেতৃত্বের মুখে জিন্নাহর দাবি কোনোভাবেই টিকে থাকতে পারত না।
এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, জিন্নাহ ছিলেন সেই দাবার চাল যাকে চার্চিল এবং ব্রিটিশ রাষ্ট্রশক্তি অত্যন্ত যত্নের সাথে ব্যবহার করেছিলেন। শেরে বাংলাকে দমন করা থেকে শুরু করে ঢাকার নবাবদের তুষ্ট করা—সবই ছিল লন্ডনের সেই সুনিপুণ স্ক্রিপ্টের অংশ। পাকিস্তান তাই কোনো আকস্মিক সৃষ্টি নয়, বরং ব্রিটিশ গোয়েন্দা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সুপরিকল্পিত হস্তক্ষেপের চূড়ান্ত ফলাফল।

৯. চার্চিলের উত্তরসূরি হিসেবে আমেরিকা: মালিক বদল, কিন্তু ভূমিকা এক
১৯৪৭ সালের পর প্রশ্ন উঠেছিল, পাকিস্তান কি চার্চিলের সেই “সোভিয়েত রোধী বাফার স্টেট” হিসেবে সফল হবে? সময় প্রমাণ করেছে, পাকিস্তান সেই বাফার স্টেট হিসেবেই রয়ে গেছে। তফাৎ শুধু এটুকুই যে, মালিক বদলেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়লে চার্চিলের সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাটি আমেরিকার হাতে হস্তান্তরিত হয়।
পাহারাদার হিসেবে পাকিস্তান:
১৯৫০-এর দশকে পাকিস্তান যখন SEATO এবং CENTO-এর মতো সামরিক জোটে যোগ দেয়, তখন থেকেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমা ব্লকের পাহারাদার হিসেবে কাজ শুরু করে। ব্রিটিশ পাউন্ডের জায়গা নেয় আমেরিকান ডলার।
আফগান যুদ্ধ ও ‘গ্রেট গেম’ ২.০:
আশির দশকে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে ঢোকে, তখন চার্চিলের সেই পুরনো ভয় সত্য হয়। আমেরিকা তখন ঠিক সেই “বাফার” সুবিধাটিই ব্যবহার করে যা চার্চিল কল্পনা করেছিলেন। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনী আমেরিকার অর্থে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ লড়ে। এটি ছিল মূলত ব্রিটিশদের পুরনো ‘গ্রেট গেম’-এরই একটি আমেরিকান সংস্করণ।
‘ওয়ার অন টেরর’ ও ভাড়ার রাষ্ট্র:
আমেরিকার সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল দ্বিমুখী। একদিকে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ‘কোলিশন সাপোর্ট ফান্ড’ নিয়েছে, অন্যদিকে এই অঞ্চলের রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Rentier State’ বা ‘ভাড়ার রাষ্ট্র’। পাকিস্তান মূলত বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে তার ভৌগোলিক অবস্থানকে “ভাড়া” দিয়েই টিকে আছে।

১০. পাকিস্তান কেন আজও এই চক্রে বন্দি?
পাকিস্তানের ক্ষমতার কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে কখনোই প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা গড়ে ওঠেনি। এর মূলে রয়েছে একটি শক্তিশালী ত্রিভুজ আঁতাত।
মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স:
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কেবল একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়, এটি একটি বিশাল কর্পোরেট সাম্রাজ্য। আবাসন প্রকল্প থেকে শুরু করে সার কারখানা—সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে। যখন একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দুক এবং চেক বই উভয়ই থাকে, তখন তারা কখনোই সিভিলিয়ান নেতৃত্বকে শক্তিশালী হতে দেয় না। আমেরিকা এই স্বার্থটি খুব ভালো বোঝে, তাই তারা জনগণের বদলে জেনারেলদের সাথে ডিল করা সহজ মনে করে।
জমিদার ও মোল্লা-মিলিটারি এলায়েন্স:
পাকিস্তানের শুরুতে ক্ষমতা ছিল জমিদার ও মিলিটারির হাতে। পরবর্তীতে এর সাথে যুক্ত হয় ‘মোল্লা’ বা ধর্মীয় গোষ্ঠী। জিয়া-উল-হকের আমল থেকে শুরু হওয়া এই আঁতাত সমাজকে এমনভাবে বিভক্ত করেছে যে, যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এখন খুব সহজেই “ধর্মবিদ্বেষী” ট্যাগ দিয়ে দমন করা যায়। আর্মি এখানে “মডারেটর” হিসেবে অভিনয় করে, কিন্তু পর্দার আড়াল থেকে তারাই কলকাঠি নাড়ে।

১১. বর্তমান ও ভবিষ্যৎ: কোনো আশার আলো কি আছে?
বর্তমানে পাকিস্তানে দ্রুত গণতন্ত্র আসার সুযোগ ক্ষীণ। কারণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ বা সেনাবাহিনীর নীতি কখনো পরিবর্তন হয় না।
আমেরিকান লেভারেজ:
আমেরিকার জন্য পাকিস্তান একটি ‘প্রয়োজনীয় মন্দ’ (Necessary Evil)। আল-কায়েদা বা আইএসআইএস দমানোর জন্য আমেরিকার এখনও পাকিস্তানের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করতে হয়।
ইউএন মিশন ও গ্লোবাল ইমেজ:
সেনাবাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য পাঠিয়ে যে বৈদেশিক মুদ্রা ও পেশাদার ইমেজ তৈরি করে, তাও তাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকে পোক্ত করে। আমেরিকা এই সুযোগ-সুবিধাগুলো বহাল রেখে আর্মিকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে।

১২. চার্চিলের উত্তরাধিকার
উইনস্টন চার্চিল যে ‘বাফার স্টেট’-এর স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজ এক বিশাল দানবে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান এখন এমন এক চক্রে আটকে আছে যেখানে সেনাবাহিনী রাষ্ট্র চালায়, আর রাষ্ট্র চালায় বিদেশের ঋণ ও অনুদান। শক্তিশালী মধ্যবিত্ত সমাজ এবং বড় মাপের শিল্পায়ন ছাড়া এই ‘জমিদার-মিলিটারি-মোল্লা’ চক্র ভাঙা প্রায় অসম্ভব।
জিন্নাহর মেধা ও নেতৃত্বের পেছনে যদি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং চার্চিলের ব্যক্তিগত সমর্থন না থাকত, তবে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন সম্ভবত একটি অসম্ভব স্বপ্নই থেকে যেত। তাই ঐতিহাসিক সত্যের নিরিখে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি যতটা না লাহোর প্রস্তাবের ফসল, তার চেয়ে অনেক বেশি লন্ডনের ‘গ্রেট গেম’-এর চূড়ান্ত জয়।
আজ চার্চিল বেঁচে থাকলে দেখতেন, তার তৈরি করা সেই পরিখাটি আজও সচল। শুধু তফাৎ হলো, সেই পরিখার পাহারাদারদের বেতন এখন ব্রিটিশ পাউন্ডের বদলে আমেরিকান ডলারে পরিশোধ করা হচ্ছে। সিপেক (CPEC)-এর মাধ্যমে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কি এই মালিকানা আবারও বদলে দেবে? সেটি হয়তো কেবল “মালিক বদল” ছাড়া আর কিছুই হবে না, কারণ পাকিস্তানের ক্ষমতার মূলে থাকা সেই চার্চিলীয় ‘বাফার স্টেট’ দর্শন আজও অপরিবর্তিত। তথ্যের ভিত্তিতে এটিই বর্তমান সময়ের এক কঠোর ও অকাট্য সত্য।

রেফারেন্স:
এই আর্টিকেলে উল্লিখিত ঐতিহাসিক তথ্য ও বিশ্লেষণের জন্য নিম্নলিখিত উৎসসমূহ ব্যবহার করা হয়েছে:
- Sarila, Narendra Singh (2005). The Shadow of the Great Game: The Untold Story of India’s Partition. HarperCollins. (এটি আর্টিকেলের মূল ভিত্তি, যা ব্রিটিশদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের গোপন নথিপত্র উন্মোচন করেছে)।
- Dhulipala, Venkat (2015). Creating a New Medina: State Power, Islam, and the Quest for Pakistan in Late Colonial North India. Cambridge University Press. (জিন্নাহর রাজনৈতিক কৌশল ও ব্রিটিশদের ভূমিকার ওপর বিস্তারিত গবেষণা)।
- Wolpert, Stanley (1984). Jinnah of Pakistan. Oxford University Press. (জিন্নাহর জীবনী এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সাথে তার সম্পর্কের বিশ্লেষণ)।
- Segev, Tom (2010). One Palestine, Complete: Jews and Arabs Under the British Mandate. (ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘বাফার স্টেট’ ও ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসির তুলনামূলক আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক)।
- Churchill Archives Centre, Cambridge: The Churchill Papers (File Ref: CHUR 2/22, CHUR 2/225). জিন্নাহ এবং চার্চিলের মধ্যকার ব্যক্তিগত ও গোপন চিঠিপত্রের মূল উৎস।
- British National Archives (Kew, London): Transfer of Power Papers (1942–1947). বিশেষ করে ক্যাবিনেট মিশন, ক্রিপস মিশন এবং মাউন্টব্যাটেন পেপারস।
- Joint Intelligence Committee (JIC) Reports: ১৯৪৫-৪৬ সালের ব্রিটিশ গোয়েন্দা রিপোর্টসমূহ, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের তেল এবং সোভিয়েত বিরোধী বাফার স্টেট হিসেবে পাকিস্তানের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে।
- Wavell, Archibald (1973). Wavell: The Viceroy’s Journal. (লর্ড ওয়াভেলের ডায়েরি, যা জিন্নাহর প্রতি চার্চিলের বিশেষ দুর্বলতা ও সমর্থনের সাক্ষ্য দেয়)।
- Ismay, Lord (1960). The Memoirs of General Lord Ismay. (মাউন্টব্যাটেনের চিফ অফ স্টাফের স্মৃতিচারণ, যেখানে ব্রিটিশ সামরিক কৌশল স্পষ্ট হয়েছে)।
- The Churchill-Jinnah Correspondence: ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক পোর্টালে সংরক্ষিত এলিজাবেথ হ্যান্ডলি-সিমোরের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা চিঠির অনুলিপি।
- BBC History/Al Jazeera Documentaries: দক্ষিণ এশিয়া বিভক্তি এবং এতে চার্চিলের ভূমিকা নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র।
এই আর্টিকেলটি মূলত ব্রিটিশ ‘ডিপ স্টেট’ এবং চার্চিলের ভূ-রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে ভারত বিভক্তিকে বিশ্লেষণ করার একটি প্রচেষ্টা। এখানে ব্যবহৃত প্রতিটি ঐতিহাসিক চরিত্রের ভূমিকা সমকালীন দাপ্তরিক নথির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আরও দেখুন:
