আমাদের যে তালিম, তাতে মুরুব্বীদের মূল্যায়নের জন্য সমালোচনাও করা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, তাই নেতিবাচক সমালোচনা একেবারেই আমাদের তালিম বিরোধী। এই কারণে ইচ্ছে করে তো দূরে থাক, পারত পক্ষে আমরা ভাসানী হুজুরের নামে নেতিবাচক কিছু লিখতে চাই না। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু লোক না বুঝে, আর বঙ্গবন্ধু বিরোধীরা চতুরতা করে হুজুরকে রাজনীতিতে একটা মজলুম ও অতিকায় চেহারা দিতে চায়। পারলে তারা হুজুরকে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বড় ও ত্যাগী নেতা বানিয়ে দেন। সেসময় বাধ্য হয়ে আমাদের লিখতে হয়। সেজন্যই আজকের লেখা। লেখার শুরুতে হুজুরের জন্য দোয়া করি। পাশাপাশি তাঁর লিগেসি এবং তাঁর ভক্তদের জন্য করুণা পোষণ করি।
রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু থাকে না—এই প্রবাদটি আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু যখন এই প্রবাদের নিষ্ঠুর বাস্তবায়ন ঘটে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের দুই মহানায়কের জীবনের শেষ অঙ্কে, তখন তা কেবল এক চরম রাজনৈতিক ট্র্যাজেডিই তৈরি করে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে জন্ম দেয় এক তীব্র ক্ষোভ এবং হাজারো অনুচ্চারিত প্রশ্ন। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতা ছিলেন। তিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের (পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। বাঙালি জাতিকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক সুতোয় বাঁধার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরদের একজন ছিলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর ভাসানী হুজুরের প্রতিক্রিয়া
কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায় এবং স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি আওয়ামী লীগের মূল ধারার রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে মওলানা ভাসানী তৎকালীন ক্ষমতাসীন বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ দুর্ভিক্ষের পটভূমি এবং জাসদ ও অন্যান্য বামপন্থীদের উগ্র তৎপরতার ভেতর দাঁড়িয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রকাশ্য সমালোচকে পরিণত হন।
তবে, রাজনৈতিকভাবে চরম বৈরিতা ও মুখোমুখি অবস্থান থাকলেও, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর এই রাজনৈতিক গুরুর সাথে ব্যক্তিগত ও আত্মিক সম্পর্ক কখনোই খারাপ করেননি। রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে বসেও বঙ্গবন্ধু নিয়মিত হুজুরের খোঁজখবর রাখতেন, তাঁর চিকিৎসার সুব্যবস্থা করতেন এবং সাধ্যমতো সব ধরনের রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সাহায্য-সহযোগিতা পাঠিয়ে যেতেন। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে কৃষ্ণতম অধ্যায়—১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট, যখন সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো, তখন সেই ভালোবাসার বিপরীতে মওলানা ভাসানী যে রূপ দেখালেন, তা আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায় এক বিরাট অপরাধবোধের জন্ম দেয়।
সত্যি বলতে কী, সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর মওলানা ভাসানীর তৎকালীন রাজনৈতিক ভূমিকা ও প্রকাশ্য অবস্থান ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী’ চরমপন্থী মহলের ভূমিকার চাইতে এক চুল পরিমাণও আলাদা ছিল না।

খুনি চক্র ও আন্তর্জাতিক শক্তির মেলবন্ধন: মোশতাক সরকারের প্রতি ভাসানীর আশীষ
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তিগুলো উল্লাসে ফেটে পড়ে। যে পরাশক্তিগুলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির রক্তের বিরুদ্ধে গিয়ে পাকিস্তানের মরণাস্ত্র জুগিয়েছিল এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তারা তৎক্ষণাৎ স্বস্তি ফিরে পায়। সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং গণচীনের মতো বৈশ্বিক শক্তিগুলো খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদের অবৈধ সামরিক সরকারকে কালবিলম্ব না করে স্বীকৃতি ও প্রকাশ্য সমর্থন দেয়।
ঠিক একই আন্তর্জাতিক সমীকরণে পা মিলিয়েছিলেন একদা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রবক্তা মওলানা ভাসানীও। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সমস্ত নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের চরম বিসর্জন দিয়ে, বাঙালি জাতির পিতার রক্ত তখনো ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে শুকানোর আগেই, তিনি খুনি চক্র ও অবৈধ মোশতাক সরকারকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

সন্তোষ থেকে পাঠানো সেই কুখ্যাত টেলিগ্রাম: মিডিয়ার চোখে ভাসানীর রূপ
ইতিহাস কোনো অস্পষ্ট ধারণা নয়, ইতিহাস টিকে থাকে নথিতে। ১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক দিন পর, অর্থাৎ ১৬ই আগস্ট শনিবার, টাঙ্গাইলের সন্তোষ থেকে মওলানা ভাসানী খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারের প্রতি সরাসরি তাঁর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তৎকালীন রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ‘বাসস’ (BSS) মারফত এই খবরটি ১৭ই আগস্ট (১৯৭৫) বাংলাদেশের প্রধান প্রধান দৈনিকগুলোর প্রথম পাতার প্রধান শিরোনামে চলে আসে।
দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা এবং ইংরেজি দৈনিক দ্য বাংলাদেশ টাইমস (The Bangladesh Times)-এর ১৭ই আগস্টের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মওলানা ভাসানী খন্দকার মোশতাককে অভিনন্দন জানিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক ‘তারবার্তা’ বা টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন।
সংবাদপত্রের সেই সুনির্দিষ্ট বিবরণী অনুযায়ী মওলানা ভাসানীর ভূমিকা ছিল নিম্নরূপ:
অভিনন্দন ও পূর্ণ সমর্থন:
তিনি নবগঠিত খুনি সরকারের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান এবং এই অবৈধ সরকারের প্রতি তাঁর “পূর্ণ সমর্থন” ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডকে ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ আখ্যা:
যে বর্বরোচিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করা হলো, মওলানা ভাসানী তাঁর টেলিগ্রামে সেই রক্তক্ষয়ী পরিবর্তনকে একটি “ঐতিহাসিক পদক্ষেপ” (Historic Step) বলে অভিহিত করেন।
খুনিদের জন্য মোনাজাত ও দোআ:
নৈতিক দেউলিয়াত্বের চরম সীমায় পৌঁছে মওলানা ভাসানী খুনি মোশতাক ও তার সরকারের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ আপনার ও নয়া সরকারের সহায় হোন” (May Allah bless you and the new Government) এবং খুনিদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষণের জন্য বিশেষ প্রার্থনা করেন।
স্বৈরাচারের পক্ষে সাফাই:
তিনি দাবি করেন যে এই নয়া সরকার দেশ থেকে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অবিচার দূর করার জন্য কাজ করবে—যা মূলত খুনিদের রক্তমাখা হাতকে ধুয়ে-মুছে সাফ করার এক নির্লজ্জ রাজনৈতিক চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

অকৃতজ্ঞতার খতিয়ান: এত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এই কি প্রতিদান?
মওলানা ভাসানীর এই রাজনৈতিক ডিগবাজি বা খুনিদের প্রতি তোষণ নীতি কেন বাঙালিকে সবচেয়ে বেশি আহত করে, তা বুঝতে হলে বঙ্গবন্ধুর উদারতার দিকে তাকাতে হবে। বাহাত্তর পরবর্তী সময়ে মওলানা ভাসানী যখনই অসুস্থ হয়েছেন, বঙ্গবন্ধু নিজে সশরীরে বা তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালকে পাঠিয়ে হুজুরের চিকিৎসার তদারকি করেছেন। পিজি হাসপাতালে মওলানা ভাসানীর জন্য বিশেষ কেবিনের ব্যবস্থা থাকত। হুজুর যখনই কোনো দাবিদাওয়া বা অনুযোগ করতেন, বঙ্গবন্ধু তা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে পূরণ করার চেষ্টা করতেন।
কিন্তু এই গভীর শ্রদ্ধা, ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও রাষ্ট্রীয় মৈত্রীর প্রতিদান হিসেবে ভাসানী কী করলেন? তিনি বঙ্গবন্ধুর পুরো বংশকে—যার মধ্যে দশ বছরের নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেল এবং অন্তসত্ত্বা নারীরাও ছিলেন—নির্মমভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া খুনি মেজরদের এবং তাদের রাজনৈতিক মদদদাতা মোশতাকের জন্য হাত তুলে দোআ করে দিলেন। ক্ষমতার পালাবদলের এই পাশবিক খেলায় একজন সুফি-সাধক এবং জননেতার এই অন্ধ রূপ কোনোভাবেই মেলাতে পারে না ইতিহাস। তিনি যেভাবে খুনিদের অভ্যুত্থানকে ‘ঐতিহাসিক মুক্তি’ হিসেবে বয়ান করতে সাহায্য করেছিলেন, তা প্রকারান্তরে বাংলাদেশে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ও খুনিদের বিচারের পথ রুদ্ধ করার মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।
ইতিহাসের কাঠগড়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়বদ্ধতা
রাজনীতিতে ভুলত্রুটি বা কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে, কিন্তু একটি সদ্য স্বাধীন দেশের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যার পর খুনিদের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করা কোনো রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না; এটি হলো স্রেফ নৈতিক দেউলিয়াত্ব। মওলানা ভাসানী তাঁর জীবনের একদম শেষ লগ্নে এসে (তিনি ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে মারা যান) নিজের অজান্তেই নিজেকে একাত্তরের পরাজিত শক্তির কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর এই একটিমাত্র রাজনৈতিক কলঙ্ক তাঁর দীর্ঘ সাত দশকের প্রগতিশীল কৃষক আন্দোলন ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে চিরকালের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
১৭ই আগস্ট ১৯৭৫-এর সংবাদপত্রগুলো আজ জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মওলানা ভাসানী তাঁর এই ঐতিহাসিক আপসকামিতা ও খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতা করার অপরাধের জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আজীবন দায়বদ্ধ থাকবেন। কোনো কুযুক্তি, কোনো সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অতীত কিংবা বামপন্থী তাত্ত্বিকদের সাফাই দিয়ে ১৫ই আগস্টের পর মওলানা ভাসানীর এই বিতর্কিত ও দুঃখজনক ভূমিকাকে জাস্টিফাই করা বা বৈধতা দেওয়া সম্ভব নয়। ইতিহাস বড়ই নির্মম; তা যেমন ৭ই মার্চের বজ্রকণ্ঠকে অমর করে রাখে, ঠিক তেমনি ১৫ই আগস্টের খুনিদের পক্ষে হাত তোলা মোনাজাতকেও মহাকালের পাতায় অপরাধ হিসেবেই টুকে রাখে।
