শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—এই চার মহান নেতারই রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশ-ভারতের অবিভক্ত বাংলায়। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাজনীতিতেও তাঁরা প্রত্যেকেই অনস্বীকার্য গুরুত্ব ও প্রভাবের অধিকারী হয়েছিলেন।
১৯৭৬ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতির প্রায় প্রতিটি দৃশ্যপটে মওলানা ভাসানীর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ উপস্থিতি ছিল অবধারিত। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র এবং প্রধানতম পুরুষ ছিলেন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আততায়ীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক ঘটনাক্রম এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণেই এই ঐতিহাসিক আলোচনার একটি সুবৃহৎ অংশ জুড়ে থাকবে বঙ্গবন্ধু মুজিবের রাজনৈতিক বিবর্তন।

রাজনৈতিক সূচনার ভিন্নতা এবং আদর্শিক মেরুকরণ
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনাতেই, ১৯১৩ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের (Bengal Legislative Council) সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন খেলাফত আন্দোলনের বিখ্যাত ‘আলী ভ্রাতৃদ্বয়’ (মওলানা মুহম্মদ আলী এবং মওলানা শওকত আলী)-এর আহ্বানে। সোহরাওয়ার্দী খেলাফত আন্দোলন ও স্বরাজ আন্দোলন—উভয় ধারাতেই সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং ১৯২১ সালে তিনিও বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
শেরে বাংলা এবং সোহরাওয়ার্দী—উভয়েই নিজ নিজ রাজনৈতিক কৌশল, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিকবার দল পরিবর্তন করেছেন। ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁদের ক্ষেত্রে দল পরিবর্তনের বিষয়টি আদর্শিক দ্বন্দ্বের চেয়ে অনেক সময় ব্যক্তিগত অবস্থান, আঞ্চলিক প্রভাব ও মর্যাদা রক্ষার কৌশলের সাথে বেশি জড়িত ছিল। তবে তাঁরা দুজনেই আজীবন ব্রিটিশ বা পাশ্চাত্য ধারার সংসদীয় গণতন্ত্রে গভীর আস্থাশীল ছিলেন। শেরে বাংলার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন নানা পর্বে সংশয় ও বিতর্কের জন্ম দিলেও, তিনি কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেননি। তবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন এদিক থেকে সম্পূর্ণরূপে বিতর্ক বা কলঙ্কদাগ থেকে মুক্ত ছিল না।
আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং ভাসানী-মুজিবের ভিন্ন পথ
আর্থ-সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সূচনাতে একটি লক্ষণীয় ভিন্নতা ছিল। প্রকৃতপক্ষেই ভাসানী ও মুজিব কারো কৃপা বা বংশীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নয়, বরং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উপলব্ধি, ত্যাগ এবং ভেতরের তাড়না থেকে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন।
مওলানা ভাসানী প্রথম জীবনে টাঙ্গাইল জেলার কাগমারিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। সেখানে সাধারণ কৃষকদের ওপর অত্যাচারী জমিদার এবং মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলায়, শোষক চক্রের চাপে তাঁকে কাগমারি ত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর তিনি আসাম প্রদেশে চলে যান। পরবর্তী সময়ে, ১৯০২ সালে আসামেই মাত্র ২২ বছর বয়সে স্বদেশী আন্দোলন তথা সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে (স্বাধীনতা সংগ্রামীদের চরমপন্থী অংশ কর্তৃক পরিচালিত সশস্ত্র ধারা) যোগদানের মধ্য দিয়ে মওলানা ভাসানীর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।
অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের দর্শক-সারি থেকে। তাঁর নিজের ভাষায়:
“চোখের চিকিৎসার পর মাদারীপুরে (১৯৩৭) ফিরে এলাম, কোনো কাজ নেই।… শুধু একটা মাত্র কাজ, বিকালে সভায় যাওয়া। তখন স্বদেশী আন্দোলনের যুগ।… স্বদেশী আন্দোলন তখন মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের ঘরে ঘরে। আমার মনে হতো, মাদারীপুরে সুভাষ বোসের (নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু) দলই শক্তিশালী ছিল।… আমাকে রোজ সভায় বসে থাকতে দেখে আমার উপর কিছু যুবকের নজর পড়ল। ইংরেজদের সম্পর্কে আমার মনেও বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হলো। ইংরেজদের এ দেশে থাকার অধিকার নাই, স্বাধীনতা আনতে হবে। আমিও সুভাষ বাবুর ভক্ত হতে শুরু করলাম।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-৯)
গোপালগঞ্জে হক-সোহরাওয়ার্দীর আগমন এবং মুজিবের রাজনৈতিক মোড়
১৯৩৮ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দেয়। তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যৌথভাবে গোপালগঞ্জ সফরে আসেন। মুসলিম ছাত্র ও জনসাধারণের মধ্যে তখন তুমুল আলোড়ন। শেখ মুজিবের বয়স তখন অন্যদের চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়ায় তাঁর ওপর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী (Volunteer Corps) গঠনের দায়িত্ব পড়ে। তিনি দলমত নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলিম সব ছাত্রকে নিয়েই বাহিনী গঠন করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই একটি অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়:
“…পরে দেখা গেল, হিন্দু ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী থেকে সরে পড়তে লাগল।… এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম… সে আমাকে বলল, কংগ্রেস থেকে নিষেধ করেছে আমাদের যোগদান করতে। যাতে বিরূপ সংবর্ধনা হয় তারও চেষ্টা করা হবে।… আমি এ খবর শুনে আশ্চর্য হলাম। কারণ, আমার কাছে তখন হিন্দু-মুসলমান বলে কোনো জিনিস ছিল না।… আমাদের নেতারা বললেন, হক সাহেব (কৃষক-প্রজা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা) মুসলিম লীগের সাথে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন বলে হিন্দুরা ক্ষেপে গিয়েছে। এটা আমার মনে বেশ একটা রেখাপাত করল।… হক সাহেব ও শহীদ সাহেব এলেন, সভা হলো।… শান্তিপূর্ণভাবে সকল কিছু হয়ে গেল।… শহীদ সাহেব গেলেন মিশন স্কুল দেখতে।… তাঁকে সংবর্ধনা দিলাম।… তিনি (ফেরার পথে) ভাঙা ভাঙা বাংলায় আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করছিলেন, আর আমি উত্তর দিচ্ছিলাম।… আমাকে ডেকে নিলেন খুব কাছে, আদর করলেন এবং বললেন, ‘তোমাদের এখানে মুসলিম লীগ করা হয় নাই?’ বললাম, কোনো প্রতিষ্ঠান নাই। মুসলিম ছাত্রলীগও নাই। তিনি… নোটবুক বের করে আমার নাম ও ঠিকানা লিখে নিলেন। কিছুদিন পরে আমি একটা চিঠি পেলাম, তাতে তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং লিখেছেন কলকাতা গেলে যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করি। আমিও তাঁর চিঠির উত্তর দিলাম। এইভাবে মাঝে মাঝে চিঠিও দিতাম।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী; পৃষ্ঠা: ১০-১১)
প্রথম কারাবরণ: সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ছোবল
হক-সোহরাওয়ার্দীর গোপালগঞ্জ সফরের পরপরই শহরে হিন্দু ও মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে বিদ্যমান মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব প্রকাশ্য মারামারিতে রূপ নেয়। শেখ মুজিবের ‘মালেক’ নামের এক বন্ধুকে একটি হিন্দু বাড়িতে আটকে রেখে মারধর করা হলে মুজিব তাঁর বন্ধুদের নিয়ে দরজা ভেঙে মালেককে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় হিন্দু নেতারা রাতে বসে হিন্দু কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শ করে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলায় খন্দকার শামসুল হক মোক্তার সাহেবকে হুকুমের আসামি এবং তরুণ শেখ মুজিবকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও খুনের চেষ্টার প্রধান আসামি করা হয়। তৎকালীন হিন্দু এসডিও (Sub-Divisional Officer) শেখ মুজিবের জামিন প্রত্যাখ্যান করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সাত দিন জেল খাটার পর শেখ মুজিব প্রথম জামিন পান। এটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের প্রথম কারাবরণ।
রূপান্তর: ধর্মভিত্তিক থেকে ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদ
একটি চরম সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু হলেও, শেখ মুজিব পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছিলেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক কালজয়ী প্রতীক এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা। প্রয়াত বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন একটি প্রবন্ধে যথার্থই লিখেছিলেন:
“ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা থেকে ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তার যে ঐতিহাসিক রূপান্তর, তার প্রধান সূত্রধর ও মধ্য-শিরোমণি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান।”
মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিব—উভয়েই অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে আস্থাশীল হলেও তাঁদের দর্শনে গভীর ফারাক ছিল। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বিশ্লেষণে সেই পার্থক্যটি পরিষ্কার ধরা পড়ে:
“মওলানার একটা সীমাবদ্ধতা ছিল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সম্পূর্ণরূপে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি যে সমাজতন্ত্রের কথা ভাবতেন, তাকে তিনি ভাবতেই পারতেন না ধর্মকে বাদ দিয়ে। পরিচ্ছন্ন সমাজতন্ত্র নয়, তাঁর লক্ষ্য ছিল ইসলামিক সমাজতন্ত্র; যার দরুন সামন্তবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিয়োজিত হয়েও তিনি (ভাসানী) সামন্তবাদের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন, এমনটা বলা যাবে না।… মওলানার সমাজতন্ত্রের তুলনায় (শেখ মুজিবের) বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল অধিকতর ধর্মনিরপেক্ষ। ছিল তা ভাষাভিত্তিক, যে-ভাষা কোনো সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়, সব বাঙালির মানসিক ও ব্যবহারিক সম্পদ বটে। এবং ওই জাতীয়তাবাদ প্রত্যাখ্যান করেছিল ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে বেশ প্রবলভাবে।”
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী: গ্রিক ট্র্যাজেডির এক নিঃসঙ্গ নায়ক
ব্যক্তিগত জীবনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একাধারে প্রবল সাহসী ও বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দীনের স্মৃতিচারণায় তাঁর এক অনন্য অবয়ব ফুটে ওঠে:
“সোহরাওয়ার্দী সাহেবের… ব্যক্তিগত সাহস, ব্যক্তিত্ব, একই সঙ্গে অর্থের প্রতি আসক্তি ও অবহেলা, অর্থ সঞ্চয়ে অবিশ্বাস, অনুসারীদেরকে পুত্রবৎ প্রতিপালন, পরিশ্রম করার অসাধারণ ক্ষমতা ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।… সোহরাওয়ার্দী তেমন বড় ব্যক্তিত্বের অধিকারী না হলেও তাঁর মধ্যে একটা যুদ্ধংদেহী মনোভাব ছিল।… মনে হয়, সোহরাওয়ার্দী ছিলেন নিঃসঙ্গ মানুষ। বহু লোকের সঙ্গে তিনি মিশতেন, বহু রকমের রাজনীতি করেছেন – প্রথমে ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সহকারী হিসেবে তাঁর জীবনারম্ভ, জীবন শেষ হলো আওয়ামী লীগে – কিন্তু তাঁর কোনো পরমাত্মীয় বন্ধু ছিল না। তিনি সর্বদা লোক পরিবৃত থাকতেন… কিন্তু তবু তিনি ছিলেন তাঁদের থেকে আলাদা। আচার-আচরণ ও জীবনযাপন প্রণালীতে তিনি ছিলেন পুরোপুরি পশ্চিমা, রাজনীতি করতেন কুসংস্কারাচ্ছন্ন নিরক্ষর জনসাধারণের।… ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার লেশমাত্রও ছিল না।”
প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী সোহরাওয়ার্দীকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছেন:
“হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে আমি কাছে এবং দূরে থেকে বহুবার দেখেছি। যতবার দেখেছি, ততবারই মনে হয়েছে, তিনি গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়ক। ভুল করে এ যুগের বাংলাদেশে (অবিভক্ত বাংলা) জন্মেছেন। আপোসের রাজনীতির পরিণাম কী মর্মান্তিক হতে পারে, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জীবন তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।”
যুক্ত বাংলা আন্দোলন ও সোহরাওয়ার্দীর বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট
সোহরাওয়ার্দী ব্যক্তিগতভাবে অসাম্প্রদায়িক ও পশ্চিমা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও, তাঁর নানাবিধ রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা ও আপোসের কারণে তিনি প্রায়শই কোনো মহলেরই নিঃসংশয় আস্থাভাজন হতে পারেননি। ১৯৪৭ সালে ভারত-ভাগের ঠিক প্রাক-মুহূর্তে বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ রেখে ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম এক নতুন রাষ্ট্র’ (United Independent Bengal) গঠনের শেষ চেষ্টা করেছিলেন তিন নেতা—শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
প্রথম দুই নেতার আন্তরিকতা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মনে কোনো সংশয় না থাকলেও, সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা নিয়ে অনেক গবেষকই প্রশ্ন তুলেছেন। তখন না ছিল তাঁর নিজের দল মুসলিম লীগের সহকর্মীদের কাছে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা, না ছিল বাঙালি হিন্দুদের কাছে। এমনকি লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং বাংলার গভর্নর ফ্রেডরিক বারোজও তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখতেন।
ঐতিহাসিক সত্য হলো, যুক্ত বাংলা গঠনের এই আন্দোলনে সোহরাওয়ার্দী শেষ পর্যন্ত অটল থাকতে পারেননি। ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের আইনপ্রণেতাদের কনভেনশনে তিনি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি আপসমূলক নীতি গ্রহণ করেন এবং পরোক্ষভাবে জিন্নাহর ‘এক পাকিস্তান’ বা বাংলা-ভাগের অন্তরালে থাকা মূল প্রস্তাবকেই সমর্থন জোগাতে বাধ্য হন। এই আপসের মূল উদ্দেশ্য ছিল—প্রাদেশিক মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা ও বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর পদ, এই দুটিই রক্ষা করা। কিন্তু জিন্নাহর কুটিল রাজনীতির কাছে শেষ পর্যন্ত তাঁর কোনোটিই টিকল না। অবিভক্ত বাংলা প্রদেশ ভাগ হওয়ার সাথে সাথেই জিন্নাহর ইঙ্গিতে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের নেতৃত্ব থেকে সোহরাওয়ার্দীকে নির্মমভাবে অপসারণ করা হয় এবং ঢাকার মসনদে বসানো হয় খাজা নাজিমুদ্দিন ও তাঁর প্রতিক্রিয়াশীল খাজা গ্রুপকে।

গুরুর স্ববিরোধিতা থেকে মুজিবের রাজনৈতিক শিক্ষা
১৯৪৬-৪৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন মুসলিম লীগের তরুণ ও অত্যন্ত তুখোড় এক ছাত্রনেতা, যার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তবে সোহরাওয়ার্দী তাঁর ব্যক্তিগত অসাম্প্রদায়িকতাকে কখনো রাষ্ট্রপরিচালনার মূল দর্শনে যুক্ত করতে চাননি; ক্ষমতার আসন ধরে রাখতে মাঝে মাঝে যেটুকু প্রগতিশীল অবস্থান নিয়েছেন, তা ছিল স্রেফ কৌশলগত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব উত্তরকালে তাঁর রাজনৈতিক গুরুর এই সীমাবদ্ধতা ও আপোষকামী নীতিকে সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করেছিলেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, সোহরাওয়ার্দীর এই রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা এবং ভুল পরিণাম থেকেই বঙ্গবন্ধু ‘স্থির-লক্ষ্য’ ও আপসহীন রাজনীতির দীক্ষা নিয়েছিলেন। ব্যক্তিজীবনের অসাম্প্রদায়িকতা আর রাজনৈতিক অসাম্প্রদায়িকতা যে এক জিনিস নয়, তা তরুণ মুজিব খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন।
উদাহরণস্বরূপ, হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কথা বলা যায়। ব্যক্তি হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ অসাম্প্রদায়িক থাকলেও, রাজনীতির মাঠে তিনিই বাংলায় হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করেছিলেন। অপরদিকে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক একবার মুসলিম লীগের সাথে (১৯৩৭) এবং আরেকবার হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদের সাথে (১৯৪১) কোয়ালিশন করে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হলেও, সাধারণ মানুষ কখনো তাঁকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে গণ্য করেনি। কারণ তাঁর রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল সাধারণ কৃষক-প্রজার অর্থনৈতিক মুক্তি।
‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ (১৯২৩) এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রথম প্রয়াস
ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলায় এ. কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সর্বভারতীয় ও প্রাদেশিক রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। শেরে বাংলা ১৯১৩ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য হওয়ার পর ১৯১৫ সালে ঐতিহাসিক কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৯১৮ সালে তিনি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯১৯ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯২৩ সালের এপ্রিলে মুসলমানদের পক্ষ থেকে তিনি স্বরাজ্য পার্টির নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ নামক ঐতিহাসিক হিন্দু-মুসলিম চুক্তিটি সম্পাদনে মূল ভূমিকা পালন করেন। তরুণ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও এই চুক্তি গঠনে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। স্যার আব্দুর রহিম, মৌলভী আব্দুল করিম, মওলানা আকরাম খাঁ এবং হিন্দুদের পক্ষ থেকে শরৎচন্দ্র বসু ও ড. বিধান চন্দ্র রায়ের মতো প্রাজ্ঞ নেতাদের সহযোগিতায় এই চুক্তি অনুমোদিত হয়।
‘বেঙ্গল প্যাক্ট’-এর মূল শর্ত ছিল: সরকারি চাকরিতে মুসলমানরা জনসংখ্যানুপাতে (তৎকালে ৫৪%) কোটা পাবে এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান যেমন—কলকাতা কর্পোরেশন ও জেলা বোর্ডগুলোতেও একই হারে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে। এই প্রগতিশীল পদক্ষেপের কারণে কট্টরপন্থী হিন্দু নেতারা ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযোগ তোলেন যে, দেশবন্ধু বাংলা মুসলমানদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু দেশবন্ধু ১৯২৪ সালের সিরাজগঞ্জ অধিবেশনে অত্যন্ত সফলতার সাথে এটি পাস করিয়ে নেন। এই চুক্তি সম্পর্কে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর বিখ্যাত ‘India Wins Freedom’ গ্রন্থে লিখেছেন:
“চিত্তরঞ্জন দাশের এই দূরদর্শী মনোভাব বাংলার এবং বাইরের মুসলমানদের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি যদি অকালে মারা না যেতেন, তবে দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়াই বদলে যেত। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অনুসারীরা এই ঘোষণাটি বাতিল করে দেয়। যার ফলে বাংলার মুসলমানরা কংগ্রেস থেকে দূরে সরে যায় এবং দেশভাগের প্রথম বীজটি বপন করা হয়।”
এই চুক্তির সফলতার পথ ধরেই ১৯২৪ সালে দেশবন্ধু কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে তরুণ মুসলিম নেতা সোহরাওয়ার্দীকে প্রথম মুসলিম ডেপুটি মেয়র হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর চুক্তিটি বাতিল হলে সোহরাওয়ার্দী কংগ্রেসের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ১৯৩৬ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন। (উল্লেখ্য, পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালে শেরে বাংলা ফজলুল হক কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র হওয়ার গৌরব অর্জন করেন)।
১৯৩৭ সালের নির্বাচন: পটুয়াখালীর সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধ
১৯৩৭ সালের ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ঠিক পূর্বে শেরে বাংলা ফজলুল হক বাংলার সাধারণ কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার্থে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ (KPP) গঠন করেন। বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের ২৫০টি আসনের মধ্যে ১২২টি আসন ছিল মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বাংলার নওয়াব, জমিদার, নাইট, খান বাহাদুর এবং কলকাতার অবাঙালি মুসলিম ধনিক শ্রেণী ফজলুল হকের প্রগতিশীল কর্মসূচির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে ‘ইউনাইটেড মুসলিম প্রগ্রেসিভ পার্টি’ (কার্যত বেনামী মুসলিম লীগ) গঠন করে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আড়াল থেকে এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে মদদ দিচ্ছিলেন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও তখন এই ধনিক শ্রেণীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের বিপুল অর্থ এবং ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকার মতো প্রচারযন্ত্র থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ শেরে বাংলার পক্ষ নেয়।
এই নির্বাচনে পটুয়াখালী আসনে শেরে বাংলার কাছে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এই পরাজয়ের পর সোহরাওয়ার্দী জিন্নাহ ও নাজিমুদ্দিনকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণায় সেই ঘটনাটি এভাবে উঠে এসেছে:
“নাজিমুদ্দিন সাহেব পটুয়াখালী থেকে পরাজিত হয়ে ফিরে আসলেন। তাঁর রাজনীতি থেকে সরে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। শহীদ সাহেব হক সাহেবকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বললেন, আমি নাজিমুদ্দিন সাহেবকে কলকাতা থেকে বাই-ইলেকশনে (উপনির্বাচন) পাস করিয়ে নেব। যদি হক সাহেব পারেন, তাঁর প্রতিনিধি দিয়ে মোকাবিলা করতে পারেন। হক সাহেবও লোক দাঁড় করিয়েছিলেন নাজিমুদ্দিন সাহেবের বিরুদ্ধে। নাজিমুদ্দিন সাহেবই শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করলেন, শহীদ সাহেবের দয়ায়। সেই নাজিমুদ্দিন সাহেব (পরবর্তীতে) শহীদ সাহেবকে অপমানই করলেন।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-৪২)
প্রথম কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা ও কংগ্রেসের ঐতিহাসিক ভুল
১৯৩৭ সালের নির্বাচনের ফলাফল ছিল ত্রিশঙ্কু। কৃষক প্রজা পার্টি ৫৯টি, কংগ্রেস ৫৪টি এবং মুসলিম লীগ ৩৯টি আসন লাভ করায় এককভাবে কেউ সরকার গঠন করতে পারছিল না। বাংলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেরে বাংলার কৃষক প্রজা পার্টির সাথে কংগ্রেসের কোয়ালিশন সরকার গঠন করা উচিত ছিল। এতে বাংলার রাজনীতি অসাম্প্রদায়িক ধারায় বিকশিত হতো। কিন্তু কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নেতৃত্বের সংকীর্ণতা ও অহংকারের কারণে তারা ফজলুল হককে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায়।
ক্ষমতার প্রতি ফজলুল হকের দুর্বলতা এবং কৃষকদের ইশতেহার বাস্তবায়নের তাগিদে তিনি বাধ্য হয়ে মুসলিম লীগ ও অন্যান্য ছোট দলের সাথে মিলে ১ এপ্রিল, ১৯৩৭ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোালিশন সরকার গঠন করেন। মুসলিম লীগ এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। অসাম্প্রদায়িক ফজলুল হকের কাঁধে ভর করেই তারা বাংলার শাসনক্ষমতায় জাঁকিয়ে বসে এবং এই একটি ঐতিহাসিক ভুলের মাশুল হিসেবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত মুসলিম লীগ বাংলার ক্ষমতা নিজের দখলে রাখতে সক্ষম হয়। ফজলুল হক সাহেবও পরিস্থিতির চাপে পড়ে ১৯৩৭ সালের অক্টোবরে মুসলিম লীগের লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে যোগ দেন এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অনলবর্ষী বক্তৃতার মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ‘শের-এ-বাংলা’ (বাংলার বাঘ) উপাধিতে ভূষিত হন।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব এবং জিন্নাহর ‘মাকড়সা রাজনীতি’
১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোরের মিন্টো পার্কে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক অধিবেশনে বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক যে মূল প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন, তা ইতিহাসে ‘লাহোর প্রস্তাব’ নামে সমধিক পরিচিত। পরদিন থেকেই সংবাদমাধ্যমগুলো একে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ বলে প্রচার করতে শুরু করে। তবে ঐতিহাসিক সত্য হলো, মূল প্রস্তাবটিতে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি কোথাও ছিল না এবং একক কোনো রাষ্ট্রের কথাও বলা হয়নি। প্রস্তাবে স্পষ্টাক্ষরে লেখা হয়েছিল:
“ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States) গঠন করতে হবে, যার অন্তর্ভুক্ত অঙ্গরাজ্যগুলো হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।”
কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সর্বভারতীয় রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে ফজলুল হকের এই আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দর্শন মিলছিল না। জিন্নাহ বুঝতে পেরেছিলেন, ফজলুল হকের মতো গণনেতা মুসলিম লীগে থাকলে তাঁর একক নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আবু জাফর শামসুদ্দীনের ভাষায়:
“স্বপ্রতিষ্ঠিত কৃষক-প্রজা পার্টির সাথে একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা করেই ফজলুল হক সাহেব মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন।… বাংলার দুর্ভাগ্যের সূচনা সেদিন থেকেই। তিনি মি. জিন্নাহর মাকড়সা রাজনীতির জালে নিজেকে জড়িয়ে না ফেললে তখন দ্বিতীয় এমন কোনো বাঙালি মুসলমান নেতা ছিলেন না যিনি মুসলিম লীগকে বাংলাদেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। মি. জিন্নাহ ইসলাম ধর্মকে তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ সিদ্ধির হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করেছিলেন।… ফজলুল হক সাহেবের গণ-সংযোগ এবং গণ-বক্তৃতার ক্ষমতাকে (Mass demagogy) কাজে লাগিয়ে দেওয়াটা ছিল জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় সাফল্য।”
লাহোর প্রস্তাবের পর যখন ফজলুল হকের সাথে জিন্নাহর মতভেদ চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন ১৯৪১ সালে শেরে বাংলা মুসলিম লীগ ত্যাগ করেন এবং জিন্নাহর নির্দেশে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
‘শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা’ (১৯৪১) এবং ব্রিটিশদের পোড়ামাটি নীতি
মুসলিম লীগ সমর্থন প্রত্যাহার করায় ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। কিন্তু ক্ষমতার প্রতি তীব্র আকর্ষণ থেকে শেরে বাংলা এক অভাবনীয় রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেন। তিনি কট্টর হিন্দু মহাসভার নেতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং কংগ্রেসের একাংশকে সাথে নিয়ে ১২ই ডিসেম্বর, ১৯৪১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ইতিহাসে এটি ‘শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা’ বা প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা নামে পরিচিত। এই মন্ত্রিসভায় শরৎচন্দ্র বসুরও যোগ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাঁর প্রগতিশীল ও ব্রিটিশ-বিরোধী অবস্থানের কারণে শপথ গ্রহণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তাঁকে ভারত-রক্ষা আইনে গ্রেফতার করে।
গভর্নর স্যার জন হারবার্ট এই মন্ত্রিসভাকে শুরু থেকেই সহ্য করতে পারেননি। তিনি আড়ালে মুসলিম লীগের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৩৯-১৯৪৫) জাপানি আক্রমণের ভয়ে ব্রিটিশ সরকার বাংলায় যে কুখ্যাত ‘পোড়ামাটি নীতি’ (Scorched Earth Policy) বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছিল, ফজলুল হক তার তীব্র বিরোধিতা করেন। ব্রিটিশদের এই কৃত্রিম খাদ্য সংকট ও পোড়ামাটি নীতিই মূলত ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বা দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ ছিল। শেষ পর্যন্ত গভর্নর হারবার্ট ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২৮শে মার্চ, ১৯৪৩ সালে ফজলুল হককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করেন। তবে এই পদত্যাগের ফলে ফজলুল হক তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের পঙ্কিল দায় ও দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে ব্যক্তিগতভাবে নিষ্কৃতি পান।
সাধারণ মানুষের মনে শেরে বাংলার আসন
শেরে বাংলার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নানা সময়ে বিতর্কিত হলেও বাংলার সাধারণ মানুষের মন থেকে তাঁর আসন কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। তরুণ শেখ মুজিব যখন মুসলিম লীগের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে হুজুরের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে যেতেন, তখন সাধারণ মানুষের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন:
“একদিনের কথা মনে আছে, আব্বা… বললেন, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ না করতে। একদিন আমার মা-ও আমাকে বলেছিলেন, ‘বাবা যাহাই কর, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলিও না।’ শেরে বাংলা মিছামিছিই ‘শেরে বাংলা’ হন নাই। বাংলার মাটিও তাঁকে ভালোবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন… একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে—হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চান না এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক… দাঁড়িয়ে বললেন, যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তাঁর নামও শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব।… শুধু এটুকুই না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-২২)
১৯৪৬ সালের দিল্লি কনভেনশন: জিন্নাহর চূড়ান্ত চাল ও অবিভক্ত বাংলার বিদায়
ফজলুল হকের পতনের পর ২৪শে এপ্রিল, ১৯৪৩ সালে খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করে, যেখানে সোহরাওয়ার্দী পান বেসামরিক সরবরাহ (খাদ্য) মন্ত্রীর দায়িত্ব। ১৯৪৫ সালের মার্চে এই মন্ত্রিসভার পতনের পর ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ সংরক্ষিত মুসলিম আসনগুলোতে বিপুল বিজয় লাভ করে বাংলার মুসলমানদের একমাত্র মুখপাত্রে পরিণত হয়। এবার ২৪শে এপ্রিল, ১৯৪৬ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়।
কিন্তু এই বিজয়ের পরপরই জিন্নাহ তাঁর চূড়ান্ত চালটি চালেন। ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে দিল্লিতে মুসলিম লীগের নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের নিয়ে একটি ‘কনভেনশন’ ডাকা হয়। সেখানে ১৯৪০ সালের মূল লাহোর প্রস্তাবের ‘States’ (স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ) শব্দটিকে পরিবর্তন করে জিন্নাহর নির্দেশে স্বয়ং সোহরাওয়ার্দীকে দিয়ে ‘State’ (একক পাকিস্তান রাষ্ট্র) প্রস্তাব উত্থাপন করানো হয়। সাবজেক্ট কমিটির মিটিংয়ে আবুল হাশিম এবং পূর্ব বাংলার গুটিকয়েক প্রগতিশীল নেতা এর তীব্র প্রতিবাদ করলেও জিন্নাহর একনায়কতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের কাছে তা টিকল না।
দিল্লি কনভেনশনের সেই অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:
“জিন্নাহ সাহেব বক্তৃতা করলেন, … মনে হচ্ছিল সকলের মনেই একই কথা, পাকিস্তান কায়েম করতে হবে।… সাবজেক্ট কমিটির … প্রস্তাব লেখা হলো, সেই প্রস্তাবে লাহোর প্রস্তাব থেকে আপাতদৃষ্টিতে ছোট কিন্তু মৌলিক একটা রদবদল করা হলো। একমাত্র হাশিম সাহেব আর সামান্য কয়েকজন যেখানে পূর্বে ‘স্টেটস্’ লেখা ছিল, সেখানে ‘স্টেট’ লেখা হয়, তার প্রতিবাদ করলেন, তবু তা পাস হয়ে গেল। ১৯৪০ সালে লাহোরে যে প্রস্তাব কাউন্সিল পাস করে, সে প্রস্তাব আইনসভার সদস্যদের কনভেনশন পরিবর্তন করতে পারে কি না এবং সেটি পরিবর্তন করার অধিকার আছে কি না, এটা চিন্তাবিদরা ভেবে দেখবেন। কাউন্সিলই মুসলিম লীগের সুপ্রিম ক্ষমতার মালিক।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-৫২)
কামরুদ্দীন আহমদের ‘বাংলার মধ্যবিত্তের বিকাশ’ গ্রন্থের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অনুধাবন করেছিলেন যে পূর্ব বাংলার জনসমর্থন ছাড়া তিনি রাজনীতিতে টিকতে পারবেন না। তাই ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে তিনি কলকাতার ছাত্র ও যুবকদের মধ্য থেকে এমন এক তরুণ নেতৃত্ব খুঁজছিলেন, যিনি হবেন একনিষ্ঠ ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ। ১৯৪৪ সালের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিলে খাজা নাজিমুদ্দিন ও মওলানা আকরাম খাঁ যখন প্রগতিশীল আবুল হাশিমকে কমিউনিস্ট আখ্যা দিয়ে বহিষ্কার করতে চাইলেন, তখন কলকাতার সেই কাউন্সিলে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ও জোরালো বক্তব্য দিয়ে পুরো সিদ্ধান্ত বদলে দেন। কামরুদ্দীন আহমদ লিখেছেন:
“মুজিবের বক্তৃতা জোরালো হয়েছিল এবং যুক্তিপূর্ণও, ফলে সোহরাওয়ার্দী সাহেব কাউন্সিলের ওপর সিদ্ধান্তের ভার ছেড়ে দিতে রাজি হলেন।… সে মুহূর্তেই শহীদ সাহেব বেছে নিলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে।… এতদিনে যেন শহীদ সাহেব সন্ধান পেলেন তিনি যাকে খুঁজছিলেন তাকে।”
শেষ কথা:
ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলার এই ঝড়ো রাজনীতি, শেরে বাংলার কৃষক-প্রজা দরদ, মওলানা ভাসানীর প্রান্তিক লড়াই, সোহরাওয়ার্দীর সংসদীয় চাতুর্য ও স্ববিরোধিতা এবং জিন্নাহর কুটিল চালকে খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেই গড়ে উঠেছিল তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ভিত্তি। জিন্নাহর সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোহভঙ্গ হতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি। আর এ কারণেই এই চার প্রধানের আদি পর্বের চড়াই-উতরাইয়ের ভেতর দিয়েই মূলত রোপিত হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক, ভাষাভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশের মূল বীজ।
মূল সহায়ক সূত্রসমূহ:
১. অসমাপ্ত আত্মজীবনী — বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (ইউপিএল, ২০১২)।
২. আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিকথা — আবু জাফর শামসুদ্দীন।
৩. বাংলার মধ্যবিত্তের বিকাশ (১ম খণ্ড) — কামরুদ্দীন আহমদ।
৪. স্মৃতির মিনার ও কিছু কথা — আবদুল গাফফার চৌধুরী।
৫. India Wins Freedom — Maulana Abul Kalam Azad.
আরও দেখুন:
