জামায়াতে ইসলামী সবসময় সুবিধাবাদী ও অগণতান্ত্রিক শক্তির তল্পিবাহক । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

রাজনীতিতে কোনো দলের আদর্শিক সততা পরিমাপ করা হয় তার লক্ষ্য, কর্মসূচি এবং ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে নেওয়া সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা দিয়ে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ‘জামায়াতে ইসলামী’ এমন একটি ব্যতিক্রমী সত্তা, যার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—দলটির প্রকাশ্য স্লোগান ‘ইক্বামাত দ্বীন’ (ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা) হলেও, তাদের অবদমিত ও প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো যেকোনো মূল্যে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা এবং অর্থনৈতিক আখের গোছানো।

জামায়াতে ইসলামীর মূল সীমাবদ্ধতা হলো, তারা খুব ভালো করেই জানে যে একটি পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও প্রগতিশীল অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ম্যান্ডেট বা জনসমর্থন পেয়ে তারা কখনো এককভাবে ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তাদের চরমপন্থী ও মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গি যদি সাধারণ জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়, তবে ব্যালট বক্সে তারা চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব থেকেই জামায়াত দীর্ঘ আট দশক ধরে এমন এক রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “Opportunistic Entrenchment” বা সুবিধাবাদী অনুপ্রবেশ।

গণতান্ত্রিকভাবে অক্ষম এই দলটি নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময়ে স্বৈরাচারী সামরিক শাসক, অগণতান্ত্রিক শক্তি এবং বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী বা ভূ-রাজনৈতিক প্রভুদের (বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের কট্টরপন্থী রাজতন্ত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ) তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করেছে। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় তাদের গৃহীত কোনো কৌশলের সাথেই ইসলামের শাশ্বত নীতি, নৈতিকতা বা ইনসাফের দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না। বরং ইসলামকে তারা ব্যবহার করেছে একটি অতি মুনাফাজনক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্র্যান্ড হিসেবে।

Table of Contents

প্রথম অধ্যায়: পাকিস্তান আন্দোলন এবং মওদুদীর সুবিধাবাদী তত্ত্ব (১৯৪১-১৯৪৭)

১. জামায়াতে ইসলামীর জন্ম ও মওদুদীর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা

১৯৪১ সালের ২৬শে আগস্ট লাহোরে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর হাত ধরে জামায়াতে ইসলামীর জন্ম হয়। এই দলের সূচনালগ্ন থেকেই মওদুদী নিজেকে ইসলামের একমাত্র শুদ্ধ ব্যাখ্যাদাতা হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকেন। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে যখন অখণ্ড ভারতের দাবিতে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমির দাবিতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ চূড়ান্ত লড়াইয়ে লিপ্ত, তখন মওদুদী এক অদ্ভুত তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেন।

মওদুদী কংগ্রেসের ‘সেক্যুলার ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ এবং মুসলিম লীগের ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’—উভয়কেই ‘জাহেলিয়াত’ বা কুফর বলে ফতোয়া দেন। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, জাতীয়তাবাদ নিজেই একটি শিরক বা ইসলামবিরোধী ধারণা। ফলে তিনি স্বঘোষিতভাবে এক অনড় ও আপসহীন ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান গ্রহণ করেন।

২. পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা: জিন্নাহকে কাফের ও পাকিস্তানকে কুফরি রাষ্ট্র ঘোষণা

১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পর যখন কোটি কোটি অবহেলিত ও শোষিত মুসলিম জিন্নাহর পতাকাতলে সমবেত হয়ে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখছিল, তখন মওদুদী ও তাঁর নবগঠিত জামায়াত এই আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। মওদুদী তাঁর ‘সিয়াসি কাশমকাশ’ (রাজনৈতিক টানাপোড়েন) গ্রন্থের ৩য় খণ্ডে পরিষ্কার লেখেন:

“মুসলিম লীগের এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্য আপনাদের ইসলামের নাম ব্যবহার করার অধিকার নেই। কেননা, ইসলাম সকল প্রকার জাতীয়তাবাদের শত্রু।”

তিনি জিন্নাহর প্রস্তাবিত পাকিস্তানকে ‘খোঁড়া পাকিস্তান’ বা ‘না-پاکستان’ বলে উপহাস করেন। শুধু তাই নয়, মুসলিম লীগকে ইসলামের ইতিহাসের মুনাফিকদের দ্বারা নির্মিত ক্ষতিকর মসজিদ ‘মসজিদে জেরার’-এর সাথে তুলনা করে সাধারণ মুসলমানদের এই আন্দোলন থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন। জিন্নাহ এবং তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতাদের পশ্চিমা পোশাক ও জীবনযাত্রার দিকে আঙুল তুলে জামায়াত তাদের ‘কাফের’ বা ‘ইসলামের শত্রু’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে থাকে।

এখানেই জামায়াতের প্রথম বড় সুবিধাবাদী রূপটি উন্মোচিত হয়। তারা ব্রিটিশ-বিরোধী বা কংগ্রেস-বিরোধী প্রকৃত কোনো আন্দোলনে নিজেরা অংশ নেয়নি, ত্যাগ স্বীকার করেনি, জেলেও যায়নি। বরং তারা ঘরে বসে মুসলমানদের স্বাধিকার আন্দোলনকে ধর্মীয় ফতোয়া দিয়ে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল, যা প্রকারান্তরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক এবং অখণ্ড ভারতের সমর্থকদেরই সুবিধা করে দিয়েছিল।

৩. ১৯৪৭-এর ভোলবদল: আদর্শ বিসর্জন দিয়ে পাকিস্তানের কোলে

১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট যখন সমস্ত ফতোয়া ও বিরোধিতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পাকিস্তান নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলো, তখন মওদুদী ও তাঁর জামায়াতের সামনে এক অস্তিত্ব সংকটের দেয়াল এসে দাঁড়াল। জামায়াতের মূল চরিত্র এখানেই স্পষ্ট হয়—তারা যদি আদর্শিকভাবে সৎ হতো, তবে যে রাষ্ট্রকে তারা ‘কুফরি রাষ্ট্র’ বলেছিল, সেখানে তাদের রাজনীতি করার কথা ছিল না।

কিন্তু আদর্শের চেয়ে জামায়াতের কাছে বড় ছিল ‘সার্ভাইভাল’ বা টিকে থাকা। ভারতভাগের ঠিক পরপরই, কোটি কোটি ভারতীয় মুসলিম অনুসারীদের দাঙ্গা ও চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে রেখে, ১৯৪৭ সালের শেষভাগে মওলানা মওদুদী তাঁর প্রধান সহযোগীদের নিয়ে সপরিবারে হিজরত করে সেই ‘না-পাকিস্তানেই’ (লাহোরে) আস্তানা গাড়েন।

পাকিস্তানে পা রেখেই জামায়াত তাদের আগের সমস্ত তাত্ত্বিক বই ও ফতোয়াকে একপাশে সরিয়ে রেখে রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলে। যে জিন্নাহকে তারা কিছুদিন আগে ইসলামের শত্রু বলেছিল, তাঁকে তারা ‘কায়েদে আজম’ হিসেবে মেনে নেয় এবং ঘোষণা করে যে, তারা কখনোই পাকিস্তানের বিরোধিতা করেনি, বরং তারা কেবল মুসলিম লীগের পশ্চিমা চরিত্রের সংশোধন চেয়েছিল! এই নাটকীয় রূপান্তরই প্রমাণ করে, জামায়াতে ইসলামীর কাছে নিজেদের মনগড়া ধর্মীয় নীতি কোনো অনড় বিষয় ছিল না; বরং ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য তারা যেকোনো সময় নিজেদের মূল নীতি বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিল।

দ্বিতীয় অধ্যায়: পাকিস্তানে জামায়াতের সুবিধাবাদী রূপান্তর ও দাঙ্গা রাজনীতি (১৯৪৭-১৯৬৯)

১. ‘কাফের রাষ্ট্র’ থেকে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ কার্ড: নতুন রাষ্ট্রে টিকে থাকার লড়াই

পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসার পর জামায়াতে ইসলামী বুঝতে পারে, পূর্বের ফতোয়াগুলোর কারণে সাধারণ মানুষের মনে তাদের প্রতি গভীর সন্দেহ রয়েছে। এই জনবিচ্ছিন্নতা কাটাতে তারা দ্রুত কৌশল পরিবর্তন করে। তারা জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের সেক্যুলার বা উদারপন্থী পাকিস্তানের ধারণাকে নস্যাৎ করতে “ইসলামী রাষ্ট্র” এবং “ইসলামী সংবিধান”-এর স্লোগান তুলতে শুরু করে।

যে মওদুদী দেশভাগের আগে বলেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সংসদীয় গণতন্ত্র হলো ‘জাহেলিয়াত’, সেই মওদুদীই ১৯৪৮ সাল থেকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও শাসনতন্ত্রের অংশ হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। জামায়াতের এই তাত্ত্বিক ডিগবাজির মূল উদ্দেশ্য ছিল—পাকিস্তানের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে নিজেদের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিকারী দল (Pressure Group) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে শাসকরা তাদের অবহেলা করতে না পারে।

২. ১৯৫৩ সালের লাহোর দাঙ্গা: রাজনৈতিক মুনাফা ও রক্তপাতের রাজনীতি

১৯৫১-৫২ সালের দিকে জামায়াত বুঝতে পারে, কেবল তাত্ত্বিক প্রচারণা দিয়ে তারা মুসলিম লীগের ভোটব্যাংকে ফাটল ধরাতে পারছে না। ফলে তারা পাকিস্তানের ক্ষমতার অলিন্দে থাকা কট্টরপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল আমলা-রাজনীতিবিদদের সাথে হাত মেলায়। ১৯৫৩ সালে জামায়াতে ইসলামী এবং মজলিশ-ই-আহরার যৌথভাবে পাঞ্জাবে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে এক সহিংস আন্দোলন গড়ে তোলে।

ইতিহাসবিদদের মতে, এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ধর্মীয় ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুনাফা হাসিলের আকাঙ্ক্ষা। তৎকালীন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মমতাজ দৌলতানা কেন্দ্রীয় খাজা নাজিমুদ্দিন সরকারকে কোণঠাসা করতে আড়াল থেকে মওদুদীকে উসকানি দিচ্ছিলেন। জামায়াত এই সুযোগ লুফে নেয়। লাহোরের রাস্তায় শুরু হয় নৃশংস দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ এবং নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে স্বাধীন পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম ‘মার্শাল ল’ বা সামরিক আইন জারি করতে হয়।

দাঙ্গা উসকে দেওয়ার অপরাধে সামরিক আদালত মওলানা মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু এখানেই জামায়াতের আন্তর্জাতিক লবিং ও সুবিধাবাদী নেটওয়ার্কের প্রথম প্রকাশ ঘটে। মধ্যপ্রাচ্যের কট্টরপন্থী রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর (বিশেষত সৌদি আরব) তীব্র কূটনৈতিক চাপে পাকিস্তানের জান্তা সরকার মওদুদীর মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করতে এবং পরে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনার পর জামায়াত বুঝতে পারে যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে জনসমর্থন না থাকলেও বিদেশী শক্তি এবং সামরিক জান্তার সাথে সমীকরণ মেলাতে পারলে পাকিস্তানে বহাল তবিয়তে টিকে থাকা সম্ভব।

৩. আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচার এবং জামায়াতের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড (১৯৫৮-১৯৬৯)

১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করলে জামায়াতে ইসলামী এক নতুন সংকটে পড়ে। আইয়ুব খান ছিলেন কট্টর মডার্নিস্ট বা আধুনিকপন্থী এবং তিনি রাজনীতিতে ধর্মের অতি-ব্যবহার পছন্দ করতেন না। তিনি জামায়াতের উগ্রবাদী রাজনীতির লাগাম টানতে ১৯৬৪ সালে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জামায়াত তখন আরেকটি ঐতিহাসিক ডিগবাজি খায়। যে মওদুদী তাঁর ‘তাফহীমাত’ ও অন্যান্য গ্রন্থে স্পষ্ট লিখেছিলেন যে—ইসলামে নারীর নেতৃত্ব বা কোনো নারীর রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও না-জায়েজ; সেই মওদুদী ও তাঁর জামায়াত ১৯৬৪-৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খানকে হটাতে ফাতেমা জিন্নাহর (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন) নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বিরোধী দলকে (COP) নিঃশর্ত সমর্থন দেয়!

নারীর নেতৃত্বকে ‘জায়েজ’ করতে জামায়াত তখন যুক্তি দেয় যে, “আইয়ুব খানের মতো বড় স্বৈরাচারকে হটাতে ফাতেমা জিন্নাহর মতো ছোট না-জায়েজ বিষয়কে মেনে নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ!” এই চরম সুবিধাবাদী অবস্থান প্রমাণ করে, জামায়াতের কাছে ইসলাম বা শরিয়তের বিধান কোনো অলঙ্ঘনীয় বিষয় ছিল না; বরং নিজেদের রাজনৈতিক শত্রুকে ঘায়েল করতে এবং সামরিক শাসকের হাত থেকে বাঁচতে তারা যেকোনো সময় শরিয়তের ফতোয়াকে নিজেদের মতো করে বাঁকিয়ে নিতে পারত।

তৃতীয় অধ্যায়: পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতের ভূমিকা এবং বাঙালি দমনের ছক

১. ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির স্বাধিকারের বিরোধিতা

পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) জামায়াতে ইসলামীর আগমন ঘটেছিল সম্পূর্ণ এক পরজীবী শক্তি হিসেবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন—বাঙালির প্রতিটি স্বাধিকার ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে জামায়াত ‘ইসলামের শত্রু’ এবং ‘ভারতের দালালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।

তারা খুব ভালো করেই জানত, পূর্ব বাংলার রাজনীতি প্রগতিশীল, ভাষাভিত্তিক এবং অসাম্প্রদায়িক ধারায় বিকশিত হচ্ছে। এই ধারায় জামায়াতের মতো কট্টরপন্থী ও উর্দূ-আশ্রয়ী দলের কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই। তাই তারা পূর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের লড়াইকে অবদমিত করতে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রধান তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। তারা ইসলামকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বোঝানোর চেষ্টা করত যে, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার একটি ‘হিন্দুস্থানি চক্রান্ত’।

২. ১৯৭০ সালের নির্বাচন: ব্যালট বক্সে জামায়াতের চরম বিপর্যয়

১৯৭০ সালের পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন ছিল জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চোখ-ধাঁধানো ধাক্কা। জামায়াত ও মওলানা মওদুদী ভেবেছিলেন, ইসলামের দোহাই দিয়ে এবং সমাজতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ‘কুফর’ আখ্যা দিয়ে তারা বিপুল ভোট কাটতে পারবেন। তারা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলিয়ে বিপুল সংখ্যক প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণা ছিল অত্যন্ত উগ্র ও আক্রমণাত্মক; তারা ঘোষণা করেছিল যে আওয়ামী লীগ বা প্রগতিশীল দলগুলোকে ভোট দেওয়ার অর্থ হলো ইসলামকে কোরবানি দেওয়া।

কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল, পূর্ব পাকিস্তানের (তৎকালীন পূর্ব বাংলা) ১৬৭টি জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একটি আসনও পায়নি। এমনকি পুরো পাকিস্তানে তাদের মাত্র ৪টি আসন টিকেছিল। এই নির্বাচনের মাধ্যমে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সাধারণ জনগণ জামায়াতের ছদ্মবেশী ও প্রতিক্রিয়াশীল এজেন্ডাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। জামায়াত নিশ্চিতভাবে বুঝে যায়, পরিচ্ছন্ন গণতান্ত্রিক উপায়ে, ভোটের রাজনীতিতে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তারা কোনোদিন এই ভূখণ্ডে ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আর এই গণতান্ত্রিক দেউলিয়াগ্রস্ততা থেকেই তারা ব্যালটের পথ ত্যাগ করে বুটের তলায় আশ্রয় নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

৩. ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ: পাকিস্তানি জান্তার প্রধান তল্পিবাহক ও গণহত্যা

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা শুরু করে, তখন জামায়াতে ইসলামী কোনো ধরনের দ্বিধা ছাড়াই সেই খুনি সামরিক জান্তার প্রধান সহযোগী ও তল্পিবাহক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আযম এবং অন্যান্য শীর্ষ নেতারা পাকিস্তানি জেনারেলদের (যেমন জেনারেল টিক্কা খান ও জেনারেল নিয়াজী) সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে বাঙালি নিধনযজ্ঞের নীল নকশা তৈরি করেন।

তাদের এই সমর্থনের পেছনে ইসলামের কোনো নীতি ছিল না। এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুনাফা হাসিলের খেলা। তারা জানত, পাকিস্তান টিকে থাকলে এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিশীল নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করা গেলে, পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে এবং সামরিক জান্তার দয়ায় তারা সেই ক্ষমতা ভোগ করতে পারবে।

৪. রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গঠন: প্রাতিষ্ঠানিক নৃশংসতা

পাকিস্তানি বাহিনীকে সরাসরি মাঠপর্যায়ে সহায়তা করতে এবং বাঙালিদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করতে জামায়াতে ইসলামী বেশ কয়েকটি কুখ্যাত আধাসামরিক ও কিলিং স্কোয়াড বাহিনী গঠন করে:

রাজাকার বাহিনী:

মে ১৯৭১ সালে খুলনায় জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন জামায়াত নিয়ন্ত্রিত সরকারের অধীনে একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এই বাহিনী গ্রামে গ্রামে ঢুকে হিন্দু সম্প্রদায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া, লুণ্ঠন এবং নারীদের পাকিস্তানি ক্যাম্পে তুলে দেওয়ার মতো জঘন্য অপরাধের নেতৃত্ব দেয়।

আল-বদর ও আল-শামস:

জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’ (বর্তমান ছাত্রশিবির)-এর ক্যাডারদের নিয়ে গঠিত হয় নিখুঁত কিলিং স্কোয়াড ‘আল-বদর’। এর নেতৃত্বে ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং মীর কাসেম আলীর মতো নেতারা। আল-বদর ছিল মূলত হিটলারের ‘এসএস’ (SS) বাহিনীর মতো একটি ফ্যাসিস্ট বাহিনী, যাদের মূল দায়িত্বই ছিল বাঙালি জাতিকে মেধাচ্ছন্ন ও নেতৃত্বহীন করা।

 

৫. বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড: ইতিহাসের জঘন্যতম মেধা-নিধন

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে যখন জামায়াত ও তাদের পাকিস্তানি প্রভুরা নিশ্চিত হয়ে যায় যে যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী, তখন তারা তাদের শেষ কামড়টি দেয়। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও তারা বাঙালি জাতিকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য এক পরিকল্পিত ‘সিলেক্টিভ এলিমিনেশন’ বা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ছক কাটে।

১০ থেকে ১৪ই ডিসেম্বরের মধ্যে আল-বদর বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিকদের (যেমন ড. জিসি দেব, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সেলিনা পারভীন, ডা. আলিম চৌধুরী) তাঁদের বাসা থেকে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যায়। রায়েরবাজার বধ্যভূমি এবং মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে তাঁদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

এই নৃশংসতার পেছনে ছিল জামায়াতের দূরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব। তারা ভেবেছিল, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যদি জন্ম নেয়ও, তার মেরুদণ্ড যদি ভেঙে দেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে তারা আবারও এই ভূখণ্ডে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করে জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে যে বিশ্বাসঘাতকতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ইতিহাস রচনা করেছিল, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে সুবিধাবাদের নিকৃষ্টতম উদাহরণ।

চতুর্থ অধ্যায়: স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতের পুনর্বাসন ও সামরিক শাসকদের কোলে আরোহণ (১৯৭৫-১৯৯০)

১. ১৯৭২-১৯৭৫: নিষিদ্ধ জামায়াত ও আন্ডারগ্রাউন্ড অস্তিত্ব

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার কারণে ১৯৭২ সালের সংবিধানে জামায়াতে ইসলামীসহ সমস্ত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। দলটির শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী নেতারা (যেমন গোলাম আযম) পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও লন্ডনে পালিয়ে যান।

এই সময়টিতেও জামায়াতের ‘সার্ভাইভাল’ বা টিকে থাকার কৌশল থেমে ছিল না। প্রকাশ্য রাজনীতি বন্ধ থাকায় তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে ‘ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ’ (IDL) বা বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের আড়ালে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। একই সাথে তারা মধ্যপ্রাচ্যের কট্টরপন্থী রাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে জোরালো লবিং শুরু করে এবং প্রচারণা চালায় যে—নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ নাকি ইসলাম-বিদ্বেষী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাদের এই অপপ্রচারের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলা এবং একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে তারা পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ পায়।

২. ১৯৭৫-এর নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং জেনারেল জিয়ার সামরিক ছত্রছায়ায় পুর্নবাসন

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অন্ধকার ও অগণতান্ত্রিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে বসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান। নিজের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল শক্তিকে কাউন্টার করতে জেনারেল জিয়ার প্রয়োজন ছিল একটি অনুগত ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির।

জামায়াতে ইসলামী ঠিক এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। তারা খুব ভালো করেই জানত, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতিতে তাদের প্রবেশাধিকার অসম্ভব। তাই তারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই দেশের প্রথম সামরিক ডিকটেটরের তল্পিবাহক হতে সম্মত হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান জারি করে সংবিধানের মূল স্তম্ভ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ উপড়ে ফেলেন এবং নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে জামায়াতের রাজনীতি করার আইনি সুযোগ করে দেন।

এই সামরিক আনুকূল্য পেয়েই ১৯৭৮ সালে জামায়াতের আমির ও কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে বীরদর্পে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৯ সালের মে মাসে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে অফিশিয়ালি পুনরায় তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে। এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত লজ্জাজনক একটি অধ্যায়; কারণ যে দলটির জন্ম হয়েছিল একটি স্বাধীন দেশের বিরোধিতা করে এবং যার হাত ৩০ লাখ বাঙালির রক্তে রঞ্জিত ছিল, তারা স্রেফ একজন সামরিক শাসকের ক্ষমতার লোভকে পুঁজি করে বাংলাদেশে পুনরায় রাজনৈতিক জমি ফিরে পায়।

৩. জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরাচার এবং জামায়াতের দ্বিমুখী খেলা (১৯৮২-১৯৯০)

১৯৮২ সালে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে জামায়াতে ইসলামী তাদের চিরাচরিত ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বিমুখী খেলা শুরু করে। একদিকে তারা এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দিয়ে লোকদেখানো আন্দোলন করছিল, যেন নিজেদের ‘গণতন্ত্রকামী’ হিসেবে জনগণের সামনে জাহির করা যায়।

কিন্তু পর্দার আড়ালে তাদের আসল লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। এরশাদ যখন নিজের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে এবং গ্রামীণ রক্ষণশীল ভোটব্যাংক টানতে সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বিল পাস করেন, তখন জামায়াত আড়ালে এরশাদকে পূর্ণ সমর্থন জোগায়। জামায়াত জানত, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত হলে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক ভিত্তি দুর্বল হবে, যা প্রকারান্তরে জামায়াতের উগ্রবাদী রাজনীতির এজেন্ডাকেই ত্বরান্বিত করবে।

শুধু তাই নয়, এই এরশাদ আমলেই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স, রিয়েল এস্টেট এবং স্বাস্থ্য খাতে এক বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, যা ‘কর্পোরেট জামায়াত’ নামে পরিচিত। তারা বুঝতে পেরেছিল, সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে না পারলেও যদি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও মিডিয়া সেক্টরে শক্তিশালী ক্যাপিটাল বা পুঁজি গড়ে তোলা যায়, তবে যেকোনো সরকারকেই তারা জিম্মি করতে পারবে। স্বৈরাচার এরশাদ নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে জামায়াতের এই অর্থনৈতিক অনুপ্রবেশকে সম্পূর্ণ চোখ বুজে সমর্থন দিয়েছিলেন।

পঞ্চম অধ্যায়: সংসদীয় গণতন্ত্রের যুগে জামায়াতের সুবিধাবাদী জোট রাজনীতি ও ক্ষমতার দাবার ঘুঁটি

১. ১৯৯১ ও ২০০১: ক্ষমতার লোভে আদর্শের চরম বিসর্জন

১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশে যখন সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ঘটে, তখন জামায়াতে ইসলামী কিং-মেকার (King-maker) হওয়ার নতুন কৌশলে মেতে ওঠে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জামায়াত তাদের মাত্র ১৮টি আসন নিয়ে তৎকালীন বিএনপিকে সরকার গঠনে নিঃশর্ত সমর্থন দেয়। এর বিনিময়ে তারা খালেদা জিয়ার সরকারের কাছ থেকে রাজনৈতিক বৈধতা এবং তাদের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ লুফে নেয়।

এরপর ১৯৯৬ সালে জামায়াত আরেকটি অভাবনীয় ডিগবাজি খায়। যে বিএনপির সাথে তারা কিছুদিন আগে সরকার গঠন করেছিল, সেই বিএনপির বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে তারা আওয়ামী লীগের সাথে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হয়। জামায়াতের এই ডিগবাজির পেছনে ইসলামের কোনো দূরতম নীতিও ছিল না; এর মূল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারকে দুর্বল করে নিজেদের দরকষাকষির ক্ষমতা (Bargaining Power) বাড়ানো।

জামায়াতের সুবিধাবাদের চূড়ান্ত রূপটি দেখা যায় ২০০১ সালে, যখন তারা বিএনপির সাথে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকারের অংশীদার হয়। যে দলটির শীর্ষ নেতারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পতাকাকে ‘কাফেরদের তৈরি কাপড়’ বলে ছিঁড়ে ফেলেছিল, সেই মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বাংলাদেশের মন্ত্রী হিসেবে গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেড়ান। এই ঘটনাটি ছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তের প্রতি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের গালে এক চরম চপেটাঘাত। জামায়াত প্রমাণ করেছিল, ক্ষমতার চেয়ার এবং অর্থনৈতিক মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য তারা যেকোনো দলের সাথে বিছানা ভাগ করতে প্রস্তুত, সেখানে তাদের পুরনো কোনো আদর্শ বা নীতি কোনো বাধা নয়।

ষষ্ঠ অধ্যায়: বিদেশী শক্তির তল্পিবহন, করপোরেট জামায়াত এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার

১. ভূ-রাজনৈতিক ও বিদেশী প্রভুদের তল্পিবহন (মধ্যপ্রাচ্য ও মার্কিন অক্ষ)

জামায়াতে ইসলামীর পুরো ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা কখনোই একটি খাঁটি দেশীয় বা মাটি কামড়ানো রাজনৈতিক দল ছিল না। বাংলাদেশে তাদের জনভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় তারা চিরকালই বিদেশী শক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে রাজনীতি করেছে। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে তারা মধ্যপ্রাচ্যের কট্টরপন্থী রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর (বিশেষত সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ) কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ পেট্রো-ডলারের অনুদান সংগ্রহ করে। তারা এই বিদেশী দাতাদের কাছে নিজেদের দক্ষিণ এশিয়ায় ‘কমিউনিজম ও সেক্যুলারিজম-বিরোধী’ একমাত্র দুর্গ হিসেবে উপস্থাপন করত।

একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সাম্রাজ্যবাদী নীতির সাথেও জামায়াত চমৎকার বোঝাপড়া বজায় রেখেছিল। স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) সময় মার্কিন প্রশাসন যখন সমাজতন্ত্র ঠেকাতে উগ্র ধর্মীয় শক্তিগুলোকে মদদ দিচ্ছিল, জামায়াত তখন সানন্দে সেই মার্কিন অক্ষের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করেছে। পরবর্তীতে, ১৯৭১ সালে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং বিচার ঠেকাতে জামায়াত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছিল। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, জামায়াত নিজেদের স্বার্থে দেশের সার্বভৌমত্ব ও বিচারিক স্বাধীনতাকে বিদেশী শক্তির কাছে বন্ধক দিতেও কার্পণ্য করেনি।

২. ‘করপোরেট জামায়াত’: ধর্মব্যবসা ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের নিখুঁত ছক

জামায়াতে ইসলামীর সুবিধাবাদী রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ হলো তাদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, যাকে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা ‘করপোরেট জামায়াত’ বা ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’ (State within a State) হিসেবে অভিহিত করেন। তারা খুব ভালো করেই জানত যে, ভোটের বাজারে তারা সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারবে না। তাই তারা মানুষের ধর্মীয় আবেগকে বাণিজ্যিকীকরণ বা ব্র্যান্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেয়।

তারা ইসলামী ব্যাংকিং, বীমা, রিয়েল এস্টেট, বেসরকারি চিকিৎসালয় (হাসপাতাল), শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (কোচিং সেন্টার ও বিশ্ববিদ্যালয়) এবং মিডিয়া হাউজের এক বিশাল সমান্তরাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এই অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের মূল লক্ষ্য কিন্তু কোনো দাতব্য কাজ বা ধর্মীয় কল্যাণ ছিল না; এর পেছনে ছিল তিনটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুনাফার ছক:

ক্যাডার বাহিনী পোষণ:

এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ সরাসরি তাদের ছাত্রসংগঠন (ছাত্রশিবির) এবং দলীয় ক্যাডারদের পকেটে যায়, যা দিয়ে তারা অস্ত্র কেনা এবং সহিংসতা বজায় রাখার খরচ চালায়।

কর্মসংস্থান ও আনুগত্য:

জামায়াত নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল তাদের নিজস্ব মতাদর্শের লোকদের চাকরি দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে তারা একটি অনুগত ও স্থায়ী ভোটার ও কর্মী বাহিনী তৈরি করতে পেরেছে।

যেকোনো সরকারকে জিম্মি করা:

দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তারা যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারকে ব্ল্যাকমেইল বা জিম্মি করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি ছিল ধর্মের নামে সম্পূর্ণ পুঁজিপতি ও লুটেরা মানসিকতার এক নিখুঁত কর্পোরেট ব্লু-প্রিন্ট।

৩. যুদ্ধাপরাধের বিচার ও জামায়াতের সহিংস অগণতান্ত্রিক রূপ

২০০৯ সালে বাংলাদেশে যখন ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) গঠিত হয়, তখন জামায়াতের সেই পুরনো ফ্যাসিস্ট ও সহিংস রূপটি আবারও জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়। মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আব্দুল কাদের মোল্লা এবং মীর কাসেম আলীর মতো শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যখন সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল রায় দিতে শুরু করে, তখন জামায়াত দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে তারা দেশজুড়ে নজিরবিহীন তাণ্ডব, বোমাবাজি, চলন্ত বাসে অগ্নিসংযোগ করে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা, রেললাইন উপড়ে ফেলা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালায়। একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল কখনো নিজের দেশের সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মেরে বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করে বিচার প্রক্রিয়া ঠেকাতে পারে না। জামায়াতের এই উগ্র সহিংসতা প্রমাণ করে যে, তাদের ফ্যাসিবাদের গভীরতা কতটা ভয়াবহ এবং সুযোগ পেলেই তারা আইন ও গণতন্ত্রকে বুটের তলায় পিষে ফেলতে দ্বিধা করে না।

জামায়াতে ইসলামী চিরকাল সুবিধাবাদী ও অগণতান্ত্রিক শক্তির প্রতীক ছিল, আছে, থাকবে

একটি দীর্ঘ ও কালানুক্রমিক ঐতিহাসিক পর্যালোচনার পর জামায়াতে ইসলামীকে “সুবিধাবাদী ও অগণতান্ত্রিক শক্তির তল্পিবাহক” বলার পক্ষে নিম্নলিখিত রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়:

গণতান্ত্রিক দেউলিয়াত্ব:

জামায়াত শুরু থেকেই জেনে এসেছে যে, তাদের উগ্র ও মধ্যযুগীয় কর্মসূচি প্রকাশ করলে প্রগতিশীল ও মডারেট বাঙালি সমাজ তাদের ব্যালট বক্সে ছুড়ে ফেলবে। এই জনবিচ্ছিন্নতা ও দেউলিয়াত্ব থেকেই তারা চিরকাল পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার বা টিকে থাকার অগণতান্ত্রিক পথ খুঁজেছে।

ঐতিহাসিক ডাবল স্ট্যান্ডার্ড:

তাদের কাছে ইসলামের নীতি বা শরিয়তের বিধান কোনো স্থায়ী বিষয় ছিল না। নিজেদের স্বার্থে তারা জিন্নাহকে কাফের বলেছে, আবার জিন্নাহর পাকিস্তান রক্ষার নামে গণহত্যা চালিয়েছে। নারীর নেতৃত্বকে হারাম ফতোয়া দিয়েও ক্ষমতার লোভে ফাতেমা জিন্নাহ বা বেগম খালেদা জিয়ার আঁচলের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।

সামরিক ও স্বৈরাচারের দাসত্ব:

স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতের কোনো রাজনৈতিক অস্তিত্ব থাকত না, যদি না তারা জেনারেল জিয়ার মতো সামরিক স্বৈরাচারীদের ক্ষমতার লোভের সাথি হতো। তারা সবসময় বুটের তলায় আশ্রয় নিয়ে নিজেদের ডালপালা মেলেছে।

ধর্মের বাণিজ্যিকীকরণ:

তারা ইসলামকে মানুষের ইহলৌকিক বা পারলৌকিক মুক্তির জন্য ব্যবহার করেনি; বরং একে একটি অতি মুনাফাজনক “পলিটিক্যাল ব্র্যান্ড” ও “করপোরেট বিজনেস মডেল” হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গুছিয়েছে।

অতএব, জামায়াতে ইসলামীর সামগ্রিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটি সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে—এটি কোনো আদর্শিক, নৈতিক বা ধর্মীয় সংস্কারবাদী দল নয়। বরং জামায়াতে ইসলামী হলো একটি চরম সুবিধাবাদী, অগণতান্ত্রিক, ছদ্মবেশী ফ্যাসিস্ট এবং করপোরেট লুটেরা শক্তি, যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে চিরকালই অগণতান্ত্রিক ও প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তির প্রধান তল্পিবাহক হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত থাকবে।

তথ্যসূত্র ও প্রামাণিক গ্রন্থতালিকা (References):

১. সিয়াসী কাশমকাশ (১ম-৩য় খণ্ড) — মওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী।

২. The Vanguard of the Islamic Revolution: The Jama’at-i Islami of Pakistan — Seyyed Vali Reza Nasr (University of California Press).

৩. The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan — Ayesha Jalal.

৪. বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ — অ্যান্থনি মাসকারেনহাস।

৫. একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় — মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র।

৬. Radical Politics and Governance in Bangladesh — আলী রীয়াজ।

 

আরও দেখুন: