আমাদের মতো যারা মফস্বল থেকে উঠে এসেছে, কিংবা কড়া ধর্মীয় অনুশাসনে কোনো মাদ্রাসার চারপেয়ালের আবহে বড় হয়েছে, তাদের মনে এই তথাকথিত ‘এলিট’ বা উচ্চবিত্ত শ্রেণির প্রতি এক ধরণের আজন্ম ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা কাজ করে। ছোটবেলা থেকেই অবচেতন মনে একটা ধারণা গেঁথে যায়—আভিজাত্য মানেই বুঝি ধরাছোঁয়ার বাইরের কোনো এক অতিমানবীয় জগৎ। আমার মনেও এই ঘোরটা ছিল, হয়তো মনের কোনো গহীন কোণে আজও কিছুটা রয়ে গেছে।
কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে, জীবনের তাগিদে সমাজের একেবারে তলানির মানুষ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তরের মানুষের সাথেও খুব কাছ থেকে মেশার সুযোগ হয়েছে। দূর থেকে যাদের ‘এলিট’ বলে ভ্রম হতো, তাদের ড্রয়িংরুমে বসে কফি খাওয়ার সৌভাগ্য যেমন হয়েছে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়া এবং তার বাইরের নানা দেশের আসল আভিজাত্যের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগও আমার হয়েছে।
আর এই দীর্ঘ পথচলা শেষে, মানুষের ভেতরের খোলসগুলো একে একে উন্মোচিত হতে দেখার পর আজ অত্যন্ত দুঃখের সাথে, কোনো রাখঢাক না রেখেই বলছি—বাংলাদেশে আসলে কোনো এলিট নেই বললেই চলে। অন্তত যাদেরকে আমরা এলিট বলে চিনি বা মানি, তাদের প্রায় কেউই এলিট নন। এলিট হতে যে শিক্ষা, রুচি, জীবনবোধ, আদর্শ এবং প্রজ্ঞার প্রয়োজন হয়, তা আমাদের দেশের তথাকথিত উচ্চবিত্তদের মধ্যে অনুপস্থিত। তাদের আলিশান গাড়ি আছে, অঢেল সম্পত্তি আছে, কিন্তু ভেতরের মানুষটা আজও সেই কাঁচা টাকার অহংকারে অন্ধ এক ‘নব্যধনী’ মাত্র।
একজন মুসলিম এলিটের ন্যূনতম কন্ডিশন: আপনি কি মেললাতে পারেন?
এলিটের সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেক রকম হতে পারে। তবে আমাদের এই ভূখণ্ডে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন ‘মুসলিম এলিট’ ঠিক কেমন হওয়া উচিত, তার খুব সাধারণ ও ন্যূনতম কিছু প্র্যাক্টিক্যাল প্যারামিটার বা শর্ত দেওয়া যাক। আপনি যাকে এলিট ভাবেন, দয়া করে তার সাথে মিলিয়ে দেখুন:
১. ভাষা ও সাহিত্যের তামিজ
তিনি কি চলনসই বাংলা ও ইংরেজি বলতে এবং লিখতে পারেন? শুধু এটুকুই নয়, তিনি কি বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখেন? এই পাঁচটি ভাষার অন্তত ১০ জন কালজয়ী লেখকের নাম এবং তাঁদের অন্তত ৫টি করে সৃষ্টির প্রেক্ষাপট কি তিনি এক লাইনে ব্যাখ্যা করতে পারবেন?
তিনি কি রবীন্দ্রনাথের অন্তত ১০টি কবিতার কয়েক লাইন কোনো আড্ডায় কনটেক্সট অনুযায়ী আউড়াতে পারেন?
নজরুলের ১০টি লেখার ভেতরের মূল সুর নিয়ে কথা বলতে পারেন?
জীবনানন্দের অন্তত ৫টি কবিতার নির্জনতা কি তিনি অনুভব করতে পারেন?
শেকসপিয়ারের অন্তত ৫টি কালজয়ী নাটকের নাম এবং সেখান থেকে ৩/৪টি বিখ্যাত সংলাপ কি তাঁর নখদর্পণে আছে?
২. ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
তিনি কি অন্তত দুই হাজার বছরের প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাসের বেসিক ক্রনোলজি বা কালানুক্রমটা জানেন? ভারতবর্ষে মুসলমানদের আগমন, তাদের শাসন, তাদের সুফি সংস্কৃতির বিকাশ, তাদের খাদ্যাভ্যাস, কিংবা তাদের ফ্যাশন ও স্টাইল নিয়ে কি তিনি কোনো টেবিলে বসে এক ঘণ্টা জ্ঞানগর্ভ কথা বলতে পারেন?
যিনি নিজের ধর্ম বা ইসলাম ধর্মের সৃষ্টি, এর উত্থান-পতন এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত এর বিবর্তনের ইতিহাস জানেন। ইসলামের পুরো আইনি ও দার্শনিক ফ্রেমওয়ার্কটা যিনি ব্যাখ্যা করতে পারেন। যিনি কেবল তোতাপাখির মতো না পড়ে, কুরআনের মর্মার্থ বুঝে পড়েছেন, ‘সিয়াহ সিত্তা’র (ছয়টি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ) সকল হাদিসে জীবনে অন্তত একবার হলেও চোখ বুলিয়েছেন এবং অন্তত ৩টি ক্লাসিক্যাল সিরাত (মহানবীর জীবনী) পড়েছেন। যার মধ্যে সত্যিকারের ইসলামিক বুনিয়াদি আদব ও বিনয়ের তালিম আছে। যিনি জানেন অমুসলিম বা প্রাচ্যবিদরা মুসলমানদের ধর্মের ন্যারেটিভকে কীভাবে দেখে এবং অন্য প্রধান ধর্মগুলোর ফিলসফির সাথে ইসলামের মিল ও অমিলটা ঠিক কোথায়।
৩. রুচি, সুর ও নন্দনতত্ত্ব
তিনি কি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (Hindustani Classical Music) বোঝেন? অন্তত ১০টি রাগ শুনে চিনতে পারেন? শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ৫টি বিখ্যাত ঘরানা এবং তাদের দিকপাল শিল্পীদের সম্পর্কে তাঁর কি ধারণা আছে? শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্তত ১০ জন ভালো শিল্পীকে নিয়ে তিনি কি আধঘণ্টা কথা বলতে পারবেন? সঙ্গীতের ১০টি প্রধান ইন্সট্রুমেন্ট বা জনরা সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা আছে কি? কবির সুমনের গানগুলোর অন্তর্নিহিত মানে বুঝে কি তিনি শোনেন? কেউ জিজ্ঞেস করলে “সূর্যোদয়ের আগে” গানটির মতো জটিল ও গভীর গানের পলিটিক্যাল ও ফিলসফিক্যাল ব্যাখ্যা কি তিনি দিতে পারবেন?
visual art বা চারুকলার ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের বিখ্যাত ১০ জন পেইন্টার এবং তাঁদের অন্তত ২/৪টি বিশ্বজয়ী শিল্পকর্মের নাম কি তিনি জানেন? ফাইন আর্টের ৩/৪টি প্রধান ধারা সম্পর্কে কি তাঁর ন্যূনতম পড়াশোনা আছে? আর সবচেয়ে বড় কথা—তাঁর মাইন্ড কি ‘জুডিশিয়াল’ বান্যায়পরায়ণ? তিনি কি সস্তা হুজুগে না মেতে যেকোনো বিষয়ে নিরপেক্ষ ও যৌক্তিক রায় দিতে পারেন?
৪. বংশগৌরব ও খাদ্যাভ্যাস (The Culinary Art)
সত্যিকারের এলিট তিনি, যার এই বৈভব স্রেফ এক প্রজন্মের কামাই বা ‘নিউ মানি’ নয়। অন্তত ৪ পুরুষ ধরে তারা সচ্ছল ছিলেন এবং পরবর্তী প্রজন্ম যেন কোনো রকম বৈষয়িক চিন্তা বা বেঁচে থাকার লড়াই ছাড়া নিশ্চিন্তে মানবিক গুণাবলী নিয়ে বড় হতে পারে, সেই রকম ‘জেনারেশনাল ওয়েলথ’ বা বংশানুক্রমিক সম্পদ তাদের ছিল।
এই পারিবারিক আভিজাত্য ফুটে ওঠে তাদের খাবারের টেবিলে। তিনি টেবিলে বসার পর কোনো খাবারটা ঠিকঠাক রান্না হয়েছে আর কোনটা হয়নি—তা এক চামচ মুখে দিয়েই বলতে পারেন। তিনি কি পায়েশ, ক্ষীর এবং ফিন্নির সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরতে পারেন? রান্নার পরে পোলাওয়ের চাল আর বিরিয়ানির চালের টেক্সচার কেমন থাকা উচিত, তা কি তিনি জানেন?
আজকের দিনে কয়জন তথাকথিত এলিট আছেন যারা সব কিছুকে স্রেফ ‘পাকশাক’ বা রান্না করা না বলে—মাংস যে ‘রান্না’ করা হয়, মুড়ি ‘ভাজা’ হয়, চিড়া ‘কোটা’ হয়, দই ‘পাতা’ হয়, রুটি-কাবাব ‘সেকা’ হয়, মালাই ‘জমানো’ হয়, ভাপা পিঠা ‘ভাপানো’ হয় কিংবা ডালের বড়ি ‘দেওয়া’ হয়—এই ভাষাগত সূক্ষ্মতাগুলো আলাদা আলাদা করে বলতে পারেন? ফাইন ডাইনিং, টেবিল ম্যানার্স এবং কোন খাবারের সাথে কোন পদের কম্বিনেশন জমবে (Food Pairing), তা কি তারা জানেন?
৫. আচরণ, বাকসংযম ও সামাজিক তামিজ
একজন সত্যিকারের এলিট নিজের কণ্ঠের টোন ঠিক রেখে কথা বলেন। অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের আদব বা ম্যানার্স তিনি জানেন। তিনি জানেন কাউকে প্রশ্ন করার ভদ্রতা কী, কারও প্রশংসা করার সঠিক তরিকা কী। সব কথা সব জায়গায় চেঁচিয়ে বলতে হয় না—এই টোন এবং ভলিউমের নিয়ন্ত্রণ তাঁর জানা থাকে। কথা বলার সময় তিনি কখনো সস্তা বা কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেন না, তাঁর শব্দ চয়ন হয় নিখুঁত ও মার্জিত।
তাঁর মধ্যে সব ধর্মের প্রতি এক ধরণের দার্শনিক, উদার ও শ্রদ্ধাশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান বা লোকদেখানো গোঁড়ামির চেয়ে তিনি ধর্মের ভেতরের আধ্যাত্মিক গভীরতাকে বেশি খোঁজার চেষ্টা করেন। এবং সমাজে নিজের অবস্থান থেকে তিনি সবসময় প্রচারহীন কিছু চ্যারিটি বা দাতব্য কাজ করেন। তিনি নিজে চিন্তা করতে পারেন এবং চিন্তা করার একটা নিজস্ব আর্ট বা শৈলী তাঁর জানা আছে। তিনি চাইলে সমসাময়িক ইতিহাস, দর্শন, সমাজ, সংসার বা ধর্ম নিয়ে যেকোনো প্রথম সারির পত্রিকার জন্য একটি চমৎকার ও যুক্তিপূর্ণ লেখা নিজে লিখে দিতে পারেন।
সবচেয়ে বড় কথা, কোনো নতুন মানুষের সাথে দেখা হলে কীভাবে কথাবার্তা আগাতে হয়, সেই সামাজিক তামিজ তাঁর আছে। কোনো শিশু কিংবা নারীর সাথে কথা বলার সময় কতটা সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধাশীল হতে হয়, সেই পরিশীলিত শিক্ষা তাঁর মজ্জায় থাকে।
আমাদের ‘এলিট’দের আসল চেহারা: লোভ, অহংকার আর ডাকাতি মন
এবার হাতেনাতে মিলিয়ে দেখুন, উপরে যে প্যারামিটারগুলো দিলাম, তার কয়টি আমাদের দেশের তথাকথিত এলিটদের সাথে মেলে? উত্তরটা আপনিও জানেন।
আমাদের দেশের তথাকথিত এলিটদের হয়তো দুই বা তিন প্রজন্ম ধরে পয়সা হয়েছে, কিন্তু সেই পয়সা তাদের এই শিক্ষা দিতে পারেনি যে—সব টাকা হাত দিয়ে ধরতে নেই। কোনো উপায়ে টাকা আয় করা গেলেই যে তা করতে নেই, এই পরিমিতিবোধ ও নৈতিকতার অভ্যাস তাদের বংশে গড়ে ওঠেনি। তারা দেখতে যতই সুবেশধারী হোন না কেন, ভেতরের ক্ষুধার্ত মানসিকতাটা তারা ঢাকতে পারেন না। এক চরম ক্ষুধার্তের মতো তারা যেন ডাস্টবিন বা ময়লার মধ্য থেকেও টাকা তুলতে দ্বিধা করেন না।
তাদের ড্রয়িংরুমের চাকচিক্য দিয়ে তারা তাদের ভেতরের ‘ডাকাতি মন’ কোনোভাবে ঢেকে রাখেন। লুটপাট, দুর্নীতি, আর অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জন করে তারা নিজেদের এলিট বলে দাবি করেন। অথচ তাদের নিজেদের ভেতরেই ন্যূনতম কোনো আদব, শিক্ষা বা সংস্কৃতি নেই। যে পিতা-মাতা নিজেই এই অপসংস্কৃতি আর লোভের মধ্যে বড় হয়েছেন, তিনি তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকে কী দেবেন? দেওয়ার মতো কোনো ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ তো তাদের কাছে নেই!
শিক্ষা আর রুচির দিক থেকে তারা পুরোপুরি দেউলিয়া, কিন্তু তাদের আছে আকাশচুম্বী এক বিরাট অহংকার। এই অহংকার ক্ষমতার, এই অহংকার কালো টাকার। ফলে তাদের মুখ খুললেই লোভ, ঘৃণা আর চরম বেয়াদবি—লাভা স্রোতের মতো ছলকে ছলকে চারদিকে বের হয়ে আসে। নিচের পিয়নের সাথে বা সাধারণ মানুষের সাথে তাদের আচরণ দেখলেই তাদের আসল বংশপরিচয় ও মজ্জাগত দীনতা প্রকাশ পেয়ে যায়।
কেন আমাদের এই দশা? ইতিহাসের এক শূন্যতা
বাংলাদেশে আজ যে এই সত্যিকারের এলিটের খরা, তার পেছনে কিন্তু এক নির্মম ঐতিহাসিক সত্য জড়িয়ে আছে। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত ভাগ হলো, তখন এই ভূখণ্ডের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সিংহভাগ উচ্চশিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা ও বনেদি হিন্দু পরিবারগুলো ভারতে চলে গেলেন। আবার দেশভাগের পর হায়দ্রাবাদ বা দাক্ষিণাত্য থেকে যে অল্প কিছু পরিশীলিত ও উর্দুভাষী মুসলিম এলিট পরিবার ঢাকায় এসেছিলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর তারা আবার পাকিস্তানে ফিরে গেলেন বা যেতে বাধ্য হলেন।
বাকি রইলেন এ দেশের হাতেগোনা কয়েকজন প্রকৃত বাঙালি মুসলিম এলিট ও বুদ্ধিজীবী পরিবার। ১৯৭১ সালের আল-বদর, আল-শামস আর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে সেই প্রগতিশীল ও মেরুদণ্ডসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী ও এলিটদের ধরে ধরে হত্যা করল।
ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে আভিজাত্য বা এলিট সংস্কৃতির জায়গায় এক মস্ত বড় ‘শূণ্যস্থান’ তৈরি হলো। আর এই শূন্যস্থানটি রাতারাতি পূরণ করল কারা? যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে চোরাচালান, পারমিটবাজি, লাইসেন্সবাজি, ব্যাংকের টাকা লোপাট আর জমি দখল করে গড়ে ওঠা একদল সুযোগ সন্ধানী নব্যধনী শ্রেণী। এদের পকেটে রাতারাতি কোটি টাকা এলেও, মগজে বা রক্তে আভিজাত্যের ছোঁয়া লাগেনি।
আর এই কারণেই, আজ চারদিকে তাকালে আমি শুধু ব্র্যান্ডের লোগো সর্বস্ব, চড়া গলায় কথা বলা, ক্ষমতার দাপট দেখানো কিছু ধনী মানুষ দেখি—কিন্তু আফসোস, পুরো বাংলাদেশে একজনও সত্যিকারের ‘এলিট’ আমি খুঁজে পাই না।
আরও দেখুন: