বিশ্বের বড় ধর্ম সমূহের বিভিন্ন প্রকার অন্ত্যমিল । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

আমি যেকোনো ঘটনার বিশ্লেষণ করতে বসলে ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিষয়টা মাথায় আসে। আর মানুষের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিরাট জায়গা জুড়ে আছে ধর্ম। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ যখনই প্রকৃতির বিশালতার সামনে দাঁড়িয়েছে, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভেবেছে, তখনই তার মনে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা তৈরি হয়েছে। জীবনের মানে খোঁজার, এক পরম শক্তির ওপর ভরসা রাখার এই তাগিদ থেকেই জন্ম নিয়েছে পৃথিবীর নানা ধর্ম।

ওপর ওপর দেখলে মনে হতে পারে আরবের মরুভূমি, ভারতের হিমালয়, জেরুজালেমের প্রাচীন দেয়াল আর পাঞ্জাবের প্রান্তর থেকে উঠে আসা বিশ্বাসগুলোর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এক ধর্মের মানুষ যেখানে কাবা শরিফ ঘিরে ‘তাওয়াফ’ করছে, অন্য ধর্মমতের কেউ সেখানে পবিত্র আগুন কিংবা ধর্মগ্রন্থ বুকে জড়িয়ে ‘সাত পাক’ বা ‘হাকাফাত’ দিয়ে ঘুরছে। কেউ দিনে পাঁচবার মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে সেজদা দিচ্ছে, কেউ সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করছে, আবার কেউ চোখ বুজে ধ্যানে মগ্ন। ভাষা, পোশাক, নিয়ম আর ভূগোলের এই ভিন্নতা আমাদের চোখে বড় বেশি ধরা পড়ে; এজন্য মনে হয় আমরা কত আলাদা!

কিন্তু এই বাইরের নিয়মকানুন আর আচার-অনুষ্ঠানের খোলসটা যদি একটু সরিয়ে দেওয়া যায়, তবে ভেতরের ঘরটায় এক অবিশ্বাস্য মিল চোখে পড়ে। এই লেখাটি মূলত সেই লুকিয়ে থাকা মিলগুলোকে খুঁজে বের করার একটা আন্তরিক চেষ্টা। নদীর উৎস আর মোহনা যেমন এক, তেমনি মানুষের তৈরি সব বড় ধর্মের ভেতরের মূল সুর, নৈতিক শিক্ষা আর শেষ গন্তব্যটাও আসলে এক ও অভিন্ন।

Table of Contents

এই লেখার মূল কারণ ও দর্শন

বিগত বেশ কিছু বছর ধরে বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা আর ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে আমার মনে কিছু প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খেত। প্রাচীনকালে যখন এক অঞ্চলের সাথে অন্য অঞ্চলের কোনো যোগাযোগই ছিল না, তখনো কেন আলাদা আলাদা সংস্কৃতির মানুষ সৃষ্টির রহস্য বোঝাতে গিয়ে ঠিক ‘৭’ সংখ্যাটাকেই বেছে নিল? কেন মুসলিমদের ‘হালাল’ আর ইহুদিদের ‘কোশার’ নিয়মের মধ্যে কাটায় কাটায় এত মিল?

তবে এই লেখাটি লেখার পেছনে আমার সবচেয়ে বড় তাগিদটি ছিল সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক। আমরা ছোটবেলা থেকে সাধারণত অন্য ধর্মগুলো সম্পর্কে কেবল নিজেদের ধর্মের বা নিজেদের সংস্কৃতির নিজস্ব ‘ন্যারেটিভ’ (Narrative) বা দৃষ্টিভঙ্গি শুনে বড় হই। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট ধর্মের যারা আসল অনুসারী, তাদের মুখ থেকে তাদের বিশ্বাসের কথাগুলো আমরা কখনো সরাসরি শুনি না, কিংবা তাদের মূল ধর্মগ্রন্থগুলোও কখনো নিজে পড়ে দেখি না। এর ফলে আমাদের মনে অন্য ধর্ম সম্পর্কে একটি একপাক্ষিক ও সংকীর্ণ ধারণা তৈরি হয়। একটি বহুমাত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজের (Pluralist Society) জন্য এই ধরনের একপাক্ষিক মানসিকতা অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং বিপজ্জনক।

আমার বিশ্বাস, মানুষ যত বেশি অন্য ধর্মগুলোকে জানবে, তাদের মূল বিশ্বাস এবং বিভিন্ন আচারের পেছনের আসল কারণগুলো বুঝতে পারবে, মানুষের ভেতর তত বেশি পরমতসহিষ্ণুতা বা টলারেন্স (Tolerance) তৈরি হবে। অন্ধত্ব কাটাতে কুয়াশাচ্ছন্ন জানলাটা পরিষ্কার করা বড্ড প্রয়োজন।

এখানে পরিষ্কার বলে রাখা ভালো, এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো ধর্মকে ছোট বা বড় প্রমাণ করা নয়, কিংবা সব ধর্মকে জোর করে একাকার করে ফেলাও নয়। প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব যে অনন্য সৌন্দর্য, বৈশিষ্ট্য আর আত্মপরিচয় আছে, তা তার নিজের জায়গায় অক্ষুণ্ণ রেখেও তাদের মধ্যকার অন্তর্নিহিত মানবিক মিলগুলোকে সামনে আনাই আমার মূল লক্ষ্য। আজকের এই অশান্ত আর হানাহানিতে ভরা পৃথিবীতে এই মিলগুলোর কথা জানা এবং বোঝা বড্ড বেশি প্রয়োজন।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: ধর্মের সংখ্যা ও বর্তমান বাস্তবতা

এই অনুসন্ধানের শুরুতে আমাদের একটু পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো দরকার। ইতিহাস, নৃবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের দীর্ঘ গবেষণা সত্ত্বেও পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত মোট কত রকম ধর্মের জন্ম হয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা একক সংখ্যা দেওয়া অসম্ভব। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ক্ষুদ্র উপজাতীয় বিশ্বাস, আঞ্চলিক লোকধর্ম, কাল্ট (Cult) এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম মিলিয়ে পৃথিবীতে প্রায় ১০,০০০-এরও বেশি স্বতন্ত্র ধর্ম ও বিশ্বাসের জন্ম হয়েছে।

প্রাচীনকালের বহু ঐতিহ্যবাহী ও শক্তিশালী ধর্ম (যেমন: মেসোপটেমীয়, সুমেরীয়, মায়া বা ইনকা সভ্যতা) তাদের নিজস্ব সভ্যতার পতনের সাথে সাথে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার অনেক ক্ষুদ্র উপজাতীয় ধর্ম কোনো লিখিত দলিল বা শাস্ত্র না থাকায় কালের গর্ভে চিরতরে হারিয়ে গেছে।

তাহলে বর্তমানে কয়টি ধর্ম টিকে আছে? হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান পৃথিবীতে সক্রিয় বা জীবিত ধর্মের সংখ্যা, তাদের প্রধান প্রধান ধারা এবং সেগুলোর উপদল বা শাখা (Sects) মিলিয়ে প্রায় ৪,৩০০টি। তবে বিশ্ব জনসংখ্যার সিংহভাগই (প্রায় ৮৫%) প্রধান ৫টি ধর্মের অনুসারী। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এই জীবিত ধর্মগুলোকে প্রধানত ৪টি বড় স্তরে ভাগ করা হয়:

১. প্রধান বৈশ্বিক ধর্মসমূহ: খ্রিষ্টধর্ম, ইসলাম, হিন্দুধর্ম এবং বৌদ্ধধর্ম।

২. অন্যান্য বড় ও আঞ্চলিক ধর্মসমূহ: শিখধর্ম, ইহুদি ধর্ম, বাহাই ধর্ম, শিন্তো ধর্ম, তাওবাদ, কনফুসীয়বাদ এবং জরথুষ্ট্রবাদ।

৩. লোকধর্ম বা আদিবাসী ধর্ম (Folk/Indigenous Religions): আফ্রিকা, আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের উপজাতীয় ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস (যেমন: অ্যানিমিজম বা প্রকৃতিপূজা)।

৪. নতুন ধর্মীয় আন্দোলন (New Religious Movements): গত ২০০-৩০০ বছরের মধ্যে গড়ে ওঠা বিভিন্ন আধুনিক আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ধারা।

ধর্মের প্রধান উৎস ও মূল উৎসধারা

পৃথিবীর জীবিত ও মৃত সব ধর্মকে তাদের ভৌগোলিক উৎপত্তি, ঐতিহাসিক বিকাশ এবং দার্শনিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি প্রধান উৎসধারায় বিভক্ত করা যায়, যা আমাদের এই গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে:

ক) আব্রাহামিক উৎসধারা (Abrahamic Religions):

মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি অঞ্চলে উৎপত্তি হওয়া এই ধারাটির মূল উৎস হযরত ইব্রাহিম (আব্রাহাম)-এর শিক্ষা ও তাঁর বংশধরদের মাধ্যমে আসা ঐশী বাণী। এই ধারার ধর্মগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো—তারা কঠোরভাবে একেশ্বরবাদী, নবী-রাসূল ও দেবদূতে বিশ্বাসী, এবং একটি নির্দিষ্ট পবিত্র কিতাব বা শাস্ত্র মেনে চলে। এর মধ্যে রয়েছে ইহুদি ধর্ম (আব্রাহামিক ধারার সবচেয়ে প্রাচীন জীবিত ধর্ম), খ্রিষ্টধর্ম (যীশু খ্রিষ্টের শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিশ্বের বৃহত্তম ধর্ম), এবং ইসলাম (এই ধারার সর্বশেষ ও অন্যতম প্রধান ধর্ম)। এছাড়া বাহাই ধর্ম এবং দ্রুজ (Druze) ধর্মও এই আব্রাহামিক ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত বা উদ্ভূত।

খ) ভারতীয় বা ধার্মিক উৎসধারা (Dharmic/Indian Religions):

ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে সিন্ধু নদ ও হিমালয় উপত্যকা অঞ্চলে এই ধারার উৎপত্তি। এই ধর্মের উৎসগুলোর প্রধান ভিত্তি হলো ‘ধর্ম’ (মহাজাগতিক ও নৈতিক নিয়ম), ‘কর্ম’ (কাজের ফল) এবং ‘পুনর্জন্ম’ বা ‘মোক্ষ’ (জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি)। এর প্রধান স্তম্ভগুলো হলো সনাতন (হিন্দু) ধর্ম (বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন জীবিত ধর্ম যার কোনো একক প্রতিষ্ঠাতা নেই), বৌদ্ধ ধর্ম (সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারতে উদ্ভূত), জৈন ধর্ম (মহাবীর ও তীর্থঙ্করদের কঠোর অহিংস নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত), এবং শিখ ধর্ম (পঞ্চদশ শতকে পাঞ্জাবে গুরু নানক দেব জি-এর হাত ধরে উদ্ভূত একেশ্বরবাদী ধর্ম)।

গ) দূরপ্রাচ্য বা পূর্ব এশীয় উৎসধারা (East Asian Religions):

চীন, জাপান এবং কোরিয়া অঞ্চলে এই ধারার ধর্ম ও দর্শনগুলোর উৎপত্তি। এই ধারার মূল বৈশিষ্ট্য হলো—এরা কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিসত্তা ঈশ্বরে বিশ্বাস করার চেয়ে মহাজাগতিক শৃঙ্খলা, প্রকৃতি, পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নৈতিক জীবনযাপনের ওপর বেশি জোর দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তাওবাদ (Taoism) (লাও সে-র দর্শন, যা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বা ‘তাও’-এর সাথে খাপ খাইয়ে চলার শিক্ষা দেয়), কনফুসীয়বাদ (Confucianism) (কনফুসিয়াসের সামাজিক নীতি, সদাচার ও পারিবারিক শৃঙ্খলা), এবং শিন্তো ধর্ম (Shinto) (জাপানের আদি ধর্ম, যা প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি বা আত্মাকে ‘Kami’ রূপে পূজা করার ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে)।

ঘ) প্রাচীন পৌরাণিক বা মৃত উৎসধারা (Ancient Polytheistic Religions):

এই ধর্মগুলো একসময় মানবসভ্যতার মূল চালিকাশক্তি ছিল, কিন্তু বর্তমানে এগুলো কেবল ‘পৌরাণিক কাহিনী’ বা মিথোলজি (Mythology) হিসেবে টিকে আছে। এগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল বহুঈশ্বরবাদ (Polytheism) এবং প্রকৃতির বিভিন্ন রূপকে মানুষের মতো আবেগ-অনুভূতিসম্পন্ন দেবতা জ্ঞান করা। যেমন: গ্রীক ও রোমান ধর্ম (অলিম্পাস পর্বতের জিউস, জুপিটার, অ্যাপোলো কেন্দ্রিক উপাসনা), মেসোপটেমীয় ও মিশরীয় ধর্ম (যেখানে ফারাওদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি বা অবতার মনে করা হতো), এবং নর্স ধর্ম (স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের প্রাচীন ভাইকিংদের ওডিন, থর, লোকি ইত্যাদি দেবতা কেন্দ্রিক বিশ্বাস)।

ঙ) পারসিক বা ইরানীয় উৎসধারা (Iranian/Persian Religions):

প্রাচীন পারস্য (বর্তমান ইরান) অঞ্চলে এই ধারার উৎপত্তি। এই ধারার ধর্মগুলো পৃথিবীতে ‘দ্বৈতবাদ’ (Dualism)—অর্থাৎ আলো ও আঁধার, বা ভালো ও মন্দের চিরন্তন লড়াইয়ের ধারণা জনপ্রিয় করে তোলে। এর মূল প্রতিনিধি হলো জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism) (হযরত জরথুষ্ট্রের মাধ্যমে প্রচারিত ধর্ম, যা এক পরম ঈশ্বর ‘আহুরা মাজদা’-র উপাসনা শেখায়। একসময় এটি পারস্য সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ছিল, বর্তমানে এদের অনুসারীদের পার্সী বলা হয়)।

বিশ্বের বড় ধর্মসমূহ:

শুরু করার আগে দেখে নিই পৃথিবীতে কতগুলো ধর্ম আছে যেগুলোর অন্তত ১০ লাখ অনুসারী আছে:

অনুসারীদের সংখ্যার ক্রমানুসারে (বেশি থেকে কম) পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্মগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো। প্রতিটি ধর্মের নামের পাশে এর অনুসারী সংখ্যা এবং নিচে সহজ ভাষায় দুই লাইনের বর্ণনা দেওয়া হলো:

আপনার দেওয়া তালিকাটি ধরে প্রতিটি ধর্মের সৃষ্টিকর্তা বা পরম ঈশ্বরের নাম এবং তাদের বিশ্বাসের ধরণ (একেশ্বরবাদী, বহুত্ববাদী নাকি ঈশ্বরহীন) নিচে যুক্ত করে দেওয়া হলো:

১. খ্রিষ্টধর্ম (Christianity)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ২৪০ কোটি

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: গড (পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা—এই ত্রিত্ববাদের অন্তরালে একেশ্বরবাদী)।

যীশু খ্রিষ্টের (হযরত ঈসা আ.) জীবন ও শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে মধ্যপ্রাচ্যে এই ধর্মের উৎপত্তি হয়। বর্তমানে এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ধর্ম এবং এদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হলো বাইবেল।

২. ইসলাম ধর্ম (Islam)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ২০০ কোটি

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: আল্লাহ (কঠোর একেশ্বরবাদী বা তৌহিদ)।

সপ্তম শতকে আরবে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে প্রচারিত এই ধর্ম আল্লাহর একত্ববাদ বা তৌহিদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পবিত্র কুরআন অনুসারী এই ধর্মটি বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বিশ্বাস।

৩. সনাতন বা হিন্দু ধর্ম (Hinduism)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ১২০ কোটি

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: বহুত্ববাদী, তবে প্রধান ঈশ্বর হলেন ‘ব্রহ্ম’ (যাঁর সাকার রূপ ত্রিদেব: ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব)।

কোনো একক প্রবক্তা ছাড়া সিন্ধু উপত্যকায় গড়ে ওঠা এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন জীবন্ত ধর্ম ও দর্শন। বেদ, উপনিষদ ও গীতা অনুসারী এই ধর্মটি মূলত কর্মফল, পুনর্জন্ম এবং মোক্ষলাভের কথা বলে।

৪. বৌদ্ধ ধর্ম (Buddhism)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ৫২ কোটি

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: অব্যাকৃত বা নিরীশ্বরবাদী (এই ধর্মে কোনো সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের ধারণা নেই, মহাজাগতিক নিয়মই মূল)।

খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতে গৌতম বুদ্ধের হাত ধরে এই অহিংসা ও ধ্যানের ধর্মের উৎপত্তি হয়েছিল। চতুরার্য সত্য ও অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণের মাধ্যমে জীবনের সমস্ত দুঃখ থেকে ‘নির্বাণ’ বা মুক্তি লাভই এর মূল লক্ষ্য।

৫. শিখ ধর্ম (Sikhism)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ৩ কোটি

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: ওয়াহেগুরু / ইক ওঙ্কার (একেশ্বরবাদী)।

পঞ্চদশ শতকে পাঞ্জাবে গুরু নানকের মাধ্যমে এই একেশ্বরবাদী ধর্মের সূচনা ঘটে। তাঁদের পবিত্র গ্রন্থ ‘গুরু গ্রন্থ সাহিব’-এর শিক্ষা অনুযায়ী মানবসেবা, সাম্য এবং ঈশ্বরের নাম জপ করাই শিখদের প্রধান আদর্শ।

৬. ইহুদি ধর্ম (Judaism)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: ইয়াহওয়েহ (কঠোর একেশ্বরবাদী)।

হযরত ইব্রাহিম ও মুসা (আ.)-এর ঐতিহ্যের সাথে জড়িত এটি প্রাচীনতম আব্রাহামিক বা একেশ্বরবাদী ধর্ম. হিব্রু তোরাহ বা তানাখ গ্রন্থ অনুসারী এই ধর্মের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ইসরায়েল ও জেরুজালেম।

৭. তাওবাদ (Taoism)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: বহুত্ববাদী, তবে প্রধান চালিকাশক্তি হলো ‘তাও’ (মহাজাগতিক আদি শক্তি বা নিয়ম, যা নিরাকার)।

প্রাচীন চীনে দার্শনিক লাওতজু-র শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে এই আধ্যাত্মিক জীবনদর্শনের জন্ম হয়। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বা ‘তাও’-এর সাথে খাপ খাইয়ে শান্ত ও ভারসাম্যपूर्ण জীবনযাপন করাই এর মূল কথা।

৮. বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: ঈশ্বর / গড (একেশ্বরবাদী)।

ঊনবিংশ শতকে পারস্যে (ইরান) বাহাউল্লাহর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এটি একটি আধুনিক বিশ্বজনীন ধর্ম। বিশ্বের সমস্ত বর্ণ, জাতি ও ধর্মের মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে মানবজাতির ঐক্য প্রতিষ্ঠা করাই এর মূল লক্ষ্য।

৯. কনফুসীয়বাদ (Confucianism)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ৬০ লাখ

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: মূলত সামাজিক ও নৈতিক দর্শন, তবে তারা ‘তিয়ান’ (স্বর্গ বা মহাজাগতিক শৃঙ্খলা)-কে প্রধান শক্তি মানে।

প্রাচীন চীনের মহান শিক্ষক কনফুসিয়াসের নৈতিক ও সামাজিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে এটি গড়ে উঠেছে। এটি প্রথাগত উপাসনার চেয়ে পারিবারিক মূল্যবোধ, বড়দের শ্রদ্ধা এবং সুশাসিত সমাজ গঠনের ওপর বেশি জোর দেয়।

১০. জৈন ধর্ম (Jainism)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: নিরীশ্বরবাদী (মহাবিশ্ব সৃষ্টিহীন ও অনন্ত, তবে তারা কর্মের বন্ধনমুক্ত মুক্তাত্মা বা ‘জিন’-দের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা করে)।

ভারতের একটি প্রাচীন ধর্ম, যা মহাবীরসহ ২৪ জন তীর্থঙ্করের আধ্যাত্মিক শিক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সম্পূর্ণ নিরামিষাশী এই ধর্মের মূল চালিকাশক্তি হলো ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ এবং কঠোর আত্মসংযম।

১১. শিন্তো ধর্ম (Shinto)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ৪০ লাখ

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: বহুত্ববাদী (তারা প্রকৃতির লাখ লাখ শক্তি বা আত্মাকে পুজো করে, যাদের ‘কামি’ বলা হয়)।

এটি জাপানের একটি প্রাচীন লোকজ ও ঐতিহ্যবাহী প্রকৃতিবাদী ধর্ম। এই ধর্মের অনুসারীরা প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান, পূর্বপুরুষ এবং ‘কামি’ নামক অদৃশ্য আত্মাদের শ্রদ্ধা ও পূজা করে থাকে।

১২. ক্যাও দাই (Cao Dai)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: দুক কাও দাই (পরম পিতা ঈশ্বর—একেশ্বরবাদী)।

১৯২৬ সালে ভিয়েতনামে প্রতিষ্ঠিত এটি একটি তুলনামূলক নতুন ও সমন্বিত আধ্যাত্মিক ধর্ম। এই ধর্মে ইসলাম, খ্রিষ্ট, বৌদ্ধ, হিন্দু ও তাওবাদের মূল শিক্ষাগুলোকে একসাথে মিলিয়ে চর্চা করা হয়।

১৩. তেনরিকিও (Tenrikyo)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ২০ লাখ

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: তেনরি-ও-নো-মিকোতো (পরম পিতা বা জগতের সৃষ্টিকর্তা—একেশ্বরবাদী)।

উনবিংশ শতকে জাপানে নাকিয়ামা মিকি নামের এক নারীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই ধর্মের সূচনা হয়। এই ধর্মের মূল শিক্ষা হলো—ঈশ্বর মানুষকে সুখে শান্তিতে বসবাসের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের সেবাই পরম ধর্ম।

১৪. জরথুষ্ট্রবাদ বা পারসি ধর্ম (Zoroastrianism)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ১৫ থেকে ২৬ লাখ

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: আহুরা মাজদা (একমাত্র পরম জ্ঞানী ঈশ্বর—একেশ্বরবাদী)।

প্রাচীন পারস্যের (ইরান) প্রবক্তা জরথুষ্ট্রের মাধ্যমে অবিনশ্বর পরম সত্তা ‘আহুরা মাজদা’-র উপাসনা নিয়ে এই ধর্মের উৎপত্তি। ভালো চিন্তা, ভালো কথা এবং ভালো কাজ—এই তিন মূল নীতির ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে মূলত ভারত ও ইরানে পারসিরা টিকে আছেন।

১৫. ড্রুজ (Druze)

অনুসারী সংখ্যা: প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ

সৃষ্টিকর্তা/পরম ঈশ্বর: আল-হাকিম বি-আমরিল্লাহ (কঠোর একেশ্বরবাদী)।

একাদশ শতকে মধ্যপ্রাচ্যে জন্ম নেওয়া এটি একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক ও রহস্যবাদী আব্রাহামিক ধর্ম বিশ্বাস। তারা কঠোর একেশ্বরবাদ এবং আত্মার পুনর্জন্মে বিশ্বাসী হলেও তাদের ধর্মীয় আচারগুলো গোপন রাখা হয়।

মানুষ যখনই প্রকৃতির বিশালতা দেখেছে, মহাবিশ্বের নিয়মকে বোঝার চেষ্টা করেছে, কিংবা নিজের মৃত্যুর ওপারের জীবন নিয়ে ভেবেছে—তখনই সে একটি বিশ্বাস বা ধর্মের জন্ম দিয়েছে। উৎস, ভূগোল বা ঐতিহাসিক নিয়ম যা-ই হোক না কেন, এই হাজারো ধর্মের মূল সামাজিক লক্ষ্য ছিল মানবসমাজকে একটি সুনির্দিষ্ট নৈতিক ফ্রেমে বেঁধে রাখা এবং মানুষের ভেতর থেকে স্বার্থপরতা দূর করা।

আশা করি, এই লেখার পাতাগুলো আমাদের মনের সংকীর্ণতা দূর করতে এবং আমাদের একপাক্ষিক ন্যারেটিভগুলোকে ভেঙে একটু উদার হতে সাহায্য করবে। আমরা যদি আমাদের ভেতরের আসল মানুষটাকে চিনতে পারি, তবে দেখব আমাদের প্রার্থনার সুর আর চোখের জলের ভাষা আসলে এক—তা যে ঈশ্বরের চরণেই গিয়ে পৌঁছাক না কেন।

বৌদ্ধ ধর্ম

দর্শন, সৃষ্টিতত্ত্ব এবং পরমতত্ত্ব

অধ্যায় ১: আধ্যাত্মিক একতাবোধের দর্শন

সহজ করে বললে, মানুষের ইতিহাস আসলে বিশ্বাসের ইতিহাস। সভ্যতার একেবারে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ যখনই খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়েছে, প্রকৃতির বিশালতা দেখে থমকে গেছে কিংবা নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভেবেছে—ঠিক তখনই তার মনে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা তৈরি হয়েছে। এক পরম শক্তির ওপর ভরসা রাখার এই যে গভীর তাগিদ, এটাই পৃথিবীর নানা ধর্মের জন্ম দিয়েছে। নৃবিজ্ঞানী আর সমাজবিজ্ঞানীরা একটা চমৎকার বিষয় খেয়াল করেছেন—দেশ, কাল, ভাষা আর সংস্কৃতির এত এত তফাত থাকার পরেও পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলোর ভেতরে এমন একটা অদৃশ্য যোগসূত্র আছে, যা আমাদের সবাইকে একটা সাধারণ বিন্দুতে এনে দাঁড় করায়। এই গভীর সত্যটাকে তাত্ত্বিকরা বলেন ‘Perennial Philosophy’ বা সনাতন সত্যবাদ। এই দর্শনের মূল কথাটি খুব সুন্দর—সব ধর্মের বাইরের রূপ, ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান আলাদা হতেই পারে, কিন্তু তাদের ভেতরের আসল সত্য, আত্মিক নির্যাস আর নৈতিক শিক্ষাটা মূলত এক ও অভিন্ন।

বিখ্যাত জার্মান পণ্ডিত ফ্রিডরিখ ম্যাক্সমুলার একবার বলেছিলেন, “যিনি কেবল একটি ধর্ম সম্পর্কে জানেন, তিনি আসলে কোনো ধর্মই জানেন না।” কথাটা কত বড় সত্যি, তা বোঝা যায় যখন আমরা একটু খোলা মন নিয়ে বিভিন্ন বিশ্বাসের গভীরে তাকাই। ইসলাম, সনাতন ধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদি ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম কিংবা শিখ ধর্ম—যেটাই হোক না কেন, মন থেকে বুঝতে চেষ্টা করলেই দেখা যায়, মানুষের মুক্তি, পরম সত্তার কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া আর মানুষের সেবা করার ব্যাপারে প্রতিটি ধর্ম আসলে একই কথা বলছে।

একটু খেয়াল করলেই মিলগুলো চোখে পড়ে। এক ধর্মের ‘তাওয়াফ’ অন্য ধর্মে গিয়ে রূপ নিচ্ছে ‘হাকাফাত’ কিংবা ‘প্রদক্ষিণ’-এ; আবার এক ধর্মের ‘রোজা’ অন্য সংস্কৃতিতে ‘উপবাস’, ‘Lent’ কিংবা ‘Yom Kippur’ নাম নিয়ে মানুষের মন আর শরীরকে শুদ্ধ করছে। এই লেখাটি লেখার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে অন্য সবকিছুর চেয়ে বড় দেখানো নয়, কিংবা সব বিশ্বাসকে জোর করে একাকার করে ফেলাও নয়। বরংচ মানুষ হিসেবে আমাদের ইতিহাসকে একটু কাছ থেকে দেখা; ধর্মের বাইরের দেয়ালগুলো সরিয়ে তার ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক মিলগুলোকে খুব সহজ ও নিরপেক্ষ চোখে চেনা এবং বোঝা।

বাহাই ধর্ম

অধ্যায় ২: সৃষ্টিতত্ত্ব ও মহাজাগতিক পূর্ণতার প্রতীক: ‘৭’ সংখ্যার রহস্য

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় ধর্মের সৃষ্টিতত্ত্ব (Cosmology) আর পবিত্র নিয়মগুলোর দিকে তাকালে একটা বিশেষ সংখ্যা বারবার আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে—সেটা হলো ‘৭’ (সাত)। এই সংখ্যাটি কেবল গণিতের কোনো সাধারণ অঙ্ক নয়, একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় এটি যেন এক মহাজাগতিক পূর্ণতা, জীবনচক্র আর পবিত্রতার এক চিরন্তন প্রতীক।

ক) আব্রাহামিক ধর্মে (ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্ম) ৭ সংখ্যা

ইব্রাহিমীয় বা আব্রাহামিক বিশ্বাসের একেবারে মূলে রয়েছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সাতটি পর্যায়।

  • মহাবিশ্ব সৃষ্টি: তোরাহ (Torah), বাইবেল (Bible) এবং পবিত্র কুরআনের বিবরণ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ঈশ্বর বা আল্লাহ এই পুরো সৃষ্টিজগৎ ৬টি দিনে বা পর্যায়ে তৈরি করেছেন এবং ৭ম পর্যায়ে গিয়ে তা পূর্ণতা পায়। ইহুদি-খ্রিষ্টীয় মতে ঈশ্বর ৭ম দিনে বিশ্রাম নেন, যাকে তারা ‘Sabbath’ বা শাবাত বলে; আর ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহ সৃষ্টিশেষে আরশে সমাসীন হন।

  • ইসলামী ঐতিহ্য: মুসলিমরা হজ্জ ও ওমরার সময় কাবার চারপাশ ঘিরে ঠিক ৭ বার ‘তাওয়াফ’ করেন। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝেও তাদের ৭ বার ‘সাঈ’ বা চক্কর দিতে হয়। এছাড়া কুরআন ও হাদিসে ‘সাত আসমান’ (Seven Heavens), সাতটি পৃথিবী এবং জাহান্নামের সাতটি দরজার কথা বারবার এসেছে।

  • ইহুদি ঐতিহ্য: ইহুদিদের পবিত্র উৎসব ‘Simchat Torah’ এবং ‘Sukkot’-এ তাওরাত বা বেদির চারপাশ দিয়ে ৭ বার চক্কর দেওয়া বাধ্যতা মূলক, যাকে তারা ‘হাকাফাত’ বলে। প্রাচীন জেরুজালেমের মন্দিরে যে পবিত্র বাতিদানী ছিল—যাকে ‘Menorah’ বলা হয়—তার শাখা ছিল ঠিক ৭টি। এমনকি ঐতিহ্যবাহী ইহুদি বিয়েতে কনে বরের চারপাশে ৭ বার ঘুরে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করে।

  • খ্রিষ্টধর্মীয় ঐতিহ্য: বাইবেলের শেষ খণ্ড ‘Book of Revelation’-এ এই ৭ সংখ্যাটি খুব সুনির্দিষ্টভাবে এসেছে। সেখানে ৭টি চার্চ, ৭টি সোনালী বাতিদানী, ৭টি সিলমোহর, ৭টি তূরী আর ঈশ্বরের ৭টি আত্মিক রূপের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া catholic খ্রিষ্টধর্মে মানুষের জীবনকে পবিত্র করার জন্য ৭টি প্রধান সংস্কার বা ‘Sacraments’ রয়েছে।

খ) ভারতীয় ধর্মে (সনাতন, বৌদ্ধ ও শিখ ধর্ম) ৭ সংখ্যা

সিন্ধু, সরস্বতী আর গাঙ্গেয় উপত্যকায় বেড়ে ওঠা ধর্মগুলোতেও এই ৭ সংখ্যাটির আধ্যাত্মিক গুরুত্ব সমানভাবে জড়িয়ে আছে।

  • সনাতন ঐতিহ্য: সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের সূক্ষ্ম শরীরে শক্তির ৭টি মূল কেন্দ্র বা ‘সপ্তচক্র’ (Seven Chakras) রয়েছে, যা জাগ্রত করতে পারলে আধ্যাত্মিক মুক্তি মেলে। হিন্দু মহাজাগতিক ধারণায় ৭টি উচ্চলোক আর ৭টি নিম্নলোকের কথা বলা হয়েছে। বৈদিক সমাজ গঠনে ‘সপ্তর্ষি’ বা সাতজন প্রধান ঋষির স্থান সবার ওপরে। সবচেয়ে বড় কথা, হিন্দু বিয়েতে অগ্নি সাক্ষী রেখে দম্পতিকে ‘সপ্তপদী’ বা সাত পাক ঘুরতে হয়, যা ছাড়া বিয়ে পূর্ণতাই পায় না।

  • বৌদ্ধ ঐতিহ্য: বৌদ্ধ জাতকের গল্প ও ইতিহাসে আছে, গৌতম বুদ্ধ যখন লুম্বিনী কাননে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তখন তিনি ভূমিতে পা রেখেই উত্তর দিকে ৭টি কদম ফেলেছিলেন এবং প্রতিটি পদক্ষেপে একটি করে পদ্মফুল ফুটে উঠেছিল। এটি ছিল তাঁর মহাজাগতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। এছাড়া বৌদ্ধ দর্শনে আধ্যাত্মিক জাগরণের জন্য ‘সপ্ত বুধ্যঙ্গ’ বা সাতটি উপাদানের কথা বলা হয়েছে।

  • শিখ ঐতিহ্য: শিখ ধর্মে অন্যান্য রূপকগুলোর পাশাপাশি আধ্যাত্মিক ও জাগতিক মেলবন্ধনের এক সুন্দর ধারণা রয়েছে। গুরু নানক দেব জি তাঁর বাণীতে ঈশ্বরের সৃষ্টির গভীরতা বোঝাতে ‘সপ্ত পাতাল’ এবং ‘সপ্ত আকাশ’-এর রূপক ব্যবহার করেছেন। এছাড়া শিখ ঐতিহ্যে আনন্দ কারাজ (বিয়ে) সম্পন্ন করার সময় পবিত্র গ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহিব-কে কেন্দ্র করে চার পাক (লাভা) দেওয়া হলেও, মনের ভেতরের আধ্যাত্মিক পূর্ণতা ও আনন্দের সাতটি স্তর বা আত্মিক ধাপের কথা সুফি ভাবধারার মতোই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।

গ) অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে ৭ সংখ্যা

আব্রাহামিক আর ভারতীয় ধারার বাইরেও পৃথিবীর অন্যান্য প্রাচীন ও প্রভাবশালী ধর্মে এই ‘৭’ সংখ্যাটি গভীর অর্থ বহন করে।

  • তাওবাদ (Taoism): প্রাচীন চীনের এই জীবনদর্শনে ৭ সংখ্যাটিকে খুবই রহস্যময় ও শক্তিশালী মনে করা হয়। তাওবাদের মহাজাগতিক তত্ত্বে ‘সপ্তর্ষিমণ্ডল’ বা ‘Big Dipper’ (সাতটি প্রধান তারা)-কে মহাবিশ্বের শক্তির মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধরা হয়। তাদের বিশ্বাস, মানুষের শরীরের ভেতরেও সাতটি প্রধান আধ্যাত্মিক ছিদ্র বা শক্তিদ্বার রয়েছে যা প্রকৃতির সাথে মানুষের সংযোগ ঘটায়।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): ঊনবিংশ শতকে প্রতিষ্ঠিত এই আধুনিক বিশ্বজনীন ধর্মে ৭ সংখ্যাটি আধ্যাত্মিক উত্তরণের প্রতীক। বাহাউল্লাহর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Seven Valleys’ (haft-vádí)-এ মানুষের আত্মার খোদার সান্নিধ্যে পৌঁছানোর সাতটি উপত্যকা বা ধাপের কথা বলা হয়েছে—যার মধ্যে প্রথমটি হলো অনুসন্ধানের উপত্যকা (Valley of Search) এবং শেষটি হলো পরম বিলীনতার উপত্যকা (Valley of True Poverty and Absolute Nothingness)।

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): প্রাচীন পারস্যের এই একেশ্বরবাদী ধর্মে পরম ঈশ্বর আহুরা মাজদা-র অধীনে সাতটি পবিত্র আলো বা স্বর্গীয় সত্তা রয়েছেন, যাদের ‘Amesha Spentas’ বলা হয়। এই সাতটি সত্তা মহাবিশ্বের সাতটি মূল উপাদান (যেমন: আলো, পানি, মাটি, আগুন, উদ্ভিদ, পশু ও মানুষ) রক্ষা করেন। পারসিদের প্রাচীন আচার ও উৎসবেও এই সাতটি উপাদানের প্রতীকী ব্যবহার বাধ্যতামূলক।

  • শিন্তো ধর্ম (Shinto): জাপানের এই ঐতিহ্যবাহী প্রকৃতিবাদী ধর্মে ভাগ্য, সমৃদ্ধি আর দীর্ঘায়ুর প্রতীক হিসেবে সাতজন স্বর্গীয় দেব-দেবীর ধারণা অত্যন্ত জনপ্রিয়, যাদের একসাথে ‘Shichifukujin’ বা ‘Seven Lucky Gods’ বলা হয়। নতুন বছরের শুরুতে বা শুভ কোনো কাজে জাপানিরা এই সাত শক্তির আশীর্বাদ কামনা করে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভাবলে অবাক লাগে—আরবের মরুভূমি, চীনের উপত্যকা, পারস্যের মালভূমি আর ভারতের হিমালয়ের মধ্যে প্রাচীনকালে সরাসরি কোনো যোগাযোগ না থাকলেও কেন সব ধারার ধর্মগুলোই এই ‘৭’ সংখ্যাটিকে তাদের সর্বোচ্চ পবিত্র আচার আর সৃষ্টির রহস্যের সাথে এভাবে জুড়ে দিল?

সমাজবিজ্ঞানীদের চোখে এর ব্যাখ্যাটা অবশ্য বেশ সহজ। মানুষ তার অবচেতন মন দিয়েই প্রকৃতির একটা স্বাভাবিক ছন্দকে টের পেয়েছিল। যেমন—আকাশে খালি চোখে দেখা যায় এমন ৭টি প্রধান জ্যোতিষ্ক (সূর্য, চাঁদ ও ৫টি গ্রহ), প্রকৃতির আলোর ৭টি রঙ, কিংবা চাঁদের আকৃতির পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সপ্তাহের ৭টি দিন। পৃথিবীর ধর্মগুলো মানুষের মনের এই চিরন্তন ও প্রাকৃতিক পূর্ণতাকেই তাদের আধ্যাত্মিক জগতের রূপক হিসেবে আপন করে নিয়েছে।

 

জৈন ধর্ম

 

অধ্যায় ৩: একশ্বরবাদ, পরমতত্ত্ব এবং ঈশ্বরের ধারণার একতা

বাহ্যিক দৃষ্টিতে ধর্মগুলোকে বহুঈশ্বরবাদী, ত্রিত্ববাদী কিংবা কঠোর একেশ্বরবাদী—এই তিন ভাগে ভাগ করা হলেও, দার্শনিক ও ধর্মগ্রন্থের গভীর পর্যালোচনায় দেখা যায়, সব কটি ধর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য আসলে এক এবং অদ্বিতীয় মূল সত্তার দিকে ধাবিত হওয়া।

ধর্মের মূল পরিভাষা ও দার্শনিক রূপ:

  • ইসলাম: পরম সত্তাকে ‘আল্লাহ’ (الله) নামে ডাকা হয়। প্রধান গ্রন্থ পবিত্র আল-কুরআন এবং এর মূল দর্শন হলো এক ও অদ্বিতীয় সত্তা বা ‘তৌহিদ’
  • ইহুদি ধর্ম: পরম সত্তার নাম ‘ইয়াহওয়েহ’ (Yahweh)। প্রধান উৎস তোরাহ বা তানাখ এবং এর রূপ কঠোর একেশ্বরবাদ
  • খ্রিষ্টধর্ম: পরম সত্তাকে ‘গড’ বা ‘ঈশ্বর’ নামে সম্বোধন করা হয়। মূল গ্রন্থ বাইবেল এবং এর দর্শন ত্রিত্ববাদের অন্তরালে একত্ব
  • সনাতন ধর্ম: পরম সত্তার মূল পরিভাষা ‘ব্রহ্ম’ (Brahman)। মূল উৎস উপনিষদ ও গীতা এবং এর মূল দর্শন ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’ (অদ্বৈত বা সর্বেশ্বরবাদ)।
  • শিখ ধর্ম: পরম সত্তার প্রতীক ও নাম ‘ইক ওঙ্কার’ (Ik Onkar)। প্রধান গ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহিব এবং এর রূপ এক পরম সত্য কর্তাপুরখ
  • জরথুষ্ট্রবাদ: পরম সত্তার নাম ‘আহুরা মাজদা’ (Ahura Mazda)। মূল গ্রন্থ আবেস্তা এবং এর দর্শন এক পরম জ্ঞানী ঈশ্বর
  • বাহাই ধর্ম: পরম সত্তাকে ‘বাহা’ (The Unknowable Essence) হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মূল গ্রন্থ কিতাব-ই-আকদাস এবং এর রূপ পরম ও অগম্য একেশ্বরবাদ
  • তাওবাদ: পরম সত্তার পরিভাষা ‘তাও’ (The Tao)। মূল গ্রন্থ তাও তে চিং এবং এর রূপ মহাজাগতিক আদি উৎস ও পরম নিয়ম

ক) আব্রাহামিক ধারায় ঈশ্বরের একতা (ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্ম)

  • ইসলামের তৌহিদ: ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তিই হলো ‘তৌহিদ’ বা আল্লাহর একত্ববাদ। সূরা আল-ইখলাসে স্পষ্ট বলা হয়েছে—“বলুন, তিনিই আল্লাহ, একক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী।” এখানে আল্লাহর সত্তা ও গুণের সাথে অন্য কারো অংশীদারিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে।

  • ইহুদি ধর্মের ‘শেমা’: ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র ঘোষণা হলো ‘শেমা ইসরায়েল’ (Shema Yisrael), যা তাদের প্রতিদিনের প্রার্থনাতে আবশ্যিকভাবে পাঠ করতে হয়। তোরাহের পঞ্চম খণ্ডে (Deuteronomy 6:4) বলা হয়েছে—“শোন হে ইসরায়েল! আমাদের ঈশ্বর ইয়াহওয়েহ, ইয়াহওয়েহ এক।”

  • খ্রিষ্টধর্মের ত্রিত্ববাদের অন্তরালে একত্ববাদ: অনেক সময় খ্রিষ্টধর্মের ‘ত্রিত্ববাদ’ (Trinity: পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা)-কে আপাতদৃষ্টিতে বহুত্বের রূপ মনে হতে পারে, কিন্তু খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের (Christian Theology) মূল কথা হলো—এই তিন রূপ মূলত একই ঈশ্বরের তিনটি ভিন্ন প্রকাশ (Three Persons, One Essence)। যীশু খ্রিষ্ট নিজেই বাইবেলে ইহুদিদের সেই ‘শেমা’ বা একত্ববাদের বাণীকে পুনর্ব্যক্ত করে বলেছিলেন—“সবচেয়ে প্রধান আদেশটি হলো: শোন হে ইসরায়েল! আমাদের প্রভু ঈশ্বর, তিনিই একমাত্র প্রভু।” (মার্ক ১২:২৯)

খ) ভারতীয় ধারায় পরম সত্তা (সনাতন ও শিখ ধর্ম)

  • সনাতন ধর্মের ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’: সনাতন বা হিন্দু ধর্মে বহু দেব-দেবীর উপাসনা করা হলেও ঋগ্বেদের বিখ্যাত একটি শ্লোক (১/১৬৪/৪৬) বলে—“একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি”, অর্থাৎ “সত্য এক, জ্ঞানীরা তাঁকে বহু নামে ডাকেন।” উপনিষদের মূল দর্শন হলো ‘ব্রহ্ম’ (Brahman)—যিনি নিরাকার, সর্বব্যাপী এবং সৃষ্টির আদি ও অন্ত। দেব-দেবীরা হলেন সেই এক পরমেশ্বরেরই বিভিন্ন গুণ, শক্তি বা প্রকৃতির সাকার রূপ।

  • শিখ ধর্মের ‘ইক ওঙ্কার’: শিখ ধর্মের মূল প্রতীক এবং গুরু গ্রন্থ সাহিবের প্রথম শব্দই হলো ‘ইক ওঙ্কার’ (ੴ), যার অর্থ—”ঈশ্বর এক এবং তিনি ওঙ্কার (পরম ধ্বনি) স্বরূপ।” গুরু নানক দেব জি স্পষ্ট করেছিলেন যে, সেই কর্তাপুরখ বা সৃষ্টিকর্তা জন্ম ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বে এক চিরন্তন ও স্বয়ম্ভূ সত্তা।

গ) দূরপ্রাচ্য ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ধর্মে পরমতত্ত্ব

  • বৌদ্ধ ধর্মের ‘ধর্মকায়’ বা পরম সত্য: বৌদ্ধ ধর্মে আব্রাহামিক ধারার মতো কোনো ব্যক্তিসত্তা ঈশ্বরের ধারণা না থাকলেও, মহাযান বৌদ্ধ দর্শনে ‘ধর্মকায়’ (Dharmakaya) বা পরম সত্যের একটি গভীর ধারণা রয়েছে। এটি হলো এমন এক শাশ্বত, অবিনশ্বর এবং মহাজাগতিক নিয়ম বা নীতি, যা পুরো মহাবিশ্বকে সুশৃঙ্খলভাবে টিকিয়ে রেখেছে।

  • তাওবাদ ও কনফুসীয়বাদের পরমতত্ত্ব: তাওবাদের মূল গ্রন্থ ‘তাও তে চিং’-এ বলা হয়েছে, মহাবিশ্বের একটি আদি ও অনির্বচনীয় উৎস রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘তাও’ (The Way)। এই তাও-এর কোনো আকার বা নাম নেই, কিন্তু এর থেকেই সমস্ত সৃষ্টির উৎপত্তি। কনফুসীয় দর্শনেও এই পরম নিয়ম বা মহাজাগতিক শৃঙ্খলাকে ‘তিয়ান’ (Tian) বা স্বর্গীয় বিধান হিসেবে মান্য করা হয়।

  • জরথুষ্ট্রবাদের আহুরা মাজদা: প্রাচীন পারস্যের এই ধর্মে পরম ঈশ্বরকে বলা হয় ‘আহুরা মাজদা’, যার অর্থ পরম জ্ঞানী প্রভু। জরথুষ্ট্রীয় শাস্ত্র অনুযায়ী, তিনি এক, অদ্বিতীয়, সৃষ্টির আদি এবং সমস্ত ভালোর উৎস।

  • বাহাই ধর্মের একেশ্বরবাদ: বাহাই বিশ্বাসে ঈশ্বরকে এক, শাশ্বত এবং মানুষের বুদ্ধির অগম্য এক পরম সত্তা মনে করা হয়। বাহাউল্লাহর শিক্ষা অনুযায়ী, ঈশ্বরের প্রকৃত রূপ মানুষ সরাসরি জানতে পারে না, তবে যুগে যুগে আসা অবতার বা বার্তাবাহকদের মাধ্যমে তাঁর গুণ ও ইচ্ছা প্রকাশিত হয়।

মরুভূমির একেশ্বরবাদ যাকে ‘আল্লাহ’ বা ‘ইয়াহওয়েহ’ বলছে, খ্রিষ্টধর্ম যাকে ‘স্বর্গীয় পিতা’ বলছে, আর্য উপত্যকার ঋষিরা তাকেই ‘ব্রহ্ম’ বা ‘ইক ওঙ্কার’ বলে ডেকেছেন, আর দূরপ্রাচ্যের দার্শনিকেরা তাকেই ‘তাও’ বা ‘ধর্মকায়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নাম, ভাষা, উপাসনাপদ্ধতি এবং সংস্কৃতির ভিন্নতা বাদ দিলে মানুষের আরাধনা ও পরম আশ্রয়ের শেষ ঠিকানা একজনই।

 

জরথুষ্ট্রবাদ বা পারসি ধর্ম

 

অধ্যায় ৪: ঐশ্বরিক দূত, অবতার এবং নবুয়তের ধারণা

মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা বা পরম সত্য যদি এক হন, তবে সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর বার্তা পৌঁছাবে কীভাবে? এই একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পৃথিবীর সব ধর্মের মধ্যে এক অলৌকিক সমান্তরাল রেখা দেখা যায়। ঈশ্বর আর মানুষের মাঝখানের দূরত্বটা ঘুচিয়ে দিতে যুগে যুগে একদল অতিমানবীয়, পবিত্র ও সৎ চরিত্রের মানুষের আগমন ঘটেছে। এদের মূল কাজই ছিল মানুষকে অন্ধকারের পথ থেকে আলোর পথ দেখানো, জীবনের সঠিক মানে বুঝিয়ে দেওয়া।

১. আব্রাহামিক ধর্মে নবুয়ত ও রিসালাত

ইসলাম, খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মে এই পথপ্রদর্শকদের নবী (Prophet) বা রাসুল (Messenger) বলা হয়। হিব্রু ভাষায় এদের একটি সুন্দর নাম আছে—’Navi’।

  • ইসলাম: ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রথম মানুষ আদম (আ.) থেকে শুরু করে ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা হয়ে শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত যুগে যুগে পৃথিবীতে ১ লক্ষ ২৪ হাজার নবী-রাসুল এসেছেন। তাঁরা নিজেরা কেউ ঈশ্বর নন, বরং ঈশ্বরের মনোনীত সবচেয়ে নিখুঁত দাস ও বাণীবাহক, যাঁদের কাজ ছিল আল্লাহর একত্ববাদের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

  • ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্ম: ইহুদিদের প্রধান নবী হলেন হযরত মুসা (Moses), যিনি সিনাই পাহাড়ে ঈশ্বরের কাছ থেকে সরাসরি ‘Ten Commandments’ বা দশটি আদেশ লাভ করেছিলেন। খ্রিষ্টধর্মেও ওল্ড টেস্টামেন্টের সমস্ত নবীকে (যেমন—যিশাইয়, দানিয়েল) পরম শ্রদ্ধেয় মনে করা হয়, যাঁরা যীশুর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। খ্রিষ্টধর্মে যীশুকে সরাসরি ঈশ্বরের মানব রূপ বা ‘ঈশ্বরের পুত্র’ মনে করা হলেও, মানুষের কাছে ঈশ্বরের ভালোবাসা, ক্ষমা ও মুক্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যটি কিন্তু একই।

২. সনাতন ধর্মে অবতারবাদ

সনাতন বা হিন্দু ধর্মের একটি অত্যন্ত গভীর ও অনন্য ধারণা হলো অবতার (Avatar)। শব্দটার সহজ অর্থ হলো—’যিনি ওপর থেকে নিচে অবতীর্ণ হন’। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের ৭-৮ নম্বর শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন:

“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত… তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।”

এর সহজ অর্থ হলো—যখনই পৃথিবীতে ধর্মের গ্লানি বা পতন ঘটে এবং অধর্মের উত্থান হয়, তখনই সাধুদের রক্ষা, দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ এবং ধর্মকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমি যুগে যুগে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হই। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, এই বাণীটি আব্রাহামিক ধর্মের নবীদের আগমনের উদ্দেশ্যের সাথে হুবহু মিলে যায়—সমাজ থেকে অন্যায় দূর করা এবং মানবজাতিকে সৎ পথ দেখানো।

৩. বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মে বোধিসত্ত্ব ও গুরু

  • বৌদ্ধ ধর্ম: বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবীতে কেবল একজন বুদ্ধই আসেননি। যখনই মানুষ চরম নৈতিক সংকটে পড়ে, তখনই তাদের মুক্তির পথ দেখাতে ‘বোধিসত্ত্ব’ বা বুদ্ধগণ আসেন। গৌতম বুদ্ধের পূর্বেও যেমন আরও অনেক বুদ্ধ এসেছিলেন, তেমনি বৌদ্ধ শাস্ত্রে ভবিষ্যতে ‘Maitreya’ (মৈত্রেয়) বুদ্ধের আগমনের কথাও খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

  • শিখ ধর্ম: শিখ ধর্মে মানুষের আধ্যাত্মিক মুক্তির কাণ্ডারি হলেন ‘গুরু’। গুরু নানক দেব জি থেকে শুরু করে গুরু গোবিন্দ সিংহ জি পর্যন্ত ১০ জন মানব গুরু পৃথিবীতে এসেছিলেন। শিখদের বিশ্বাস, এই ১০ জন গুরুর শরীর আলাদা হলেও তাঁদের ভেতরে মূলত একই ঐশ্বরিক আলো বা ‘জ্যোত’ প্রবাহিত ছিল।

৪. অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে ঐশ্বরিক বার্তাবাহক

এই প্রধান ধারাগুলোর বাইরেও পৃথিবীর অন্যান্য বড় বড় ধর্মেও এই ঐশ্বরিক যোগাযোগের ধারণাটি সমানভাবে বিদ্যমান।

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): প্রাচীন পারস্যের এই ধর্মে প্রবক্তা জরথুষ্ট্র (Zoroaster) হলেন পরম ঈশ্বর আহুরা মাজদার মনোনীত একমাত্র বার্তাবাহক। তিনি পাহাড়ের চূড়ায় ধ্যানমগ্ন থাকা অবস্থায় ঈশ্বরের ঐশ্বরিক জ্ঞান বা ‘Vahishta Manah’ লাভ করেন এবং মানুষের কাছে আলো ও অন্ধকারের চিরন্তন লড়াইয়ের মাঝে সত্যের পথে চলার বাণী নিয়ে আসেন।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): এই ধর্মের মূল ভিত্তিটাই দাঁড়িয়ে আছে ‘Progressive Revelation’ বা প্রগতিশীল ঐশ্বরিক প্রকাশের ওপর। বাহাই বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈশ্বর ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মানুষের চেতনা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁর দূত পাঠান। আব্রাহাম, মুসা, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, মুহাম্মদ—এঁরা সবাই ঈশ্বরের একেকটি রূপ বা ‘Manifestation of God’। আর এই যুগের জন্য প্রেরিত সর্বশেষ দূত হলেন স্বয়ং বাহাউল্লাহ।

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদে আব্রাহামিক ধর্মের মতো প্রথাগত নবীর ধারণা না থাকলেও, তারা ‘Zhenren’ বা আত্মিক দিক থেকে নিখুঁত ও অমর মহাপুরুষদের বিশ্বাস করে। এই দর্শনের আদি গুরু লাওতজু (Laozi)-কে তাওবাদের অনুসারীরা কেবল একজন সাধারণ দার্শনিক ভাবেন না, বরং তাঁকে মহাজাগতিক শক্তি ‘তাও’-এর এক মানবিক প্রকাশ বা পরম শিক্ষক হিসেবে শ্রদ্ধা করেন।

আজকের দিনে একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে বোঝা যায়—স্থান, কাল আর ভাষাভেদে নামের হয়তো কিছুটা পার্থক্য ঘটেছে; আরবের ‘নবী’, হিব্রু সংস্কৃতির ‘নভি’, সনাতন ধর্মের ‘অবতার’, বৌদ্ধ ধর্মের ‘বোধিসত্ত্ব’, শিখ ধর্মের ‘গুরু’ কিংবা পারস্যের ‘জরথুষ্ট্র’—সবার ঐতিহাসিক ভূমিকা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কিন্তু এক।

তাঁরা সবাই নিজের যুগের সবচেয়ে সৎ, বিশ্বস্ত ও পবিত্র মানুষ ছিলেন। তাঁরা সবাই মানবজাতিকে হিংসা, অহংকার আর পাপাচার ছেড়ে ক্ষমা, দয়া, আত্মশুদ্ধি এবং এক পরম সত্যের প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছেন। পোশাক আর ভাষার দেয়ালটা সরিয়ে দিলে তাঁদের সবার কণ্ঠস্বর যেন এক অলৌকিক সমান্তরালে এসে মিলে যায়।

 

খ্রিষ্টধর্ম

 

পরকাল, কর্মফল এবং আধ্যাত্মিক সাধনা

অধ্যায় ৫: কর্মফল, পরকাল এবং পুনর্জন্মের তত্ত্ব: রূপকের অন্তরালে অভিন্ন সত্য

একটি খুব চেনা কথা আছে—”মানুষ যা বপন করে, তাই কাটে।” এই সাধারণ কিন্তু গভীর নৈতিক সত্যটিই আসলে পৃথিবীর প্রতিটি প্রধান ধর্মের প্রাণভ্রমরা। ওপর ওপর দেখলে মনে হতে পারে আব্রাহামিক ধর্মের ‘এক জীবন ও পরকাল’-এর সরল ধারণার (linear concept) সাথে ভারতীয় ধর্মের ‘পুনর্জন্ম ও কর্মফল’-এর চক্রাকার ধারণার (Cyclical Concept) একটা মস্ত বড় তদ্বগত অমিল রয়েছে। কিন্তু যদি আমরা একটু খোলা মন নিয়ে এর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক গভীরে প্রবেশ করি, তবে দেখব এই দুই ভাবধারার মূল উদ্দেশ্য আসলে একটাই—মানুষের কর্মের চূড়ান্ত জবাবদিহিতা এবং এই মহাবিশ্বে এক পরম ন্যায়বিচার (Cosmic Justice) প্রতিষ্ঠা করা।

ক) আব্রাহামিক ধর্মে পরকাল ও শেষ বিচার (Linear View)

ইসলাম, খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মে মানুষের জীবনকে একটি সরলরেখা হিসেবে দেখা হয়, যার শুরু আছে এবং এই পৃথিবীতেই তার শেষ। এর ধাপগুলো হলো: জন্ম > মৃত্যু > পুনরুত্থান এবং শেষ বিচার (Resurrection and Judgment Day)।

  • ইসলাম: পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বলা হয়েছে, “যে বিন্দুমাত্র সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে এবং যে বিন্দুমাত্র অসৎকর্ম করবে, সে তাও দেখতে পাবে।” (সূরা আজ-জিলজাল, আয়াত: ৭-৮)। এই বিশ্বাস অনুযায়ী, ইহকাল হলো একটা পরীক্ষার ক্ষেত্র মাত্র। মৃত্যুর পর হাশরের ময়দানে মানুষের প্রতিটি ছোট-বড় কাজের হিসাব নেওয়া হবে এবং তার ভিত্তিতেই চিরস্থায়ী জান্নাত (স্বর্গ) বা জাহান্নাম (নরক) নির্ধারিত হবে।

  • খ্রিষ্টধর্ম ও ইহুদি ধর্ম: বাইবেলের স্পষ্ট শিক্ষা হলো, মানুষের এই পার্থিব মৃত্যুর পর তাকে ঈশ্বরের সামনে জবাবদিহি করতে হবে। খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বে ‘Last Judgment’ বা শেষ বিচারের দিনটি বিশ্বাসের অন্যতম মূল স্তম্ভ, যেখানে যীশু খ্রিষ্টের মাধ্যমে ঈশ্বর মানুষের জীবনের সমস্ত পাপ-পুণ্যের বিচার করবেন। ইহুদি ধর্মেও পরকাল বা ‘Olam Ha-Ba’-এর ধারণা রয়েছে, যেখানে পবিত্র আত্মারা তাদের সৎকাজের জন্য ঈশ্বরের সান্নিধ্যে পুরস্কৃত হয়।

খ) ভারতীয় ধর্মে কর্ম ও পুনর্জন্মের তত্ত্ব (Cyclical View)

সনাতন, বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মে জীবনকে দেখা হয় একটি বৃত্তাকার চক্র হিসেবে, যাকে বলা হয় ‘Samsara’ বা জন্ম-মৃত্যুর অন্তহীন আবর্তন।

  • সনাতন ঐতিহ্য: গীতা ও উপনিষদের মূল কথাই হলো, আত্মা অমর—তার কোনো ক্ষয় বা মৃত্যু নেই। মানুষের শরীরটা কেবল একটা পুরোনো পোশাকের মতো, যা আত্মা বারবার পরিবর্তন করে। এখানে কর্মের হিসাবটা খুব চমৎকার। কর্মের মূলত দুটি অংশ থাকে: ‘ক্রিয়মাণ’ (যা মানুষ এখন করছে) এবং ‘প্রারব্ধ’ (অতীতে করা কর্ম, যার ফল ভোগ করা বাকি)। যতক্ষণ না মানুষ তার জমা হওয়া সমস্ত কর্মের ফল ভোগ করে শেষ করছে, ততক্ষণ তাকে বারবার এই পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়। আর এই চক্র থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়ার নামই হলো ‘Moksha’।

  • বৌদ্ধ ও শিখ ঐতিহ্য: বৌদ্ধ ধর্মেও ‘Karma’ বা ‘Kamma’ হলো এক অমোঘ মহাজাগতিক কার্যকারণ নিয়ম। তবে বৌদ্ধরা সনাতন ধর্মের মতো কোনো স্থায়ী আত্মায় বিশ্বাস করে না; তাদের মতে মানুষের চেতনা বা কর্মের অবিনশ্বর শক্তিটুকুই পরবর্তী জীবনের রূপ ধারণ করে। বুদ্ধ একে একটা প্রদীপের আলো দিয়ে বুঝিয়েছেন—এক প্রদীপ থেকে যেমন অন্য প্রদীপে আগুন ছড়ানো যায়, ঠিক তেমনি এক জীবনের কর্মের শক্তি অন্য জীবনের জন্ম দেয়। এই চক্রের চাকা চিরতরে থামিয়ে দেওয়ার নামই হলো ‘Nirvana’। শিখ ধর্মেও পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, মানুষের ভেতরের অহংকার আর খারাপ কর্মই তাকে জন্ম-মৃত্যুর এই অন্তহীন চক্রে আটকে রাখে, যা থেকে মুক্তি মেলে কেবল ঈশ্বরের স্মরণে ও পবিত্র জীবনে।

গ) অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে জবাবদিহিতার তত্ত্ব

আব্রাহামিক আর ভারতীয় ধারার বাইরে থাকা অন্যান্য প্রাচীন ও বড় বিশ্বাসগুলোতেও মানুষের কর্মের এই ফল পাওয়ার নিয়মটি সমানভাবে সত্য।

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): প্রাচীন পারস্যের এই ধর্মেও জবাবদিহিতার চমৎকার বিবরণ আছে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর প্রতিটি আত্মাকে ‘Chinvat Bridge’ বা বিচার-সেতু পার হতে হয়। মানুষের জীবনের ভালো চিন্তা, ভালো কথা ও ভালো কাজ (Humata, Hukhta, Hvarshta) যদি বেশি হয়, তবে সেতুটি চওড়া হয়ে যায় এবং আত্মা সহজেই আলোর জগতে চলে যায়। আর পাপের পাল্লা ভারী হলে সেতুটি তরবারির মতো ধারালো ও চিকন হয়ে যায় এবং আত্মা নিচের অন্ধকারের গহ্বরে পড়ে যায়।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাই দর্শনে পরকালকে কোনো ভৌগোলিক স্থান (যেমন আলাদা কোনো স্বর্গ বা নরক) মনে করা হয় না। তাদের মতে, পরকাল হলো আত্মার এক আধ্যাত্মিক যাত্রা। এই পৃথিবীতে মানুষ যে ভালো কাজ করে, তা আসলে পরকালের যাত্রার জন্য আত্মাকে শক্তিশালী করে তোলে। আর খারাপ কাজ করলে আত্মা ঈশ্বর থেকে দূরে সরে যায়—ঈশ্বরের এই দূরত্বের যন্ত্রণাই হলো নরক, আর ঈশ্বরের নৈকট্যই হলো আসল স্বর্গ।

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদে মানুষের জাগতিক কর্মের হিসাব রাখার এক মহাজাগতিক নিয়ম রয়েছে। তাদের বিশ্বাস, মানুষের প্রতিটি কাজের প্রভাব প্রকৃতির ওপর পড়ে। যদি কেউ প্রকৃতির নিয়ম বা ‘তাও’-এর বিরুদ্ধে গিয়ে অন্যায় কাজ করে, তবে তার জীবনশক্তি বা ‘Qi’ কমে যায়, যা তাকে অসুস্থতা, মানসিক অশান্তি ও অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ, কর্মের ফল মানুষ এই জীবনেই প্রকৃতিগতভাবে ভোগ করে।

আজকের দিনে একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, আব্রাহামিক ধর্ম ও জরথুষ্ট্রবাদ বলছে মানুষের সব হিসাব-নিকাশ মৃত্যুর পর একবারে একটি মহাজাগতিক বড় বিচারালয়ে (Judgment Day) হবে। আর ভারতীয় ধর্ম ও তাওবাদ বলছে এই হিসাব-নিকাশটি কোনো এক দিনের বিষয় নয়, বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা ধাপে ধাপে ভিন্ন ভিন্ন জীবনে বা প্রকৃতির নিয়মে পরিশোধিত হতে থাকে।

কিন্তু এই বাহ্যিক রূপকগুলোর দেয়ালটা ভেঙে ফেললে যে মূল সুরটি বেজে ওঠে, তা কিন্তু একদম এক: এই মহাবিশ্বে অন্যায় করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি ভালো কাজের সুন্দর পরিণতি এবং প্রতিটি খারাপ কাজের জন্য অনুশোচনা বা শাস্তি একেবারেই সুনিশ্চিত। মানুষের তৈরি করা আইনকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও, মহাজাগতিক ন্যায়বিচারকে ফাঁকি দেওয়ার কোনো উপায় নেই।

 

ইহুদি ধর্ম

 

অধ্যায় ৬: প্রার্থনা, জিকির এবং মন্ত্র জপের আধ্যাত্মিকতা

(Salah, Hakafot, Chanting, and Meditation: The Geometry of Prayer)

প্রার্থনা হলো আসলে মানুষ হিসেবে আমাদের এই ছোট, সসীম জীবনের সাথে পরম ও অসীম এক সত্তার যোগাযোগের একটা অদৃশ্য সেতু। পৃথিবীর সব ধর্মেই এই যোগাযোগের জন্য শরীর, মন আর শব্দকে একটা নির্দিষ্ট শৃঙ্খলায় আনা হয়। নামাযের সিজদা, বৌদ্ধদের ধ্যান, সনাতন ধর্মের জপ কিংবা ইহুদিদের হাকাফাত—সবগুলোর বাইরের রূপ যা-ই হোক না কেন, ভেতরের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই—নিজের ভেতরের অহংকারকে বিসর্জন দিয়ে সেই পরম সত্তার কাছে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া।

১. কায়িক সমর্পণ ও প্রার্থনার ভঙ্গি (Physical Postures)

মানুষ যখন ঈশ্বরের সামনে দাঁড়ায়, তখন তার ভেতরের বিনয়টা শরীরের ভঙ্গিতেও প্রকাশ পায়। পৃথিবীর ধর্মগুলোতে শরীরকে বাঁকানোর এই ভঙ্গিগুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত মিল আছে।

  • ইসলামের সালাত (নামায): নামাযের প্রতিটি ভঙ্গি—যেমন সোজা হয়ে দাঁড়ানো, রুকু করা এবং সবশেষে সিজদা দেওয়া—পরম বিনয় আর সমর্পণের প্রতীক। বিশেষ করে সিজদা বা নিজের কপাল ও নাক মাটিতে ঠেকানোর এই যে ভঙ্গি, এটা মানুষের ভেতরের সমস্ত অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।

  • সনাতন ধর্মের দণ্ডবৎ বা সাষ্টাঙ্গ প্রণাম: হিন্দু ধর্মে উপাসনার একটি বিশেষ ও পরম ভঙ্গি হলো সাষ্টাঙ্গ প্রণাম। এখানে হাত, পা, বুক, কপালসহ শরীরের আটটি অঙ্গ মাটিতে স্পর্শ করিয়ে ঈশ্বরের সামনে নিজেকে সঁপে দেওয়া হয়। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এটি নামাযের সিজদার ভাবনার সাথে হুবহু মিলে যায়।

  • ইহুদি ধর্মের ‘কাদিশ’ ও শরীর দোলানো (Shuckling): ঐতিহ্যবাহী ইহুদিরা যখন জেরুজালেমের পশ্চিম দেয়ালে (Western Wall) বা তাদের সিনাগগে দাঁড়িয়ে তোরাহ পাঠ বা প্রার্থনা করেন, তখন তারা অনবরত শরীরকে সামনে-পেছনে দোলাতে থাকেন। হিব্রু ভাষায় একে বলা হয় ‘Shuckling’। তাদের বিশ্বাস, এটি ঈশ্বরের পবিত্র আলোর সামনে মোমের আলোর মতো নিজের আত্মাকে প্রকম্পিত করার একটি বাহ্যিক রূপ।

২. শব্দ ও ধ্বনির শক্তি: জিকির, মন্ত্র এবং নামজপ (Chanting and Remembrance)

শুধু শরীর নয়, মনের একাগ্রতা আনার জন্য শব্দের সুর আর কম্পনকেও ধর্মগুলো খুব সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছে।

  • ইসলামের জিকির ও তাসবিহ: মুসলমানরা আল্লাহর নাম সার্বক্ষণিক মনে রাখার জন্য হাতের আঙুলে কিংবা তাসবিহ দানা গুনে ‘জিকির’ বা স্রষ্টার গুণগান করেন (যেমন: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ)। এর মূল উদ্দেশ্য হলো চারপাশের হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও মনকে স্রষ্টামুখী রাখা।

  • সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মে মন্ত্র জপ (Japa): সনাতন ধর্মে তুলসী বা রুদ্রাক্ষের মালা ঘুরিয়ে ঈশ্বরের নাম কিংবা বিভিন্ন পবিত্র মন্ত্র জপ করা হয়। ঠিক একইভাবে তিব্বতি বৌদ্ধরা ‘Prayer Wheel’ বা প্রার্থনার চাকা ঘুরিয়ে এবং মালা জপে নির্দিষ্ট মন্ত্র উচ্চারণ করেন (যেমন: ওঁ মণি পদ্মে হুঁ)। শব্দের এই পবিত্র তরঙ্গের মাধ্যমে মনের অস্থিরতা দূর করাই এর আসল লক্ষ্য।

  • শিখ ধর্মের ‘নাম সিমরান’: শিখ ধর্মের প্রধানতম সাধনা বা আরাধনার মাধ্যম হলো ‘নাম সিমরান’ বা ‘ওয়াহেগুরু’ (পরম শিক্ষক ঈশ্বর) নাম মনে মনে বা মুখে জপ করা। গুরু নানক দেব জি স্পষ্ট বলেছিলেন, ঈশ্বরের নাম জপ করা ছাড়া মানুষের মনের ভেতরের ময়লা পরিষ্কার হতে পারে না।

৩. অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে ধ্যানের ঐতিহ্য

আব্রাহামিক আর ভারতীয় ধারার বাইরেও পৃথিবীর অন্যান্য প্রভাবশালী ধর্মে মন ও আত্মাকে শান্ত করার এই চর্চা চমৎকারভাবে টিকে আছে।

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদে প্রথাগত মন্ত্র জপের চেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয় নীরব ধ্যানের ওপর, যাকে তারা বলে ‘Zuowang’ বা “বসে বসে সবকিছু ভুলে যাওয়া”। এই সাধনায় মানুষ চোখ বন্ধ করে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসকে প্রকৃতির ছন্দের সাথে মিলিয়ে দেয়। এর উদ্দেশ্য হলো মনের সমস্ত জাগতিক চিন্তা দূর করে মহাজাগতিক শক্তি ‘তাও’-এর সাথে নিজের আত্মাকে এক করে ফেলা।

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): পারসিরা দিনে পাঁচবার পবিত্র আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে বা আলোর দিকে মুখ করে তাদের বিশেষ প্রার্থনা ‘Kusti’ সম্পন্ন করে। তারা যখন অবিনশ্বর ঈশ্বর আহুরা মাজদার উদ্দেশ্যে তাদের পবিত্র গ্রন্থ আবেস্তা (Avesta) থেকে সুর করে মন্ত্র বা ‘Gathas’ পাঠ করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য থাকে মন থেকে সমস্ত খারাপ চিন্তাকে দূর করে দেওয়া।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাই ধর্মে প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে ‘Obligatory Prayer’ বা প্রার্থনা করার নিয়ম রয়েছে। এছাড়া তারা প্রতিদিন ৯৫ বার ঈশ্বরের একটি গুণবাচক নাম ‘আল্লাহু আবহা’ (আল্লাহ পরম উজ্জ্বল) জপ করে। বাহাউল্লাহর শিক্ষা অনুযায়ী, এই জপ কেবল কোনো আচার নয়, বরং এটি মানুষের আত্মাকে প্রতিদিন ঈশ্বরের গুণাবলীতে রাঙিয়ে তোলার একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন।

আজকের দিনে একটু গভীরভাবে তাকিয়ে দেখলে খুব অবাক লাগে—আরবি ভাষার ‘জিকির’ (Remembrance), হিব্রু ভাষার ‘Kavanah’ (যার অর্থ হলো মনকে এক বিন্দুতে এনে প্রার্থনা করা), সংস্কৃত ভাষার ‘জপ’ (Chanting) আর বৌদ্ধ দর্শনের ‘সমাধি’ (Meditation)—সবগুলোর পেছনের মনস্তত্ত্ব কিন্তু একদম এক।

এগুলোর সব কটিই আসলে মানুষের ছটফটে ও বিক্ষিপ্ত মনকে চারপাশের মায়া, কোলাহল আর জাগতিক মোহ থেকে টেনে এনে এক পরম বিন্দুর দিকে স্থির করার একেকটি বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক চেষ্টা। ভাষা আলাদা, বসার ভঙ্গি আলাদা, কিন্তু মানুষের মনের গভীরে পরম শক্তির সান্নিধ্য পাওয়ার আকুলতা আর প্রশান্তি খোঁজার ব্যাকুলতা সবখানেই হুবহু এক।

 

শিন্তো ধর্ম

 

অধ্যায় ৭: উপবাস ও ব্রত পালন: শরীর ও আত্মার পরিশুদ্ধি

উপবাস বা না খেয়ে থাকাটা কেবল ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করার কোনো সাধারণ নিয়ম নয়; এটি মূলত শরীরের ওপর মনের এবং আমাদের ভেতরের পশুপ্রবৃত্তির ওপর আত্মার বিজয় ঘোষণার এক চিরন্তন উৎসব। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় ধর্মে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা তিথিতে অন্ন-জল ত্যাগ করে আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং সেই পরম ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের এক অমোঘ বিধান রয়েছে।

ক) আব্রাহামিক ধর্মে উপবাসের আধ্যাত্মিকতা

ইব্রাহিমীয় বা আব্রাহামিক বিশ্বাসের মূলে উপবাসের মূল উদ্দেশ্য হলো স্রষ্টার প্রতি ভয়, ভালোবাসা এবং নিজের আত্মাকে পবিত্র করা।

  • ইসলামের সওম বা রোজা: ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি হলো পবিত্র রমজান মাসের দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখা। সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার ও জাগতিক চাহিদা থেকে বিরত থাকার মূল উদ্দেশ্য হলো ‘Takwa’ বা খোদাভীতি অর্জন করা। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: “হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর—যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৩)

  • ইহুদি ধর্মের ইয়োম কিপ্পুর (Yom Kippur): ইহুদি ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে পবিত্র ও গম্ভীর দিন হলো এই ‘Yom Kippur’ বা ‘প্রায়শ্চিত্তের দিন’। এই বিশেষ দিনে ইহুদিরা বিগত বছরের সমস্ত পাপের জন্য ঈশ্বরের কাছে আকুল হয়ে ক্ষমা চান এবং টানা ২৫ ঘণ্টা পূর্ণ উপবাস (এমনকি এক ফোঁটা পানি পান করা থেকেও বিরত থাকা) পালন করেন।

  • খ্রিষ্টধর্মের লেন্ট (Lent): যীশু খ্রিষ্টের মরুভূমিতে ৪০ দিনের উপবাস এবং তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পূর্বের সময়কালকে স্মরণ করে খ্রিষ্টানরা (বিশেষ করে ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স সম্প্রদায়) ৪০ দিনের ‘Lent’ বা মহোপবাস পালন করেন। এই সময়ে তারা সাধারণত মাছ-মাংস, বিভিন্ন বিলাসিতা বা নিজেদের খুব প্রিয় কোনো খাবার ত্যাগ করে ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা ও আত্মসংযমে মগ্ন থাকেন।

খ) ভারতীয় ধর্মে উপবাস ও ব্রত

সিন্ধু ও গাঙ্গেয় উপত্যকার ধর্মগুলোতে উপবাসকে দেখা হয় শরীর ও মনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার একটি আধ্যাত্মিক সাধনা হিসেবে।

  • সনাতন ধর্মের একাদশী ও ব্রত: সনাতন ধর্মে চাঁদের গতির ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে দুটি একাদশী তিথিতে উপবাস রাখার নিয়ম রয়েছে। এছাড়া দুর্গাপূজা, শিবরাত্রি বা ছট পূজার মতো বড় বড় ধর্মীয় উৎসবে অনেকে কঠিন নির্জলা (পানি ছাড়া) উপবাস পালন করেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে এনে মনকে ভগবানের চরণে অর্পণ করা।

  • বৌদ্ধ ধর্মের ‘উপোসথ’ (Uposatha): বৌদ্ধ ধর্মে পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও অষ্টমীর তিথিতে অনুসারীরা ‘Uposatha’ পালন করেন। এই পবিত্র দিনে সাধারণ গৃহীরাও সন্ন্যাসীদের মতো দুপুরের পর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত সমস্ত শক্ত খাবার বর্জন করেন এবং বুদ্ধের আটটি শীল (অষ্টাঙ্গ শীল) খুব কঠোরভাবে মেনে চলেন।

  • জৈন ধর্মের উপবাস ও ত্যাগ: জৈন ধর্মে উপবাস বা ‘Upvas’ আত্মশুদ্ধির সবচেয়ে বড় মাধ্যম। তাদের বিখ্যাত উৎসব ‘Paryushana’-র সময় অনুসারীরা টানা কয়েকদিন ধরে কেবল ফোটানো পানি খেয়ে উপবাস পালন করেন। জৈন দর্শনে স্বেচ্ছায় খাবার ত্যাগ করে আত্মাকে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত করার এই প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়।

গ) অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে উপবাসের ঐতিহ্য

আব্রাহামিক আর ভারতীয় ধারার বাইরেও পৃথিবীর অন্যান্য প্রভাবশালী ও বড় বিশ্বাসগুলোতে উপবাসের সুন্দর চর্চা রয়েছে।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাই ক্যালেন্ডারের শেষ মাসটিতে (যা সাধারণত মার্চের ২ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে পড়ে) বাহাই অনুসারীদের জন্য ১৯ দিনের রোজা বা উপবাস রাখা বাধ্যতামূলক। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা সব ধরনের পানাহার থেকে বিরত থাকেন। বাহাউল্লাহর শিক্ষা অনুযায়ী, এই বাহ্যিক উপবাস আসলে মনের ভেতরের স্বার্থপরতা ও জাগতিক লোভ-লালসা থেকে মুক্ত থাকার একটি প্রতীকী রূপ।

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদে উপবাসের একটি অনন্য ও প্রাচীন রূপ রয়েছে যাকে বলা হয় ‘Bigu’ বা “শস্য বর্জন”। তাওবাদী সাধকেরা আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চাল, গম বা শস্যদানা খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। তাদের বিশ্বাস, এর ফলে শরীর হালকা হয়, ভেতরের নেতিবাচক শক্তি দূর হয় এবং মহাজাগতিক শক্তি ‘Qi’ খুব সহজে শরীরে প্রবাহিত হতে পারে।

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): পারসি ধর্মে অন্যান্য ধর্মের মতো শরীরকে কষ্ট দিয়ে রোজা রাখার প্রথাগত নিয়ম নেই, কারণ তারা শরীরকে ঈশ্বরের একটি সুন্দর উপহার মনে করে। তবে তাদের দর্শনে এক গভীর উপবাসের কথা বলা হয়েছে—তা হলো “reaping the fast of sin” বা পাপ থেকে উপবাস। অর্থাৎ, মনকে সবসময় খারাপ চিন্তা, খারাপ কথা ও খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখাই হলো তাদের আসল উপবাস। এছাড়া বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিনে (যেমন প্রতিটি মাসের চারটি বিশেষ দিনে) তারা মাংস খাওয়া থেকে বিরত থেকে এক ধরনের প্রতীকী উপবাস পালন করে।

আজকের আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান যেটিকে ‘Autophagy’ (অটোফেজি) বা উপবাসের মাধ্যমে শরীরের ভেতরের ক্ষতিকর ও বিষাক্ত কোষগুলো ধ্বংস করার এক চমৎকার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া বলছে, পৃথিবীর ধর্মগুলো হাজার বছর আগেই তাকে এক গভীর আধ্যাত্মিক রূপ দিয়েছিল।

ক্ষুধার তীব্র জ্বালা নিজে অনুভব করার মাধ্যমে ধনীদের মনে যেন গরিব ও অনাহারী মানুষের প্রতি সত্যিকারের সহমর্মিতা ও দয়া তৈরি হয়, এবং আমাদের ভেতরের খারাপ কামনা-বাসনাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে এনে আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করা যায়—এটাই হলো পৃথিবীর সব ধর্মের উপবাসের পেছনের আসল ও অভিন্ন দর্শন। ভাষা আর নিয়মের তফাত থাকলেও, মানুষের আত্মাকে শুদ্ধ করার আকুতিটা সবখানেই এক।

 

ড্রুজ

 

অধ্যায় ৮: দান, চ্যারিটি এবং সেবামূলক অর্থনীতি

সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর করা, সম্পদের সঠিক বণ্টন এবং মানুষের সেবা করাকে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্মই ঈশ্বরের আরাধনার সমকক্ষ মর্যাদা দিয়েছে। ধর্মগুলোর অর্থনৈতিক দর্শনের দিকে তাকালে একটা চমৎকার বিষয় দেখা যায়—নিজের উপার্জিত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য খরচ করাকে কেবল ওপর ওপর ‘দয়া’ হিসেবে দেখানো হয়নি, বরং একে একটি বাধ্যতামূলক ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে রূপ দেওয়া হয়েছে।

১. ইসলামের যাকাত ও সামাজিক নিরাপত্তা

ইসলামে ধনীদের অলস বা উদ্বৃত্ত সম্পদের ওপর প্রতি বছর আড়াই শতাংশ (২.৫%) যাকাত দেওয়া ফরজ বা একদম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল কথা হলো—সম্পদ যেন কেবল ধনীদের মাঝেই ঘুরপাক না খায়। এখানে যাকাত কোনো ঐচ্ছিক করুণা বা দয়া নয়, বরং ধনীর সম্পদে দরিদ্র মানুষের একটি আইনগত ও অলঙ্ঘনীয় অধিকার।

২. ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মের তজেদাকাহ ও দশমাংশ (Tithing)

  • ইহুদি ধর্মের তজেদাকাহ: হিব্রু ‘Tzedakah’ শব্দের অর্থ কেবল দান বা চ্যারিটি নয়, এর মূল অর্থ হলো ‘ন্যায়বিচার’ (Justice)। ইহুদি ধর্মীয় আইন বা হালাখাহ অনুযায়ী, অভাবী মানুষকে সাহায্য করা কোনো মনের খেয়াল বা ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য একটি বাধ্যতামূলক সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

  • খ্রিষ্টধর্মের টাইথ বা দশমাংশ: বাইবেলের দীর্ঘ ঐতিহ্য অনুযায়ী, খ্রিষ্টানদের (বিশেষ করে অনেক প্রথাগত ও গোঁড়া সম্প্রদায়ে) তাদের মোট উপার্জনের দশ ভাগের এক ভাগ (১০%) ঈশ্বরের কাজে অর্থাৎ চার্চের উন্নয়ন এবং গরিব-দুঃখীদের সেবায় দান করার নিয়ম রয়েছে, যাকে তারা ‘Tithe’ বা দশমাংশ বলে।

৩. ভারতীয় ধর্মের দান ও শিখদের ‘দাসবান্ধ’

  • সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মে ‘দান’: হিন্দু শাস্ত্রে ‘গুপ্তদান’ এবং ক্ষুধার্তকে ‘অন্নদান’ করাকে সবচেয়ে মহৎ পুণ্য বলা হয়েছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, কোনো প্রতিদানের আশা না করে, সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে যে দান করা হয়, তা-ই হলো ‘সাত্ত্বিক দান’। বৌদ্ধ ধর্মেও ভিক্ষু সংঘ ও সাধারণ মানুষকে অন্ন-বস্ত্র দান করাকে আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রথম ধাপ মনে করা হয়, যার একটি বড় উদাহরণ হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘কঠিন চীবর দান’।

  • শিখ ধর্মের দাসবান্ধ ও লঙ্গর: শিখ ধর্মের অন্যতম মূল অর্থনৈতিক স্তম্ভ হলো ‘Dasvandh’। প্রতিটি শিখ তাদের মোট আয়ের ১০% অংশ গুরুদ্বারের কেন্দ্রীয় তহবিল ও আর্তমানবতার সেবায় দান করতে বাধ্য। আর এই ভালোবাসার টাকা দিয়েই পরিচালিত হয় তাদের বিখ্যাত ‘Langar’ বা লঙ্গরখানা, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-জাতি বা ধনী-দরিদ্রের কোনো তফাত না করে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ও পরম সমাদরে খাবার খাওয়ানো হয়।

৪. অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে সেবামূলক অর্থনীতি

আব্রাহামিক আর ভারতীয় ধারার বাইরে থাকা অন্যান্য প্রাচীন ও বড় বিশ্বাসগুলোতেও মানুষের সেবায় অর্থ খরচ করাকে আত্মশুদ্ধির অংশ মনে করা হয়।

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): পারসি বা জরথুষ্ট্রীয় দর্শনে দানশীলতাকে মানুষের সবচেয়ে বড় গুণের একটি মনে করা হয়। তাদের মূল মন্ত্রই হলো—ভালো চিন্তা, ভালো কথা ও ভালো কাজ। পারসি সমাজ বিশ্বজুড়ে তাদের দাতব্য কাজের জন্য পরিচিত। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সম্পদ জমিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং খোদার সৃষ্টিকে সুখে রাখার জন্য সম্পদ খরচ করাই হলো প্রকৃত ধর্ম। আর এ কারণেই ধনী পারসিরা তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও অনাথ আশ্রমে দান করে থাকেন।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাই ধর্মে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নিয়ম রয়েছে যাকে বলা হয় ‘Huqúqu’lláh’ বা “ঈশ্বরের অধিকার”। এই নিয়ম অনুযায়ী, একজন মানুষের সমস্ত প্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ শোধ করার পর যদি তার কাছে অতিরিক্ত সঞ্চয় থাকে, তবে সেই বাড়তি আয়ের ১৯% বা উনিশ শতাংশ অংশ বিশ্বজুড়ে মানবসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য বাহাই কেন্দ্রীয় তহবিলে দান করতে হয়।

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদে প্রথাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কর বা যাকাতের মতো নিয়ম না থাকলেও, তাদের জীবনদর্শনে ‘Gongde’ বা পুণ্য অর্জনের জন্য নিঃস্বার্থ পরোপকারকে অপরিহার্য মনে করা হয়। তাওবাদের অন্যতম আদি গ্রন্থ ‘Taiping Jing’-এ বলা হয়েছে, যারা সমাজে অনেক বেশি সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তা ক্ষুধার্ত ও অভাবী মানুষকে না দিয়ে জমিয়ে রাখে, তারা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বা ‘তাও’-এর চোর। সম্পদকে নদীর পানির মতো প্রবাহিত রাখতে হবে যেন তা সবার উপকারে আসে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, জগতের সব বড় ধর্মই একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে একদম একমত: আমাদের উপার্জিত সম্পদ কেবল নিজের একার ভোগের জন্য নয়।

আরবের ‘যাকাত’, হিব্রুর ‘Tzedakah’, খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতির ‘Tithe’, পাঞ্জাবের ‘Dasvandh’ কিংবা সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মের ‘দান’—সবগুলোর বাইরের ভাষা ও নিয়ম যা-ই হোক না কেন, মূল ভেতরের বার্তাটি কিন্তু হুবহু এক। তা হলো—সামাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের দেয়ালটা ভেঙে ফেলে প্রতিটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, এবং নিজের স্বার্থপরতা ত্যাগ করে মানুষের সেবা করার মাধ্যমেই সেই পরম স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা।

 

ইসলাম ধর্ম

 

 

সমাজ, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক আচার

অধ্যায় ৯: বিবাহ ও পরিবার গঠন: বৃত্তাকার প্রদক্ষিণ ও সুরক্ষা

বিবাহ কেবল দুটি মানুষের আইনি বা সামাজিক চুক্তি নয়, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্মে একে একটি পবিত্র আধ্যাত্মিক বন্ধন (Sacramental Union) হিসেবে দেখা হয়। মানব সমাজের এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির সূচনাতে বিভিন্ন ধর্মের রীতিনীতির মধ্যে এক বিস্ময়কর মনস্তাত্ত্বিক মিল লক্ষ্য করা যায়—বিশেষ করে মহাজাগতিক পূর্ণতার প্রতীক ‘৭’ সংখ্যাকে কেন্দ্র করে গোল হয়ে প্রদক্ষিণ করার ঐতিহ্য।

ক) ইহুদি ও হিন্দু বিয়ের বৃত্তাকার মিল (Hakafot & Saptapadi)

  • ইহুদি বিয়ের হাকাফাত (Hakafot): ঐতিহ্যবাহী ইহুদি বিয়েতে বর-কনে যখন বিয়ের মণ্ডপে—যাকে তারা ‘Chuppah’ বলে—প্রবেশ করে, তখন এক অনন্য দৃশ্য দেখা যায়। কনে তার মা ও শাশুড়িকে সাথে নিয়ে মণ্ডপে দাঁড়িয়ে থাকা বরের চারপাশ দিয়ে গোল হয়ে ঠিক সাতবার চক্কর দেয়। ইহুদি আধ্যাত্মিক বিশ্বাস মতে, ঈশ্বর যেভাবে ৭ দিনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছিলেন, তেমনি এই ৭টি চক্করের মাধ্যমে কনে তার স্বামীর চারপাশে একটি ‘আধ্যাত্মিক সুরক্ষাবলয়’ তৈরি করে একটি নতুন ঘর বা পৃথিবী সাজানোর অঙ্গীকার করে।

  • হিন্দু বিয়ের সাত পাক ও সপ্তপদী: সনাতন বা হিন্দু বিয়েতেও এই চক্কর দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত কেন্দ্রীয়। যেমন বাঙালি হিন্দু ঐতিহ্যে বিয়ের শুরুতে কনেকে পিঁড়িতে বসিয়ে বরের চারপাশে সাতবার ঘোরানো হয়। এরপর মূল বৈদিক আচার ‘সপ্তপদী’-তে বর ও কনে একসাথে পবিত্র অগ্নিকে সাক্ষী রেখে সাতটি পদক্ষেপ ফেলে বা সাতবার প্রদক্ষিণ করে। এই সাতটি চক্করের প্রতিটিতে একটি করে সুনির্দিষ্ট প্রতিজ্ঞা বা অঙ্গীকার থাকে—যার মধ্যে রয়েছে পরস্পরকে আগলে রাখা, সুখ-দুঃখের ভাগীদার হওয়া, সম্পদ রক্ষা এবং আজীবন বিশ্বস্ত থাকার শপথ।

খ) ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মে পারিবারিক বন্ধনের পবিত্রতা

  • ইসলামের নিকাহ (Nikah): ইসলামে বিয়েকে বলা হয় ঈমানের বা বিশ্বাসের অর্ধেক। যদিও ইসলামে বিয়ের সময় কনে বরের চারপাশ ঘোরার মতো কোনো কায়িক আচার নেই, তবে এখানেও বিয়ের মূল ভিত্তি হলো ‘ইজাব ও কবুল’ (প্রস্তাব ও সম্মতি) এবং ‘মোহরানা’ (কনেকে দেওয়া বাধ্যতামূলক বিয়ের উপহার), যা নারীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

  • খ্রিষ্টধর্মের পবিত্র চুক্তি (Holy Matrimony): খ্রিষ্টধর্মে বিবাহকে ঈশ্বরের তৈরি একটি শাশ্বত নকশা মনে করা হয়। চার্চের বেদির সামনে দাঁড়িয়ে যাজকের উপস্থিতিতে বর-কনে একে অপরের আঙুলে আংটি পরিয়ে দেয় এবং বাইবেলের বাণী উচ্চারণ করে প্রতিজ্ঞা করে— “সুখে-দুঃখে, সম্পদে-বিপদে, মরণেও আমরা এক থাকব।” খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈশ্বর যাকে যুক্ত করেছেন, মানুষ যেন তাকে আলাদা না করে।

গ) অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে বিবাহের রূপরেখা

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): পারসি বিয়েতেও বৃত্তাকার বন্ধনের একটি সুন্দর রূপক দেখা যায়। বিয়ের মূল অনুষ্ঠানের সময় বর ও কনেকে একটি সুতোর মাধ্যমে একে অপরের সাথে বাঁধা হয় এবং তাদের মাঝখানে একটি সাদা কাপড় বা পর্দা রাখা হয়। এরপর পুরোহিত যখন পবিত্র মন্ত্র পাঠ করেন, তখন সেই সুতো দিয়ে তাদের চারপাশ সাতবার পেঁচানো হয়, যা তাদের জীবনের চিরন্তন আধ্যাত্মিক বন্ধনের প্রতীক মনে করা হয়।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাই দর্শনে বিবাহ হলো দুটি আত্মার গভীর ও চিরস্থায়ী মিলন। বাহাই বিয়েতে খুব বেশি বাহ্যিক আড়ম্বর বা আচার থাকে না। তবে বিয়ের আইনি বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি বর ও কনে উভয়েই বাহাউল্লাহর নির্দেশিত একটি পবিত্র বাণী পাঠ করে প্রতিজ্ঞা করেন: “আমরা সবাই, সত্যই, ঈশ্বরের ইচ্ছার প্রতি বিশ্বস্ত থাকিব।” এই একটি সাধারণ বাক্যের মাধ্যমেই তারা আজীবন পরস্পরের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন।

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদে বিবাহকে দেখা হয় মহাবিশ্বের দুটি বিপরীত কিন্তু পরিপূরক শক্তি—’Yin’ (নারীসুলভ শক্তি) এবং ‘Yang’ (পুরুষসুলভ শক্তি)-এর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি পরম মাধ্যম হিসেবে। তাওবাদী বিয়েতে বর-কনে প্রকৃতির শক্তিগুলোকে সাক্ষী রেখে এবং তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একসঙ্গে চা বা মদ পান করার একটি বিশেষ আচার বা ‘Tea Ceremony’ পালন করে, যা তাদের জীবনের একাত্মতার প্রতীক।

আজকের দিনে একটু নিরপেক্ষ ও মনস্তাত্ত্বিক জায়গা থেকে ভাবলে দেখা যায়, ভৌগোলিক ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও ইহুদিদের ‘হাকাফাত’ আর হিন্দুদের ‘সপ্তপদী’ বা ‘সাত পাক’-এর মূলে রয়েছে একই ধরনের মনস্তত্ত্ব—নিজের জীবনসঙ্গীকে নিজের জীবনের ‘কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে গ্রহণ করা।

পৃথিবীর সব ধর্ম ও সমাজই বিয়েকে কেবল মানুষের একটি জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখে না, বরং একে সমাজ রক্ষা, বংশ রক্ষা এবং মানুষের আত্মিক ও নৈতিক উন্নতির একটি অত্যন্ত পবিত্র ও শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

 

ক্যাও দাই

 

অধ্যায় ১০: পবিত্র স্থান, তীর্থযাত্রা এবং পরিক্রমার মনস্তত্ত্ব

মানুষের মন যখন জাগতিক কোলাহল আর জীবনের প্রতিদিনের টানাপোড়েনে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন সে এক গভীর আধ্যাত্মিক টানে ঘরের বাইরে পা বাড়ায়। এই চেনা জগৎ ছেড়ে অচেনা পথের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার নামই হলো তীর্থযাত্রা (Pilgrimage)। আরবের তপ্ত মরুভূমি, জেরুজালেমের প্রাচীন দেয়াল, ভারতের পুণ্যতোয়া নদী কিংবা হিমালয়ের বরফঢাকা চূড়া—সবখানেই মানুষ ছুটে যায় একই মনস্তাত্ত্বিক ব্যাকুলতা থেকে। এটি যেন নিজের ক্ষুদ্র অহংকে বিসর্জন দিয়ে এক পরম স্পর্শ বা মানসিক শান্তি লাভের এক চিরন্তন চেষ্টা।

১. ইসলামের হজ্জ এবং বিশ্বজনীন সমতা

ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো জিলহজ্জ মাসে মক্কার পবিত্র কাবা শরিফে হজ্জ পালন করা। হজ্জের মূল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে এর অভূতপূর্ব সমতার মধ্যে। সমাজের তথাকথিত উঁচু স্তরের মানুষ বা ধনী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাইকে সমস্ত জৌলুস ত্যাগ করে ‘Ihram’ নামক দুটি সেলাইবিহীন সাধারণ সাদা চাদর পরিধান করতে হয়। লাখ লাখ মানুষ একসাথে কাবার চারপাশে গোল হয়ে ঘুরছেন (তাওয়াফ), সাফা ও মারওয়ায় দৌড়াচ্ছেন এবং আরাফাতের ময়দানে হাত তুলে কাঁদছেন—ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দৃশ্যটি মনে করিয়ে দেয় যে স্রষ্টার কাছে সব মানুষের আত্মিক মূল্য সমান।

২. সনাতন ধর্মের তীর্থ ও পরিক্রমা (Yatra)

সনাতন বা হিন্দু ধর্মে তীর্থযাত্রাকে বলা হয় ‘Yatra’ (যেমন: চারধাম যাত্রা, অমরনাথ যাত্রা, কিংবা কৈলাস যাত্রা)। হিন্দু সংস্কৃতিতে কোনো পবিত্র স্থান বা মন্দিরে যাওয়ার পর মূল উপাস্যকে কেন্দ্রে রেখে তার চারপাশ দিয়ে বৃত্তাকারে ঘোরার প্রাচীন নিয়ম রয়েছে, যাকে বলা হয় প্রদক্ষিণ। বাহ্যিক দিক থেকে এটি ইসলামের কাবা শরীফ তাওয়াফ করার আচারের সাথে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। এছাড়া কুম্ভমেলার মতো মহাসমাবেশে জাতি-বর্ণ বা সামাজিক অবস্থান ভুলে লাখ লাখ মানুষ যেভাবে পবিত্র নদীতে স্নান করে আত্মশুদ্ধি খোঁজেন, তার ভেতরের মনস্তত্ত্বও এক পরম শুদ্ধতারই প্রকাশ।

৩. আব্রাহামিক ধর্মে জেরুজালেম ও রোম যাত্রা

  • ইহুদিদের আলিয়াহ (Aliyah): প্রাচীন ঐতিহ্যে তোরাহ-এর বিবরণ অনুযায়ী, প্রতি বছর তিনটি প্রধান উৎসবে (পাসওভার, শ্যাভুওত ও সুক্কোত) ইহুদিদের জন্য জেরুজালেমের পবিত্র মন্দিরে তীর্থযাত্রা করার একটি নিয়ম বা ধারা ছিল। বর্তমানে তারা জেরুজালেমের পবিত্র ‘Western Wall’ বা পশ্চিম দেয়ালে গিয়ে তাদের হারিয়ে যাওয়া গৌরব ও আধ্যাত্মিক সংযোগের জন্য প্রার্থনা করে।

  • খ্রিষ্টধর্মের তীর্থযাত্রা: খ্রিষ্টানদের জন্য জেরুজালেমের ‘Holy Sepulchre’ (যীশুর স্মৃতিবিজড়িত স্থান) এবং ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান। মধ্যযুগ থেকেই খ্রিষ্টানরা দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে ‘Camino de Santiago’-র মতো পবিত্র ও কষ্টসাধ্য পথ পাড়ি দিয়ে আসছেন কেবলই আত্মিক শান্তির খোঁজে।

৪. বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মের পুণ্যভূমি

  • বৌদ্ধদের চার প্রধান তীর্থ: গৌতম বুদ্ধের জীবনকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধদের ৪টি প্রধান পবিত্র স্থান রয়েছে: লুম্বিনী (জন্মস্থান), বুদ্ধগয়া (বোধি বা জ্ঞান লাভ), সারনাথ (প্রথম ধর্মোপদেশ) এবং কুশিনগর (মহাপরিনির্বাণ)। বৌদ্ধ অনুসারীরা এই স্থানগুলোতে গিয়ে পবিত্র স্তূপের চারপাশ দিয়ে হেঁটে প্রদক্ষিণ বা চক্কর দিয়ে থাকেন।

  • শিখদের অমৃতসর ও হরিমন্দির সাহেব: শিখদের প্রধান তীর্থ হলো পাঞ্জাবের অমৃতসরের ‘Golden Temple’ বা স্বর্ণ মন্দির। এখানে তারা পবিত্র সরোবরের চারপাশে পরিক্রমা করেন এবং গুরুবাণী শ্রবণ করে মনকে শান্ত ও স্থির করার চেষ্টা করেন।

৫. অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে তীর্থযাত্রার রূপ

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদে চীনের পাঁচটি পবিত্র পাহাড়কে (যেমন—Mount Tai বা Mount Wudang) অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়। তাওবাদী সাধক ও সাধারণ অনুসারীরা এই খাড়া পাহাড়গুলোর চূড়ায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যান। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই কষ্টসাধ্য ভ্রমণের মাধ্যমে শরীর হালকা হয় এবং পাহাড়ের শান্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে মহাজাগতিক শক্তি ‘Qi’-এর সাথে আত্মার সংযোগ ঘটানো সহজ হয়।

  • শিন্তো ধর্ম (Shinto): জাপানের এই প্রকৃতিবাদী ধর্মে ‘Ise Grand Shrine’ বা ইসে মহাতীর্থকে সবচেয়ে পবিত্র মনে করা হয়। জাপানিরা বিশ্বাস করেন, এই তীর্থযাত্রার মাধ্যমে তারা প্রকৃতির আদি শক্তি এবং তাদের পূর্বপুরুষদের আত্মার আশীর্বাদ লাভ করেন। এই পবিত্র স্থানে যাওয়ার পর তারা একটি নির্দিষ্ট নদীর পবিত্র পানিতে হাত ও মুখ ধুয়ে শরীর ও মনকে শুদ্ধ করেন।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাইদের প্রধান পবিত্র স্থান ও বিশ্ব কেন্দ্র হলো ইসরায়েলের হাইফা শহরে অবস্থিত ‘Shrine of the Báb’ এবং এক্কা-র ‘Shrine of Bahá’u’lláh’। বিশ্বজুড়ে থাকা বাহাই অনুসারীরা এই নয়নাভিরাম উদ্যান ও পবিত্র সমাধিগুলোতে তীর্থযাত্রার (Nine-Day Pilgrimage) উদ্দেশ্যে ছুটে যান। তাদের বিশ্বাস, এই পবিত্র প্রাঙ্গণে প্রার্থনা করার মাধ্যমে আত্মার এক পরম উন্নতি ও বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়।

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): পারসি বা জরথুষ্ট্রীয়দের জন্য ইরানের ইয়াজদ প্রদেশের মরুভূমির মাঝে অবস্থিত ‘Chak Chak’ বা ‘Pir-e Sabz’ একটি অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান। পাহাড়ের বুক চিরে টপটপ করে পানি পড়ার কারণে এর নাম হয়েছে চাক চাক। পারসিরা বিশ্বাস করেন, এটি তাদের ইতিহাসের এক আত্মত্যাগের পবিত্র স্মারক। প্রতি বছর হাজার হাজার পারসি এখানে সমবেত হয়ে অবিনশ্বর ঈশ্বর আহুরা মাজদার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেন।

আজকের দিনে একটু গভীর ও নিরপেক্ষ মনস্তাত্ত্বিক জায়গা থেকে দেখলে বোঝা যায়, সব ধর্মের তীর্থযাত্রার ভেতরের দর্শনটি আসলে একই। তা হলো—মানুষকে তার চিরচেনা আরামদায়ক পরিবেশ ও দৈনন্দিন মায়া থেকে সাময়িকভাবে বের করে আনা, দীর্ঘ ও কষ্টের ভ্রমণের মধ্য দিয়ে তার ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া এবং পৃথিবীর বুকে সে যে কেবল একজন ‘মুসাফির’ বা ক্ষণস্থায়ী যাত্রী, সেই পরম সত্যটি তাকে মনে করিয়ে দেওয়া।

মক্কার ‘লাব্বাইক’, হিন্দুদের ‘হর হর মহাদেব’, বৌদ্ধদের মন্ত্রধ্বনি কিংবা খ্রিষ্টানদের ‘হাল্লেলুইয়া’—পোশাক আর ভাষার দেয়াল সরিয়ে দিলে এই সব কটি সুরের পেছনের আকুলতা মূলত একই আধ্যাত্মিক উৎসের দিকে ধাবিত হয়।

 

কনফুসীয়বাদ

 

অধ্যায় ১১: খাদ্য সংহতি এবং পবিত্রতার ব্যাকরণ

মানুষ যা আহার করে, তার প্রভাব কেবল শরীরের ওপর নয়, বরং তার মন ও চেতনার ওপরও পড়ে—এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় ধর্মেই কোনো না কোনোভাবে স্বীকার করা হয়েছে। সেই কারণে বিভিন্ন বিশ্বাসের খাদ্যের ক্ষেত্রে এক কঠোর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ব্যাকরণ তৈরি হতে দেখা যায়। কোন খাবারটি খাওয়া যাবে আর কোনটি বর্জনীয়, তা নির্ধারণের পেছনে সব ধর্মেরই মূল উদ্দেশ্য হলো শরীরকে সুস্থ রাখা এবং আত্মাকে কলুষতা থেকে রক্ষা করা।

১. হালাল ও কোশারের বিস্ময়কর মিল (Halal & Kosher)

খাদ্য বিধির ক্ষেত্রে ইসলাম এবং ইহুদি ধর্মের মধ্যে যে মিল রয়েছে, তা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অন্যতম চমৎকার একটি অধ্যায়।

  • ইসলামের হালাল (Halal): ইসলামে শুকরের মাংস, রক্ত, মৃত পশু এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে উৎসর্গ করা পশুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ বা হারাম করা হয়েছে। পশু জবাইয়ের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে) বলে ধারালো ছুরি দিয়ে পশুর শ্বাসনালী ও প্রধান রক্তনালী এমনভাবে কাটার নিয়ম রয়েছে, যেন পশুর শরীর থেকে সমস্ত রক্ত দ্রুত বের হয়ে যায়। একে জবাই বা ‘জাবিহা’ বলা হয়।

  • ইহুদি ধর্মের কোশার (Kosher): ইহুদিদের খাদ্য আইনকে বলা হয় ‘Kashrut’, আর নিয়ম অনুযায়ী তৈরি খাবারকে বলা হয় ‘কোশার’। ইসলামের মতোই ইহুদি ধর্মেও শুকরের মাংস, রক্ত এবং মৃত পশু খাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ মনে করা হয়। তাদের পশু জবাইয়ের পদ্ধতিকে বলা হয় ‘Shechita’। ইহুদিদের কসাই (যাকে ‘শোখেত’ বলা হয়) ঈশ্বরের নাম নিয়ে একটি নিখুঁত ধারালো ব্লেড দিয়ে পশুর গলার প্রধান ধমনী কাটেন, যাতে পশুর কষ্ট কম হয় এবং শরীর থেকে সব রক্ত বের হয়ে যায়।

  • কুরআনের স্বীকৃতি: এই দুই ধারার মিল এতটাই গভীর যে, পবিত্র কুরআনেও আহলে কিতাব বা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের খাবারকে মুসলিমদের জন্য বৈধ ঘোষণা করে বলা হয়েছে: “আজ তোমাদের জন্য সমস্ত পবিত্র বস্তু হালাল করা হলো এবং আহলে কিতাবদের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল…” (সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৫)

২. ভারতীয় ধর্মে আহার ও ‘অহিংসা’র দর্শন

সিন্ধু ও গাঙ্গেয় উপত্যকায় বিকশিত ধর্মগুলোতে খাদ্যকে আত্মিক উন্নতির একটি প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

  • সনাতন ধর্মের সাত্বিক আহার: হিন্দু শাস্ত্রে খাদ্যকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে—সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক। বিশ্বাস করা হয় যে শাকসবজি, ফলমূল ও দুধ হলো ‘সাত্ত্বিক খাদ্য’, যা মনকে শান্ত ও পবিত্র রাখে। অন্যদিকে মাংস ও অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার মনকে চঞ্চল করতে পারে। বিশেষ করে সনাতন ধর্মে গরুকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয় এবং গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ।

  • বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের নিরামিষবাদ: বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মূল ভিত্তি হলো ‘অহিংসা পরম ধর্ম’। কোনো প্রাণীকে হত্যা করে নিজের ক্ষুধা মেটানো আধ্যাত্মিক চেতনার পরিপন্থী মনে করা হয়। এই কারণে অনেক বৌদ্ধ এবং প্রায় সমস্ত জৈন অনুসারী সম্পূর্ণ নিরামিষাশী (Vegetarian) হন, যাতে তাদের কারণে কোনো জীবের প্রাণহানি না ঘটে।

৩. অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে খাদ্যের নিয়ম

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদে খাদ্যকে শরীরের ভেতরের শক্তির ভারসাম্য বা ‘Yin’ এবং ‘Yang’-এর মেলবন্ধন হিসেবে দেখা হয়। তাওবাদের প্রাচীন খাদ্য বিধি বা ‘Bigu’-তে কিছু নির্দিষ্ট শস্যদানা এবং অতিরিক্ত গন্ধযুক্ত বা তীব্র মসলাদার খাবার (যেমন—পেঁয়াজ, রসুন) বর্জন করার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ এগুলো শরীরের আত্মিক শক্তি বা ‘Qi’-এর প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে বলে বিশ্বাস করা হয়। তারা প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত তাজা ও হালকা খাবার খাওয়ার ওপর জোর দেয়।

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): পারসি ধর্মে খাবার বা পশুবলি নিয়ে কোনো কঠোর নিষেধাজ্ঞা নেই, কারণ তারা সৃষ্টিজগতের ভালো সব খাবারকেই ঈশ্বরের নেয়ামত মনে করে। তবে তাদের দর্শনে পশুর প্রতি দয়াশীলতাকে অনেক বড় গুণ ধরা হয়। বছরের একটি নির্দিষ্ট মাসকে তারা ‘Bahman’ মাস হিসেবে পালন করে, যে সময়ে পারসিরা সাধারণত মাংস খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ রাখে এবং নিরামিষ আহার গ্রহণ করে।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাই ধর্মে কোনো নির্দিষ্ট খাবারকে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ করা হয়নি, তবে বাহাউল্লাহর শিক্ষা অনুযায়ী মানুষের ভবিষ্যৎ খাদ্য হিসেবে নিরামিষ বা ফলমূল-শাকসবজিকেই সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা হয়। বাহাই বিশ্বাসে এটি ধরা হয় যে, মানবজাতির চেতনার যত উন্নতি ঘটবে, মানুষ ধীরে ধীরে প্রাণিজ আমিষের ওপর নির্ভরতা তত কমিয়ে দেবে।

আজকের দিনে একটু গভীর ও নিরপেক্ষ মনস্তাত্ত্বিক জায়গা থেকে দেখলে বোঝা যায়, মরুভূমির আব্রাহামিক ধর্মগুলো যেখানে পশুকে একটি নির্দিষ্ট পবিত্র উপায়ে রক্তমুক্ত করে খাওয়ার নিয়ম করেছে, সেখানে ভারতীয় ধর্মগুলো সমস্ত জীবের প্রতি দয়াশীল হয়ে মাংস পুরোপুরি বর্জন করার ওপর জোর দিয়েছে।

তবে বাহ্যিক পদ্ধতি যা-ই হোক না কেন, উভয়ের পেছনের মনস্তত্ত্ব কিন্তু এক: যত্রতত্র যা ইচ্ছা তা-ই খাওয়া যাবে না। আহারের ক্ষেত্রে সংযম, সচেতনতা ও পবিত্রতা বজায় রাখাই এই সব কটি ধর্মের মূল আধ্যাত্মিক শিক্ষা।

 

তাওবাদ

 

অধ্যায় ১২: জন্ম ও মৃত্যুর শেষ কৃত্য: আত্মার বিদায়ের আচার

জন্ম যেমন মানব জীবনের প্রথম উৎসব, মৃত্যু তেমনি এই পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায়ের শেষ অংক। মানুষের জীবনের এই দুটি প্রধান ক্রান্তিলগ্নে পৃথিবীর বড় বড় ধর্মগুলো যে আচারগুলো পালন করে, তার ভেতরের অন্তর্নিহিত রূপকগুলোর মধ্যে এক গভীর সমান্তরাল রেখা লক্ষ্য করা যায়।

১. জন্মের কৃত্য ও সুরক্ষার আচার

নবজাতককে পৃথিবীতে স্বাগত জানাতে এবং তার সুরক্ষার জন্য প্রতিটি সংস্কৃতিতেই কিছু সুন্দর নিয়ম রয়েছে।

  • ইসলাম ও ইহুদি ধর্মের মিল: ইসলামে সন্তান জন্মের পর তার মাথার চুল ফেলে সমপরিমাণ সোনা বা রূপা দান করা এবং পশু কোরবানি দেওয়াকে আকিকা বলা হয়। এছাড়া পুত্রসন্তানের খতনা (Circumcision) করার নিয়ম রয়েছে। ইহুদি ধর্মেও সন্তান জন্মের ঠিক ৮ম দিনে এই খতনা করা বাধ্যতামূলক, যাকে হিব্রুতে বলে ‘Brit Milah’। এটি ঈশ্বরের সাথে আব্রাহামের চুক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

  • খ্রিষ্টধর্মের বাপ্তিস্ম (Baptism): খ্রিষ্টধর্মে শিশু জন্মের পর বা কোনো ব্যক্তি নতুন করে বিশ্বাস গ্রহণ করলে তাকে চার্চের পবিত্র জল দিয়ে স্নান করানো বা জলের ছিটা দেওয়া হয়, যাকে বাপ্তিস্ম বলে। খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এর মাধ্যমে মানুষ সমস্ত আদিপাপ (Original Sin) থেকে মুক্ত হয়ে যীশুর হাত ধরে এক পবিত্র জীবনে প্রবেশ করে।

২. মৃত্যুর শেষ কৃত্য: মাটির মানুষ মাটিতে ফেরত

মানুষের মৃত্যুর পর তার নশ্বর দেহের শেষ কৃত্য করার ক্ষেত্রে ধর্মগুলোর নিজস্ব অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:

  • আব্রাহামিক ধারা (কবর দেওয়া): ইসলাম, খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মে মৃতদেহকে পরম শ্রদ্ধার সাথে পবিত্র পানি দিয়ে গোসল করিয়ে বা ধুয়ে সাদা কাপড়ে জড়িয়ে কবরস্থ বা মাটি দেওয়া হয়। আব্রাহামিক বিশ্বাস অনুযায়ী, যেহেতু মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাই মৃত্যুর পর তাকে মাটিতেই ফিরিয়ে দেওয়া উচিত, যেন শেষ বিচারের দিনে (Resurrection) তারা আবার এই মাটি থেকেই পুনরুত্থিত হতে পারে।

  • ভারতীয় ধারা (অগ্নিদাহ ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া): সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে, মানুষের শরীর পাঁচটি উপাদান দিয়ে তৈরি—ক্ষিতি (মাটি), অপ (জল), তেজ (অগ্নি), মরুৎ (বাতাস) এবং ব্যোম (আকাশ)। মৃত্যুর পর অগ্নিদাহ বা শ্মশানে পোড়ানোর মাধ্যমে এই পাঁচটি উপাদানকে আবার প্রকৃতির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়, যাতে আত্মা তার পুরোনো দেহের মায়া ত্যাগ করে নতুন যাত্রায় (পুনর্জন্ম বা মোক্ষ) রওনা হতে পারে। বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মেও সাধারণত এই দাহ করার প্রথাই অনুসরণ করা হয়।

৩. অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে শেষ কৃত্য

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): পারসি বা জরথুষ্ট্রীয়দের ঐতিহ্যবাহী শেষ কৃত্যটি বেশ ভিন্ন ধরনের। তারা মৃতদেহকে কবর দেয় না বা পোড়ায়ও না, কারণ তারা মাটি, পানি ও আগুনকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করে এবং বিশ্বাস করে মৃতদেহ এগুলোকে কলুষিত করতে পারে। সেই কারণে তারা মৃতদেহকে একটি উঁচু গোল পাথরের তৈরি কাঠামোতে রেখে দেয়, যাকে ‘Tower of Silence’ বা দখমা বলা হয়। সেখানে শকুন বা শিকারি পাখিরা মৃতদেহটি খেয়ে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেয়। তবে আধুনিক যুগে অনেক পারসি বৈদ্যুতিক চুল্লিতে দাহ করার পদ্ধতিও বেছে নিচ্ছেন।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাই নিয়মে মৃতদেহকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে দেখা হয়। বাহাই বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মৃতদেহকে কোনোভাবেই পোড়ানো বা দাহ করা উচিত নয়, কারণ শরীর প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক নিয়মেই মাটিতে বিলীন হওয়া উচিত। তারা মৃতদেহকে ধুয়ে পরিষ্কার করে সুতি বা রেশমি কাপড়ে জড়িয়ে কফিনে রেখে কবর দেয়। তবে বাহাই আইনে একটি বিশেষ নিয়ম আছে—মৃত্যুর স্থান থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বের বেশি মৃতদেহ বহন করে নেওয়া যায় না, অর্থাৎ মানুষ যেখানে মারা যাবে, তার আশেপাশেই তাকে সমাহিত করতে হয়।

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদে মৃত্যুর পর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়, কারণ তারা বিশ্বাস করে সঠিক আচারের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির আত্মাকে শান্ত না করলে তা ক্ষতিকর আত্মায় রূপ নিতে পারে। তাওবাদী শেষ কৃত্যে সাধারণত মৃতদেহকে কবর দেওয়া হয় এবং পুরোহিতরা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সুর করে মন্ত্র পাঠ করেন, যা আত্মার যাত্রাপথকে সুগম করে বলে বিশ্বাস করা হয়।

মানুষের এই পার্থিব দেহকে মাটিতে সমর্পণ করা হোক, অগ্নির শিখায় ভস্ম করা হোক, কিংবা প্রকৃতির অন্য কোনো উপাদানের কাছে সঁপে দেওয়া হোক—সব ধর্মের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মূল মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য কিন্তু দুটি:

প্রথমত, চলে যাওয়া একজন মানুষের মরদেহের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা এবং দ্বিতীয়ত, জীবিতদের মনে করিয়ে দেওয়া যে—এই পৃথিবীর জৌলুস, আমাদের অহংকার আর পার্থিব শরীর চিরস্থায়ী নয়। ভাষা, পোশাক আর নিয়মের দেয়াল সরিয়ে দিলে এই শেষ বিদায়ের ক্ষণটি সবাইকে একই পরম সত্যের মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়—একদিন সবকিছু প্রকৃতির বুকেই বিলীন হয়ে যাবে।

 

তেনরিকিও

 

নৈতিকতা, সুফিদর্শন এবং বিশ্বশান্তি

অধ্যায় ১৩: সুবর্ণ নিয়ম (The Golden Rule): পরোপকার ও নৈতিকতার মূল ভিত্তি

দর্শন এবং সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় একটি সুনির্দিষ্ট তত্ত্বকে মানব সভ্যতার সর্বজনীন নৈতিক মেরুদণ্ড মনে করা হয়, যাকে বলা হয় ‘সুবর্ণ নিয়ম’ বা গোল্ডেন রুল (The Golden Rule)। এর মূল কথাটি অত্যন্ত সহজ কিন্তু গভীর: “তুমি অন্যের কাছ থেকে যেমন ব্যবহার আশা করো, অন্যের সাথে নিজেও ঠিক তেমন আচরণ করো।”

ভৌগোলিক সীমানা, ভাষা কিংবা যুগের প্রাচীনত্ব ভেদ করে পৃথিবীর প্রতিটি প্রধান ধর্মের মৌলিক বাণীতে এই গোল্ডেন রুলটি হুবহু একই ব্যাকরণে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। এটি ইঙ্গিত করে যে, মানবজাতির জন্য পারস্পরিক আচরণের মূল ভিত্তিটি সব ধর্ম ও দর্শনেই এক রাখা হয়েছিল।

১. আব্রাহামিক ধর্মে সুবর্ণ নিয়ম

  • ইসলাম: হাদীস শাস্ত্রে (সহীহ বুখারী) হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি বিখ্যাত ঘোষণা রয়েছে: “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন বা বিশ্বাসী হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” এই বাণীর মাধ্যমে নিজের ভালো লাগাকে অন্যের ভালো লাগার সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

  • খ্রিষ্টধর্ম: যীশু খ্রিষ্ট তাঁর বিখ্যাত পাহাড়ের উপদেশ বা ‘Sermon on the Mount’-এ এই নিয়মটিকে খ্রিষ্টীয় নৈতিকতার মূল চাবিকাঠি হিসেবে ঘোষণা করেন: “অতএব, মানুষ তোমাদের প্রতি যেরূপ আচরণ করুক তোমরা চাও, তোমরাও তাদের প্রতি সেইরূপ আচরণ করো; কারণ ইহাই মোশির ব্যবস্থা ও ভাববাদীদিগের শিক্ষা।” (মথি ৭:১২)

  • ইহুদি ধর্ম: খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকের বিখ্যাত ইহুদি পণ্ডিত হিল্লেল (Hillel the Elder)-কে এক ব্যক্তি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন যে, তিনি এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পুরো তোরাহ বা ধর্মগ্রন্থের সারমর্ম বুঝিয়ে দিতে পারবেন কি না। হিল্লেল উত্তর দিয়েছিলেন: “তোমার নিজের কাছে যা ঘৃণ্য, তা তোমার প্রতিবেশীর প্রতি করো না। এটাই পুরো তোরাহ; বাকি যা আছে তা কেবল এর ব্যাখ্যা।” (তালমুদ, শিয়াবাত ৩১ক)

২. ভারতীয় ধর্মে সুবর্ণ নিয়ম

  • সনাতন (হিন্দু) ধর্ম: মহাভারতের অনুশাসন পর্বে পিতামহ ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে পরম ধর্মের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন: “আত্মনঃ প্রতিকূলানি পরেষাং ন সমাচরেৎ”, অর্থাৎ “নিজের জন্য যা প্রতিকূল বা কষ্টদায়ক, তা অন্যের প্রতিও আচরণ করো না।”

  • বৌদ্ধ ধর্ম: ত্রিপিটকের উদনবর্গ শাস্ত্রে গৌতম বুদ্ধের বাণী হিসেবে উল্লেখ আছে: “যে অবস্থাটি আমার নিজের কাছে আনন্দদায়ক বা ভালো নয়, সেই একই অবস্থা অন্যের কাছেও কীভাবে ভালো হতে পারে? নিজের জন্য যা যন্ত্রণাদায়ক, তা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিও না।”

  • শিখ ধর্ম: গুরু গ্রন্থ সাহিবের বাণীতে বলা হয়েছে: “তুমি যদি ঈশ্বরের দর্শনের আকাঙ্ক্ষা করো, তবে কারো মনে আঘাত দিও না; কারণ প্রতিটি হৃদয়ের মাঝেই সেই পরম রত্ন (ঈশ্বর) বাস করেন।”

৩. দূরপ্রাচ্য ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ধর্মে সুবর্ণ নিয়ম

  • কনফুসীয়বাদ (Confucianism): চীনের এই বিখ্যাত দর্শনে গোল্ডেন রুলটিকে তাদের বিশ্বাসের মূল ভিত্তি বা ‘Shu’ (সহানুভূতি) মনে করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে কনফুসিয়াসের এক ছাত্র তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এমন কোনো একটি শব্দ আছে কি না যা সারা জীবন মেনে চলা যায়? কনফুসিয়াস উত্তর দিয়েছিলেন: “তা হলো সহানুভূতি। নিজের জন্য যা তুমি পছন্দ করো না, তা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিও না।” (অ্যানালেক্টস ১৫:২৪)

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদের অন্যতম আদি ও প্রধান গ্রন্থ ‘Taishang Ganjying Pian’-এ নৈতিকতার এই নিয়মটিকে প্রকৃতির নিয়মের সাথে মেলানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে: “একজন ভালো মানুষ অন্যের লাভকে নিজের লাভ মনে করেন, এবং অন্যের ক্ষতিকে নিজের ক্ষতি মনে করেন।” তাওবাদে বিশ্বাস করা হয় যে, অন্যের প্রতি দয়াশীল হলে তা প্রাকৃতিকভাবেই নিজের জীবনে ইতিবাচক শক্তি ফিরিয়ে আনে।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাই দর্শনে বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়। বাহাউল্লাহর বাণীতে এই সুবর্ণ নিয়মটি খুব সুন্দরভাবে এসেছে: “তোমার নিজের চোখের দিকে এমন কোনো জিনিস নির্দেশ করো না যা তুমি অন্যের চোখের জন্য চাও না, এবং নিজের আত্মার জন্য যা পছন্দ করো না তা অন্যের জন্য কামনা করো না।”

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): প্রাচীন পারস্যের এই ধর্মেও গোল্ডেন রুলটির স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। তাদের পবিত্র গ্রন্থ শায়েস্ত না-শায়েস্ত (Shayast Na-Shayast)-এ বলা হয়েছে: “মানুষের স্বভাব কেবল তখনই ভালো হয়, যখন সে অন্যের প্রতি এমন আচরণ করে যা নিজের জন্য ভালো মনে করে।”

আজকের দিনে একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে বোঝা যায়, এই সর্বজনীন মিলটি প্রমাণ করে যে—বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, উপাসনার ধরণ কিংবা পোশাকের ভিন্নতা যা-ই থাকুক না কেন, পৃথিবীর সব ধর্মেরই মূল সামাজিক লক্ষ্য হলো মানুষের ভেতর থেকে স্বার্থপরতা, অহংকার ও নিষ্ঠুরতা দূর করা।

প্রতিটি ধর্মই মানুষকে নিজের ছোট গণ্ডি থেকে বের হয়ে অন্যের কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করার মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা দেয়। ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু “মানুষ মানুষের জন্য”—এই চিরন্তন সুরটি পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তেই সমানভাবে সত্য।

শিখ ধর্ম

অধ্যায় ১৪: অহিংসা, জিহাদ এবং ধর্মের নামে ন্যায়ের লড়াই

ধর্ম নিয়ে আধুনিক পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হলো ‘যুদ্ধ’ এবং ‘শান্তি’। অনেক সময় সাধারণ দৃষ্টিতে মনে করা হয়, পূর্বের ধর্মগুলো (বৌদ্ধ, হিন্দু) কেবলই অহিংসার কথা বলে, আর মরুভূমির আব্রাহামিক ধর্মগুলো যুদ্ধের কথা বলে। কিন্তু প্রতিটি ধর্মের ইতিহাস এবং মূল গ্রন্থের ভেতর প্রবেশ করলে দেখা যায়, সব ধর্মই প্রথম পছন্দ হিসেবে শান্তিকে বেছে নেয়, তবে অন্যায়, অত্যাচার এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা এবং সমাজ-রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে প্রতিটি ধর্মই শর্তসাপেক্ষে বলপ্রয়োগ, সশরীরে যুদ্ধ বা লড়াইকে স্পষ্ট বৈধতা দিয়েছে। অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করাকে কোনো ধর্মই ‘ধার্মিকতা’ বলে না, বরং একে কাপুরুষতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

১. ইসলামের ‘জিহাদ’ এবং এর যুদ্ধনীতি

ইসলামে ‘জিহাদ’ শব্দটির অর্থ হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা বা সংগ্রাম করা। ইসলামী শরিয়তে এর দুটি প্রধান রূপ রয়েছে, যা বাস্তবসম্মত এবং সুনির্দিষ্ট:

  • জিহাদ আন-নাফস (অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম): এটি হলো নিজের কুপ্রবৃত্তি, লোভ, অহংকার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক লড়াই। ইসলামী রেওয়াতে একে আত্মশুদ্ধির মহত্তম ধাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

  • কিতাল বা কায়িক জিহাদ (বাহ্যিক যুদ্ধ): এটি হলো সমাজ, রাষ্ট্র বা বিশ্বাসের সুরক্ষায় এবং অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে সশরীরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা। ইসলামে এই জিহাদের বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং এর জন্য নির্দিষ্ট যুদ্ধনীতি রয়েছে। ইসলামী আইন অনুযায়ী—কোনো নারী, শিশু, বৃদ্ধ, উপাসনালয়ে মগ্ন থাকা সন্ন্যাসী কিংবা আত্মসমর্পণকারীকে আঘাত করা যাবে না। এমনকি শত্রুপক্ষের গাছপালা বা ফসলের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ। এই লড়াই কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বরং জমিনে আল্লাহর আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়।

২. সনাতন ধর্মের ‘ধর্মযুদ্ধ’ এবং গীতার দর্শন

সনাতন বা হিন্দু ধর্মের একটি বড় বাণী ‘অহিংসা পরম ধর্ম’। কিন্তু যখন কুরুক্ষেত্রের ময়দানে অধর্ম ও অন্যায়ের প্রতীক কৌরবদের বিরুদ্ধে অর্জুন পারিবারিক ও মানসিক মোহের কারণে অস্ত্র ত্যাগ করতে চাইলেন, তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে অর্জুনের ক্ষত্রিয় বীরের প্রধান দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরাসরি ‘ধর্মযুদ্ধ’ করার নির্দেশ দেন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মূল শিক্ষাই হলো—অন্যায়ের সামনে কাপুরুষের মতো চুপ থাকা প্রকৃত অহিংসা নয়, বরং সমাজে অধর্ম, অনীতি ও অত্যাচার দমনের জন্য প্রয়োজনে অস্ত্র তুলে নেওয়াটাই আসল ধার্মিকতা। গীতায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, ফলাফলের আশা না করে ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রতিটি বীরের প্রধান কর্তব্য।

৩. খ্রিষ্টধর্মের ‘জাস্ট ওয়ার’ (Just War Theory) ও বৌদ্ধদের অবস্থান

  • খ্রিষ্টধর্মের জাস্ট ওয়ার: যীশু খ্রিষ্টের বাণীতে ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষমার কথা বলা হলেও, রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে খ্রিষ্টধর্ম পরবর্তীকালে যুদ্ধের বাস্তবতাকে স্বীকার করেছে। সেন্ট অগাস্টিন এবং থমাস অ্যাকুইনাসের মতো মহান খ্রিষ্টান সেন্টরা ‘Just War Theory’ (ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ নীতি) তৈরি করেন। এর মূল কথা হলো, যখন শান্তি প্রতিষ্ঠার সমস্ত কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন মজলুম বা অত্যাচারিত মানুষকে বাঁচাতে এবং রাষ্ট্রের সুরক্ষায় যুদ্ধ করা ঈশ্বরের দৃষ্টিতে পাপ নয়, বরং একটি বড় দায়িত্ব।

  • বৌদ্ধ ধর্ম ও আত্মরক্ষা: সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে যুদ্ধ ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং অহিংসার বাণী প্রচার করেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মে প্রথাগতভাবে আক্রমণাত্মক যুদ্ধের কোনো বিধান নেই, তবে রাষ্ট্র বা সমাজকে দস্যু, আততায়ী বা বহিরাগত আক্রমণকারীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য রাজধর্ম বা নিজের জীবন রক্ষার্থে কায়িক বলপ্রয়োগ ও আত্মরক্ষার অধিকারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়নি।

৪. অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে ন্যায়ের লড়াই

  • শিখ ধর্মের ‘ধরম যুদ্ধ’ ও কৃপাণ: শিখ ধর্মে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরাকে কেবল বৈধ নয়, বরং পবিত্র কর্তব্য মনে করা হয়। গুরু গোবিন্দ সিংহ জি শিখদের সামরিক বাহিনী ‘Khalsa’ (খালসা) গঠন করেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার প্রতীক হিসেবে ‘Kirpan’ (তলোয়ার) বহন করা বাধ্যতামূলক করেন। জাফরনামা-য় গুরু গোবিন্দ সিংহ জি স্পষ্টভাবে লিখেছেন: “যখন শান্তিস্থাপনের সমস্ত উপায় ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন তলোয়ার হাতে তুলে নেওয়া সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত।” শিখদের এই লড়াইকে বলা হয় ‘Dharam Yudh’ বা ন্যায়ের যুদ্ধ।

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): প্রাচীন পারস্যের এই ধর্মের মূল ভিত্তিটাই দাঁড়িয়ে আছে আলো ও অন্ধকারের অবিনশ্বর লড়াইয়ের ওপর। পরম ঈশ্বর আহুরা মাজদা (আলো) এবং দুষ্ট শক্তি আহরিমান (অন্ধকার)-এর মধ্যে মহাজাগতিক যুদ্ধ চলছে। জরথুষ্ট্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের দায়িত্ব হলো চুপচাপ বসে না থেকে ভালো চীন্তা, ভালো কথা ও ভালো কাজের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে অন্ধকারের বিরুদ্ধে এবং আলোর পক্ষে লড়াইয়ে অংশ নেওয়া। অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে এই লড়াইকে তারা জীবনের প্রধান লক্ষ্য মনে করে।

  • তাওবাদ (Taoism): তাওবাদে সাধারণত যুদ্ধকে পরিহার করার কথা বলা হয়, কারণ তা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী। তবে তাওবাদের আদি গ্রন্থ ‘Tao Te Ching’-এ যুদ্ধকে একটি চরম ও শেষ উপায় হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যখন কোনো উপায় থাকে না, তখন সমাজ বা রাষ্ট্রের সুরক্ষায় অস্ত্র ধরা যেতে পারে, তবে তা করতে হবে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে, কোনো প্রকার অহংকার বা রক্তপাতের আনন্দ ছাড়া।

পৃথিবীর সব বড় ধর্মের গভীর ও বাস্তবসম্মত দর্শন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো ধর্মই বিনা কারণে রক্তপাত, নিরপরাধ হত্যা বা বিশৃঙ্খলা সমর্থন করে না।

আরবের ‘জিহাদ’, ভারতের ‘ধর্মযুদ্ধ’, খ্রিষ্টীয় দর্শনের ‘জাস্ট ওয়ার’ কিংবা শিখ ধর্মের ‘ধরম যুদ্ধ’—সবগুলোর ভেতরের মূল স্পিরিট বা উদ্দেশ্য এক: সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। সব ধর্মেরই প্রথম পছন্দ হলো অহিংসা ও শান্তি, তবে যখন অত্যাচারী বা আগ্রাসী শক্তি সীমা লঙ্ঘন করে, তখন তাদের বিরুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগ বা যুদ্ধ করাকে প্রতিটি ধর্মই এক পরম সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

 

সনাতন বা হিন্দু ধর্ম

 

অধ্যায় ১৫: সুফিবাদ, ভক্তি আন্দোলন এবং রহস্যবাদের মিলনমেলা

ধর্মের বাহ্যিক কাঠামো বা নিয়মকানুনের (আইন ও আচার) ঊর্ধ্বে উঠে স্রষ্টাকে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও প্রেমের মাধ্যমে লাভ করার যে গভীর সাধনা, তাকে বলা হয় রহস্যবাদ (Mysticism)। মধ্যযুগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সরাসরি কোনো ভৌগোলিক যোগাযোগ ছাড়াই ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে এক অভূতপূর্ব আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটতে দেখা গিয়েছিল। ইসলামের সুফিবাদ, সনাতন ধর্মের ভক্তি আন্দোলন এবং ইহুদি ধর্মের কাবালাহ—সবগুলোরই মূল সুর ছিল এক: ঈশ্বর কেবল কোনো দূরবর্তী বিচারক নন, তিনি মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে কাছে থাকা এক পরম সত্তা বা ‘প্রিয়তম’।

১. ইসলামের সুফিবাদ: ‘ইশকে হাকিকি’ বা পরম প্রেম

সুফি দর্শনের মূল কথাই হলো শরিয়তের বাহ্যিক বিধানসমূহ পালনের পাশাপাশি ‘তরিকত’ ও ‘হাকিকত’ বা অন্তরের গভীর শুদ্ধি অর্জন করা। সুফি সাধক জালালুদ্দিন রুমি, মনসুর হাল্লাজ কিংবা রাবেয়া বসরীর বাণীতে লক্ষ্য করা যায়—আল্লাহকে কেবল শাস্তির ভয়ে বা জান্নাতের লোভে নয়, বরং তাঁর সৌন্দর্যের প্রেমে মগ্ন হয়ে আরাধনা করাই হলো প্রকৃত ইবাদত। একে বলা হয় ‘ইশকে হাকিকি’। সুফি ভাবধারায় বিশ্বাস করা হয় যে, মানুষের অহংকার যখন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়, তখন সে স্রষ্টার প্রেমে বিলীন হয়ে যায়, যাকে সুফি পরিভাষায় ‘Fana’ (ফানা) বলা হয়।

২. সনাতন ধর্মের ভক্তি আন্দোলন: ‘একমেব শরণং’

সুফিবাদের সমসাময়িক কালেই ভারতীয় উপমহাদেশে চণ্ডীদাস, মীরাবাঈ, কবীর এবং শ্রীচৈতন্যদেবের হাত ধরে ভক্তি আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। এই আন্দোলনের মূল দর্শন ছিল—জাতি-ভেদ, বর্ণ-ভেদ বা কঠিন আচার-অনুষ্ঠান ছাড়াই কেবল ব্যাকুল ‘ভক্তি’ বা ভালোবাসার মাধ্যমে ভগবানকে পাওয়া সম্ভব। শ্রীচৈতন্যদেব যেভাবে হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রেমে মগ্ন হতেন, তার সাথে সুফিদের ‘Sama’ (সামা) বা আধ্যাত্মিক নৃত্যের (Whirling Dervishes) মনস্তাত্ত্বিক মিল লক্ষ্য করা যায়। কবীর দাসের দোহায় সুফি ও ভক্তি দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বয় পাওয়া যায়, যেখানে রাম আর রহিমকে একই পরম সত্তার ভিন্ন নাম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

৩. ইহুদি রহস্যবাদ: কাবালাহ (Kabbalah)

ইহুদি ধর্মের আধ্যাত্মিক ও রহস্যবাদী ধারাকে বলা হয় কাবালাহ। সাধারণ ইহুদিরা যেখানে তোরাহের আইনকানুন কঠোরভাবে পালন করেন, কাবালিস্ট বা রহস্যবাদী ইহুদিরা সেখানে তোরাহের ভেতরের লুকানো আধ্যাত্মিক অর্থ খোঁজেন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের আত্মাকে ঈশ্বরের পরম আলোর (Ein Sof) সাথে যুক্ত করা। এই দর্শনে বিশ্বাস করা হয় যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার মাঝে ঈশ্বরের ঐশ্বরিক আলো লুকিয়ে আছে এবং মানুষ তার ভালোবাসার মাধ্যমে সেই আলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, যাকে হিব্রুতে বলে ‘Tikkun Olam’ বা পৃথিবীর নিরাময়।

৪. অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে রহস্যবাদ

  • খ্রিষ্টধর্মীয় রহস্যবাদ (Christian Mystical Theology): খ্রিষ্টধর্মেও বাহ্যিক প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের বাইরে ঈশ্বরের সাথে সরাসরি একাত্ম হওয়ার এক দীর্ঘ রহস্যবাদী ঐতিহ্য রয়েছে। সেন্ট জন অব দ্য ক্রস, সেন্ট তেরেসা অব আভিলা কিংবা মাস্টার একহার্টের মতো সাধকদের মতে, ঈশ্বরকে তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং অন্তরের গভীর নীরবতা ও প্রেমের মাধ্যমে অনুভব করা যায়। তাঁরা একে ‘Mystical Union’ বা ঈশ্বরের সাথে আত্মার বিয়ে বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে মানুষের ক্ষুদ্র সত্তা ঈশ্বরের অসীম ভালোবাসায় হারিয়ে যায়।

  • শিখ ধর্ম ও আত্মিক একাত্মতা: শিখ ধর্মের মূল ভিত্তিটাই দাঁড়িয়ে আছে এক পরম ঈশ্বরের প্রতি গভীর ভক্তি ও প্রেমের ওপর। গুরু গ্রন্থ সাহিবের বাণীতে বারবার বলা হয়েছে যে, ঈশ্বর মানুষের থেকে আলাদা কিছু নন, তিনি মানুষের অন্তরেই বাস করেন। গুরু নানক দেব জি তাঁর বাণীতে ঈশ্বরকে ‘পাবলিক বা স্বামী’ এবং নিজের আত্মাকে ‘বধূ’ হিসেবে রূপক ব্যবহার করেছেন। শিখ বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈশ্বরের প্রতি এই নিঃস্বার্থ প্রেমই মানুষকে অহংকার থেকে মুক্ত করে পরম আলো বা ‘জ্যোত’-এর সাথে এক করে দেয়।

  • তাওবাদ (Taoism): দূরপ্রাচ্যের তাও দর্শনেও এক গভীর রহস্যবাদের দেখা মেলে। তাওবাদের মূল কথা হলো—মহাবিশ্বের আদি ও চিরন্তন উৎস ‘তাও’-এর সাথে নিজের চেতনাকে মিলিয়ে দেওয়া। লাওতজু-র শিক্ষা অনুযায়ী, মানুষ যখন নিজের কৃত্রিম অহংকার, ইচ্ছা ও জাগতিক চিন্তা সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিতে পারে (যাকে তারা বলে ‘Wu Wei’ বা নিষ্ক্রিয়তার সাধনা), তখনই সে প্রকৃতির মূল সুর ও তাও-এর অসীম রহস্যের সাথে একাত্ম হয়ে এক পরম শান্তি লাভ করে।

আজকের দিনে একটু নিরপেক্ষ জায়গা থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ও ভিন্ন ভিন্ন যুগে রচিত হলেও রুমির ফারসি কবিতা, মীরাবাঈয়ের হিন্দি ভজন, খ্রিষ্টান সাধকদের ল্যাটিন প্রার্থনা আর কাবালিস্টদের হিব্রু বাণীর মূল আকুলতা কিন্তু হুবহু একই।

এই রহস্যবাদীরা দেখিয়েছেন যে, যখন ধর্মের কট্টর বাহ্যিক দেয়ালগুলো মানুষকে বিভক্ত করতে চায়, তখন হৃদয়ের খাঁটি ভালোবাসাই পারে সব মানুষকে এক বিন্দুতে মেলাতে। তাঁদের কাছে পরম সত্তা কোনো জটিল দার্শনিক তত্ত্ব নন, বরং তিনি হলেন মানুষের হৃদয়ের গভীরতম এক পরম অনুভূতি।

 

বিশ্বের বড় ধর্মসমূহের বিভিন্ন প্রকার অন্তর্মিল
বিশ্বের বড় ধর্মসমূহের বিভিন্ন প্রকার অন্তর্মিল

 

অধ্যায় ১৬: পবিত্র পানি ও অভিষেকের আচার

জল বা পানি কেবল তৃষ্ণা মেটানোর উপাদান নয়, সৃষ্টির আদি থেকেই পানিকে জীবন এবং শুদ্ধতার পরম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পৃথিবীর সব কটি বড় ধর্মের উপাসনা বা পবিত্র কোনো আচারের দিকে তাকালে দেখা যায়—স্রষ্টার সামনে দাঁড়ানোর বা পবিত্র স্থানে প্রবেশের আগে পানি দিয়ে শরীর ও আত্মাকে পবিত্র করার এক সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক নিয়ম রয়েছে।

১. ইসলাম ও ইহুদি ধর্মের পবিত্র স্নান ও ওযু

  • ইসলামের ওযু ও গোসল: মুসলিমদের জন্য দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার আগে পানি দিয়ে হাত, মুখ, কনুই, মাথা মাসেহ ও পা ধুয়ে ওযু (Wudu) করা ফরজ। এছাড়া কায়িক অপবিত্রতা দূর করার জন্য পুরো শরীর ধুয়ে গোসল করার সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। পানি না পাওয়া গেলে পবিত্র মাটি বা ধূলিকণা দিয়ে পবিত্র হওয়ার বিকল্প নিয়ম রয়েছে, যাকে বলে ‘তায়াম্মুম’।

  • ইহুদি ধর্মের মিকভাহ (Mikveh): ইহুদিদেরও ঠিক ইসলামের মতোই উপাসনার আগে শরীর পবিত্র করার জন্য বিশেষ জলাধারে সম্পূর্ণ ডুব দিয়ে স্নান করার নিয়ম আছে, যাকে হিব্রুতে বলে ‘মিকভাহ’। প্রাচীনকালে জেরুজালেমের মন্দিরে প্রবেশের আগে এবং বর্তমানে কট্টর ইহুদিরা নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় নিয়ম পালনের পর এই মিকভাহর পানিতে ডুব দিয়ে পবিত্র হন। নামাযের ওযুর মতো তাদেরও খাওয়ার আগে বা প্রার্থনার আগে দুই হাত বিশেষ নিয়মে ধুতে হয়, যাকে বলে ‘নেতিলাত ইয়াদাইম’।

২. খ্রিষ্টধর্মের বাপ্তিস্ম এবং ভারতীয় ধর্মের অভিষেক

  • খ্রিষ্টধর্মের বাপ্তিস্ম (Baptism): খ্রিষ্টধর্মে কোনো মানুষকে আনুষ্ঠানিকভাবে খ্রিষ্টান হিসেবে দীক্ষা দিতে বা চার্চের অন্তর্ভুক্ত করতে পবিত্র জলে সম্পূর্ণ ডুবানো হয় অথবা মাথায় জল ঢালা হয়। যীশু নিজে জর্ডান নদীতে সেন্ট জনের হাত ধরে বাপ্তিস্ম নিয়েছিলেন। খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই জলের স্পর্শ মানুষের ভেতরের সমস্ত অতীত পাপ বা আদিপাপ ধুয়ে মুছে দেয়।

  • সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মের অভিষেক ও আচমন: সনাতন বা হিন্দু ধর্মে যেকোনো পূজার শুরুতে পানি মুখে দিয়ে ‘আচমন’ বা শরীর-মন শুদ্ধ করার নিয়ম রয়েছে। এছাড়া গঙ্গা নদীকে পরম পবিত্র মনে করা হয় এবং গঙ্গাস্নানের মাধ্যমে পাপমুক্তির ধারণা রয়েছে। দেবতার বিগ্রহকে দুধ, জল বা মধু দিয়ে স্নান করানোকে বলা হয় ‘অভিষেকম’। বৌদ্ধ ধর্মেও বুদ্ধের মূর্তিকে জল দিয়ে স্নান করানোর মাধ্যমে নিজেদের মনকে কলুষতামুক্ত করার প্রতীকী উৎসব (যেমন: বুদ্ধ পূর্ণিমা বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্ক্রান উৎসব) উদযাপিত হতে দেখা যায়।

৩. অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ধর্মে জলের শুদ্ধাচার

  • শিন্তো ধর্ম (Shinto): জাপানের শিন্তো ধর্মে যেকোনো পবিত্র মন্দিরে (Jinja) প্রবেশের আগে শরীর ও মনকে শুদ্ধ করার একটি কঠোর ও প্রাচীন নিয়ম রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘Temizu’ বা ‘Misogi’। মন্দিরের প্রবেশদ্বারে একটি পাথরের জলের পাত্র এবং কাঠের হাতা রাখা থাকে। অনুসারীরা সেখান থেকে পানি নিয়ে প্রথমে বাম হাত, তারপর ডান হাত ধুয়ে নেন এবং শেষে মুখ ধুয়ে কুলি করেন। শিন্তো বিশ্বাসে, বাইরের জগতের কোনো অপবিত্রতা বা ‘Kegare’ নিয়ে দেবতাদের সামনে যাওয়া নিষিদ্ধ।

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাইদের প্রধান উপাসনা বা বাধ্যতামূলক প্রার্থনা (Obligatory Prayer) করার পূর্বে হাত ও মুখ পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়ার বিধান রয়েছে, যাকে ওযু বা ‘Ablutions’ বলা হয়। বাহাউল্লাহর আইনগ্রন্থ ‘কিতাব-ই-আকদাস’-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রার্থনার পূর্বে হাত ও মুখ ধুয়ে নেওয়া আবশ্যক। যদি কেউ অসুস্থতার কারণে পানি ব্যবহারে অক্ষম হন বা পানি না পান, তবে নির্দিষ্ট একটি মন্ত্র পাঁচবার পাঠ করে পবিত্র হওয়ার নিয়ম রয়েছে।

  • শিখ ধর্ম ও ইশনাণ (Ishnan): শিখ ধর্মে প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে নাম জপ করার আগে শরীর ধুয়ে পরিষ্কার করা বা স্নান করাকে বলা হয় ‘Ishnan’। শিখদের পবিত্র তীর্থ অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরের চারপাশ জুড়ে রয়েছে একটি বিশাল পবিত্র সরোবর। দেশ-বিদেশ থেকে আসা শিখ অনুসারীরা এই অমৃত সরোবরের পবিত্র পানিতে ডুব দিয়ে স্নান করেন, যা তাদের মন ও শরীরকে আধ্যাত্মিকভাবে জাগিয়ে তোলে এবং শান্ত করে বলে বিবেচনা করা হয়।

সব ধর্মের এই জল-কেন্দ্রিক আচারের পেছনের মনস্তত্ত্বটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। পানি যেভাবে শরীরের বাইরের ময়লা পরিষ্কার করে, ধর্মগুলো সেই ভৌত প্রক্রিয়াটিকে আধ্যাত্মিক রূপক ও আবশ্যিক বিধান হিসেবে ব্যবহার করেছে।

আরবের মরুভূমির ‘ওযু’, জর্ডান নদীর ‘বাপ্তিস্ম’, জেরুজালেমের ‘মিকভাহ’, জাপানের ‘মিশোগি’ কিংবা ভারতের ‘গঙ্গাস্নান’—সবগুলোর মূল কাঠামোগত শিক্ষা হলো এক: পরম পবিত্র সত্তার সান্নিধ্যে যাওয়ার আগে বা পবিত্র স্থানে পা রাখার আগে মানুষকে বাইরে ও ভেতরে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নির্মল ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে শুদ্ধ হতে হবে।

 

মান্দাইজম

 

ভবিষ্যতের পথ

অধ্যায় ১৭: ধর্মীয় গোঁড়ামির ব্যবচ্ছেদ এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি

সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে ধর্ম মানবজাতিকে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক সংহতির পাঠ শিখিয়েছে। অথচ ইতিহাসের এক নির্মম বাস্তবতা হলো, যে আদর্শ এসেছিল মানুষকে যুক্ত করতে, সেই ধর্মেরই বাহ্যিক রূপ, ভুল ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক অপব্যবহার মানবসমাজে বহু রক্তপাত ও গভীর বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটের মূল কারণ হলো ধর্মের ‘মূল নির্যাস’ (Essence) বা ভেতরের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিকটিকে বাদ দিয়ে কেবল তার ‘বাহ্যিক কাঠামো’ (Dogma) বা আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে অতিরিক্ত গোঁড়ামি ও ক্ষমতার লড়াই করা।

১. গোঁড়ামির মনস্তাত্ত্বিক ও শাস্ত্রীয় ব্যবচ্ছেদ

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মীয় চরমপন্থা বা গোঁড়ামির জন্ম হয় অহংকার, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং অজ্ঞতা থেকে। যখন কোনো গোষ্ঠী মনে করে যে কেবল তারাই পরম সত্যের একমাত্র একচেটিয়া মালিক এবং বাকি সবাই সমূলে ধ্বংসের যোগ্য, তখনই জন্ম নেয় উগ্রবাদ। অথচ সব ধর্মের মূল গ্রন্থ ও স্তম্ভগুলো এই সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে:

  • ইসলাম: পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে, “দ্বীনের (ধর্মের) ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৬)। অন্য আয়াতে স্পষ্টভাবে পরমতসহিষ্ণুতার সীমানা নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, “তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য।” (সূরা আল-কাফিরুন, আয়াত: ৬)

  • সনাতন (হিন্দু) ধর্ম: ঋগ্বেদের বিখ্যাত বাণীতে স্পষ্ট বলা হয়েছে—“একং সদ বিপ্রা বহুধা বদন্তি”, অর্থাৎ একই পরম সত্যকে জ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকেন। ধর্মের নামে অন্যায় হিংসা করাকে সনাতন শাস্ত্রে ‘অধর্ম’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

  • খ্রিষ্টধর্ম: যীশু খ্রিষ্ট তাঁর বিখ্যাত বাণীতে বলেছিলেন, “যারা শান্তি স্থাপন করে, তারা ধন্য; কারণ তারা ঈশ্বরের সন্তান বলে পরিচিত হবে।” (মথি ৫:৯)

  • জৈন ধর্ম ও অনেকান্তবাদ (Anekantavada): জৈন ধর্মের ‘অনেকান্তবাদ’ দর্শনটি গোঁড়ামির বিরুদ্ধে অন্যতম বড় তাত্ত্বিক অস্ত্র। এই দর্শন অনুযায়ী, সত্য কোনো একক মানুষের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না; সত্যের বহু দিক থাকে। তাই অন্য মানুষের মতকেও পুরোপুরি মিথ্যা না ভেবে তার দৃষ্টিকোণকে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।

২. আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহাসিক দলিল

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যখনই শাসকেরা এবং সাধারণ মানুষ ধর্মের বাহ্যিক দেয়াল টপকে এর অন্তর্নিহিত দর্শন ও সামাজিক সুরক্ষাকে গ্রহণ করেছেন, তখনই সমাজ সর্বোচ্চ সমৃদ্ধি লাভ করেছে।

  • স্পেনের কর্ডোভা (আন্দালুসিয়া): মধ্যযুগে মুসলিম শাসিত স্পেনে খ্রিষ্টান, ইহুদি ও মুসলিমরা একসাথে শতাব্দীর পর শতাব্দী শান্তি, বিজ্ঞান ও দর্শন চর্চায় কাটিয়েছে, যা ইতিহাসে ‘La Convivencia’ বা সহাবস্থান নামে পরিচিত।

  • ভারতের সুফি-ভক্তি ঐতিহ্য: সুফি সাধক খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী, বাবা ফরিদ কিংবা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরবারে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব মানুষের সমাগম প্রমাণ করে যে, আধ্যাত্মিক ও মানবিক স্তরে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভেদ ছিল না।

  • শিখ ধর্মের স্বর্ণ মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর: শিখ ইতিহাসের এক অনন্য দলিল হলো, যখন চতুর্থ গুরু রামদাস জি অমৃতসরের পবিত্র স্বর্ণ মন্দির (Harmandir Sahib) নির্মাণের উদ্যোগ নেন, তখন এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার জন্য ইসলামের বিখ্যাত সুফি সাধক মিয়া মীর-কে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই ঘটনাটি অন্য ধর্মের প্রতি শিখদের গভীর শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির এক ঐতিহাসিক প্রতীক।

৩. অন্যান্য আন্তর্জাতিক ধর্মে বিশ্বজনীন সম্প্রীতির বাণী

  • বাহাই ধর্ম (Bahá’í Faith): বাহাই দর্শনের মূল ভিত্তিটাই হলো মানবজাতির ঐক্য এবং সব ধর্মের একত্ব। বাহাউল্লাহর শিক্ষায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, সব ধর্মই মূলত এক ঈশ্বরের কাছ থেকে আসা প্রগতিশীল বাণীর বিভিন্ন অধ্যায়। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন: “সব ধর্মের মানুষের সাথে পরম বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির সাথে মেলামেশা করো।” বাহাই বিশ্বাসে ধর্মীয় গোঁড়ামিকে বিশ্বশান্তির প্রধান অন্তরায় মনে করা হয়।

  • জরথুষ্ট্রবাদ (Zoroastrianism): প্রাচীন পারস্যের এই ধর্মে সম্রাট মহান কুরুশ (Cyrus the Great)-এর ইতিহাস সম্প্রীতির এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি ব্যাবিলন জয় করার পর সেখানকার ইহুদিদের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন এবং তাদের নিজস্ব উপাসনালয় পুনর্নির্মাণ করার অর্থ ও স্বাধীনতা দেন, যা ‘Cyrus Cylinder’-এ মানব ইতিহাসের প্রথম মানবাধিকার সনদ হিসেবে খোদাই করা আছে। জরথুষ্ট্রীয় দর্শন শাসককে অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করে।

আধুনিক পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বাস্তব স্বার্থেই আজ প্রতিটি ধর্মের মানুষকে তাদের নিজস্ব ধর্মের সেই উদার, সুনির্দিষ্ট এবং মানবিক বাণীর দিকে ফিরে যেতে হবে।

আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির অর্থ নিজের বিশ্বাসকে বিসর্জন দেওয়া বা সব ধর্মকে জোর করে এক বানিয়ে ফেলা নয়; বরং নিজের ধর্মে শতভাগ অটল ও গভীরভাবে বিশ্বাসী থেকেও অন্য ধর্মের মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, তাদের বিশ্বাস ও আচারের প্রতি পরম সামাজিক শ্রদ্ধা পোষণ করা। যখন বাহ্যিক সংকীর্ণতা ও ভুল ব্যাখ্যা দূর করা সম্ভব হবে, তখনই আরবের ‘জিহাদ’ আর ভারতের ‘ধর্মযুদ্ধ’-এর আসল উদ্দেশ্য—অর্থাৎ সমাজে বিশৃঙ্খলা দূর করে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

অধ্যায় ১৮: এক পৃথিবী, এক মানবজাতি, এক গন্তব্য

আমরা এই সুদীর্ঘ গবেষণাগ্রন্থে আরবের মরুভূমি থেকে শুরু করে ভারতের হিমালয় উপত্যকা, জেরুজালেমের প্রাচীন পাথর থেকে শুরু করে পাঞ্জাবের সবুজ প্রান্তর, কিংবা দূরপ্রাচ্যের চীন ও জাপানের প্রাচীন উপাসনালয়—সবখানেই তাদের নিজস্ব বিশ্বাসের মূল উৎসগুলো অনুসন্ধান করেছি। বাহ্যিক চোখ দিয়ে দেখলে মনে হতে পারে আমরা ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মানুষের সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা উপাসনাপদ্ধতি বা জীবনধারা দেখছি। কিন্তু আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কষ্টিপাথরে যাচাই করলে একটি সত্য বাস্তবতার আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে: মানুষের মৌলিক আকুলতা, নৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার গন্তব্য মূলত একই সূত্রে গাঁথা।

১. চিরন্তন সত্যের অভিন্ন রূপরেখা

আমরা এই সুদীর্ঘ অধ্যায়গুলোর পাতায় পাতায় যে বাস্তব মিল ও দালিলিক প্রমাণগুলো দেখেছি, তার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:

  • মহাজাগতিক সংখ্যাতত্ত্ব: মহাবিশ্বের সৃষ্টি, সময় ও পূর্ণতার রহস্য প্রকাশ করতে গিয়ে আব্রাহামিক ধর্মসমূহ (ইসলাম, খ্রিষ্ট, ইহুদি) থেকে শুরু করে দূরপ্রাচ্যের তাওবাদ এবং প্রাচীন পারস্যের জরথুষ্ট্রবাদে ‘৭’ সংখ্যাটির জাদুকরী ও মহাজাগতিক রূপককে হুবহু একইভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

  • কেন্দ্রমুখী আবর্তন: আরবের ‘তাওয়াফ’, ইহুদিদের ‘হাকাফাত’, সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মের ‘প্রদক্ষিণ’ বা ‘সাত পাক’, এবং শিখ ধর্মের ‘লাভা’—সবগুলোর মূলে রয়েছে কায়িক সমর্পণের মাধ্যমে পরম সত্তা বা উচ্চতর নৈতিক আদর্শকে জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু বানানোর একই মনস্তত্ত্ব।

  • আহারের ব্যাকরণ: মুসলিমদের ‘হালাল’ আর ইহুদিদের ‘কোশার’ আহারের শুদ্ধতার আইনি বিধান যেমন হুবহু এক; তেমনি ভারতীয় ধর্মের ‘নিরামিষবাদ’, বাহাই ধর্মের ভবিষ্যৎ আহারের শিক্ষা, তাওবাদের ‘বিগু’ এবং জরথুষ্ট্রবাদের নির্দিষ্ট মাসের সংযমের মূলে রয়েছে শরীর ও আত্মার পবিত্রতা এবং জীবকুলের প্রতি দয়াশীলতার একই অনুভূতি।

  • সর্বজনীন গোল্ডেন রুল: মানুষের নৈতিক চরিত্রের সুরক্ষায় আরবের নবী, আর্যের অবতার, বৌদ্ধের বোধিসত্ত্ব, চীনের কনফুসিয়াস আর শিখদের গুরু—সবার মূল নীতি ছিল এক: সুবর্ণ নিয়ম বা গোল্ডেন রুল—“নিজের জন্য যা কষ্টদায়ক বা অপছন্দনীয়, তা অন্যের প্রতি আচরণ করো না।”

  • জল ও শুদ্ধাচার: আরবের ‘ওযু’, জর্ডান নদীর ‘বাপ্তিস্ম’, জেরুজালেমের ‘মিকভাহ’, জাপানের শিন্তো ধর্মের ‘মিশোগি’ কিংবা ভারতের ‘গঙ্গাস্নান’—সবগুলোর মূল কাঠামোগত শিক্ষা হলো এক: পরম পবিত্র স্থানে পা রাখার আগে মানুষকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নির্মল হতে হবে।

  • ন্যায়ের লড়াই ও শান্তিস্থাপন: আরবের ‘জিহাদ’, ভারতের ‘ধর্মযুদ্ধ’, খ্রিষ্টীয় দর্শনের ‘জাস্ট ওয়ার’ কিংবা শিখ ধর্মের ‘ধরম যুদ্ধ’—সবগুলোর মূল স্পিরিট বা উদ্দেশ্য এক: সমাজে অন্যায়, অত্যাচার ও বিশৃঙ্খলা দূর করে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

শেষ কথা

নদী যেমন ভিন্ন ভিন্ন উৎস ও পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে তৈরি হয়ে আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত একই বিশাল সমুদ্রে গিয়ে লীন হয়, মানবজাতির নৈতিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রার শেষ পরিণতিও ঠিক তেমনই।

নামাযের সিজদায় যে কপাল মাটিতে ঠেকছে, চার্চের মোমবাতির আলোয় যে চোখ দুটো ভিজছে, মন্দিরের আরতিতে যে হাত দুটো জোড় হচ্ছে, সিনাগগের দেয়ালে মাথা রেখে যে বুকটা কাঁপছে, বাহাই উপাসনালয়ে যে নীরব প্রার্থনা চলছে, কিংবা তাওবাদী মন্দিরে যে ধ্যানমগ্নতা দেখা যাচ্ছে—সব কটি হৃদয়ের আকুলতা এবং পরম আশ্রয় খোঁজার আকুতি এক ও অভিন্ন।

ধর্মের নামে গোঁড়ামি, ভুল ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক অপব্যবহার অনেক সময় সমাজকে বিভক্ত করলেও, প্রতিটি বিশ্বাসের মূল গ্রন্থ ও আদর্শ মানুষকে যত্রতত্র হিংসা বা রক্তপাত শেখায়নি, বরং শিখিয়েছে নিজের ভেতরের পশুবৃত্তিকে ধ্বংস করে একজন আদর্শ ও সুশৃঙ্খল ‘মানুষ’ হতে। মানবজাতি যেদিন ধর্মের এই বাহ্যিক দেয়াল ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য টপকে এর ভেতরের গভীর সত্য ও নৈতিক অনুশাসনকে কঠোরভাবে উপলব্ধি করতে পারবে, সেদিনই পৃথিবীতে প্রকৃত সামাজিক শৃঙ্খলা ও টেকসই শান্তি নেমে আসবে। কারণ বাহ্যিক আচার বা নিয়মের ভিন্নতা যা-ই থাকুক না কেন, আমরা সবাই এই এক পৃথিবীর বাসিন্দা, একই মানবজাতির অংশ এবং আমাদের সবার শেষ গন্তব্যও এক ও অনিবার্য।

রেফারেন্স:

একেশ্বরবাদ, পরমতত্ত্ব এবং ঈশ্বরের ধারণার একতা

  • ইসলাম (তৌহিদ): পবিত্র আল-কুরআন, সূরা আল-ইখলাস (১১২:১-২)।
  • ইহুদি ধর্ম (শেমা): হিব্রু বাইবেল (Tanakh), তোরাহ, দ্বিতীয় বিবরণ / ডিউটেরোনমি (Deuteronomy 6:4)।
  • খ্রিষ্টধর্ম (একত্ব ও ত্রিত্ব): নিউ টেস্টামেন্ট, মার্কের সুসমাচার (Gospel of Mark 12:29); এবং নাইসিন ক্রিড (Nicene Creed, 325 CE) — Three Persons, One Essence তত্ত্বের জন্য।
  • সনাতন ধর্ম: ঋগ্বেদ (মণ্ডল ১, সূক্ত ১৬৪, ঋক ৪৬) — “একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি”; এবং ছান্দোগ্য উপনিষদ (৬.২.১) — “একমেবাদ্বিতীয়ম্”
  • শিখ ধর্ম: গুরু গ্রন্থ সাহিব (পৃষ্ঠা ১), জপজী সাহেব — ‘ইক ওঙ্কার’ ও ‘মূল মন্তর’ (Mool Mantar)।
  • তাওবাদ: লাওতজু রচিত প্রাচীন গ্রন্থ ‘তাও তে চিং’ (Tao Te Ching), অধ্যায় ১।
  • জরথুষ্ট্রবাদ: আবেস্তা (Avesta), ইয়াসনা (Yasna 44) — আহুরা মাজদার একত্ব।

জন্ম ও মৃত্যুর শেষ কৃত্য: আত্মার বিদায়ের আচার

  • ইসলাম (আকিকা ও খতনা): সহীহ বুখারী (হাদীস নম্বর: ৫৪৭২, আকিকা সংক্রান্ত) এবং সহীহ মুসলিম (হাদীস নম্বর: ২৫৭, ফিতরাত ও খতনা সংক্রান্ত)।
  • ইহুদি ধর্ম (ব্রেট মিলাহ): তোরাহ, আদিপুস্তক / জেনেসিস (Genesis 17:10-12) — আব্রাহামের সাথে ঈশ্বরের চুক্তি।
  • খ্রিষ্টধর্ম (বাপ্তিস্ম): নিউ টেস্টামেন্ট, মথির সুসমাচার (Gospel of Matthew 28:19) এবং রোমীয় (Romans 6:4 — আদিপাপ ও পুনরুত্থান)।
  • সনাতন ধর্ম (অন্ত্যেষ্টি ও পঞ্চভূত): মনুস্মৃতি এবং গরুড় পুরাণ (প্রেত খণ্ড) — মৃতদেহের দাহ ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিয়ম।
  • জরথুষ্ট্রবাদ (দখমা/Tower of Silence): আবেস্তা, ভেন্দিদাদ (Vendidad, Fargard 5 & 6) — মৃতদেহ এবং মাটির পবিত্রতা রক্ষা নীতি।
  • বাহাই ধর্ম: বাহাউল্লাহ রচিত ‘কিতাব-ই-আকদাস’ (The Kitáb-i-Aqdas), অনুচ্ছেদ ১২৮-১৩০ (মৃতদেহ সমাহিতকরণ ও এক ঘণ্টার দূরত্ব নীতি)।

সুবর্ণ নিয়ম (The Golden Rule)

  • ইসলাম: সহীহ বুখারী (কিতাবুল ঈমান, হাদীস নম্বর: ১৩) — “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না…”
  • খ্রিষ্টধর্ম: নিউ টেস্টামেন্ট, মথির সুসমাচার (Gospel of Matthew 7:12) — পাহাড়ের উপদেশ (Sermon on the Mount)।
  • ইহুদি ধর্ম: ব্যবিলনীয় তালমুদ, ট্র্যাকটেট শিয়াবাত (Babylonian Talmud, Shabbat 31a) — পণ্ডিত হিল্লেলের উক্তি।
  • সনাতন ধর্ম: মহর্ষি বেদব্যাস রচিত মহাভারত, অনুশাসন পর্ব (১১৩/৮) — “আত্মনঃ প্রতিকূলানি পরেষাং ন সমাচরেৎ”
  • বৌদ্ধ ধর্ম: ত্রিপিটক, খুদ্দক নিকায়, উদনবর্গ (Udanavarga 5:18)।
  • শিখ ধর্ম: গুরু গ্রন্থ সাহিব, পৃষ্ঠা ১২৯১ (ভগত ফরিদ জি-এর বাণী)।
  • কনফুসীয়বাদ: কনফুসিয়াসের কথোপকথনের সংকলন ‘অ্যানালেক্টস’ (Analects of Confucius 15:24) — ‘Shu’ বা সহানুভূতি তত্ত্ব।
  • তাওবাদ: প্রাচীন তাওবাদী পাঠ্য ‘তাইশাং গাঞ্জিং পিয়ান’ (Taishang Ganjying Pian / Treatise of the Exalted One on Response and Retribution)।

অহিংসা, জিহাদ এবং ধর্মের নামে ন্যায়ের লড়াই

  • ইসলাম (জিহাদ ও যুদ্ধনীতি): পবিত্র আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারাহ (২:১৯০ — আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ) এবং সহীহ মুসলিম (হাদীস নম্বর: ১৭৩১ — নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের হত্যা না করার কঠোর নির্দেশ)। ‘জিহাদ আকবার’ সংক্রান্ত বর্ণনা খতিব আল-বাগদাদীর ‘তারিখ বোগদাদ’ গ্রন্থে সংকলিত।
  • সনাতন ধর্ম (ধর্মযুদ্ধ): শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, অধ্যায় ২ (ক্ষত্রিয় ধর্ম ও অর্জুনের বিষাদ যোগ)।
  • খ্রিষ্টধর্ম (জাস্ট ওয়ার): সেন্ট অগাস্টিন রচিত ‘দ্য সিটি অব গড’ (The City of God, Book XIX) এবং থমাস অ্যাকুইনাসের ‘সুম্মা থিওলজিকা’ (Summa Theologiae, II-II, Q. 40) — Just War Theory
  • শিখ ধর্ম (ধরম যুদ্ধ): গুরু গোবিন্দ সিংহ জি রচিত ‘জাফরনামা’ (Zafarnama) — দশম গ্রন্থের (Dasam Granth) অংশ।
  • তাওবাদ: লাওতজু রচিত ‘তাও তে চিং’ (Tao Te Ching), অধ্যায় ৩০ ও ৩১ (অস্ত্র ও যুদ্ধ পরিহারের চরম শর্ত)।

সুফিবাদ, ভক্তি আন্দোলন এবং রহস্যবাদের মিলনমেলা

  • সুফিবাদ: জালালুদ্দিন রুমির ‘মসনবী’ (Masnavi-ye Ma’navi) এবং রাবেয়া বসরীর জীবন ও প্রেমের দর্শন (ফরিদুদ্দিন আত্তার রচিত ‘তাযকিরাতুল আউলিয়া’ দ্রষ্টব্য)।
  • ভক্তি আন্দোলন: শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত (কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত); কবীর দাসের ‘বীজক’ (Bijak) এবং মীরাবাঈয়ের ভজন সংকলন।
  • কাবালাহ (ইহুদি রহস্যবাদ): প্রাচীন কাবালিস্টিক প্রধান গ্রন্থ ‘যোহার’ (The Zohar) এবং ‘তিক্কুন ওলাম’ (Tikkun Olam) দর্শন।
  • খ্রিষ্টান রহস্যবাদ: সেন্ট জন অব দ্য ক্রস রচিত ‘ডার্ক নাইট অব দ্য সোল’ (Dark Night of the Soul) এবং সেন্ট তেরেসা অব আভিলা রচিত ‘দ্য ইন্টেরিয়র ক্যাসেল’ (The Interior Castle)।

পবিত্র পানি ও অবিষেকের আচার

  • ইসলাম (ওযু ও তায়াম্মুম): পবিত্র আল-কুরআন, সূরা আল-মায়েদাহ (৫:৬ — ওযু, গোসল ও তায়াম্মুমের বিধান)।
  • ইহুদি ধর্ম (মিকভাহ): তোরাহ, লেবীয় পুস্তক / লেভিটিকাস (Leviticus 15); এবং তালমুদের ‘নেতিলাত ইয়াদাইম’ (হস্তক্ষালন বিধি)।
  • খ্রিষ্টধর্ম (বাপ্তিস্ম): নিউ টেস্টামেন্ট, মার্কের সুসমাচার (Gospel of Mark 1:9-11 — জর্ডান নদীতে যীশুর বাপ্তিস্ম)।
  • সনাতন ধর্ম (অভিষেক ও আচমন): যজুর্বেদ ও বিভিন্ন পূজাবিধি সংকলন (যেমন: পুরোহিত দর্পণ) — আচমন ও বিগ্রহ অভিষেকের নিয়ম।
  • শিন্তো ধর্ম (মিশোগি/তেমিজু): জাপানি প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থ ‘কোজিকি’ (Kojiki) — ইজানাগি দেবতার স্নানের মাধ্যমে শুদ্ধি অর্জনের আদি বিবরণ।

ধর্মীয় গোঁড়ামির ব্যবচ্ছেদ এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি

  • ইসলাম: পবিত্র আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারাহ (২:২৫৬) এবং সূরা আল-কাফিরুন (১০৯:৬)।
  • সনাতন ধর্ম: ঋগ্বেদ (১.১৬৪.৪৬)।
  • খ্রিষ্টধর্ম: নিউ টেস্টামেন্ট, মথির সুসমাচার (৫:৯)।
  • জৈন ধর্ম (অনেকান্তবাদ): আচারঙ্গ সূত্র (Acaranga Sutra) — সত্যের বহুমাত্রিকতা ও অহিংসা দর্শন।
  • ঐতিহাসিক দলিল (কর্ডোভা): ‘লা কনভিভেনসিয়া’ (La Convivencia) ঐতিহাসিক যুগ — ড. মারিয়া রোসা মেনোকাল রচিত “দ্য অর্নামেন্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড: হাউ মুসলিমস, জিউস, অ্যান্ড ক্রিশ্চিয়ানস ক্রিয়েটেড আ কালচার অব টলারেন্স ইন মেডিভাল স্পেন”
  • ঐতিহাসিক দলিল (স্বর্ণ মন্দির): শিখ ইতিহাস গ্রন্থ ‘শ্রী সুরজ প্রকাশ’ (Sri Gur Pratap Suraj Granth) — সুফি সাধক মিয়া মীর কর্তৃক স্বর্ণ মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের বিবরণ।
  • ঐতিহাসিক দলিল (সাইরাস সিলিন্ডার): ‘সাইরাস সিলিন্ডার’ (Cyrus Cylinder, 539 BCE), বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত (প্রাচীন পারস্যের পরমতসহিষ্ণুতার প্রথম আন্তর্জাতিক দলিল)।