বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ: সংকট, রাজনীতি ও আসল অর্থনীতি

সাধারণ যেকোনো পণ্যের সাথে বিদ্যুতের একটি বড় মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আপনি যদি জামাকাপড় বা কোনো আসবাবপত্র তৈরি করেন, তবে তা গুদামে জমিয়ে রেখে চাহিদা অনুযায়ী বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু জাতীয় গ্রিডের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ কোনো গুদামে জমা করে রাখা যায় না। ব্যাটারি প্রযুক্তিতে কিছু অগ্রগতি হলেও বৃহৎ স্কেলে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়া এবং তা গ্রাহকের ঘরে ব্যবহৃত হওয়ার ঘটনাটি ঘটে একই সময়ে, একই মুহূর্তে। এই কারিগরি বৈশিষ্ট্যের কারণেই বিদ্যুৎ খাতের অর্থনীতি সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্যের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

একটি দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হলে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়ে প্রস্তুত রাখতে হয়। আর এই প্রস্তুতি ধরে রাখার যে মূলধনী খরচ, তা মেটানোর অর্থনৈতিক কাঠামোর নামই হলো ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ (Capacity Charge)। বিদ্যুৎ খাতের ভাষায় একে ‘টু-পার্ট ট্যারিফ’ বা দ্বিমুখী মূল্য কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ বলা হয়।

আমাদের দেশে প্রায়ই শোনা যায়— বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রেখে ‘বসিয়ে বসিয়ে’ চুক্তিভিত্তিক টাকা দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে ফেললেও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং মূলধনী বিনিয়োগের নিরিখে এটি কীভাবে কাজ করে, তা বোঝা জরুরি।

Table of Contents

ক্যাপাসিটি চার্জ আসলে কী এবং কেন এটি দেওয়া হয়?

সহজ কথায়, একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু থাকুক বা বন্ধ থাকুক, এটি যখনই জাতীয় গ্রিডের নির্দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম ও প্রস্তুত থাকে, তখন চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদককে যে নির্দিষ্ট সার্ভিস বা ভাড়া মেটাতে হয়, তা-ই হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। এটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থায়ী বা নির্দিষ্ট ব্যয় (Fixed Cost)।

বিষয়টি বোঝার জন্য একটি বাস্তব জীবনের উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। আপনি যদি ভ্রমণের জন্য প্রতিদিনের ভিত্তিতে একটি গাড়ি ভাড়া করেন, তবে ড্রাইভারকে একটি নির্দিষ্ট দৈনিক ভাড়া মেটাতে হয়। গাড়িটি নিয়ে আপনি সারাদিন ঘুরে বেড়ান কিংবা গ্যারেজে দাঁড় করিয়ে রাখেন—দৈনিক ভাড়ার কোনো পরিবর্তন হয় না। কারণ, চালক তার গাড়িটি আপনার সেবায় নিয়োজিত রেখেছেন এবং অন্য কোথাও ভাড়া দিতে পারছেন না। আর যখন গাড়িটি নিয়ে আপনি ভ্রমণ করবেন, তখন যে অতিরিক্ত পেট্রোল বা ডিজেল খরচ হবে, তা হলো পরিবর্তনশীল ব্যয় (Variable Cost)।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও ঠিক একই হিসাব প্রযোজ্য। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যখন গ্রিডের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য সব কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বসে থাকে, তখন তার বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ উঠে আসার নিশ্চয়তা হিসেবেই রাষ্ট্র বা গ্রিড কর্তৃপক্ষ এই চার্জ প্রদান করে।

 

বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) এবং দ্বিমুখী মূল্য কাঠামো

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে স্বাধীন বা বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (Independent Power Producer – IPP) কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহ যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ক্রয় করে, তাকে ‘পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট’ বা পিপিএ (PPA) বলা হয়। একটি আদর্শ পিপিএ-তে বিদ্যুতের মোট ব্যয়কে মূলত দুটি প্রধানভাগে ভাগ করা হয়।

১. ক্যাপাসিটি চার্জ বা স্থির ব্যয়

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল যন্ত্রপাতি কেনা, ভবন নির্মাণ, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, কর্মীদের বেতন এবং অবকাঠামো সচল রাখার জন্য যে নির্দিষ্ট খরচ প্রতিনিয়ত হতেই থাকে, তাকে ক্যাপাসিটি চার্জ বা ফিক্সড কস্ট বলা হয়। কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হোক বা না হোক, কেন্দ্র প্রস্তুত থাকলে এই অর্থ পরিশোধের আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকে।

২. এনার্জি চার্জ বা পরিবর্তনশীল ব্যয়

বিদ্যুৎ কেন্দ্র যখন প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে, তখন যে জ্বালানি (গ্যাস, কয়লা, ফার্নেস অয়েল, ডিজেল বা ইউরেনিয়াম) ব্যবহৃত হয়, সেই খরচকে এনার্জি চার্জ বা পরিবর্তনশীল ব্যয় (Variable Cost) বলা হয়। যদি গ্রিডের চাহিদা না থাকার কারণে কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র একদিনও চালু না হয়, তবে রাষ্ট্র বা গ্রিড কর্তৃপক্ষকে এক টাকারও এনার্জি চার্জ দিতে হয় না। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে এনার্জি চার্জ সম্পূর্ণ শূন্য থাকে।

সুতরাং, মোট বিদ্যুৎ ব্যয় হিসাবের মূল সূত্রটি দাঁড়ায়:

মোট বিদ্যুৎ ব্যয় = ক্যাপাসিটি চার্জ (স্থির ব্যয়) + এনার্জি চার্জ (পরিবর্তনশীল জ্বালানি ব্যয়)

 

ক্যাপাসিটি চার্জের টাকা কোথায় যায়: চার মৌলিক উপাদান

একটি আধুনিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা অত্যন্ত মূলধন-নিবিড় বা ক্যাপিটাল ইন্টেন্সিভ একটি উদ্যোগ। ৫০০ বা ১০০০ মেগাওয়াটের একটি মাঝারি থেকে বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। কোনো কোম্পানির পক্ষে নিজস্ব পকেটের টাকায় পুরো প্ল্যান্ট বানানো সম্ভব নয়। ফলে এই বিশাল বিনিয়োগের একটি বড় অংশই আসে দেশি-বিদেশি ব্যাংক ঋণ থেকে। ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পাওয়া অর্থ মূলত চারটি নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করা হয়:

 

১. মূলধনী ঋণ ও কিস্তি পরিশোধ

বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানানোর সময় যে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক ও দেশীয় ব্যাংক ঋণ নেওয়া হয়, তার মূলধন এবং নিয়মিত সুদ পরিশোধ করতে হয় নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী। বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারুক বা না পারুক, ব্যাংকের ঋণের কিস্তি থেমে থাকে না। ক্যাপাসিটি চার্জের সবচেয়ে বড় অংশটি সরাসরি চলে যায় এই প্রজেক্ট ফাইন্যান্সের ব্যাংক ঋণ পরিশোধে।

 

২. স্থায়ী পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়

একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র না চললেও সেটিকে সচল রাখতে শত শত প্রকৌশলী, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, সিকিউরিটি এবং প্রশাসনিক কর্মীকে নিয়োজিত রাখতে হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও তাদের মাসিক বেতন ও ভাতা প্রদান করতে হয়। এছাড়া সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির মরিচা ধরা রোধ করতে বা কারিগরি পরিদর্শন সচল রাখতে নিয়মিত মেইনটেন্যান্স বা রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটাতে হয়।

 

৩. মূলধনের ওপর লভ্যাংশ বা রিটার্ন অন ইকুইটি

যেসব দেশি বা আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিয়ে একটি প্রকল্পে নিজেদের মূলধন (Equity) বিনিয়োগ করেন, তারা বিনিয়োগের বিপরীতে একটি সুনির্দিষ্ট লভ্যাংশ আশা করেন। ব্যাংকের সুদের বাইরে এই লভ্যাংশ নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ববাজারে বিদ্যুৎ খাতে কোনো বেসরকারি বিনিয়োগকারী আসতে চায় না।

 

৪. বীমা প্রিমিয়াম ও সংবিধিবদ্ধ সরকারি ফি

একটি মেগা প্রজেক্ট বা বিদ্যুৎ প্ল্যান্টকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড কিংবা আকস্মিক যান্ত্রিক দুর্ঘটনাজনিত ক্ষয়ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখতে কোটি কোটি টাকার আন্তর্জাতিক বীমা (Insurance) কাভারেজ নিতে হয়। এর পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন নিয়মিত অনুমোদন লাইসেন্স ফি ও কর দিতে হয়, যা স্থির ব্যয়েরই অন্তর্ভুক্ত।

 

ক্যাপাসিটি চার্জ হিসাব করার গাণিতিক পদ্ধতি ও উদাহরণ

ক্যাপাসিটি চার্জ কিন্তু আন্দাজে বা ইচ্ছামতো নির্ধারণ করা হয় না। বিশ্বজুড়ে পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফাইন্যান্সের একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে এটি নির্ধারিত হয়। ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পাওয়ার মূল শর্তই হলো ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রাপ্যতা’ (Plant Availability Factor)।

 

প্রাপ্যতা সূচক বা এভেলেবিলিটি ফ্যাক্টর

পিপিএ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যান্ত্রিকভাবে শতভাগ প্রস্তুত থাকে এবং জাতীয় লোড ডেসপ্যাচ সেন্টার (NLDC) নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুৎ গ্রিডে দিতে সক্ষম হয়, তবেই তাকে ‘অ্যাভেলেবল’ বা প্রস্তুত বলে গণ্য করা হয়। যদি প্ল্যান্টের নিজস্ব যান্ত্রিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের গাফিলতি বা যন্ত্রাংশ নষ্ট থাকার কারণে সেটি বিদ্যুৎ দিতে ব্যর্থ হয়, তবে চুক্তি অনুযায়ী তারা সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্যাপাসিটি চার্জ পাওয়ার অধিকার হারায়।

 

ক্যাপাসিটি পেমেন্ট হিসাবের মূল সূত্র

প্রতিদিনের বা প্রতি মাসের প্রস্তুত থাকার সময় হিসাব করে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়। হিসাবের সহজ টেক্সট সমীকরণটি হলো:

 

ক্যাপাসিটি পেমেন্ট = চুক্তিকৃত নিট ক্ষমতা (মেগাওয়াট) × অনুমোদিত নির্দিষ্ট ক্যাপাসিটি রেট (প্রতি মেগাওয়াটের জন্য নির্ধারিত টাকা) × প্রকৃত প্রাপ্যতা সূচক (প্রস্তুত থাকার অনুপাত)

 

এখানে, প্রকৃত প্রাপ্যতা সূচক = (বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট প্রস্তুত থাকা সময়কাল / মাসের মোট সময়কাল) × ১০০।

 

বাস্তব জীবনের একটি গাণিতিক উদাহরণ

ধরে নেওয়া যাক, একটি ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে গ্রিডের একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে।
  • চুক্তিকৃত উৎপাদন ক্ষমতা: ৩০০ মেগাওয়াট
  • প্রতি মেগাওয়াটের জন্য নির্ধারিত মাসিক ক্যাপাসিটি রেট: ৫০ লাখ টাকা
  • প্রতি মাসে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য ক্যাপাসিটি চার্জ: ৩০০ মেগাওয়াট × ৫০ লাখ টাকা = ১৫ কোটি টাকা।
এখন তিনটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে কী ঘটবে তা দেখা যাক:

 

প্রথম পরিস্থিতি (চাহিদা ছিল এবং কেন্দ্র বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে):

বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরো ৩০ দিনই (১০০% সময়) প্রস্তুত ছিল এবং জাতীয় গ্রিডের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ তৈরি করেছে।

ফলাফল: কেন্দ্রটি শতভাগ প্রাপ্যতা দেখিয়েছে। তাই সেটি পুরো ১৫ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পাবে। এর পাশাপাশি যত ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে, তার জন্য অতিরিক্ত ‘এনার্জি চার্জ’ (জ্বালানি খরচ) আলাদাভাবে পাবে।

 

দ্বিতীয় পরিস্থিতি (চাহিদা ছিল না, কিন্তু কেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল):

শীতকাল হওয়ার কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা কমে গেছে। জাতীয় লোড ডেসপ্যাচ সেন্টার এই ৩০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটিকে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে বন্ধ রাখতে বলেছে। তবে কেন্দ্রটির প্রকৌশলীরা প্ল্যান্টকে শতভাগ প্রস্তুত রেখেছিলেন।

ফলাফল: যেহেতু কেন্দ্রটি তার নিজের বাধ্যবাধকতা পূরণ করে নিজেকে তৈরি রেখেছিল, তাই নিয়ম অনুযায়ী এটি পুরো ১৫ কোটি টাকাই ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পাবে। কিন্তু যেহেতু প্ল্যান্টটি চলেনি এবং এক ফোঁটা জ্বালানিও পোড়ায়নি, তাই রাষ্ট্রকে এক টাকারও ‘এনার্জি চার্জ’ দিতে হবে না।

 

তৃতীয় পরিস্থিতি (বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিজস্ব যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল):

মাসের ৩০ দিনের মধ্যে ১০ দিন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির টারবাইনে ত্রুটি ছিল, যার কারণে সেটি বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

ফলাফল: কেন্দ্রটির প্রকৃত প্রাপ্যতা ছিল ২০ দিন, অর্থাৎ ৬৬.৬৭%।
প্রাপ্য ক্যাপাসিটি চার্জ = ৩০০ মেগাওয়াট × ৫০ লাখ টাকা × ৬৬.৬৭% = ১০ কোটি টাকা (প্রায়)।
এখানে নিজস্ব ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটি প্রায় ৫ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হারাল বা আর্থিক জরিমানা গুনল।

 

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অন্যান্য খরচ

একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করতে কী কী ধরণের খরচ হয়, তা যদি আমরা স্থির এবং পরিবর্তনশীল খাতের নিরিখে আলাদা করে লক্ষ্য করি, তবে পুরো অর্থব্যবস্থাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

স্থির খরচ বা ফিক্সড কস্ট (যা ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে দেওয়া হয়)

বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু থাকুক বা বন্ধ থাকুক, এটি প্রস্তুত থাকলে এই খরচগুলো নিয়মিত হয়ে থাকে:

  • ব্যাংক থেকে নেওয়া মূলধনী ঋণের আসোলের কিস্তি ও সুদের টাকা।
  • প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, কর্মী ও প্রহরীদের স্থায়ী বেতন-ভাতা।
  • আন্তর্জাতিক বীমা প্রিমিয়াম, সরকারি লাইসেন্সিং ও সংবিধিবদ্ধ ফি।
  • প্ল্যান্টের ক্ষয় রোধে নিয়মতান্ত্রিক স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ খরচ।
  • বিনিয়োগকারীর মূলধনের নির্ধারিত লভ্যাংশ বা রিটার্ন অন ইকুইটি।

পরিবর্তনশীল খরচ বা ভেরিয়েবল কস্ট (যা এনার্জি চার্জের মাধ্যমে দেওয়া হয়)

বিদ্যুৎ কেন্দ্র যখন প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎ তৈরি করে, কেবল তখনই এই খরচগুলো তৈরি হয়:

  • প্রধান জ্বালানি খরচ (যেমন কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস অয়েল, কিংবা ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা)।
  • কেমিক্যাল, ডিমিনারেলাইজড ওয়াটার ট্রিটমেন্ট এবং লুব্রিকেটিং অয়েল খরচ।
  • প্ল্যান্ট চলার ফলে তৈরি হওয়া ছাই বা উপজাত বর্জ্য অপসারণের খরচ।
  • একটি বন্ধ বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে পুনরায় চালু করার সময় প্রথম কয়েক ঘণ্টায় যে অতিরিক্ত স্টার্ট-আপ জ্বালানি লাগে (স্টার্ট-আপ চার্জ)।

 

ক্যাপাসিটি চার্জ কেন অবকাঠামোগতভাবে অপরিহার্য?

অনেকের মনে এই মৌলিক প্রশ্নটি আসতে পারে— বিদ্যুৎ যখন নেওয়া হচ্ছে না, তখন টাকা দেওয়া হবে কেন? শুধু বিদ্যুৎ নেওয়ার সময় ইউনিটের দাম চুকিয়ে দিলেই তো ঝামেলা মিটে যায়!
শুনতে সহজ মনে হলেও বিদ্যুৎ অর্থনীতিতে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা প্রায় অসম্ভব। এর প্রধান তিনটি কারণ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. মূলধন নিবিড় শিল্পের ঝুঁকি বণ্টন

একটি সাধারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হঠাৎ পণ্য বিক্রি কমে গেলে মালিক উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারেন বা কর্মী ছাঁটাই করতে পারেন। কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সিংহভাগ খরচই হয়ে যায় অবকাঠামো নির্মাণেই। যদি বিনিয়োগকারীকে বলা হয়— “বিদ্যুৎ কিনলে টাকা দেব, না কিনলে এক টাকাও দেব না”, তবে রাষ্ট্র যখন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিদ্যুৎ কেনা বন্ধ রাখবে, তখন বিনিয়োগকারী দেউলিয়া হয়ে যাবে। এই অনিশ্চয়তার মুখে কোনো প্রাইভেট কোম্পানি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিনিয়োগ করতে আসবে না।

২. ব্যাংকিং ফাইন্যান্স এবং আন্তর্জাতিক ঋণের নিশ্চয়তা

বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বড় অংশই অর্থায়ন করে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থাগুলো (যেমন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এডিবি বা আইএফসি)। ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার একমাত্র শর্ত হিসেবে দেখে যে প্রকল্প থেকে নিশ্চিতভাবে ঋণের কিস্তি ফেরত আসার আইনি ব্যবস্থা আছে কি না। দীর্ঘমেয়াদি পিপিএ চুক্তি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নিশ্চয়তা না থাকলে বিশ্বের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ প্রকল্পে ঋণ অনুমোদন করে না।

৩. পিক চাহিদা ও রিজার্ভ মার্জিন সামলানো

যেকোনো দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ঋতু ও সময়ভেদে বিশাল ওঠানামা করে।
যেমন: একটি ক্রান্তীয় দেশে শীতকালে যদি বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ৯,০০০ মেগাওয়াট, তীব্র গরমে এসি ও সেচ চালুর কারণে সেই চাহিদা একলাফে বেড়ে দাঁড়াড়ায় ১৬,০০০ মেগাওয়াটে।
গরমকালের এই বাড়তি ৭,০০০ মেগাওয়াট চাহিদা সামাল দিতে সরকারকে কিন্তু অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়ে প্রস্তুত রাখতেই হয়।
শীতকালে হয়তো এই ৭,০০০ মেগাওয়াটের প্ল্যান্টগুলো অলস বসে থাকবে। কিন্তু যদি ক্যাপাসিটি চার্জের ব্যবস্থা না থাকত, তবে শীতে আয় না পেয়ে এই ব্যাকআপ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে যেত। ফলে গরমকাল আসামাত্র দেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং এবং গ্রিড বিপর্যয় দেখা দিত। বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা ‘রিজার্জ মার্জিন’ বানিয়ে রাখার খরচ মূলত ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমেই মেটাতে হয়।

ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়া কি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালিত হতে পারে?

উন্নত বিশ্বের কিছু দেশে ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াও বিদ্যুৎ বাজার পরিচালনা করার কিছু ভিন্ন মডেল দেখা যায়। তবে সেগুলোরও নিজস্ব জটিলতা ও মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে।

এনার্জি-অনলি মার্কেট বা মুক্ত স্পট মার্কেট

এই মডেলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে কোনো নিশ্চিত ক্যাপাসিটি চার্জ বা স্থির ভাড়া দেওয়া হয় না। বিদ্যুৎ কেন্দ্র কেবল প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে আয় করে।তবে এর পদ্ধতিটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মুক্ত বাজারে বিদ্যুতের দাম প্রতি মুহূর্তে চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করে বদলায়। স্বাভাবিক সময়ে হয়তো বিদ্যুতের দাম কম থাকে, কিন্তু যখন প্রচণ্ড গরমে বা খরায় বিদ্যুতের চরম সংকট তৈরি হয়, তখন পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫০ থেকে ২০০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। এই চরম আকাশচুম্বী দামের মাধ্যমে তারা সারা বছরের ফিক্সড খরচ এক মাসের মধ্যে তুলে নেয়।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো— এতে গ্রাহক হঠাৎ করে মারাত্মক আর্থিক ধাক্কার মুখে পড়ে। আমেরিকার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে ‘ইআরসিওটি’ (ERCOT) গ্রিডে এই এনার্জি-অনলি মার্কেট চালু আছে। ২০২১ সালের শীতকালীন তুষারঝড়ে যখন বিদ্যুতের প্রচণ্ড চাহিদা তৈরি হয়, তখন সাধারণ গ্রাহকদের এক সপ্তাহের বিদ্যুতের বিল এসেছিল কয়েক হাজার ডলার (কয়েক লাখ টাকা)।

তাছাড়া, দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী আয় না থাকার কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ঝুঁকিতে পড়ে এবং নতুন কেউ প্ল্যান্ট বানাতে চায় না। অর্থনীতিতে এই সংকটকে বলা হয় ‘মিসিং মানি প্রবলেম’ (Missing Money Problem)।

কেন উন্নয়নশীল দেশে বিকল্প মডেল কাজ করে না?

উন্নয়নশীল বা আমাদের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক কাঠামোর দেশে মুক্ত স্পট মার্কেট বা পাওয়ার এক্সচেঞ্জ গড়ে ওঠার মতো পরিপক্ব আর্থিক বাজার বা বিতরণ ব্যবস্থা থাকে না। এখানে রাষ্ট্র নিজেই বিদ্যুৎ খাতের একমাত্র বড় ক্রেতা (Single Buyer)। ফলে আন্তর্জাতিক মূলধন আকর্ষণ করতে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পিপিএ এবং ক্যাপাসিটি চার্জের দ্বিমুখী মূল্য ব্যবস্থাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মডেল।

বাংলাদেশে ক্যাপাসিটি চার্জ কেন্দ্রিক বিভ্রান্তি ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্ক ও অপপ্রচারের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, যা আবেগ মুক্ত হয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।

কুইক রেন্টাল প্ল্যান্ট ও সংকটের প্রেক্ষাপট

২০০৯ সালের দিকে বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ভয়াবহ লোডশেডিং হতো, যা শিল্পকারখানা ও জনজীবন স্থবির করে দিয়েছিল। বাসাবাড়িতে ১৪ ঘন্টার বেশিও লোডশেডিং। কয়লা বা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বৃহৎ ‘বেসলোড’ প্ল্যান্ট তৈরি হতে ৫ থেকে ৮ বছর সময় লাগে। সেই সময় দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে দ্রুত সময়ে (মাত্র ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে) বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ‘রেন্টাল’ ও ‘কুইক রেন্টাল’ ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক প্ল্যান্টের চুক্তি করা হয়।

তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসাতে আসা উৎপাদকদের সাথে চুক্তিতে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের শর্ত যুক্ত না করলে কেউই বিনিয়োগে রাজি হতো না, বাংকও কোন ঋণ দিতে রাজি হতো না। ওই সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশকে লোডশেডিং থেকে বাঁচাতে এটিই একমাত্র স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত পদক্ষেপ ছিল।

‘বসিয়ে বসিয়ে টাকা দেওয়া’ অপপ্রচারের সত্যতা

সমালোচনায় মূল দাবিটি থাকে— “বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রেখে বসিয়ে বসিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।”

অর্থনৈতিক নিরিখে এটি একটি অর্ধসত্য ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য।

একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র যদি যান্ত্রিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকে, কিন্তু জাতীয় গ্রিডে চাহিদার অভাব থাকে কিংবা প্রাথমিক জ্বালানির (গ্যাস বা কয়লা) অভাবে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে প্ল্যান্ট বন্ধ রাখে—তবে আইনি চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রটিকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে রাষ্ট্র বাধ্য।

এটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিককে দেওয়া কোনো অনুদান বা খয়রাত নয়; এটি তার শত শত কোটি টাকার মূলধনী বিনিয়োগ ও ব্যাংকের ঋণের কিস্তি মেটানোর আইনগত অধিকার। যদি রাষ্ট্র চুক্তি ভেঙে এই ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তবে বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগকারীরা আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে (Arbitration Court) মামলা দায়ের করবে। এতে রাষ্ট্রকে সুদে-আসলে জরিমানা দিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ও ক্রেডিট রেটিং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আসল সমস্যা কোথায়: ওভারক্যাপাসিটি ও চাহিদা প্রাক্কলন

ক্যাপাসিটি চার্জ নিজেই কোনো গলদ বা সমস্যা নয়; আসল সমস্যা তৈরি হয় যখন দেশের প্রকৃত বিদ্যুতের চাহিদা এবং মোট উৎপাদন সামর্থ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য বা ‘ওভারক্যাপাসিটি’ (Overcapacity) তৈরি হয়।

একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বোঝা যাক:

একটি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুতের সম্ভাব্য চাহিদা যদি হয় ১৬,০০০ মেগাওয়াট, তবে নিরাপদে গ্রিড চালানোর জন্য এবং ব্যাকআপ বজায় রাখার জন্য ২০,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকা যুক্তিসঙ্গত (প্রায় ২৫% রিজার্ভ মার্জিন)। কিন্তু সরকারের শিল্প প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য ছিল, বৈশ্বিক মন্দা বা অভ্যন্তরীণ কারণে যদি শিল্পকারখানা সেভাবে না বাড়ে এবং প্রাক্কলিত চাহিদা না বাড়ে, অথচ উৎপাদন সামর্থ্য বাড়িয়ে ২৬,০০০ মেগাওয়াটে নিয়ে যাওয়া হয়—তবে প্রতিমুহূর্তে অতিরিক্ত ১০,০০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে অলস বসে থাকতে হবে।

এই অতিরিক্ত ১০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো যেহেতু তৈরি হয়ে বসে আছে, তাদের নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতেই হবে। এই অতিরিক্ত রিজার্ভ মার্জিনের ফলেই রাজস্বের ওপর বড় চাপ তৈরি হয়। এটি মূল নীতিগত জায়গা— চাহিদা প্রাক্কলনে (Demand Forecasting) ভুল ছিল কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যৌক্তিক, কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জ প্রথাটিকেই অবৈধ বলা অর্থনৈতিক অজ্ঞতা।

কিন্তু আমরা সবাই জানি  নতুন ফ্যাক্টরির প্রচুর ডিমান্ড আছে, অর্থাৎ আওয়ামীলীগ সরকার যে ক্যাপাসিটি বানিয়েছিল সেটা প্রয়োজন । এমনকি তার বেশি বানালেও সেটা ব্যবহার হয়ে যেত।

মেগা প্রকল্প এবং ক্যাপাসিটি চার্জের গুণগত পরিবর্তন

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে বিগত বছরগুলোতে বড় বেসলোড (Base Load) পাওয়ার প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছে। যেমন— পায়রা ১২২০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল, মাতারবাড়ি, এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
স্বল্পমেয়াদি ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক প্ল্যান্টের সাথে এই মেগা প্রজেক্টগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জের একটি বড় গুণগত তফাত রয়েছে:
  • স্বল্পমেয়াদি ছোট তেলের প্ল্যান্টগুলোতে প্রাথমিক নির্মাণ খরচ কম হলেও জ্বালানি খরচ অত্যন্ত বেশি। ফলে এগুলো চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে প্রতি ইউনিটের দাম অনেক বেশি পড়ে।
  • বৃহৎ মেগা প্রজেক্টগুলোতে (যেমন কয়লা বা পারমাণবিক) প্রারম্ভিক অবকাঠামো নির্মাণ খরচ বা ক্যাপিটাল কস্ট অনেক বেশি। ফলে এদের ক্যাপাসিটি চার্জের হিসাবটি টাকার অঙ্কে বড় দেখায়। তবে এদের সুবিধা হলো— এদের এনার্জি চার্জ বা জ্বালানি খরচ অত্যন্ত কম।
একবার এই মেগা প্ল্যান্টগুলো নিয়মিত চলা শুরু করলে এবং ব্যাংক ঋণের প্রাথমিক কিস্তিগুলো পরিশোধ হয়ে গেলে, এগুলো কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত সুলভ মূল্যে দেশের মানুষকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে সক্ষম হয়।

সারসংক্ষেপ ও নীতি-নির্ধারণী মূলকথা

বিদ্যুৎ খাতের আধুনিকায়ন, শিল্পায়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ কোনো কৃত্রিম অপব্যয় নয়; বরং এটি বৈশ্বিক বিদ্যুৎ অর্থনীতি ও প্রজেক্ট ফাইন্যান্সের একটি মৌলিক কাঠামো। বিশ্বজুড়ে যেখানেই বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, সেখানেই এই দ্বিমুখী মূল্য কাঠামো কার্যকর রয়েছে।
তবে এই ক্যাপাসিটি চার্জের অর্থনৈতিক বোঝা যেন জনগণের ওপর অতিরিক্ত বিদ্যুতের দাম হয়ে না চেপে বসে, সেজন্য নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন:
  • বাস্তবমুখী চাহিদা প্রাক্কলন: শিল্পকারখানা ও দেশের অর্থনীতি কতটুকু বাড়বে তার সঠিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নতুন বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের অনুমোদন দেওয়া।
  • আধুনিক ‘নো পাওয়ার নো পেমেন্ট’ বা মার্চেন্ট মডেলে রূপান্তর: পুরাতন মেয়াদোত্তীর্ণ চুক্তিগুলো নবায়নের সময় নিশ্চিত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট তুলে দিয়ে আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক মডেলে রূপান্তর করা।
  • ব্যয়বহুল প্ল্যান্ট ফেজ-আউট করা: ছোট, পুরোনো ও ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল প্ল্যান্টের চুক্তি শেষ হওয়ার সাথে সাথে সেগুলো বন্ধ করে দিয়ে সাশ্রয়ী মেগা প্ল্যান্ট ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়া।
ক্যাপাসিটি চার্জকে রাজনৈতিক অপপ্রচারের বিষয় না বানিয়ে, এর অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করা এবং সঠিক পরিকল্পিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।