ইতিহাসের কাঠগড়ায় কায়দে আজম: ‘Jinnah: His Successes, Failures and Role in History’ । বই রিভিউ । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এমেরিটাস অধ্যাপক এবং লাহোরে জন্মগ্রহণকারী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ইশতিয়াক আহমেদের এই গ্রন্থটি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন, চিন্তার রূপান্তর এবং ভারত বিভাজনের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস নিয়ে লিখিত আধুনিক যুগের সবচেয়ে বিস্তারিত, দলিল-ভিত্তিক ও সমালোচনামূলক গবেষণা। বিশ শতকের দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে জিন্নাহর মতো বিতর্কিত ও প্রভাবশালী চরিত্র দ্বিতীয়টি নেই। একদল ঐতিহাসিকের কাছে তিনি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ‘পবিত্র স্রষ্টা’ ও অপাপবিদ্ধ কায়দে আজম; অন্য দলের কাছে তিনি ভারত বিভাগের প্রধান খলনায়ক এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানির জন্য দায়ী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির রূপকার। অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমেদ এই দুটি অতি-সরলীকৃত রাজনৈতিক ধারণাকে ভেঙে ফেলে একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি সূক্ষ্ম বাক, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং তাঁর কাজের সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ফলাফল বিশ্লেষণ করেছেন।

গ্রন্থটিতে জিন্নাহর বক্তৃতা, প্রাইভেট চিঠিপত্র, গোপন ব্রিটিশ আর্কাইভাল ফাইল, সমসাময়িক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের স্মারক এবং পত্রপত্রিকার খবর—অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ প্রাথমিক উৎস (Primary Sources) ব্যবহার করা হয়েছে। লেখক জিন্নাহর চার দশকের রাজনৈতিক যাত্রাকে চারটি সুনির্দিষ্ট পর্বে ভাগ করেছেন: উদারপন্থী ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম সম্প্রদায়বাদী, স্বাতন্ত্র্যবাদী মুসলিম জাতীয়তাবাদী এবং অবশেষে উদীয়মান পাকিস্তান রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতাধর গভর্নর জেনারেল। এটি কেবল জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবনী নয়; বরং ব্যক্তির ভূমিকা কীভাবে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয় এবং তার ফলশ্রুতিতে ভৌগোলিক রাজনীতির রূপান্তর ঘটে—তার এক গভীর তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদ।

 

জিন্নাহ - তাঁর সাফল্য, ব্যর্থতা এবং ইতিহাসে ভূমিকা

 

বইয়ের প্রাথমিক পরিচিতি
বইয়ের নাম: Jinnah: His Successes, Failures and Role in History
লেখক: অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমেদ
প্রকাশকাল: ২০২০ (পেনগুইন র‍্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া)
পৃষ্ঠা সংখ্যা: প্রায় ৮০০-৮৪০

Table of Contents

অধ্যায় ১: জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও তাত্ত্বিক কাঠামো (Jinnah’s Role in History: A Scheme of Analysis)

প্রথম অধ্যায়ে ইশতিয়াক আহমেদ গ্রন্থটির তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত বুনিয়াদ স্থাপন করেছেন। একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কতটা তার নিজস্ব ইচ্ছাধীন এবং কতটা তৎকালীন ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরিস্থিতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত—তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক ১৯ শতকের রুশ মার্কসবাদী তাত্ত্বিক জর্জি প্লেখানভের বিখ্যাত গ্রন্থ The Role of the Individual in History-এর সাহায্য নিয়েছেন। প্লেখানভের মতে, ইতিহাসে মহান ব্যক্তিদের স্থান তৈরি হয় তখন, যখন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতি নির্দিষ্ট ধরণের নেতৃত্বের আবির্ভাবের জন্য উর্বর জমি তৈরি করে। তবে সেই পরিস্থিতির ভেতর দাঁড়িয়ে ব্যক্তি নেতার কৌশলগত সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের চূড়ান্ত মোড় নির্ধারণ করে।

এই তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে লেখক কতগুলো গভীর কাউন্টারফ্যাকচুয়াল বা বিপরীতমুখী ঐতিহাসিক প্রশ্ন (Counterfactual Questions) উত্থাপন করেছেন। প্রথমত, সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যদি দৃঢ় ও কঠোরভাবে ভারত বিভাজনের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করত এবং কোনো অবস্থাতেই ভূখণ্ড খণ্ডন মানতে রাজি না হতো, তবে কি জিন্নাহর পক্ষে একক শক্তিতে পাকিস্তান তৈরি করা সম্ভব ছিল? দ্বিতীয়ত, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকশক্তি যদি নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কথা চিন্তা না করে অবিভক্ত ভারতের পক্ষে অবস্থান নিত এবং বিভাজনের কঠোর বিরোধিতা করত, তবে কি জিন্নাহ তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারতেন? তৃতীয়ত, ব্রিটিশ এবং কংগ্রেস যদি যৌথভাবে একটি একক যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতের পক্ষে অটল থাকত, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র কেমন হতে পারত?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের মধ্য দিয়ে ইশতিয়াক আহমেদ দেখিয়েছেন যে জিন্নাহ নিছক এক একক অদম্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, যার একক ইচ্ছায় একটি রাষ্ট্র তৈরি হয়ে গেছে; আবার তিনি কাঠামোগত পরিস্থিতির নিছক শিকারও ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন এক দূরদর্শী ও অত্যন্ত চতুর রাজনৈতিক দাবাড়ু, যিনি তৎকালীন প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ ভারতের কৌশলগত দুর্বলতা, কংগ্রেসের নীতিগত ভুল এবং মুসলমানদের মধ্যকার উদীয়মান পরিচয়-সংকটকে অসাধারণ দক্ষতায় নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন।

অধ্যায় ২ ও ৩: ভারতীয় জাতীয়তাবাদী জিন্নাহ ও কংগ্রেসে বিকাশ (Jinnah as an Indian Nationalist & Joining the Indian National Congress)

এই দুই অধ্যায়ে জিন্নাহর প্রারম্ভিক পারিবারিক জীবন, বোম্বেতে আইনজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল ধারায় যুক্ত হওয়ার ইতিহাস বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। গুজরাটি কাঠিয়াবাড়ি বংশোদ্ভূত আগাখানী ইসমাইলি শিয়া মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী জিন্নাহ ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক লিনকনস ইনে আইন শিক্ষা লাভের পর তিনি তৎকালীন বোম্বে শহরে আইন পেশায় যোগ দেন এবং খুব অল্প বয়সেই একজন অতি সফল ও ধনী ব্যারিস্টার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

১৯০৬ সালে কলকাতা অধিবেশনে দাদাভাই নওরোজির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়ে জিন্নাহ তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। এই পর্বে তিনি ছিলেন উগ্র সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনীতির ঘোর বিরোধী। ১৯০৫ সালের লর্ড কার্জনের বাংলা ভাগ (বঙ্গভঙ্গ)-এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, জিন্নাহ তার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজেছিলেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসক কর্তৃক ১৯০৯ সালের মার্লে-মিন্টো সংস্কারের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য চালু করা ‘পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী’ (Separate Electorates) ব্যবস্থারও তিনি শুরুতে বিরোধী ছিলেন, কারণ তিনি মনে করতেন ধর্মভিত্তিক নির্বাচন ভারতীয়দের রাজনৈতিক ঐক্যের পথে বড় বাধা।

১৯১৩ সালে তিনি সর্বভারতীয় মুসলিম লীগে যোগদান করেন, তবে একটি স্পষ্ট শর্ত যুক্ত করেছিলেন—মুসলিম লীগের সদস্যপদ কোনোভাবেই তাঁর ভারতীয় জাতীয়তাবাদী সত্তা ও কংগ্রেসের প্রতি আনুগত্যকে খর্ব করতে পারবে না। গোপাল কৃষ্ণ গোখলেকে জিন্নাহ তাঁর রাজনৈতিক গুরু মনে করতেন। এই পর্বের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক মাইলফলক ছিল ১৯১৬ সালের ‘লক্ষ্মৌ চুক্তি’ (Lucknow Pact)। জিন্নাহর নিরলস মধ্যস্থতায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ প্রথমবারের মতো এক যৌথ সাংবিধানিক দাবি তৈরিতে একমত হয়। কংগ্রেস পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর নীতি মেনে নেয়, আর লীগ ভারতের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে কংগ্রেসের সাথে হাত মেলায়। এই অভাবনীয় সাফল্যের জন্যই বিশিষ্ট লেখিকা ও রাজনীতিবিদ সরোজিনী নাইডু জিন্নাহকে ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রধান দূত’ (Ambassador of Hindu-Muslim Unity) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

অধ্যায় ৪ ও ৫: সংঘাত, কৌশলগত পরিবর্তন ও সম্প্রদায়বাদী রাজনীতি (Jinnah as a Muslim Communitarian & Communitarian Forays)

১৯২০-এর দশক থেকে জিন্নাহর রাজনীতিতে এক গভীর ফাটল ও রূপান্তর দেখা দেয়। ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন জোয়ার আনেন। গান্ধী খিলাফত আন্দোলনকে কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনের সাথে যুক্ত করেন এবং ভারতের রাজনীতিতে বিপুল গণমানুষ ও ধর্মীয় আবেগের সমাবেশ ঘটান। সুনির্দিষ্ট আইনগত, সাংবিধানিক ও এলিট-কেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী জিন্নাহ রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগ ও গণ-উত্তেজনার এই অনুপ্রবেশকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতেন। ১৯২০ সালের কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে তিনি প্রকাশ্যে গান্ধীর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং চরম অপমানিত বোধ করে কংগ্রেস ত্যাগ করেন।

কংগ্রেস ত্যাগের পর জিন্নাহ রাজনীতিতে কিছুটা একা হয়ে পড়েন, কিন্তু তিনি তাঁর আদর্শিক ধারা পরিবর্তন করেন। সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে সরে এসে তিনি নিজেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রধান সাংবিধানিক রক্ষক হিসেবে পুনর্গঠিত করতে শুরু করেন। এটিই তাঁর ‘মুসলিম সম্প্রদায়বাদী’ (Communitarian) পর্যায়। এই সময়ে তিনি মুসলমানদের সংখ্যালঘু হওয়ার ভয় দূর করার জন্য নানা সাংবিধানিক গ্যারান্টি দাবি করেন।

১৯২৮ সালে পন্ডিত মতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে প্রণীত ‘নেহরু রিপোর্ট’ এই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করে। নেহরু রিপোর্টে মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী বাতিল করে একটি শক্তিশালী একক কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাব করা হয়, যেখানে মুসলিমদের জন্য বিশেষ স্বায়ত্তশাসন বা সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। জিন্নাহ এই রিপোর্টের সংশোধনী দাবি করেন, কিন্তু কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করে। এর জবাবে ১৯২৯ সালে জিন্নাহ তাঁর বিখ্যাত ‘১৪ দফা দাবি’ (Fourteen Points) পেশ করেন, যেখানে একটি দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার এবং শক্তিশালী প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর জোর দেওয়া হয়। এই ঘটনাকে জিন্নাহ নিজে ভারতের মূলধারার রাজনীতির সাথে তাঁর ‘পথ আলাদা হয়ে যাওয়ার সূচনা’ (Parting of the Ways) হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ১৯৩০-৩২ সালের লন্ডনে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকগুলোতে জিন্নাহ উভয় সম্প্রদায়ের চরমপন্থার কারণে হতাশ হন এবং কিছুদিন রাজনীতি থেকে দূরে গিয়ে লন্ডনে আইন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

অধ্যায় ৬, ৭ ও ৮: দ্বিজাতি তত্ত্বের উদ্ভব, কংগ্রেস মন্ত্রিসভার ভুল ও বিভাজনের রাজনীতি (The Two-Nation Theory, Congress Ministries & Politics of Polarization)

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পাস হওয়ার পর ১৯৩৭ সালে ভারতে প্রথমবারের মতো প্রদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে কংগ্রেস নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে এবং প্রধান প্রধান প্রদেশগুলোতে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে মুসলিম লীগ দুর্বল পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে। কিন্তু নির্বাচনের পর, বিশেষ করে যুক্তপ্রদেশে (United Provinces), কংগ্রেস মুসলিম লীগের সাথে জোট সরকার গঠন করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং শর্ত দেয় যে লীগ নেতাদের ব্যক্তিগতভাবে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে সরকারে আসতে হবে।

ইশতিয়াক আহমেদ দেখিয়েছেন যে ১৯৩৭ সালের কংগ্রেসের এই রাজনৈতিক অহংকার ও এককিপোস্ট নীতি জিন্নাহকে পুরোপুরি উগ্র মুসলিম জাতীয়তাবাদের দিকে ঠেলে দেয়। জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ দাবি করতে শুরু করে যে কংগ্রেস কেবল একটি হিন্দু সংগঠন, যারা কোনোভাবেই মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। লীগ পীরপুর রিপোর্ট এবং ওয়ার্ধা শিক্ষা পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলোকে সামনে এনে প্রচার করতে থাকে যে কংগ্রেসের অধীনে মুসলিম সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভাষা হুমকির মুখে।

এই পটভূমিতেই জিন্নাহ তাঁর ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ (Two-Nation Theory) নিপুণভাবে সাজান। তিনি ঘোষণা করেন, হিন্দু ও মুসলমান কেবল দুটি পৃথক ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়; তারা দুটি ভিন্ন সভ্যতা, সাংস্কৃতিক সত্তা ও পৃথক জাতি। তাই ভারতের জাতীয় সং সংজ্ঞাকে পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে তাদের আলাদা সার্বভৌম ভূখণ্ড দিতে হবে।

এখানেই ইশতিয়াক আহমেদ বিখ্যাত ক্যামব্রিজ বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি ঐতিহাসিক আয়েশা জালালের ‘দরকষাকষির কৌশল’ (Bargaining Chip) তত্ত্বকে চরমভাবে খণ্ডন করেছেন। আয়েশা জালাল তাঁর The Sole Spokesman গ্রন্থে দাবি করেছিলেন যে জিন্নাহ কখনো সত্যি সত্যি ভারত ভাগ বা বিচ্ছিন্ন পাকিস্তান চাননি; তিনি কেবল যুক্ত ভারতের ভেতরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও কেন্দ্রীয় সরকারে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য ‘পাকিস্তান’ শব্দটিকে দরকষাকষির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমেদ জিন্নাহর ১৯৩৭ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যকার অজস্র ব্যক্তিগত চিঠি, ভাষণ, খবরের কাগজের বিবৃতি এবং সহকর্মীদের সাথে কথোপকথন উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেছেন যে আয়েশা জালালের এই দাবি ঐতিহাসিক সত্যের পরিপন্থী। ইশতিয়াক দেখান, ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিক থেকেই জিন্নাহ মনেপ্রাণে এবং কৌশলগতভাবে একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই কাজ করছিলেন।

অধ্যায় ৯, ১০ ও ১১: গতি সঞ্চার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচন (Building Momentum, Quit India Movement & Relentless Campaign)

১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোর অধিবেশনে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে তথাকথিত ‘লাহোর প্রস্তাব’ (যা পরে পাকিস্তান প্রস্তাব হিসেবে পরিচিত হয়) গ্রহণ করে। এতে বলা হয়, ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States) গঠন করতে হবে। যদিও শব্দচয়ন নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা ছিল, জিন্নাহ এটিকে একটি একক ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্র অর্জনের মেনিফেস্টো হিসেবে উপস্থাপন করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) শুরু হলে ভারতের রাজনীতির সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়। কংগ্রেস ব্রিটিশদের যুদ্ধপ্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়’ (Quit India Movement) আন্দোলন শুরু করে। এর ফলে ব্রিটিশ সরকার মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরুসহ প্রায় সমস্ত শীর্ষ কংগ্রেস নেতৃত্বকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করে। জিন্নাহ এই সুবর্ণ সুযোগকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেন। তিনি ব্রিটিশদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন এবং কংগ্রেস নেতাদের অনুপস্থিতিতে পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেঙ্গল এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে মুসলিম লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি অভূতপূর্বভাবে প্রসারিত করেন।

১৯৪৫-৪৬ সালের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন ছিল জিন্নাহর জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাজি। তিনি এই নির্বাচনকে দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং ‘পাকিস্তান’ দাবির ওপর গণভোট হিসেবে ঘোষণা করেন। মুসলিম লীগের প্রার্থীরা মসজিদ, মাজার এবং ধর্মীয় উন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে প্রচার চালান যে “পাকিস্তান না চাওয়া মানে ইসলামের বিরোধিতা করা”। নির্বাচনের ফলাফল ছিল বিস্ময়কর—মুসলিম লীগ ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভায় সমস্ত মুসলিম সংরক্ষিত আসন (১০০%) জিতেছিল এবং প্রাদেশিক পরিষদগুলোতেও মুসলিম আসনের প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি দখল করেছিল। এই অভূতপূর্ব বিজয়ের মাধ্যমে জিন্নাহ ব্রিটিশ ও কংগ্রেস উভয়ের কাছেই মুসলমানদের একমাত্র ও একচ্ছত্র মুখপাত্র হিসেবে নিজের অবস্থান চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

অধ্যায় ১২, ১৩ ও ১৪: ক্যাবিনেট মিশন, রক্তক্ষয়ী ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ ও বিভাজনের সিদ্ধান্ত (The Cabinet Mission Plan & The Decision to Partition India)

১৯৪৬ সালের শুরুতে ব্রিটিশ সরকার ভারতে একটি ঐক্যবদ্ধ সমাধান খোঁজার শেষ চেষ্টা হিসেবে ‘ক্যাবিনেট মিশন’ পাঠায়। ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানে ভারতকে তিনটি আলাদা ‘গ্রুপ’ বা গুচ্ছপ্রদেশে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল (গ্রুপ এ: হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল, গ্রুপ বি: উত্তর-পশ্চিম মুসলিম অঞ্চল, এবং গ্রুপ সি: উত্তর-পূর্ব মুসলিম অঞ্চল)। এটি ছিল একটি অত্যন্ত জটিল তিন-স্তরবিশিষ্ট যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, যেখানে কেন্দ্র দুর্বল থাকবে এবং প্রদেশগুলো দশ বছর পর গ্রুপ থেকে বের হয়ে যাওয়ার অধিকার পাবে।

জিন্নাহ কৌশলগতভাবে এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন, কারণ তিনি বুঝেছিলেন এর মাধ্যমে বাস্তবে অঘোষিত ‘পাকিস্তান’ অর্জিত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জওহরলাল নেহরু এক সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করে বসেন যে কংগ্রেস ক্যাবিনেট মিশনের কোনো শর্ত মেনে চলতে বাধ্য নয় এবং তারা গণপরিষদে গিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন আনবে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জিন্নাহ ক্যাবিনেট মিশনের সম্মতি প্রত্যাহার করেন এবং ১৬ আগস্ট ১৯৪৬-এ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ আহ্বান করেন।

ইশতিয়াক আহমেদ এই অধ্যায়ে গভীর বিশদে দেখিয়েছেন যে কীভাবে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষণার ফলে বাংলায় সোহরাওয়ার্দীর লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিথিলতার কারণে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ বা নোয়াখালী ও বিহারে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। দাঙ্গা ও হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ভারতের রাজনীতিতে এমন এক গভীর সাম্প্রদায়িক বিষের জন্ম দেয়, যার ফলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আর কোনো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সম্ভাবনা অবশিষ্ট থাকে না। ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ (প্যাটেল ও নেহরু) বুঝে যান যে গৃহযুদ্ধ এড়ানোর একমাত্র পথ হলো বিভাজন। অবশেষে ১৯৪৭ সালের ৩ জুন মাউন্টব্যাটেন ভারত ও পাঞ্জাব-বেঙ্গল ভাগের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।

অধ্যায় ১৫ থেকে ১৯: সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপ্রধান, ঐতিহাসিক বৈপরীত্য ও পাকিস্তানের সংকট (Jinnah as State Head, 11th August Speech & Politics of Crisis)

৪৭-এর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পর জিন্নাহ নবগঠিত রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একই সাথে রাষ্ট্রের প্রধান, আইনসভার স্পিকার এবং মুসলিম লীগের সুপ্রিম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। শাসনব্যবস্থার সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করে তিনি প্রায় এক স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন।

১৫ থেকে ১৯ অধ্যায়ে লেখক জিন্নাহর সংক্ষিপ্ত রাষ্ট্র পরিচালনা ও তাঁর ধারণাগত বৈপরীত্যগুলো তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি হলো ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট পাকিস্তানের গণপরিষদে দেওয়া জিন্নাহর বিখ্যাত ভাষণ। সেখানে জিন্নাহ বলেছিলেন:
“আপনারা স্বাধীন; আপনারা আপনাদের মন্দিরে যেতে পারেন, আপনাদের মসজিদে যেতে পারেন বা এই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্য যেকোনো উপাসনালয়ে যেতে পারেন। রাজনীতির সাথে আপনার ধর্ম, বর্ণ বা বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই… সময়ের সাথে সাথে হিন্দুরা আর হিন্দু থাকবে না, মুসলিমরা আর মুসলিম থাকবে না—ধর্মীয় অর্থে নয়, কারণ তা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার, বরং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক অর্থে।”

ইশতিয়াক আহমেদ এই ভাষণটিকে গভীর রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যে নেতা গত ১০ বছর ধরে কোটি কোটি মানুষকে শিখিয়েছেন যে হিন্দু ও মুসলিম দুটি আলাদা জাতি এবং তারা কখনো এক রাষ্ট্রে সমান নাগরিক হিসেবে বাস করতে পারে না—তিনি রাষ্ট্র অর্জনের তিন দিন আগে কীভাবে দাবি করেন যে এক রাষ্ট্রে তারা সব বিভেদ ভুলে ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক হয়ে যাবে? লেখক দেখান যে জিন্নাহর এই হঠাৎ ধর্মনিরপেক্ষ বার্তা তাঁর আগের দ্বিজাতি তত্ত্বের সাথে চরমভাবে সাংঘর্ষিক ছিল। তিনি যে ধর্মীয় জিনকে বোতল থেকে বের করেছিলেন, রাষ্ট্র অর্জনের পর এই একটি প্রগতিশীল ভাষণ দিয়ে তাকে আর বোতলে বন্দি করা সম্ভব হয়নি।

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জিন্নাহ বেশ কিছু বিপজ্জনক শাসনতান্ত্রিক নজির স্থাপন করেছিলেন:
  • প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন দমন: ১৯৪৭ সালের আগস্টেই তিনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের নির্বাচিত ড. খান সাহেবের ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সরকারকে অগণতান্ত্রিকভাবে বরখাস্ত করেন।
  • কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অতি-ব্যবহার: সিন্ধু ও পাঞ্জাবের রাজনৈতিক কোন্দল মেটাতে গিয়ে তিনি কেন্দ্রীয় শাসন জারি করেন এবং আমলাতন্ত্রনির্ভর রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে পাকিস্তানে দীর্ঘ সামরিক শাসনের পথ সুগম করেছিল।
  • উর্দু ভাষানীতি ও পূর্ব বাংলার বিচ্ছিন্নতা: ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকা সফরে এসে কার্জন হলে জিন্নাহ অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর কণ্ঠে ঘোষণা করেন— “উর্দুই হবে, এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের ভাষা বাংলাকে অস্বীকার করে চাপিয়ে দেওয়া এই নীতি সম্পর্কে ইশতিয়াক আহমেদ লিখেছেন, জিন্নাহ অজান্তেই ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তান ধ্বংসের বীজ রোপণ করে দিয়েছিলেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের মাধ্যমে।
জিন্নাহর শারীরিক অসুস্থতা, ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু এবং পরবর্তীতে লিয়াকত আলী খানের আমলে ১৯৪৯ সালে ‘অবজেক্টিভস রেজোলিউশন’ (Objectives Resolution)-এর মাধ্যমে কীভাবে পাকিস্তানকে একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়—তার বর্ণনার মধ্য দিয়ে লেখক এই পর্বের সমাপ্তি টেনেছেন।

বইটির মূল সংক্ষেপ ও সমালোচনামূলক শেষ মূল্যায়ন

অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমেদের Jinnah: His Successes, Failures and Role in History গ্রন্থটি আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস চর্চায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বইটির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এটি কোনো সস্তা রাজনৈতিক আবেগ, জাতীয়তাবাদী প্রোপাগান্ডা বা ব্যক্তি পূজার দ্বারা প্রভাবিত নয়।

লেখক অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণতার সাথে জিন্নাহর সাফল্য ও ব্যর্থতাকে চিহ্নিত করেছেন:
জিন্নাহর ঐতিহাসিক সাফল্য:

তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক গণনাকৌশলী ছিলেন। কোনো সেনাবাহিনী না থাকা সত্ত্বেও, কোনো বড় ধরনের সশস্ত্র বিপ্লব না করে, কেবল সাংবিধানিক আইন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, অনমনীয় অবস্থান এবং বক্তৃতা-কৌশল ব্যবহার করে তিনি বিশ্ব মানচিত্রে ‘পাকিস্তান’ নামক একটি সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পেরেছিলেন। এটি নেতার ব্যক্তিত্বের দিক থেকে এক অভূতপূর্ব অর্জন।

জিন্নাহর ঐতিহাসিক ব্যর্থতা:

১. মথ-ইটেন পাকিস্তান ও বাস্তুচ্যুত মানুষ: জিন্নাহ একটি বিশাল ‘পূর্ণাঙ্গ’ পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পেয়েছিলেন এক ‘ক্ষতবিক্ষত ও খণ্ডবিখণ্ড’ পাকিস্তান। আর এই বিভাজনের মূল্য হিসেবে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ মানুষ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছিল এবং দেড় কোটিরও বেশি মানুষ ভিটামাটিচ্যুত হয়েছিল।

২. সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা: ভারতে থেকে যাওয়া কোটি কোটি মুসলিমদের তিনি চিরতরে এক চরম নিরাপত্তাহীন ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে পরিণত করে রেখে গেছেন।

৩. পাকিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক পতন: পাকিস্তানের ভেতরের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জন্মলগ্ন থেকেই শক্তিশালী হতে না দিয়ে তিনি যে আমলাতন্ত্র, সামরিক প্রভাব এবং ভাষা-কেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় শাসনের ঐতিহ্য শুরু করেছিলেন—তা পরবর্তীতে পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রটির ভৌগোলিক অবলুপ্তি ঘটায়।

ইশতিয়াক আহমেদের স্বচ্ছ ও প্রামাণিক ভাষা, অজস্র দলিলের রেফারেন্স এবং নির্মোহ বিশ্লেষণ এই গ্রন্থটিকে জিন্নাহ, ভারত বিভাজন, দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক গতিপথ শেখার ও বোঝার জন্য একটি মাস্টারপিস এবং অবশ্য পাঠ্য আকর গ্রন্থে পরিণত করেছে।