বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের’ (Two-Nation Theory) ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। এই তত্ত্বের মূল ধারণা ছিল—দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচিতির ভিত্তিতে একটি পৃথক ও নিরাপদ ভূখণ্ড প্রদান করা। তবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাত দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশটির সামরিক-আমলাতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী (Military-Bureaucratic Establishment) নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ এবং একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখতে সবচেয়ে বেশি সামরিক অভিযান, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ চালিয়েছে স্বয়ং মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপরই।
পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ), বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া (FATA), জর্ডান এবং মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালিত বিভিন্ন সামরিক অভিযান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তান রাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের প্রধান শিকার হয়েছেন মুসলিম নাগরিকেরা। এই ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটগুলো বস্তুনিষ্ঠ উপাত্ত, আন্তর্জাতিক চুক্তি, গবেষণা নথি এবং মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনের আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
১. ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ গণহত্যা: পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক জান্তার অপরাধযজ্ঞ
১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানের সামরিক জান্তা কর্তৃক পরিচালিত হত্যাযজ্ঞ আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষার অজুহাতে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি মুসলিম ও অমুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর সর্বাত্মক সামরিক হামলা চালায়।
+-----------------------------------------------------------------------------------+
| ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পরিচালিত গণহত্যার পর্যায়ক্রম |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
| ১. অপারেশন সার্চলাইট (২৫ মার্চ ১৯৭১) --> ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ লাইনস ও গণহত্যা |
| ২. পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth) --> গ্রামীণ জনপদে অগ্নিসংযোগ, নির্বিচার হত্যা |
| ৩. বুদ্ধিজীবী নিধন ও টার্গেট কিলিং --> পেশাজীবী ও সংস্কৃতিজনদের পরিকল্পিত হত্যা |
| ৪. সহায়ক বাহিনীদের তণ্ডবলীলা --> রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের গণপীড়ন |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
‘অপারেশন সার্চলাইট’ ও প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার রূপরেখা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে এবং জেনারেল টিক্কা খানের প্রত্যক্ষ পরিকল্পনায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হয়। এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক শক্তিবলে বাঙালি জাতির রাজনৈতিক স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।
- প্রাথমিক আঘাতের কেন্দ্র: ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, জহুরুল হক হল (তৎকালীন ইকবাল হল), রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এবং পিলখানা ইআরপি (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সদর দপ্তরে ভারী অস্ত্র, ট্যাংক ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে হামলা চালানো হয়। কেবল প্রথম রাত্রেই হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়।
- পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ: ঢাকা শহর থেকে শুরু করে পরবর্তীতে দেশের প্রতিটি জেলা, মহকুমা, থানা এবং দূরবর্তী গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এই হত্যাকাণ্ড। হাট-বাজার, জনপদ এবং বসতবাড়িতে আগুন লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়।
বাঙালি মুসলিমদের ‘সাচ্চা মুসলমান’ না মনে করার মনস্তাত্ত্বিক বর্ণবাদ
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও জোয়ানদের মধ্যে বাঙালি মুসলিমদের সম্পর্কে একটি গভীর বর্ণবাদী ও সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়নের মনস্তত্ত্ব তৈরি করা হয়েছিল।
- সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়ন: পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক কাঠামো বাঙালি মুসলিমদের আচরণ, ভাষা ও সংস্কৃতিকে “হিন্দুপন্থী” বা “অসম্পূর্ণ ইসলাম” (Pseudo-Muslims) হিসেবে গণ্য করত।
- সামরিক মতাদর্শ: সেনা ছাউনিগুলোতে জোয়ানদের বোঝানো হয়েছিল যে, বাঙালিদের ‘সাচ্চা মুসলমান’ বানাতে হলে বা তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে কঠোর রক্তপাতের প্রয়োজন। এই চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাঙালি মুসলিমদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, নির্বিচার হত্যা এবং ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ চালোনো প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পায়।
নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা: একাডেমিক ও আইনি বিশ্লেষণ
- নিহতের সংখ্যা: বাংলাদেশ সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগীদের হাতে ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) মানুষ নিহত হন।
- আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসংখ্যান: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক আর. জে. রামেল (R.J. Rummel) তাঁর Death by Government গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালে পরিচালিত এই গণহত্যায় নিহত মানুষের সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখের মধ্যে।
- শারীরিক ও যৌন নির্যাতন: বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী The Lancet এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই লাখ থেকে চার লাখ বাঙালি নারী পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা পরিকল্পিত যৌন নির্যাতনের (Mass Rape/War Crime) শিকার হন। এই নির্যাতনের শিকারদের সিংহভাগই ছিলেন বাঙালি মুসলিম নারী।
- শরণার্থী সংকট: ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) মানুষ, যার একটি বিশাল অংশ ছিলেন ভিটেমাটি হারানো সাধারণ বাঙালি মুসলিম কৃষক ও শ্রমিক।
সহযোগী বাহিনীর গঠন: রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে উগ্র ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তায় প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠন করে:
- রাজাকার: সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও গ্রামগঞ্জে তল্লাশি অভিযানের নামে নির্বিচার হত্যা ও লুণ্ঠনে লিপ্ত ছিল।
- আল-বদর ও আল-শামস: প্রধানত ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনীগুলো বুদ্ধিজীবী হত্যা, টার্গেট কিলিং এবং বিশেষ অপারেশনে অত্যন্ত হিংস্র ভূমিকা পালন করে। ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এই পরিকল্পনারই চরম বহিঃপ্রকাশ।
২. বেলুচিস্তান সংঘাত: সাত দশকের সামরিক অভিযান ও ‘কিল অ্যান্ড ডাম্প’ নীতি
১৯৪৮ সালে তৎকালীন স্বাধীন কালত রাজ্যকে (State of Kalat) জোড়পূর্বক পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রদেশ বেলুচিস্তানে সামরিক বাহিনীর অত্যাচার অব্যাহত রয়েছে। বেলুচ জনগোষ্ঠীর প্রায় শতভাগই মুসলিম হলেও কেবল নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন, সম্পদের অধিকার এবং জাতিগত মর্যাদার দাবির কারণে তাদের ওপর দীর্ঘ সাত দশক ধরে সামরিক নিপীড়ন পরিচালিত হচ্ছে।
+-----------------------------------------------------------------------------------+
| বেলুচিস্তানে প্রধান পাঁচটি সামরিক অভিযানের সময়কাল |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
| • প্রথম পর্যায় (১৯৪৮) --> প্রিন্স করিম খানের বিদ্রোহ দমন ও কালত দখল |
| • দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৫৮) --> নওরোজ খানের নেতৃত্বে প্রতিরোধ ও সেনা অভিযান |
| • তৃতীয় পর্যায় (১৯৬৩-৬৯) --> শের মোহাম্মদ মারির গেরিলা দমন অভিযান |
| • চতুর্থ পর্যায় (১৯৭৩-৭৭) --> জুলফিকার আলী ভুট্টোর আমলে সর্বাত্মক সেনা হামলা |
| • পঞ্চম পর্যায় (২০০৫-বর্তমান)--> নওয়াব আকবর বুগতি হত্যা ও গুমের রাজনীতি |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
জোরপূর্বক অন্তর্ধান (Enforced Disappearances) ও রাষ্ট্রীয় ‘কিল অ্যান্ড ডাম্প’ নীতি
২০০০-এর দশকের পর থেকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের শাসনামলে বেলুচিস্তানে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা (ISI, MI) এবং ফ্রন্টিয়ার কোর (FC) এক নতুন ধরনের দমননীতি চালু করে, যা বিশ্বজুড়ে ‘কিল অ্যান্ড ডাম্প’ (Kill and Dump) নামে পরিচিত।
- গুম করার পদ্ধতি: বেলুচ জাতীয়তাবাদী কর্মী, কবি, ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের দিনের আলোতে বা গভীর রাতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের কোনো আদালতের মুখোমুখি করা হয় না বা নিখোঁজ হিসেবেও স্বীকার করা হয় না।
- লাশ উদ্ধার: তুলে নিয়ে যাওয়ার কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর তাদের নির্যাতন-বিক্ষত লাশ বেলুচিস্তানের জনমানবহীন মরুভূমি, পার্বত্য অঞ্চল বা খাদের মধ্যে ফেলে রাখা অবস্থায় পাওয়া যায়। বেশিরভাগ লাশের মাথায় গুলির চিহ্ন এবং শরীরে চরম নির্যাতনের আলামত থাকে।
প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান
- ভয়েস ফর বেলুচ মিসিং পারসন্স (VBMP): বেলুচ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, বিগত দুই দশকে ৪৫,০০০-এরও বেশি বেলুচ নাগরিককে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে এবং ৫,০০০-এর বেশি মানুষের গুলিবিদ্ধ ও বিকৃত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
- সামগ্রিক হতাহত: সংঘাতের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সেনা অভিযান, বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং রকেট হামলায় আনুমানিক ৩ লাখের বেশি বেলুচ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন বা গৃহহীন হয়েছেন।
- আকাশপথে হামলা: ১৯৭৪ সালে এবং পরবর্তীকালে ২০০৬ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনী বেলুচ অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলে এফ-১৬ এবং যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করে, যাতে বহু নারী ও শিশু নিহত হয়।
৩. ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ (১৯৭০): জর্ডানে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের ওপর পাকিস্তানের সামরিক অভিযান
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে নিজ দেশে গণহত্যা চালানোর ঠিক এক বছর আগে, ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিদেশের মাটিতে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের ওপর এক নির্মম হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেছিল, যা ইতিহাসে ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ (Black September) নামে পরিচিত।
[১৯৭০: জর্ডানে রাজনৈতিক সংকট (PLO বনাম কিং হুসেইন)]
│
▼
[পাকিস্তান সামরিক প্রতিনিধি দলের প্রধান: ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল হক]
│
▼
[জর্ডানের ২য় ডিভিশনের কমান্ড গ্রহণ ও সামরিক অভিযান]
│
▼
[১০,০০০ - ২৫,০০০ ফিলিস্তিনি মুসলিম নিহত ও রিফিউজি ক্যাম্প ধ্বংস]
ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল হকের নেতৃত্ব ও সামরিক তৎপরতা
১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে জর্ডানে আশ্রিত ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন ‘প্যালেনস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন’ (PLO) এবং জর্ডানের বাদশাহ হোসেনের রাজকীয় বাহিনীর মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাত তৈরি হয়। সে সময় জর্ডানি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য সেখানে অবস্থান করছিল পাকিস্তানের এক বিশেষ সামরিক মিশন।
- কমান্ড গ্রহণ: জর্ডানের বাদশাহ হোসেনের অনুরোধে তৎকালীন পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার (পরবর্তীতে জেনারেল ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট) মুহাম্মদ জিয়াউল হক জর্ডানের সেনাবাহিনীর ২য় ডিভিশনের সরাসরি কমান্ড গ্রহণ করেন।
- ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা: ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল হক জর্ডানি সাঁজোয়া যান, ভারী আর্টিলারি ও ট্যাংক নিয়ে আম্মানসহ বিভিন্ন শহরে অবস্থিত ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোতে (যেমন: ওয়াহদাত ও আল-হুসেইন রিফিউজি ক্যাম্প) সর্বাত্মক সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করেন।
হতাহতের সংখ্যা ও ফিলিস্তিনি দৃষ্টিভঙ্গি
- ইয়াসির আরাফাতের বক্তব্য: পিএলও-র তৎকালীন প্রধান প্রধান ইয়াসির আরাফাত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মাত্র ১০ দিনের এই অভিযানে ১০,০০০ থেকে ২৫,০০০ ফিলিস্তিনি নাগরিককে হত্যা করা হয়। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ ফিলিস্তিনি মুসলিম পুরুষ, নারী ও শিশু।
- মোশে দায়ানের ঐতিহাসিক মন্তব্য: এই ঘটনার নির্মমতা দেখে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে দায়ান (Moshe Dayan) একটি ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন:
“বাদশাহ হুসেইন ও পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল হক মিলে মাত্র ১০ দিনে যত ফিলিস্তিনি হত্যা করেছে, ইসরায়েল গত ২০ বছরেও তত ফিলিস্তিনি হত্যা করতে পারেনি।”
৪. খাইবার পাখতুনখাওয়া ও এফএটিএ (FATA): পশতুন মুসলিমদের ওপর অভ্যন্তরীণ অভিযান
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলার পর তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ (War on Terror)-এর প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ শুরু করে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী। পাকিস্তানের উপজাতীয় এলাকা (Federally Administered Tribal Areas – FATA) এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নিজস্ব পশতুন মুসলিম নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় একাধিক বৃহৎ সামরিক অভিযান।
+-----------------------------------------------------------------------------------+
| এফএটিএ (FATA) অঞ্চলে প্রধান সামরিক অভিযানসমূহ |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
| ১. অপারেশন আল-মিজান (২০০২-২০০৬) --> দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে প্রাথমিক প্রবেশ |
| ২. অপারেশন রাহ-ই-রাস্ত (২০০৯) --> সোয়াত উপত্যকা থেকে লক্ষাধিক নাগরিক বাস্তুচ্যুত |
| ৩. অপারেশন রাহ-ই-নিজাত (২০০৯) --> দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে ভারী বিমান হামলা |
| ৪. অপারেশন জার্ব-ই-আজব (২০১৪) --> উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সর্বাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
ধ্বংসাত্মক সামরিক পদ্ধতি ও সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি
- বিমান হামলা ও কামান ব্যবহার: তালিবান বা উগ্রপন্থীদের দমনের নামে পাকিস্তান বিমানবাহিনী (PAF) নিয়মিত উপজাতীয় এলাকাগুলোর গ্রাম ও বাজারে ভারী বোমা এবং সাঁজোয়া গানশিপ হেলিকপ্টার ব্যবহার করে। এতে হাজার হাজার সাধারণ পশতুন পরিবার ধসে পড়া মাটির ঘরের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারায়।
- বাস্তুচ্যুতি (IDP Crisis): কেবল ২০০৯ সালের ‘অপারেশন রাহ-ই-রাস্ত’ (সোয়াত উপত্যকা) এবং ২০১৪ সালের ‘অপারেশন জার্ব-ই-আজব’ (উত্তর ওয়াজিরিস্তান)-এর কারণে ৩০ লাখেরও বেশি পশতুন মুসলিম নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির ঘটনা।
- পশতুন তাহাফুজ মুভমেন্ট (PTM): মনজুর পশতিন -এর নেতৃত্বে গঠিত ‘পশতুন তাহাফুজ মুভমেন্ট’ (PTM) অভিযোগ করেছে যে, সামরিক অভিযানের নামে হাজার হাজার পশতুন তরুণকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে এবং তাদের কৃষিজমিতে পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনে প্রতিদিন শিশুরা পঙ্গু হচ্ছে।
৫. প্রাতিষ্ঠানিক সাম্প্রদায়িকতা: শিয়া, হাজারা ও আহমদীয়া মুসলিম নিপীড়ন
+-----------------------------------------------------------------------------------+
| সাম্প্রদায়িক চরমপন্থা ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার সম্প্রদায় |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
| • আহমদীয়া সম্প্রদায় --> আইন করে অমুসলিম ঘোষণা, উপাসনালয় ভাঙচুর ও হত্যা |
| • শিয়া মুসলিম --> মসজিদ ও মিছিলে আত্মঘাতী হামলা, টার্গেট কিলিং |
| • হাজারা শিয়া --> কোয়েটায় জাতিগত নিধন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
আহমদীয়া সম্প্রদায়ের ওপর সাংবিধানিক ও আইনি নিপীড়ন
- ১৯৫৩ সালের লাহোর দাঙ্গা: আহমদীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে লাহোরে উগ্রপন্থীরা ব্যাপক সহিংসতা চালায়। পরবর্তীতে বিচারপতি মুনীর কমিশনের রিপোর্টে রাষ্ট্র ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর এই মারমুখী রূপ উন্মোচিত হয়।
- দ্বিতীয় সাংবিধানিক সংশোধনী (১৯৭৪): তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের সংবিধানে সংশোধন এনে আনুষ্ঠানিকভাবে আহমদীয়া সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করেন।
- অধ্যাদেশ ২০ (Ordinance XX – ১৯৮৪): জেনারেল জিয়াউল হক প্রণীত এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে আহমদীদের নিজেদের ‘মুসলিম’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া, আজান দেওয়া, বা তাদের উপাসনালয়কে ‘মসজিদ’ বলাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আইনত এই নিষেধাজ্ঞার কারণে বিগত কয়েক দশকে শত শত আহমদী মুসলিম উগ্রপন্থীদের হাতে নিহত হয়েছেন এবং তাদের মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে।
শিয়া ও হাজারা মুসলিমদের পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ
- টার্গেট কিলিং ও সুন্নি মিলিশিয়া: পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কর্তৃক পৃষ্ঠপোষিত চরমপন্থী গোষ্ঠী যেমন—লস্কর-ই-ঝংভি (LeJ), সিপাহ-ই-সাহাবা পাকিস্তান (SSP) এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP) ধারাবাহিকভাবে শিয়া মুসলিমদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
- হাজারা গণহত্যা (কোয়েটা): বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটায় বসবাসকারী মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীর শিয়া হাজারা সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত নিধনের শিকার। বিগত দুই দশকে বাজার, আশুরা মিছিল এবং শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২০০০-এর বেশি হাজারা শিয়া প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের নিরাপত্তার বদলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
৬. সিন্ধু প্রদেশ ও করাচির রাজনীতি: ‘অপারেশন ক্লিন-আপ’
১৯৯০-এর দশকে পাকিস্তানের বাণিজ্যিক রাজধানী করাচি এবং সিন্ধু প্রদেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী দিয়ে রক্তক্ষয়ী অভিযান চালানো হয়।
- অপারেশন ক্লিন-আপ (১৯৯২): তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান আসিফ নওয়াজের আমলে করাচিতে ‘মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট’ (MQM) এবং মোহাজের (ভারত থেকে আগত মুসলিম অভিবাসী) রাজনৈতিক কর্মীদের দমনে সেনাবাহিনী ও রেঞ্জার্স পাঠায়।
- বিচারবহির্ভূত হত্যা: এই অপারেশনের নামে হাজার হাজার মোহাজের তরুণকে গ্রেফতারের পর ‘ভুয়া এনকাউন্টারে’ হত্যা করা হয়। মোহাজেরদের পাশাপাশি সিন্ধি জাতীয়তাবাদীদের ওপরও সামরিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। এতে কেবল করাচি শহরের রাস্তায় কয়েক হাজার মুসলিম নাগরিক প্রাণ হারান।
৭. আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপ ও প্রক্সি যুদ্ধের প্রভাব
পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনা তাদের ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ (Strategic Depth) বা কৌশলগত গভীরতা নীতির অংশ হিসেবে দীর্ঘ চার দশক ধরে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে আসছে।
- আফগান-সোভেত যুদ্ধ ও মুজাহিদিন সৃষ্টি: ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন অর্থায়ন ও সিআইএ-র সহযোগিতায় পাকিস্তানের আইএসআই (ISI) পাকিস্তানের মাটিতে হাজার হাজার মাদ্রাসা ব্যবহার করে কট্টরপন্থী মুজাহিদিন তৈরি করে।
- তালিবানের উত্থান ও আফগান গৃহযুদ্ধ: ১৯৯০-এর দশকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ কারিগরি ও সামরিক সহায়তায় আফগানিস্তানে তালিবান গোষ্ঠী ক্ষমতা দখল করে। এর ফলে পরবর্তী তিন দশকে আফগান অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, মার্কিন বোমাবর্ষণ এবং সন্ত্রাসী হামলায় আনুমানিক ৩ থেকে ৫ লাখ আফগান মুসলিম নাগরিক মৃত্যুমুখে পতিত হন।
৮. বিভিন্ন অভিযানে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে নিহত মুসলিমদের তুলনামূলক উপাত্ত
নিচে পাকিস্তান রাষ্ট্র, তার সামরিক বাহিনী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষিত ছায়া গোষ্ঠীগুলোর (Proxies) হাতে নিহত মুসলিম জনগোষ্ঠীর এলাকাভিত্তিক একটি ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান প্রদান করা হলো:
| অঞ্চল / ঘটনা | সময়কাল | প্রধান টার্গেট জনগোষ্ঠী | নিহতের আনুমানিক সংখ্যা | ব্যবহৃত পদ্ধতি / কৌশল |
| বাংলাদেশ গণহত্যা | ১৯৭১ (৯ মাস) | বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু জনগোষ্ঠী | ১৫ লাখ – ৩০ লাখ | অপারেশন সার্চলাইট, নির্বিচার গুলি, আগুন, ধর্ষণ ও হত্যা |
| বেলুচিস্তান সংঘাত | ১৯৪৮ – বর্তমান | বেলুচ মুসলিম নাগরিক | ৩,০০,০০০+ (গুম ও হত্যা) | ড্রোন হামলা, ‘কিল অ্যান্ড ডাম্প’ ও এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স |
| ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর (জর্ডান) | ১৯৭০ (সেপ্টেম্বর) | ফিলিস্তিনি রিফিউজি ও নাগরিক | ১০,০০০ – ২৫,০০০ | ট্যাংক ও আর্টিলারি দিয়ে রিফিউজি ক্যাম্প ধ্বংস করা |
| এফএটিএ ও সোয়াত অঞ্চল | ২০০১ – বর্তমান | পশতুন মুসলিম উপজাতি | ৫০,০০০ – ৮০,০০০ | বিমান হামলা, ভারী গানশিপ, অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি |
| শিয়া ও হাজারা নিধন | ১৯৮৮ – বর্তমান | শিয়া ও হাজারা মুসলিম | ২০,০০০+ | আত্মঘাতী বোমা হামলা, টার্গেট কিলিং, ড্রাইভ-বাই শুটিং |
| করাচি (অপারেশন ক্লিন-আপ) | ১৯৯২ – ১৯৯৪ | মোহাজের ও সিন্ধি মুসলিম | ৫,০০০+ | বিচারবহির্ভূত হত্যা (Extrajudicial Killings) ও কাস্টোডিয়াল ডেথ |
