ওরাটোরিও | কণ্ঠ ও কোরাল সঙ্গীত । পশ্চিমা বা পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সংগীতের (Western Classical Music) বিশাল ও গভীর ক্যানভাসে ‘ওরাটোরিও’ (Oratorio) হলো অপেরার নাটকীয়তা এবং আধ্যাত্মিক ভাবাবেগের এক অপূর্ব ও মহিমান্বিত মেলবন্ধন। যেখানে অপেরা রঙ-বেরঙের পোশাক, চোখধাঁাধানো রূপসজ্জা, মঞ্চসজ্জা ও শারীরিক অভিনয়ের মাধ্যমে থিয়েটারের ব্যাকরণকে ফুটিয়ে তোলে, সেখানে ওরাটোরিও কোনো অভিনয়, কস্টিউম বা দৃশ্যমান মঞ্চসজ্জা ছাড়াই কেবল ঐশ্বরিক কণ্ঠসংগীত, বিশাল বৃন্দগান (Chorus) ও পূর্ণাঙ্গ অর্কেস্ট্রার যৌথ শক্তিতে মানবাত্মার গভীরতম বিশ্বাস, সংগ্রাম ও ধর্মীয় ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলে।

ইতালীয় শব্দ ‘ওরাটোরিও’ (যার আক্ষরিক অর্থ ‘প্রার্থনা কক্ষ’ বা ‘প্রার্থনামণ্ডপ’) থেকে উদ্ভূত এই ধারাটি সপ্তদশ শতকের ক্যাথলিক চার্চের ভেতরের প্রার্থনাসভা থেকে জন্ম নিয়ে পরবর্তীতে বিশ্বসংগীতের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মে পরিণত হয়। সংগীততাত্ত্বিকদের মতে, ওরাটোরিও হলো এমন এক “দৃশ্যায়নহীন থিয়েটার” (Un-staged Drama), যেখানে চরিত্রগুলোর অভিনয় ঘটে শ্রোতার নিজস্ব কল্পনার ক্যানভাসে। জর্জ ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেলের Messiah, সেবাস্টিয়ান বাখের St. Matthew Passion এবং জোসেফ হাইডনের The Creation-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টিগুলোর মাধ্যমে ওরাটোরিও কেবল খ্রিষ্টীয় ভক্তিগীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা মানব সভ্যতার সর্বজনীন নৈতিকতা, আধ্যাত্মিক রূপান্তর ও ঐক্যের সংগীতে রূপান্তরিত হয়েছে।

Table of Contents

একনজরে: ওরাটোরিওর সার্বিক রূপরেখা

মূল বিষয়বিস্তারিত তথ্য
সংজ্ঞা ও শব্দউৎপত্তিইতালীয় Oratorio (প্রার্থনা কক্ষ); অভিনয় বা মঞ্চসজ্জাহীন ধর্মীয় বা মহাকাব্যিক নাট্যমুখী বৃহৎ কণ্ঠসংগীত
মূল উপাদানএকক কণ্ঠশিল্পী (Soloists), বিশাল বৃন্দগান (Chorus), পূর্ণাঙ্গ অর্কেস্ট্রা এবং কথক (Narrator/Evangelist)
অপেরার সাথে বৈপরীত্যনাটকীয় গল্প থাকা সত্ত্বেও মঞ্চসজ্জা, কস্টিউম বা অভিনয় থাকে না; বৃন্দগান বা কোরাসের ভূমিকা সবচেয়ে প্রধান
উদ্ভবকাল ও স্থানসপ্তদশ শতকের প্রারম্ভে (১৬০০ খ্রিস্টাব্দ); রোম, ইতালি (সেন্ট ফিলিপ নেরির প্রার্থনামণ্ডপে)
স্বর্ণযুগবারোক ও ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৫০–১৮৫০); বিশেষ করে ইতালি, জার্মানি ও ইংল্যান্ডে
প্রধান বিষয়বস্তুবাইবেলের কাহিনী, ধর্মীয় ইতিহাস, মহাকাব্যিক রূপক বা সর্বজনীন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ
প্রধান রূপকারগণজিয়াকোমো কারিস্সিমি, সেবাস্টিয়ান বাখ, জর্জ ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেল, জোসেফ হাইডন, ফেলিক্স মেন্ডেলসোন
কালজয়ী নিদর্শনহ্যান্ডেলের Messiah, বাখের St. Matthew Passion, হাইডনের The Creation

১. ওরাটোরিওর সংজ্ঞা, গঠন ও মূল নান্দনিকতা

ওরাটোরিও মূলত একক কণ্ঠশিল্পী, গায়কদল (Chorus) এবং অর্কেস্ট্রার জন্য রচিত একটি দীর্ঘায়িত ও জটিল সংগীত রূপ। যদিও এর গঠন রূপরেখা অপেরার মতোই, কিন্তু এর পরিবেশনশৈলী সম্পূর্ণ আলাদা।

ওরাটোরিওর অভ্যন্তরীণ গঠন ও সুরীয় প্রবাহ:

১. কথক / ইভানজেলিস্ট (Narrator/Evangelist): কাহিনীর ব্যাকগ্রাউন্ড ও মূল ঘটনাপ্রবাহ শ্রোতার সামনে পাঠ বা সুর করে উপস্থাপন করেন।

২. রেসিটেটিভ (Recitative): দ্রুত বাচন ভঙ্গিতে কথা বলার মতো করে সুর দিয়ে সংলাপ বা তথ্য পরিবেশন।

৩. আরিয়া (Aria): একক সুরশিল্পীদের অত্যন্ত আবেগময় ও স্বরলিপিনির্ভর মূল একক গান।

৪. কোরাস / বৃন্দগান (Chorus): বাইবেলের জনতা, দেবদূত বা মানবজাতির প্রতিনিধি হিসেবে সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগীয় প্রতিক্রিয়া দান।

        [ কথক / ইভানজেলিস্ট (Narrator): কাহিনীর অগ্রগতি ও প্রেক্ষাপট ]
                                     │
        [ একক কণ্ঠশিল্পী (Soloists): নির্দিষ্ট চরিত্রের আবেগ ও 'আরিয়া' ]
                                     │
        [ বৃন্দগান (Chorus): জনতা, মানবজাতি ও ঈশ্বরের মহাকাব্যিক ঘোষণা ]
                                     │
        [ অর্কেস্ট্রা (Orchestra): সুরের বাঁধন, গতিশীলতা ও আবহ সংগীত ]

১.১. কস্টিউমহীন নাটকীয়তা (Un-staged Drama)

ওরাটোরিওতে কোনো পাত্র-পাত্রী বিশেষ পোশাক পরেন না বা মঞ্চে হেঁটে হেঁটে অভিনয় করেন না। গায়ক-গায়িকারা সাধারণ আনুষ্ঠানিক পোশাক (Concert Attire) পরে হাতে স্বরলিপির বই নিয়ে অর্কেস্ট্রার সামনে দাঁড়িয়ে গান করেন। এতে শ্রোতার দৃষ্টি পোশাক বা অভিনয়ের দিকে না গিয়ে সম্পূর্ণ সুর ও শব্দের গভীরতার দিকে নিবদ্ধ হয়।

১.২. কোরাস বা বৃন্দগানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা

অপেরা যেখানে মূলত একক তারকা গায়কদের (Prima Donna) ‘আরিয়া’র ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, ওরাটোরিওতে সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো ‘কোরাস’। এখানে গায়কদল কখনো উত্তেজিত জনতা, কখনো ভক্ত সমাজ, আবার কখনো স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার মহিমা ঘোষণা করে।

১.৩. ‘ইভানজেলিস্ট’ বা কথকের উপস্থিতি

ওরাটোরিওর একটি অন্যতম বিশেষত্ব হলো কথকের উপস্থিতি (বিশেষ করে জার্মান প্যাশন ওরাটোরিওতে)। তিনি কাহিনীর খণ্ড খণ্ড অংশকে সুরের মাধ্যমে গেয়ে জুড়তে থাকেন, যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে একক আরিয়া বা কোরাসের সৃষ্টি হয়।

২. ঐতিহাসিক বিবর্তন: রেনেসাঁ থেকে আধুনিক যুগ

ওরাটোরিওর ইতিহাস চার্চের আনুষ্ঠানিক লিটার্জি থেকে কনসার্ট হলের মুক্ত মঞ্চায়নের ইতিহাস।

২.১. ইতালীয় সূচনা: সেন্ট ফিলিপ নেরি ও কারিস্সিমি

সপ্তদশ শতকের শুরুতে রোমে সেন্ট ফিলিপ নেরি (St. Philip Neri) সাধারণ মানুষকে চার্চে আকৃষ্ট করার জন্য প্রার্থনার বিরতিতে ধর্মীয় নাটিকা সুর দিয়ে গাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই প্রার্থনাকক্ষগুলোকেই বলা হতো ‘ওরাটোরিও’। ১৬৫০ সালে ইতালীয় সুরকার জিয়াকোমো কারিস্সিমি (Giacomo Carissimi) ল্যাটিন ভাষায় Jephte রচনা করে ওরাটোরিওকে একটি স্বতন্ত্র ও সম্মানজনক সংগীত রূপ দেন।

২.২. বাখ ও জার্মান ‘প্যাশন’ সংগীত

জার্মানিতে লুথেরান চার্চের প্রভাবে ওরাটোরিও এক চরম আধ্যাত্মিক গভীরতা লাভ করে। ইয়োহান সেবাস্টিয়ান বাখ (Johann Sebastian Bach) যীশু খ্রিষ্টের বিচার ও ক্রুশারোহণের ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেন কালজয়ী ‘প্যাশন’ (Passion) ওরাটোরিও। তাঁর St. Matthew Passion ও St. John Passion-কে মানব ইতিহাসের অন্যতম গভীর ধ্যানের সুর বলা হয়।

২.৩. হ্যান্ডেল ও ব্রিটিশ ওরাটোরিও বিপ্লব

জর্জ ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেল (George Frideric Handel) ওরাটোরিওর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপ্লব ঘটান। লেন্ট (Lent) বা খ্রিষ্টীয় মহোপবাসের সময় থিয়েটারে অপেরা প্রদর্শন নিষিদ্ধ ছিল। হ্যান্ডেল বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে ইতালীয় অপেরার নাটকীয়তাকে ইংরেজি ভাষার বাইবেলীয় গল্পের সাথে মিলিয়ে ‘ইংরেজি ওরাটোরিও’ আবিষ্কার করেন। এর ফলে নাটকীয়তা বজায় রইল, অথচ কস্টিউম বা অভিনয় না থাকায় চার্চ ও সরকার এটি কনসার্ট হলে পরিবেশনের অনুমতি দেয়। তাঁর রচিত Messiah, Israel in Egypt ও Judas Maccabaeus বিশ্ববিখ্যাত হয়।

২.৪. ক্লাসিক্যাল ও রোমান্টিক যুগ: হাইডন ও মেন্ডেলসোন

অষ্টাদশ শতকের শেষে জোসেফ হাইডন ইংল্যান্ড সফর করে হ্যান্ডেলের ওরাটোরিও শুনে এতটাই অভিভূত হন যে তিনি ফিরে গিয়ে রচনা করেন The Creation (পৃথিবীর সৃষ্টি) এবং The Seasons। উনবিংশ শতকে রোমান্টিক যুগে ফেলিক্স মেন্ডেলসোন (Felix Mendelssohn) রচনা করেন Elijah, যা ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্যতম জনপ্রিয় সংগীতে পরিণত হয়।

২.৫. বিংশ শতক ও আধুনিক প্রয়োগ

বিংশ শতকে এসে ওরাটোরিও কেবল খ্রিষ্টধর্মীয় কাহিনীর গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতি, যুদ্ধ ও দর্শনে প্রবেশ করে। ইগর স্ট্রাভিনস্কির নিও-ক্লাসিক্যাল অপেরা-ওরাটোরিও Oedipus Rex, মাইকেল টিপেটের বর্ণবাদবিরোধী ওরাটোরিও A Child of Our Time এবং এডওয়ার্ড এলগারের The Dream of Gerontius এই ধারাকে আধুনিক যুগে প্রাসঙ্গিক করে তোলে।

৩. ওরাটোরিওর প্রধান ধরন ও শ্রেণীবিন্যাস

বিষয়বস্তু, ভাষা ও ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ওরাটোরিওকে প্রধানত ৪টি ভাগে ভাগ করা হয়:

ওরাটোরিওর প্রধান চার প্রকারভেদ:

  • ১. ওরাটোরিও ভলগারে (Oratorio volgare): ইতালীয় স্থানীয় লোকভাষায় রচিত ও সাধারণ মানুষের বোধগম্য হালকা ধর্মীয় ওরাটোরিও।
  • ২. ওরাটোরিও লাতিনো (Oratorio latino): ল্যাটিন ভাষায় রচিত অত্যন্ত একাডেমিক, ধর্মীয় ও গম্ভীর ধারার ওরাটোরিও।
  • ৩. প্যাশন ওরাটোরিও (Passion Oratorio): শুভ শুক্রবার (Good Friday) উপলক্ষে কেবল যীশুর শেষ দিনগুলো ও ক্রুশারোহণের ওপর রচিত বিশদ ওরাটোরিও (যেমন বাখের প্যাশনসমূহ)।
  • ৪. সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ ওরাটোরিও (Secular Oratorio): ধর্মীয় কাহিনীর বাইরে গিয়ে ইতিহাস, প্রকৃতি, গ্রিক পুরাণ বা মহাকাব্যিক থিমের ওপর রচিত ওরাটোরিও (যেমন হাইডনের The Seasons)।

৪. কালজয়ী ওরাটোরিও ও বৈচিত্র্যের তুলনামূলক সারণি

সুরকার (Composer)ওরাটোরিওর নাম (Work Title)প্রকাশের সময়ধরন / ভাষাপ্রধান নান্দনিক বৈচিত্র্য
জিয়াকোমো কারিস্সিমিJephte১৬৪৮ল্যাটিন ওরাটোরিওপ্রাথমিক যুগের ট্র্যাজিক সংলাপ ও কোরাসের করুণ আকুতি
সেবাস্টিয়ান বাখSt. Matthew Passion (BWV 244)১৭২৭জার্মান প্যাশন ওরাটোরিওগভীর আধ্যাত্মিকতা, ডাবল কোরাস ও ইভানজেলিস্টের কথন
জর্জ ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেলMessiah (HWV 56)১৭৪১ইংরেজি ওরাটোরিওবিখ্যাত ‘হাল্লেলুয়াহ কোরাস’; বাইবেলের রূপক ও সর্বজনীন আশাবাদ
জোসেফ হাইডনThe Creation (Die Schöpfung)১৭৯৮জার্মান/ইংরেজি ওরাটোরিওপৃথিবীর সৃষ্টির প্রথম আলোক ও প্রকৃতির সংগীতিময় মহাকাব্যিক উন্মোচন
ফেলিক্স মেন্ডেলসোনElijah (Op. 70)১৮৪৬রোমান্টিক ওরাটোরিওবাইবেলীয় নবী ইলিয়াসের ড্রামাটিক ঝড়, আগুন ও নীরব কণ্ঠের সুর
এডওয়ার্ড এলগারThe Dream of Gerontius১৯০০ক্যাথলিক ওরাটোরিওমৃত্যুর পর মানবাত্মার পরকালের যাত্রার পরাবাস্তব মনস্তাত্ত্বিক চিত্রায়ন
ইগর স্ট্রাভিনস্কিOedipus Rex১৯২৭আধুনিক অপেরা-ওরাটোরিওগ্রিক ট্র্যাজেডির ওপর ভিত্তি করে রচিত ল্যাটিন ভাষার নিও-ক্লাসিক্যাল রূপ

৫. কালজয়ী সুরকারদের ওরাটোরিও সাম্রাজ্য

৫.১. হ্যান্ডেলের ‘মেসায়া’ ও ‘হাল্লেলুয়াহ কোরাস’

১৭৪১ সালে মাত্র ২৪ দিনে হ্যান্ডেল তাঁর কালজয়ী ওরাটোরিও Messiah রচনা করেন। এতে কোনো একটি নির্দিষ্ট গল্প বা চরিত্র নেই; বরং এটি মানবজাতির মুক্তি ও খ্রিষ্টের আগমন, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের এক সুবিশাল রূপক। এর দ্বিতীয় অংশের শেষে যখন বিশ্ববিখ্যাত ‘হাল্লেলুয়াহ কোরাস’ (Hallelujah Chorus) বাজানো হয়, তখন লন্ডনের রাজা দ্বিতীয় জর্জ স্বয়ং সম্মানে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন—যা আজও বিশ্বব্যাপী কনসার্ট হলে একটি ঐতিহ্য হিসেবে মানা হয়।

৫.২. বাখের ‘স্টাফ ম্যাথিউ প্যাশন’: হারানো রত্নের পুনর্জন্ম

বাখের জীবদ্দশায় তাঁর St. Matthew Passion খুব একটা মূল্যায়িত হয়নি। বাখের মৃত্যুর পর এটি প্রায় ১০০ বছর ধুলোবালি জমে পড়ে ছিল। ১৮২৯ সালে মেন্ডেলসোন মাত্র ২০ বছর বয়সে এটি উদ্ধার করে পুনরায় পরিবেশন করেন। দ্বৈত গায়কদল (Double Chorus) ও দ্বৈত অর্কেস্ট্রার এই সৃষ্টিটিকে আজ বিশ্ব শাস্ত্রীয় সংগীতের সর্বোচ্চ চূড়া মনে করা হয়।

৫.৩. হাইডনের ‘দ্য ক্রিয়েশন’: অন্ধকারের বুক চিরে আলো

হাইডনের The Creation-এর সূচনা অংশটি সংগীতাঙ্গনে বিখ্যাত। সৃষ্টির পূর্বের বিশৃঙ্খলা (Chaos) বোঝাতে হাইডন অসংগতিপূর্ণ ও অস্পষ্ট সুর ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু যখন কোরাস গেয়ে ওঠে “And there was LIGHT” (এবং আলো এলো), তখন পুরো অর্কেস্ট্রা একসাথে সি-মেজর কর্ডে গর্জে ওঠে, যা শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম শিহরণ জাগানো মুহূর্ত।

৬. ওরাটোরিও বনাম অপেরা: মৌলিক বৈপরীত্য ও সাদৃশ্য

ওরাটোরিও ও অপেরার মধ্যে বাহ্যিক মিল থাকলেও তাদের মূল দর্শনে রয়েছে বিশাল ফারাক:
তুলনার বিষয়ওরাটোরিও (Oratorio)অপেরা (Opera)
মঞ্চায়ন ও অভিনয়অভিনয়, অঙ্গভঙ্গি, রূপসজ্জা বা কস্টিউম সম্পূর্ণ অনুপস্থিতপূর্ণাঙ্গ অভিনয়, পোশাক, থিয়েটার স্টেজ ও দৃশ্যপট বাধ্যতামূলক
বিষয়বস্তুপ্রধানত ধর্মীয়, বাইবেলীয়, নৈতিক বা মহাকাব্যিক রূপকপ্রেম, সামাজিক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ট্র্যাজেডি বা লৌকিক গল্প
কোরাসের ভূমিকাঅত্যন্ত শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় চরিত্র (গল্পের মূল চালিকাশক্তি)গৌণ বা সহায়ক ভূমিকা (প্রধানত নায়ক-নায়িকার ব্যাকগ্রাউন্ডে)
পরিবেশনার স্থানচার্চ বা প্রথাগত কনসার্ট হল (Concert Hall)অপেরা হাউস বা থিয়েটার মঞ্চ
মহোপবাসকাল (Lent)লেন্ট বা খ্রিষ্টীয় সংযমের সময়ও প্রদর্শনের অনুমতি ছিললেন্ট কালে প্রদর্শন ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ ছিল

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

  1. Smither, Howard E. A History of the Oratorio. (4 Volumes), University of North Carolina Press, 1977–2000. (ওরাটোরিওর বিকাশ ও বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রামাণ্য চার খণ্ডের একাডেমিক রেফারেন্স)।
  2. Dean, Winton. Handel’s Dramatic Oratorios and Masques. Oxford University Press, 1959. (জর্জ ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেলের ইংরেজি ওরাটোরিও বিপ্লবের বিস্তারিত বিশ্লেষণ)।
  3. Butt, John. Bach: Mass in B Minor / St. Matthew Passion. Cambridge University Press, 1991. (সেবাস্টিয়ান বাখের ধর্মীয় সংগীত ও প্যাশনের গঠনগত গবেষণা)।
  4. Larsen, Jens Peter. Handel’s Messiah: Origins, Composition, Sources. W. W. Norton & Company, 1972. (‘মেসায়া’ ওরাটোরিওর ইতিহাস ও সুরীয় বৈচিত্র্যের পর্যালোচনা)।
  5. Temperley, Nicholas. The Music of the English Parish Church. Cambridge University Press, 1983. (ইংল্যান্ডের সমাজ ও চার্চে ওরাটোরিওর ঐতিহাসিক প্রভাব)।
  6. Taruskin, Richard. The Oxford History of Western Music: Music in the Seventeenth and Eighteenth Centuries. Oxford University Press, 2005. (বারোক ও ক্লাসিক্যাল যুগের কণ্ঠসংগীতের বিবর্তন)।