ঠান্ডা গোশত – সাদাত হাসান মান্টো | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

সাআদাত হাসান মান্টো (১৯১২–১৯৫৫) রচিত ‘ঠান্ডা গোশত’ (উর্দু: ٹھنڈا گوشت, Punjabi: ਠੰਢੀ ਗੋਸ਼ਤ) দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ওপর লেখা অন্যতম দূরদর্শী, তীব্র এবং বিতর্কিত ছোটগল্প। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত এই গল্পটি দেশভাগের সময়ের কেবল দৈহিক বা রাজনৈতিক ধ্বংসলীলাকে চিত্রায়িত করে না, বরং মানুষের ভেতরের চরম পশুবৃত্তি, যৌন সহিংসতা এবং তার অবচেতন অপরাধবোধের এক নির্দয় মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ ঘটায়।

‘ঠান্ডা গোশত’ এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

পটভূমি ও সামাজিক গুরুত্ব

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পাঞ্জাব ও বাংলা জুড়ে যে অভূতপূর্ব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, গণহত্যা এবং নারী নির্যাতন সংঘটিত হয়েছিল, মান্টো তাকে কোনো রাজনৈতিক আদর্শ বা ধর্মীয় ফ্রেমের ভেতর দিয়ে দেখেননি। ‘ঠান্ডা গোশত’ গল্পে মান্টো দেখিয়েছেন কীভাবে দাঙ্গার মতো মানবসৃষ্ট নারকীয় পরিস্থিতিতে মানুষের নৈতিক ও মানবিক বোধ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং যৌন সহিংসতা কীভাবে যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার ও বর্বরতার শেষ সীমানায় পরিণত হয়।

মূল ভাব ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট

গল্পের মূল চরিত্র ঈশর সিং একজন দাঙ্গাবাজ, যে দাঙ্গার সময় একটি মুসলিম পরিবারের পুরুষদের হত্যা করে এক তরুণী মেয়েকে অপহরণ করে। কিন্তু যখন সে নির্জন স্থানে মেয়েটির ওপর যৌন নির্যাতন চালাতে যায়, তখন সে এক অদ্ভুত মানসিক ও শারীরিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।

১. অপরাধবোধ ও শারীরিক অক্ষমতা: ঈশর সিং একজন পেশীবহুল, নির্মম দাঙ্গাবাজ হওয়া সত্ত্বেও সে মেয়েটিকে স্পর্শ করার পর এক অদ্ভুত মানসিক ধাক্কা খায়। পরবর্তীকালে সে তার স্ত্রী/সঙ্গিনী কুলবন্ত কৌরের সাথে শারীরিক মেলামেশা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। মান্টো এখানে দেখিয়েছেন যে, হিংস্রতা ও পশুবৃত্তির একটি চূড়ান্ত সীমানা রয়েছে; সেই সীমানা অতিক্রম করলে মানুষের অবচেতন মন নিজের অজান্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়।

২. ‘ঠান্ডা গোশত’ রূপক: গল্পে ‘ঠান্ডা গোশত’ শব্দবন্ধটি দ্বি-মাত্রিক রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমত, এটি সেই মৃত মুসলিম মেয়েটির নিথর দেহকে নির্দেশ করে, যাকে জীবন্ত নারী মনে করে ঈশর সিং কাম চরিতার্থ করতে চেয়েছিল। দ্বিতীয়ত, এটি ঈশর সিংয়ের নিজের নৈতিক মৃত্যু, মানবিকতার বিনাশ এবং পশুবৃত্তির পর তার নিজস্ব শরীরের হিমশীতল নিষ্ক্রিয়তাকে বোঝায়।

চরিত্র রূপায়ণ

  • ঈশর সিং: সে দাঙ্গার কোনো আদর্শিক অনুসারী নয়; সে কেবল সহিংসতার স্রোতে ভেসে যাওয়া এক পশুবৃত্তিসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু অপরাধের চরম সীমানায় গিয়ে তার অবচেতন মন তাকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেয়।
  • কুলবন্ত কৌর: ঈশর সিংয়ের সঙ্গিনী। সে হিংসুটে, প্রাক-সামাজিক আদিম কামনায় চালিত এবং সন্দেহপ্রবণ। ঈশর সিংয়ের অনীহাকে সে অন্য নারীর প্রতি আসক্তি মনে করে এবং ঈর্ষার বশে তাকে নিজের কিরপান দিয়ে আঘাত করে। কুলবন্ত কৌর এমন এক সমাজের প্রতিনিধি, যেখানে সহিংসতা ও যৌনতা একটি অপরটির সাথে মিশে আছে।

অশ্লীলতার মামলা ও মান্টোর অবস্থান

‘ঠান্ডা গোশত’ প্রকাশের পর তৎকালীন পাকিস্তানে মান্টোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে “অশ্লীলতা”র (Obscenity under Section 292) অভিযোগ আনা হয় এবং মামলা দায়ের করা হয়। মান্টোর পক্ষে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, সালাহউদ্দিন আহমেদ সহ তৎকালীন প্রখ্যাত প্রগতিশীল সাহিত্যিকরা। মান্টোর আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল স্পষ্ট—তিনি সমাজে যা ঘটেছিল, তা-ই হুবহু সাহিত্যিক আয়নায় প্রতিফলিত করেছিলেন। এই গল্পে কোনো যৌন উত্তেজনা বা উদ্দীপনা নেই; বরং এটি কাম ও সহিংসতার আড়ালে মানুষের আত্মিক মৃত্যুর এক চরম করুণ ও ভয়াবহ দলিল।

২. ‘ঠান্ডা গোশত’ (সম্পূর্ণ গল্পের বাংলা অনুবাদ)

মূল: সাআদাত হাসান মান্টো

হোটেলের ঘরের খাটের ওপর কুলবন্ত কৌর দু-পা ভাঁজ করে বসে ছিল। তার এক হাতে ছিল সোনার চুড়ি, আর চোখ দুটোতে ছিল গভীর সন্দেহ ও ক্ষোভ।

ঈশর সিং ঘরের এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। তার মাথায় পাগড়িটা আধখোলা, হাতে লম্বা কিরপান। সে সারারাত ঘরের বাইরে কাটিয়ে কেবল ফিরেছে। তার চেহারায় একটা অদ্ভুত অপরাধী ও বিভ্রান্ত ভাব।

কুলবন্ত কৌর গর্জে উঠল, “কোথায় ছিলে সারা রাত?”

ঈশর সিং কিরপানটা কাঠের আলমারির ওপর রেখে দিয়ে কোনো উত্তর দিল না। সে গিয়ে খাটের একপাশে শুয়ে পড়ল।

কুলবন্ত কৌর চোখ ছোট ছোট করে তাকে দেখল। ঈশর সিংয়ের পরনে ছিল কেবল কুর্তা আর কাছা। সে বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আবার বলল, “ঈশর সিং, তুমি আমার গহনাগুলো চুরি করে কোন বেশ্যার কাছে কাটিয়ে এসেছ, তাই না? বলো, সতিন বানিয়ে কাকে রেখেছ?”

ঈশর সিং পাশ ফিরে শুলো। তার কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না, যা কুলবন্তের কাছে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঠেকলো। ঈশর সিং সাধারণতঃ অত্যন্ত উগ্র ও চড়া মেজাজের মানুষ। কিন্তু আজ সে যেন সম্পূর্ণ নিস্তেজ।

ঈশর সিং মৃদু স্বরে বলল, “কুলবন্ত… কেউ নেই। আমার গহনাও খোয়া যায়নি।”

“তবে তুমি রাতে বাড়ি ফেরোনি কেন? শহরে লুটপাট চলছে, মানুষ খুন হচ্ছে, আর তুমি কোনো গলিতে মুখ লুকিয়ে বসে ছিলে?”

ঈশর সিং গভীর একটা শ্বাস ফেলল, কিন্তু কিছু বলল না।

কুলবন্ত কৌরের ভেতরে কাম ও সন্দেহের এক তীব্র আগ্নেয়গিরি জমা হচ্ছিল। সে ঈশর সিংয়ের কাছে এগিয়ে এলো। ঈশর সিংয়ের বিশাল চওড়া বুক, গায়ে ঘন লোম। কুলবন্ত তার বুকের ওপর হাত রাখল। সে ঈশর সিংকে কাছে টানার চেষ্টা করল। কিন্তু ঈশর সিংয়ের শরীর থেকে কোনো সাড়া এলো না। সে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে পড়ে রইল।

কুলবন্ত আদর করতে লাগল, চুমু দিল, তাকে উত্তেজিত করার সবরকম চেষ্টা করল। কিন্তু ঈশর সিংয়ের মধ্যে পুরুষের সেই পরিচিত চঞ্চলতা বা উদ্দীপনার কোনো চিহ্নই ছিল না। সে সম্পূর্ণ অচল, নিস্পৃহ এবং অক্ষম হয়ে পড়ে রইল।

কুলবন্ত কৌরের সন্দেহ এবার আগুনে রূপ নিল। সে নিশ্চিত হয়ে গেল যে ঈশর সিং অন্য কোনো নারীর সাথে তার সমস্ত শক্তি ও কামনা উজার করে দিয়ে এসেছে, যার কারণে এখন সে তার কাছে এসে এমন নপুংসকের মতো পড়ে আছে।

“তুমি কোন রাঁড়ির কাছে গিয়েছিলে বলো!” কুলবন্ত চিৎকার করে উঠল।

ঈশর সিং কোনো উত্তর দিল না। সে কেবল অপলক চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

ক্ষোভে, ঈর্ষায় ও কামনার অপূর্ণতায় কুলবন্ত কৌরের মাথা খারাপ হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে এক লাফে আলমারির দিকে গেল। সেখান থেকে ঈশর সিংয়ের ধারালো কিরপানটি খাপ থেকে টেনে বের করে আনল।

“যদি তুমি অন্য কারও হয়ে থাকো, তবে তুমি আর জীবিত থাকবে না!” এই বলে সে উন্মত্তের মতো কিরপানটি ঈশর সিংয়ের ঘাড় ও বুকের সংযোগস্থলে বসিয়ে দিল।

ধারালো কিরপান ঈশর সিংয়ের চামড়া ও মাংস ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেল। রক্তের একটা গরম ফোয়ারা ছিটকে বের হয়ে এলো।

ঈশর সিং কোনো প্রতিরোধ করল না। সে কেবল রক্তমাখা হাত দিয়ে ঘাড়ের ক্ষতটা চেপে ধরল। সে কুলবন্তের দিকে তাকাল, তার চোখে কোনো রাগ বা প্রতিশোধের ভাব ছিল না; সেখানে ছিল কেবল এক অসীম করুণা।

ঈশর সিং ভাঙা গলায় বলল, “কুলবন্ত… তুমি এটা কী করলে?”

রক্তের তোড় দেখে কুলবন্ত কৌরের উন্মাদনা এক মুহূর্তে উবে গেল। সে ভয় পেয়ে গেল। কিরপানটি তার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল। সে দ্রুত এগিয়ে এসে ঈশর সিংয়ের মাথা নিজের কোলে তুলে নিল এবং তার জখম চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল, “ঈশরিয়া… ঈশরিয়া… আমি কী করে ফেললাম! তুমি আমাকে বললে না কেন?”

ঈশর সিং তখন মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল। সে মৃদুস্বরে বলতে শুরু করল:

“কুলবন্ত… শহরের দাঙ্গা যখন শুরু হলো… আমি এক ক্যারাভানে হামলা চালিয়েছিলাম। আমি চারজনকে আমার কিরপান দিয়ে কেটে ফেলি… তাদের ঘরে ঢুকি…”

কুলবন্ত তার কথা শুনছিল, চোখের জলে বুক ভাসিয়ে।

“সেখানে একটা মেয়ে ছিল… কী অসাধারণ সুন্দর একটা মেয়ে, কুলবন্ত! তার চোখগুলো ছিল হরিণীর মতো… আমি তাকে দেখে আর স্থির থাকতে পারলাম না। আমি তাকে কাঁধে তুলে নিলাম। পরিবারের বাকিদের শেষ করে দিয়ে আমি তাকে নিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে চলে গেলাম…”

ঈশর সিং থেমে থেমে শ্বাস নিতে লাগল। রক্তে তার শরীর ভেসে যাচ্ছিল।

“আমি তাকে ঘাসের ওপর শুইয়ে দিলাম… সে কোনো বাধা দিল না, কোনো চিৎকার করল না। আমি উন্মাদ হয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম… আমি তাকে চুমু খেতে গেলাম… তাকে স্পর্ষ করলাম…”

ঈশর সিংয়ের ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল। তার চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

“কিন্তু… কিন্তু কুলবন্ত… যখন আমি তাকে পুরোপুরি স্পর্শ করলাম, তখন বুঝলাম… সে কোনো সাড়া দিচ্ছে না। সে স্পন্দিত হচ্ছিল না… সে অনেক আগেই ভয়ে বা আঘাতে মারা গিয়েছিল…”

ঈশর সিং এক মুহূর্তের জন্য থামল, তারপর এক গভীর ট্র্যাজিক কণ্ঠে বলল:

“আমি… আমি যার সাথে কাম চরিতার্থ করতে চেয়েছিলাম… সে কোনো জীবিত নারী ছিল না, কুলবন্ত… সে ছিল একটা লাশ… একেবারে ঠান্ডা গোশত! সেই লাশের ঠান্ডাত্ব আমার শরীরের ভেতরে ঢুকে গেল… তারপর থেকে আমি আর কখনো পুরুষ হতে পারলাম না…”

ঈশর সিং তার নিজের রক্তভেজা হাতটা তুলল। সে কুলবন্তের হাতটা স্পর্শ করল। তার হাত তখন বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এসেছে।

ঈশর সিং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে অস্ফুট স্বরে বলল, “কুলবন্ত… তোমার হাতটা দাও… আমাকে একটু ছুঁয়ে দেখো… এটা… এটাও কত ঠান্ডা… একদম ঠান্ডা গোশত…”

ঈশর সিংয়ের হাত নিথর হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল।