খোলা দো – সাদাত হাসান মান্টো | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

সাআদাত হাসান মান্টোর ‘খোলা দো’ (উর্দু: کھول دو) ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত একটি কালজয়ী ছোটগল্প। দেশভাগের পটভূমিতে লেখা সাহিত্যের তালিকায় এটি অন্যতম নৃশংস ও শক্তিশালী কাজ। গল্পটিতে কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক ভাষণ নেই, নেই কোনো ঘটনার বড় বিবরণ। খুবই অল্প কথায় মান্টো এখানে এমন এক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন, যা যেকোনো পাঠকের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি ও ধাক্কা তৈরি করে।

‘খোলা দো’ গল্পের বিশ্লেষণ

‘খোলা দো’ গল্পের মূল বিষয় হলো দেশভাগের চরম বিশৃঙ্খলা এবং তার মাঝে মানুষের নৈতিক চরিত্র ও মানবিকতার চূড়ান্ত অবক্ষয়। দেশভাগের সময় যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাচ্ছিল, তখন ধর্ম বা পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল মানুষের ভেতরের পশুবৃত্তি।

গল্পের কেন্দ্রবিন্দু বুড়ো সিরাজউদ্দিন এবং তার মেয়ে সকিনা। দাঙ্গার আগুনে স্ত্রী নিহত হওয়ার পর সিরাজউদ্দিন একমাত্র মেয়েকে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়েছিল। কিন্তু ভিড়ের মাঝে সকিনা হারিয়ে যায়, সিরাজউদ্দিনের হাতে থেকে যায় কেবল মেয়েটির ওড়না। একটি শরানার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার পর সিরাজউদ্দিনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মেয়েকে খুঁজে বের করা।

এখানে মান্টো সমাজের রক্ষক ও ভক্ষকের চরিত্রকে একাকার করে দিয়েছেন। শিবিরে থাকা যে আটজন তরুণ স্বেচ্ছাসেবক সিরাজউদ্দিনকে সাহায্য করার আশ্বাস দেয়, তাদের পোশাকে ছিল সমাজসেবার ছদ্মবেশ। তারা সিরাজউদ্দিনকে বলে, “মেয়ে যদি বেঁচে থাকে, তবে আমরা তাকে খুঁজে বের করবই।” তারা সকিনাকে খুঁজে পায় ঠিকই, কিন্তু তাকে বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বদলে নিজেরাই তার ওপর চালায় নির্মম নির্যাতন। যে যুবকদের ওপর ভরসা করা হয়েছিল, তারাই পরিণত হয় চূড়ান্ত শোষকে।

গল্পের শেষ দৃশ্যটি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে করুণ ও শক্তিশালী ক্লাইম্যাক্সগুলোর একটি। হাসপাতালে অচেতন ও প্রায়-মৃত সকিনাকে আনা হয়। সিরাজউদ্দিন মেয়েটির গালে থাকা মেছতার দাগ দেখে চিনতে পারে। তখন ডাক্তার ঘরের হাওয়া আসার জন্য বলেন, “খিড়কি খোলা দো” (জানলাটা খুলে দাও)।

কিন্তু ‘খোলা দো’ (খুলে দাও) শব্দটি শোনামাত্র অচেতন সকিনার অবচেতন শরীর এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সাড়া দেয়। সে হাত বাড়িয়ে নিজের পাজামার ফিতা খুলে তা নিচে নামিয়ে দেয়। এই একটি সামান্য শারীরিক ভঙ্গি প্রকাশ করে দেয় তার ওপর দিয়ে কত বড় নারকীয় নির্যাতন বয়ে গেছে।

এখানে ট্র্যাজেডি দ্বিগুণ হয়ে ওঠে সিরাজউদ্দিনের প্রতিক্রিয়ায়। মেয়েটির ওপর কী ঘটে গেছে তা বুঝতে না পেরে, কেবল হাত নড়তে দেখে সিরাজউদ্দিন আনন্দে চিৎকার করে ওঠে— “আমার সকিনা বেঁচে আছে!”

ডাক্তারের শরীর থেকে ততক্ষণে অপরাধ ও আতঙ্কের ঘাম ছুটছে, আর একজন বাবা মেয়ের এই ধসে যাওয়া অস্তিত্বের ভেতরেই জীবনের চিহ্ন খুঁজে পেয়ে আনন্দিত হচ্ছে। মান্টো এখানে দেখিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে চরম বিপর্যয় মানুষের স্বাভাবিক বোধশক্তিকেও কেড়ে নেয়।

‘খোলা দো’ (বাংলা অনুবাদ)

মূল: সাআদাত হাসান মান্টো

বিশেষ এক ট্রেন অমৃতসর থেকে ছেড়ে বেলা দুটোয় মোঘলপুরা পৌঁছেছিল। রাস্তায় বহু লোক মারা পড়েছে, অনেকে জখম হয়েছে, আর অনেকেই হারিয়ে গেছে।

সকাল দশটায় ক্যাম্পের মাটিতে শুয়ে থাকা সিরাজউদ্দিন যখন চোখ খুলল, তার মাথার ভেতরটা পুরো ফাঁকা। চারপাশের এই ভিড়, চিৎকার আর হট্টগোলের ভেতরে সে স্থির হয়ে বসে রইল। সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করছিল।

কোথায় তার স্ত্রী? কোথায় তার মেয়ে সকিনা?

হঠাৎ তার চোখের সামনে দাঙ্গার আগুন জ্বলে উঠল। ঘরবাড়ি জ্বলছে, চারদিকে ছোটাছুটি, গুলির শব্দ। সে তার স্ত্রীকে দেখতে পেল, যে ঘরের মেঝেতেই মারা পড়েছিল। আর সকিনা? সকিনা তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, ভয়ে কাঁপছিল।

তার মনে পড়ল, সে সকিনাকে নিয়ে রাস্তায় নেমে দৌড়াতে শুরু করেছিল। রাস্তায় যেতে যেতে সকিনার ওড়নাটা খসে পড়ে যায়। সিরাজউদ্দিন ওড়নাটা তুলতে গেলে সকিনা চিৎকার করে উঠেছিল, “বাবা, ওড়না ছাড়ো! দৌড়াও!”

সিরাজউদ্দিন তার পকেটে হাত দিল। সেখানে এক টুকরো কাপড় দলা পাকিয়ে রাখা। সে কাপড়টা বের করে দেখল— ওটা সকিনারই ওড়না। কিন্তু সকিনা কোথায়?

সিরাজউদ্দিনের মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। সে উঠে দাঁড়িয়ে ক্যাম্পের চারদিকে ঘুরতে শুরু করল। যাকে দেখছিল, তাকেই জিজ্ঞেস করছিল, “তুমি কি আমার মেয়ে সকিনাকে দেখেছ? তার গাল দুটো ফর্সা, ডান গালে একটা কালো মেছতার দাগ আছে… আমি তাকে হারিয়ে ফেলেছি।”

কিন্তু সবারই নিজের নিজের স্বজন হারানোর ব্যথা ছিল। সিরাজউদ্দিনের কথা শোনার সময় কারও ছিল না।

দিন চারেক পর সিরাজউদ্দিন ক্যাম্পের আটজন তরুণের মুখোমুখি হলো। তাদের হাতে বন্দুক ছিল, কাঁধে লরি চালানোর অভিজ্ঞতা। তারা মানুষকে সাহায্য করার কাজ করছিল। সিরাজউদ্দিন তাদের কাছে গিয়ে কেঁদে ফেলল, “বাবা, আমার মেয়ে সকিনাকে কি তোমরা খুঁজে দিতে পারো? তার গালে একটা মেছতার দাগ আছে… খুব সুন্দরী মেয়ে।”

তরুণেরা আশ্বাস দিল, “চাচা, তুমি চিন্তা করো না। তোমার মেয়ে যদি বেঁচে থাকে, তবে আমরা তাকে খুঁজে বের করে তোমার কোলে ফিরিয়ে দেব।”

তারা চেষ্টা চালাতে লাগল। কয়েকদিন পর এক রাতে তারা শহরের কাছে এক নির্জন রাস্তায় একটা মেয়েকে দেখতে পেল। মেয়েটি রাস্তার পাশে পড়ে ছিল। তাদের লরির আলো মেয়েটার ওপর পড়ল। তারা লরি থামিয়ে নিচে নেমে এলো।

মেয়েটির গালে একটা কালো মেছতার দাগ ছিল।

তরুণদের একজন জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি সকিনা?”

মেয়েটি ভয়ে কোনো কথা বলতে পারল না।

তরুণেরা তাকে কিছু খাবার দিল, পানি দিল। তারপর তাকে লরিতে তুলে নিয়ে গেল।

ওদিকে সিরাজউদ্দিন রোজ রাতে আল্লার কাছে দোয়া করত, “হে আল্লাহ, আমার সকিনাকে ভালো রেখো। ওই তরুণদের সাহায্য করো যেন তারা আমার মেয়েকে এনে দিতে পারে।”

একদিন বিকেলে ক্যাম্পে গোলমাল শোনা গেল। চারজন লোক একটা স্ট্র্যাচার বয়ে নিয়ে আসছিল। সিরাজউদ্দিন ভিড় ঠেলে সামনে গেল। লোকগুলো স্ট্র্যাচারটি ক্যাম্পের অস্থায়ী হাসপাতালের ঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।

সিরাজউদ্দিনও তাদের পেছনে পেছনে ভেতরে ঢুকল।

হাসপাতালের ঘরে বেডের ওপর স্ট্র্যাচার থেকে একটি মেয়েকে নামিয়ে রাখা হলো। মেয়েটির পরনে কোনো ভালো কাপড় ছিল না, শরীরটা সম্পূর্ণ নিস্তেজ। ঘরের লাইট জ্বালানো হলো।

সিরাজউদ্দিন এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকাল। গালে একটা কালো মেছতার দাগ।

সিরাজউদ্দিন চিৎকার করে উঠল, “সকিনা!”

ডাক্তার, যিনি টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে একটা ফাইল দেখছিলেন, তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। মেয়েটির পালস পরীক্ষা করে দেখলেন। তারপর ঘরের ভেতরের পরিবেশটা কেমন যেন দমবন্ধ লাগায় তিনি বারান্দার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “খিড়কি খোলা দো…” (জানলাটা খুলে দাও…)

কথাটা ঘরের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হলো— “খোলা দো…” (খুলে দাও…)

স্ট্র্যাচারে পড়ে থাকা বেহুশ মেয়েটির হাত দুটো কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে হাত দুটো তুলল। তারপর কোনো আওয়াজ না করে, সম্পূর্ণ যান্ত্রিকভাবে নিজের সালোয়ারের ফিতাটা খুলে তা নিচে নামিয়ে দিল।

বৃদ্ধ সিরাজউদ্দিন আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “আমার সকিনা বেঁচে আছে! ডাক্তার সাহেব, দেখুন… আমার মেয়ে বেঁচে আছে!”

ডাক্তারের শরীরটা এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। তার কপাল বেয়ে ঠাণ্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়তে লাগল।